জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বর্তমান বিশ্বের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমে বাড়ছে। প্রতিনিয়ত তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলে বরফ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং জলবায়ুর অনিয়মিত পরিবর্তন ঘটছে। ফলে পরিবেশ, মানুষের জীবন ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হচ্ছে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে। চরম আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও খরার কারণে কৃষি খাতে উৎপাদন যেমন কমছে, তেমনি এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি খামারেও। বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও উষ্ণমণ্ডলীয় দেশগুলোয় যেখানে অধিকাংশ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা এবং জীবিকা নির্ভর করে কৃষি ও প্রাণিসম্পদের ওপর, সেখানে ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলগুলো এমনিতেই ক্ষতিকর প্রভাবের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে এসব অঞ্চলের ব্রয়লার মুরগির খামারগুলো মারাত্মক উৎপাদন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। দ্রুত বৃদ্ধি ও অধিক মাংস উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ব্রয়লার মুরগির জাতগুলো মূলত অনুকূল পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উচ্চ তাপমাত্রা, আর্দ্রতার তারতম্য এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হতে বাধা দিচ্ছে। ফলে মুরগির স্বাভাবিক বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা ব্যাহত হচ্ছে। পরিবর্তিত জলবায়ু ব্রয়লার মুরগির সর্বোত্তম বৃদ্ধি এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাপী খাদ্য জোগানে ব্রয়লার উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গত কয়েক দশকে বিশ্বব্যাপী মুরগির মাংস উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় এর প্রসার আরো লক্ষণীয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, আমিষের চাহিদা এবং উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা এ বৃদ্ধির প্রধান কারণ। উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে পোলট্রি খামারের কিছু প্রাকৃতিক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এর ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে তা বিবেচনা করা জরুরি। ব্রয়লার শিল্প অন্যান্য পশু উৎপাদন ব্যবস্থার তুলনায় কম কার্বন নিঃসরণ করলেও সামগ্রিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে এর অবদান কম নয়। খাদ্য উৎপাদন, খামারে শক্তির ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এ শিল্পের গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের প্রধান উৎস। বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং এতে চরম আবহাওয়ার প্রকোপ ক্রমে উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। খাদ্য উৎপাদনের প্রক্রিয়া বিশেষ করে ভূমির ব্যবহার ও পরিবহন কার্বন নিঃসরণে প্রভাব ফেলে।
একদিকে পোলট্রি শিল্প গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, আবার এ পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়ে পোলট্রি প্রজাতিগুলোর ওপর। কারণ অন্যান্য খাদ্য উৎপাদনকারী প্রাণীর তুলনায় মুরগি এ পরিবর্তনের প্রতি বেশি মাত্রায় সংবেদনশীল। ফলে তাপমাত্রাজনিত ধকল বাড়ায় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে ব্রয়লার উৎপাদন। কেননা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে ব্রয়লার উৎপাদনের ক্ষেত্রে উচ্চ তাপমাত্রা, বেশি আর্দ্রতা এবং ভেজা ও শুষ্ক মৌসুমের মতো বেশকিছু পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা ব্রয়লারের জন্য তাপীয় চাপ (হিট স্ট্রেস) সৃষ্টি করে, যা তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও উৎপাদনক্ষমতা ব্যাহত করে। তাপীয় চাপ হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে প্রাণিদেহের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে শরীর অতিরিক্ত উত্তাপ গ্রহণ করলেও নিজেকে ঠাণ্ডা করার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারে না, যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্রয়লার মুরগিও একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রার মধ্যে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এবং এ সীমা অতিক্রম করলে তাদের শারীরিক কার্যকারিতা কমে যায়। পরিবর্তিত জলবায়ুর কারণে উত্তপ্ত আবহাওয়া ও অতিরিক্ত আর্দ্রতা মুরগির স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। হিট স্ট্রেসের কারণে একদিকে ব্রয়লারের খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কমে যায়, অন্যদিকে দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় হয় অতিরিক্ত শক্তি। ফলে তাদের পুষ্টির সঠিক ব্যবহারও বিঘ্নিত হয়। এতে তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা কমে যায়। উচ্চ তাপমাত্রা ও তাপীয় চাপ ব্রয়লারের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও কমিয়ে দেয়। ফলে তারা বিভিন্ন রোগের প্রতি আরো সংবেদনশীল হয়ে ওঠে এবং সহজেই বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং প্রাকৃতিক জলাধারের অসম বণ্টন ব্রয়লারের শরীরে পানিশূন্যতা, খাদ্য গ্রহণে অনীহা এবং পুষ্টি উপাদানের সঠিক শোষণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এছাড়া ঝড়, বন্যা ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্রয়লারের খামার, খাদ্য সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ব্রয়লারের খাদ্য যেমন সয়াবিন ইত্যাদির উৎপাদনও ব্যাহত হতে পারে। ফলে পোলট্রি খাদ্যের দাম বাড়ে এবং গুণগত খাদ্যের অভাব দেখা দেয়, যা ব্রয়লারের বৃদ্ধি ও উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তবে কিছু কার্যকর ব্যবস্থাপনা কৌশল গ্রহণ করলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা করে ব্রয়লার উৎপাদনকে টেকসই করা যেতে পারে। খামারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে শীতলীকরণ ব্যবস্থা নিলে হিট স্ট্রেসের মতো পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। খামারের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখতে আর্দ্রতা শোষণকারী মেঝে এবং নিয়মিত লিটার পরিবর্তন নিশ্চিত করা জরুরি। গরম আবহাওয়ায় মুরগির চাহিদা অনুযায়ী মানসম্পন্ন ও সহজে হজমযোগ্য খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। পর্যাপ্ত ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং প্রয়োজনে শীতল পানির ব্যবস্থা অতিরিক্ত তাপজনিত সংকট এড়াতে সহায়ক হতে পারে। মুরগির সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের জন্য কঠোর জৈবনিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি সময়মতো টিকা প্রদানও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
টেকসই ব্রয়লার প্রজননের উন্নয়নে সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের সমন্বিত নীতিমালা এবং পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। শক্তি সাশ্রয়ী খামার স্থাপন, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এবং টেকসই খাদ্য উৎসের জন্য সরকারি প্রণোদনা পোলট্রি খাতের উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি ব্রয়লারের খামার থেকে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন করা উচিত। তাপ সহনশীল জাত উন্নয়ন, জলবায়ুবান্ধব খাদ্য এবং আধুনিক মনিটরিং প্রযুক্তির গবেষণায় বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্রয়লার শিল্পের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে টেকসই ব্রয়লার উৎপাদনের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময়। উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, জলবায়ু সচেতন পদ্ধতি এবং সমন্বিত নীতিমালার মাধ্যমে এ শিল্পের প্রতিবন্ধকতাগুলো অতিক্রম করা সম্ভব। গরম সহনশীল জাত উদ্ভাবন, উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পোলট্রি খাত থেকে কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়ক হবে। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক খাতের সম্মিলিত প্রচেষ্টা টেকসই ব্রয়লার উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা








