লক্ষ্ণৌর বিখ্যাত ফিরিঙ্গি মহল। সময়টা গত শতকের বিশের দশকেরও আগে। তৎকালীন ভারতের মুসলিম উন্মেষের অন্যতম কেন্দ্র ছিল ফিরিঙ্গি মহল। তারপর কেটেছে ১০০ বছরেরও বেশি। সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে অনেক কিছু। বদলে গেছে মানুষের চালচলন, ভারত ও লক্ষ্ণৌ। কিন্তু ফিরিঙ্গি মহলের দেয়াল এখনো ইতিহাস ধরে রাখে। তার দেয়ালে চলে ফিসফিসানি। সে বিমূর্ত বিষয়ের বাইরেও আছে অনেক ভৌত বিষয় ও বস্তু। যেমন ফিরিঙ্গি মহলে সংরক্ষিত বহু সম্পদের মধ্যে একটি খড়মও আছে। তবে সেটি যে-সে খড়ম না। এর মালিক স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী। তিনি ফিরিঙ্গি মহলে গেলে ওই খড়ম জোড়াই পরতেন। আর বিশের দশকে তিনি কয়েকবারই গেছেন ফিরিঙ্গি মহলে।

দিল্লির মোগল শাসন দুর্বল হলে ধীরে ধীরে ইসলামী সংস্কৃতি ও ক্ষেত্রবিশেষে মুসলিমদের ক্ষমতার কেন্দ্র হয়েছিল লক্ষ্ণৌ। ভারতে ব্রিটিশ শাসনামলেও লক্ষ্ণৌ ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংস্কৃতি, অর্থনীতি, আন্দোলন প্রতিটি ক্ষেত্রেই অবদান রেখেছিল লক্ষ্ণৌ। সেখানেও মুসলিম ও ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ হয়েছিল ফিরিঙ্গি মহলে। সাধারণ একটি দালান থেকে এটি পরিণত হয়েছিল আন্দোলন, পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে। খেলাফত আন্দোলনের সময় ফিরিঙ্গি মহল বাড়িটি ছিল উত্তর ভারতে খেলাফত আন্দোলনজনিত পরিকল্পনার পাওয়ার হাউজ। আন্দোলনের অন্যতম কাণ্ডারি মাওলানা আবদুল বারী (১৮৭৮-১৯২৬ খ্রিস্টাব্দ) এতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। তার আমন্ত্রণ ও চেষ্টায়ই মহাত্মা গান্ধী ফিরিঙ্গি মহলে আসেন। মুসলিম সংস্কৃতি, শিক্ষা ও অন্যান্য বিষয়ে ফিরিঙ্গি মহল আগে থেকেই অবদান রাখলেও মহাত্মা গান্ধীর সেখানে যাতায়াত পুরো ভারত ও ব্রিটিশ শাসনের কাছে ফিরিঙ্গি মহলকে আলোচিত করে তোলে।

ফিরিঙ্গি মহল ও এর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে কিছু বলে নেয়া ভালো। একসময় লক্ষ্ণৌর বাড়িটি ছিল পর্তুগিজ ব্যবসায়ীদের মালিকানায়। সে কারণেই নাম ফিরিঙ্গি মহল। ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দে বাদশাহ আওরঙ্গজেব এ ‘হাভেলি’টি মাওলানা কুতুব-উদ-দীনের পরিবারকে দান করেন। ১৭০১ খ্রিস্টাব্দে কুতুব-উদ-দীনের পুত্র মাওলানা নিজাম-উদ-দীন ফিরিঙ্গি মহলে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নিজেই সে মাদ্রাসায় প্রায় ৫০ বছর শিক্ষকতা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে পরবর্তী ২০০ বছর ফিরিঙ্গি মহল ভারতের ইসলামী শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। সেখানকার শিক্ষক, ছাত্রদের হাত থেকে আরবি, ফার্সি ও উর্দুতে বহু বই এসেছে। এর বেশির ভাগই ফিকহ বিষয়ে। মাওলানা আবদুল হাই একাই ১০০-এর বেশি বই লিখেছেন। নিজেদের একটা সময় তারা ‘ফিরিঙ্গি মহলি’ বলতে শুরু করেন। তাদের লেখা বই এখনো দেওবন্দি ও বেরেলভি উভয় তরিকায় পড়ানো হয়। কিন্তু ইসলামী শিক্ষায় তাদের অবদান নিয়ে আলাপের পেছনে পড়ে গেছে খিলাফত আন্দোলন ও গান্ধী প্রসঙ্গ।

মাওলানা আবদুল বারীর চেষ্টা ও পরিকল্পনায় মহাত্মা গান্ধী ফিরিঙ্গি মহলে গিয়েছিলেন। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী তখন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে ভারতীয় রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছেন। জনপ্রিয়তাও পেয়েছেন অনেক। সে সময় তার লক্ষ্ণৌ ভ্রমণের কথা জানানো হলো। মাওলানা মোহাম্মদ আলী টেলিগ্রাম করে এ তথ্য পৌঁছে দেন আবদুল বারীর কাছে। তিনি মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে কথা বলে তাকে ফিরিঙ্গি মহলে নিয়ে যান। বাড়িটিতে গান্ধী বেশ কয়েকবার গেছেন এবং থেকেছেন। অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলন একই সময়ে চলছিল। ফিরিঙ্গি মহলের মুসলিম গোষ্ঠীর সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর সংযুক্তি ব্রিটিশদের সরাসরি কিছু বার্তা দিয়েছিল।

১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড এবং কাছাকাছি সময়ে ব্রিটিশদের অত্যাচার বাড়ছিল ভারতীয়দের ওপর। মুসলিম সমাজের প্রতিই তাদের এক ধরনের বিদ্বেষ দেখা যাচ্ছিল। সে সময় ফিরিঙ্গি মহল মুসলিম উন্মেষের চেষ্টা থেকে বেশকিছু কাজ করেছিল। মুসলিমদের মধ্যে সচেতনতা ও রাজনৈতিক জ্ঞান বাড়ানোর জন্য শিক্ষা ও সামাজিক আন্দোলন চলছিল লক্ষ্ণৌয়ে। কিন্তু এর মধ্যে প্রয়োজন ছিল আরো বড় কোনো শক্তির। গান্ধীর অন্তর্ভুক্তি সেটিই দিয়েছিল।

বিশ শতকের বিশের দশক শুরু হওয়ার আগে ব্রিটিশরা ভারতের মুসলমানদের প্রতি অনেকটাই বিরূপ ছিল। সে সময় খেলাফত আন্দোলন শুরু হয়। বিশ্বের মুসলিমদের জন্য এ আন্দোলন বিশেষ হয়ে উঠেছিল। ভারতের ক্ষেত্রে লক্ষ্ণৌয়ে খেলাফত আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র তৈরি হয়। ব্রিটিশরা যখন ভারতীয় মুসলমানদের প্রতি বিরূপ হচ্ছে সে সময় ভারতের কয়েকজন মাওলানা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। এর পর পরই খেলাফত আন্দোলন বেগবান হয়। মাওলানা মোহাম্মদ আলী, মাওলানা শওকত আলী, হাকিম আজমল খান, আবদুল কালাম আজাদ, মুখতার আনসারি, হসরত মোহানির মতো নেতাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মাওলানা আবদুল বারীও। তিনি ‘আখুয়াত’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এতে ইসলাম ও মুসলিম নিয়ে নানা ধরনের লেখা প্রকাশ হতো। লক্ষ্ণৌ তার নিজের এলাকা এবং সেখানে তিনি প্রভূত প্রভাব তৈরি করেছিলেন, যার প্রমাণ মেলে গান্ধীকে ১৯১৯ সালের মার্চে ফিরিঙ্গি মহলে নিয়ে আসার মাধ্যমে।

মাওলানা আবদুল বারী বুঝেছিলেন হিন্দু-মুসলমান ঐক্য ওই সময় সবচেয়ে প্রয়োজন ছিল। তিনিই বলেছিলেন হিন্দু-মুসলিমকে একত্র করার কাজটা মহাত্মা গান্ধী করতে পারেন। গান্ধী ও কংগ্রেস সে সময় স্বরাজ নিয়ে আগ্রহী ছিল। তারা স্বরাজের আন্দোলন করছিলেন। মাওলানা আবদুল বারী মনে করতেন স্বরাজ ও খেলাফত একত্রে লড়া গেলে ভারতেও হিন্দু-মুসলিম ঐক্য আনা সম্ভব। এর পরই তিনি মহাত্মা গান্ধীকে ফিরিঙ্গি মহলে নিয়ে আসেন। এ জায়গা থেকে বলা যায়, ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলনের একটা কাঠামোগত চেহারা দেয়ায়ও ফিরিঙ্গি মহলের অবদান আছে।

গান্ধী সে সময় জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। অন্যদিকে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে একটা চাপান-উতোর চলছিল। মাওলানা বারী মহাত্মা গান্ধীকে একাধিকবার নিমন্ত্রণ জানান ফিরিঙ্গি মহলে আতিথ্য নেয়ার। তিনি মুসলিমদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে আন্দোলনে কাজে লাগাতেন। এরপর তার চেষ্টায় মহাত্মা গান্ধী ফিরিঙ্গি মহলে আসেন এবং আশপাশের এলাকায় ঘুরে স্বরাজ, অসহযোগ, হিন্দু-মুসলিম সংহতি নিয়ে কথা বলেন। গান্ধীর থাকার ব্যবস্থা ফিরিঙ্গি মহলেই হয়েছিল। তিনি ১৯১৯ সালের মার্চে প্রথম গিয়েছিলেন ফিরিঙ্গি মহলে। একই বছর আবার সেপ্টেম্বরে তিনি সেখানে যান অল ইন্ডিয়া কনফারেন্সে। এ আয়োজনে মাওলানা আবদুল বারীও অংশ নিয়েছিলেন।

গান্ধী যে সময় ফিরিঙ্গি মহলে অবস্থান করেছেন সে সময়ে ফিরিঙ্গি মহল ও তার আশপাশের মুসলিম পরিবারগুলো মাংস রান্না থেকে বিরত থেকেছে বলে জানা যায়। গান্ধীর প্রতি সম্মান জানাতেই তারা এ কাজ করেছেন। এছাড়া গান্ধীর ছাগলের (গান্ধী একটি ছাগল সঙ্গে রাখতেন) যত্ন-আত্তিতেও কোনো ত্রুটি হয়নি। মহাত্মা গান্ধী তার স্মৃতিচারণে বলেছেন তার বসবাসের সময় একজন হিন্দু রাঁধুনি রাখা হয়েছিল।

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে এ আলাপে। মাওলানা আবদুল বারী রীতিমতো মহাত্মা গান্ধীকে কয়েকজন সুফির সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দেন। এমনকি গান্ধীর মৃত্যুর আগের দিন তার জনসভা ছিল মেহেরাউলিতে কুতুব-উদ-দীন বখতিয়ার কাকীর মাজারে। সেখানে মাওলানা বারীর পুত্র মাওলানা জামাল মিয়া ফিরিঙ্গি মহলির সঙ্গে দেখা হয়েছিল মহাত্মা গান্ধীর। জামাল মিয়া জানতে চেয়েছিল মহাত্মা গান্ধী কী করে বখতিয়ার কাকীকে চেনেন। এর উত্তরে গান্ধী জানিয়েছিলেন, জামালের পিতা মাওলানা আবদুল বারী তাকে এ সুফির সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিলেন।

১৯২২ সালে মহাত্মা গান্ধীকে আবদুল বারী আহমেদাবাদ থেকে আজমিরে আমন্ত্রণ করেন। সেখানে তারা মঈনুদ্দীন চিশতির দরগায় গজল শুনেছিলেন। আবদুল বারীর প্রপৌত্র আদনান জানান, গজলটি লিখেছিলেন মাওলানা মোহাম্মদ আলী আর তা উর্দু থেকে অনুবাদ করে গান্ধীকে শুনিয়েছিলেন খেলাফত কমিটির আরেক সদস্য ডাক্তার সৈয়দ মাহমুদ।

গান্ধীর সঙ্গে মাওলানা বারীর সম্পর্কটা ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। ফিরিঙ্গি মহলও গান্ধীকে আপন করে নিয়েছিল। ফিরিঙ্গি মহলে তার একাধিক উপস্থিতি ভারতের মানুষকে খেলাফত ও স্বরাজে একত্র হওয়ার বিষয়টি বুঝিয়েছিল। তারাও একসঙ্গে আন্দোলন করার মর্ম বুঝেছিলেন। গান্ধীর পর জওহরলাল নেহরু ও সরোজিনী নাইডুও একাধিকবার ফিরিঙ্গি মহলে গিয়েছেন এবং নীতিনির্ধারণী বহু সিদ্ধান্ত সেখান থেকেই এসেছে।

মাহমুদুর রহমন: লেখক ও সাংবাদিক