আল-কিন্দি নবম শতাব্দীর ইসলামী স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক ছিলেন। তিনি প্রথম ইসলামী ও আরবীয় দার্শনিক নামেও ব্যাপকভাবে খ্যাতিমান। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল, প্লেটোবাদী এবং অন্যান্য গ্রিক গণিতজ্ঞ ও বিজ্ঞানীর রচনাগুলো আরবিতে অনুবাদ করে সমকালে খ্যাতি অর্জন করেন। পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আল-কিন্দির নিজস্ব চিন্তাভাবনা নব্য-প্লেটোনিজমে অনুপ্রাণিত ছিল, অবশ্য দর্শনচর্চায় তার ওপর অ্যারিস্টটলেরও প্রভাব ছিল। তিনি মনোবিজ্ঞান, মহাতত্ত্ব, গণিত ও বিজ্ঞানে ব্যাপক চর্চা ও গ্রন্থ রচনা করেন। পাশাপাশি তিনি আরবি ও ল্যাটিন উভয় ঐতিহ্যেই জ্যোতির্বিদ্যা ওপর লেখার জন্য পরিচিত ছিলেন।
আল-কিন্দি সম্পর্কে প্রাচীন, ইসলামী ও মধ্যযুগীয় দর্শনের মার্কিন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক পিটার এডামসনের মন্তব্য হলো, ‘আল-কিন্দির মতো খুব কম দার্শনিকই আছেন যিনি জনসাধারণ এবং দার্শনিক উভয় শ্রেণীকে আকর্ষণ করতে পেরেছেন। এর দুটি কারণ—প্রথমত, তিনি আরব দার্শনিক ঐতিহ্যের প্রথম ব্যক্তি। দ্বিতীয়ত, তার চিন্তা ব্যাপকভাবে পূর্ববর্তী গ্রিক দর্শন ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সেই মিথস্ক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা।’
জীবন ও কর্ম
আল-কিন্দি আরবের কিন্দা বংশে জন্মগ্রহণ করেন। আল-কিন্দির বাবার নাম ইশাআক ইব্ন আল-সাব্বাহ। তিনি কুফার গভর্নর ছিলেন। কিন্দা বংশের লোকেরা ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
আল-কিন্দির জন্মের সঠিক তারিখ জানা যায় না। স্ট্যানফোর্ড এনসাইক্লোপিডিয়া অব ফিলোসফিতে বলা হয়েছে, তিনি ৮৬৬ খ্রিস্টাব্দের পরে মৃত্যুবরণ করেন এবং সাধারণত তার মৃত্যুর সময় ৮৭০-এর দশকের গোড়ায় ধরা হয়। তিনি খলিফা আল-মামুনের শাসনামলের সময় একজন পণ্ডিত হিসেবে কাজ করেন। আল-মামুনের শাসন শেষ হয় ৮৩৩ সালে। পরে আল-কিন্দি খলিফা আল-মু’তাসিমের (শাসনকাল ৮৩৩-৮৪২) সঙ্গেও কাজ করেন। এ কারণে আল-কিন্দির জন্ম আনুমানিক ৮০০ সালের কাছাকাছি কোনো এক সময় বলে ধরা নেয়া হয়। ইতিহাসবিদ অধ্যাপক পিটার এডামসনও এ তথ্য সমর্থন করেছেন।
আল-কিন্দির জীবনীকাররা জোর দিয়ে উল্লেখ করেন, আল-কিন্দি ছিলেন কিন্দার এক রাজার সরাসরি বংশধর। এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলামী হিস্ট্রিতে প্রফেসর ড. নাজির আহমেদ বলেছেন, প্রখ্যাত কিন্দা বংশ মূলত দক্ষিণ ইয়েমের অধিবাসী। সেই বংশের কুফায় বসবাস করা পরিবারে আল-কিন্দি জন্মগ্রহণ করেন।
আল-কিন্দি জীবনের প্রথম দিকে বাগদাদে চলে আসেন বলে মনে করা হয়। এরপর তিনি সেখানেই শিক্ষা লাভ করেন। ইবনে আবি উস আইবিয়া দাবি করেন, আল-কিন্দি খলিফা আল-মামুন ও আল-মু’তাসিমের অধীনে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। অবশ্য আল-মু’তাসিমের খিলাফতকালেই তার কর্মজীবন সর্বোচ্চ শিখরে উঠেছিল। আল-মু’তাসিমের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকাকালে আল-কিন্দি দার্শনিক কর্মজীবনে উৎকর্ষ লাভ করেন। সে সময় তার সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা ‘অন ফার্স্ট ফিলোসফি’ রচনা করেন এবং এটি খলিফাকেই উৎসর্গ করেছিলেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যে আল-মু’তাসিমের ছেলে আহমদ আল-কিন্দির কাছে শিক্ষা লাভ করেছিলেন। সেই সুবাদে ছাত্র আহমদ শিক্ষক আল-কিন্দির অসংখ্য গ্রন্থ সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন।
দর্শনচর্চা ও অনুবাদ
আল-কিন্দির দার্শনিক কর্মকাণ্ড ছিল মূলত অনুবাদ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। অবশ্য আব্বাসীয় খলিফারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রচার-প্রসারের জন্য এ অনুবাদ কার্যক্রম আল-কিন্দির জন্মের আগেই শুরু করেছিলেন। নবম শতাব্দীতে আল-কিন্দি অনুবাদকদের দুটি প্রধান দলের একটির তত্ত্বাবধান করেছিলেন (অন্য দলের নেতৃত্বে ছিলেন হুনাইন ইবনে ইসহাক)। এ সময় দর্শন ও বিজ্ঞানের অসংখ্য রচনা গ্রিক থেকে আরবি ভাষায় অনুবাদ করা হয়। আল-কিন্দি এ অনুবাদকদের পৃষ্ঠপোষক এবং প্রকৃতপক্ষে অনুবাদকারী পণ্ডিতদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন। তার সঙ্গে কাজ করা অনেকেই সিরিয়ান খ্রিস্টান বা সিরিয়ান বংশোদ্ভূত ছিলেন। তার নিজস্ব লেখা একটি ধারাবাহিক জনসংযোগ প্রচারণার মতো ছিল। নবম শতাব্দীর সমসাময়িক মুসলিম পাঠকদের কাছে গ্রিক চিন্তা প্রদর্শন ও প্রচার করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

ক্রিপটোলোজি নিয়ে আল-কিন্দির পাণ্ডুলিপি সূত্র: মুসলিম হেরিটেজ ডটকম
দর্শনচর্চা ও অনুবাদের রাজনীতি
ব্রিটিশ গবেষক ও অধ্যাপক দিমিত্রি গুটাসের মতে. গ্রিক বিজ্ঞান ও দর্শনের বিপুল ভাণ্ডার আরবিতে অনুবাদ না হলে তা হয়তো হারিয়ে যেত। তবে তিনি দাবি করেন যে এ অনুবাদকর্ম শুধু জ্ঞানের সংস্কার ও প্রসারের জন্যই করা হয়েছে বিষয়টি এমন নয়, বরং এর মাধ্যমে আব্বাসীয় খলিফাদের রাজনৈতিক কৌশল ও উদ্দেশ্যও ছিল। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও প্রাচীন পারস্য সংস্কৃতির তুলনায় আরবি সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেয়ার আগ্রহ ছিল মূলত এ অনুবাদকর্মের
চালিকাশক্তি। গবেষণায় দেখা যায়, অনুবাদকদের অধিকাংশ ছিলেন দ্বিভাষায় পারদর্শী খ্রিস্টান, যারা গ্রিক ও আরবি উভয় ভাষায়ই দক্ষ ছিলেন। হুনাইন বেন ইসহাক ছিলেন এদের অন্যতম, যিনি আল-কিন্দির সঙ্গে যুক্তভাবে কাজ করেছিলেন।
এর মোদ্দাকথা হলো, আব্বাসীয়রা বাইজেন্টাইন ও পারস্য সংস্কৃতি মোকাবেলায় আলোকিত আরবি সংস্কৃতি বিনির্মাণে প্রতিযোগিতা করেছিলেন।
আল-কিন্দির গ্রন্থভাণ্ডার
দশম শতাব্দীর ইবনে আল-নাদিমের ‘ফিহরিস্ত (Kitab al Fihrist)’-তে আল-কিন্দির লেখার শিরোনামের তালিকা পাওয়া যায়। আল-কিন্দি বিজ্ঞান ও দর্শনের বিভিন্ন শাখায় শত শত গ্রন্থ লিখেছেন।
দার্শনিক গ্রন্থসম্ভার ও মনস্তত্ত্ব বিষয়ে তুরস্কের ইস্তানবুলে আজও সংরক্ষিত রয়েছে আল-কিন্দির বেশকিছু মূল্যবান দার্শনিক রচনা, যেমন On First Philosophy, যা ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এর মাধ্যমে উত্তরাধুনিক সময়ের দর্শনও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রাখা হয়েছে। On First Philosopy-এর অবিকৃত সংস্করণের প্রথম অংশে চারটি অধ্যায় রয়েছে: প্রথম অংশটি মূলত পাঠকদের গ্রিক দার্শনিক ও জ্ঞানকে সম্মান করার জন্য একটি উপদেশ। দ্বিতীয় অধ্যায়ে রয়েছে আল-কিন্দির জগতের অনন্তকাল সম্পর্কে বিখ্যাত আলোচনা। তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়ে আছে একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের আলোচনা, যিনি অন্যান্য সবকিছুর মধ্যে ঐক্যের উৎস।
বুদ্ধিবিজ্ঞান ও মনোচিকিৎসা বিষয়ে আল-কিন্দির গ্রন্থ আছে। ইস্তানবুলে রয়েছে আল-কিন্দির ‘অন দি ইন্টেলেক্ট’। এটি আরবি ভাষার মূল কপির একটি। এর ল্যাটিন অনুবাদও সংরক্ষিত আছে। ‘অন দি ইন্টেলেক্ট’ আরবি ঐতিহ্যের প্রথম গ্রন্থ যা বুদ্ধির প্রকারের শ্রেণীবিন্যাস সম্পর্কে ধারণা প্রদান করা হয়েছে। আল-কিন্দির মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত নীতিশাস্ত্রের ওপর তার একমাত্র উল্লেখযোগ্য টিকে থাকা কাজ ‘অন ডিস্পেলিং সরোস’।
‘ডিসকোর্স অন দ্য সোল’ ও ‘দ্যাট দেয়ার আর ‘ইনকরপোরিয়াল সাবস্ট্যান্সেস’ গ্রন্থে তিনি আত্মার অদেহাত্মক প্রকৃতি এবং এর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নির্ধারণে অ্যারিস্টটলীয় ধারণাকে প্রয়োগ করেন। ‘অন স্লিপ অ্যান্ড ড্রিমে’ তিনি মনস্তত্ত্ব, স্বপ্ন-বোঝাপড়া ও ঐশী স্বপ্নের ভূমিকা ব্যাখ্যা করেন। যেখানে অ্যারিস্টটলের চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়।
নীতি ও নৈতিক দর্শন বিষয়ে আল-কিন্দির প্রধান রচনা ‘অন ডিসিপ্লিন স্যাডনেস (বিষণ্নতা দূরীকরণ)’। গ্রন্থটি সমাজ ও ব্যক্তিজীবনের সুখ-দুঃখ নিয়ে লেখা।
আল-কিন্দির ‘অন দ্য প্রক্সিমেট এজেন্ট কজ অব জেনারেশন অ্যান্ড করাপশন’ এবং ‘অন দ্য প্রস্ট্রেশন অব দি আউটারমোস্ট স্ফিয়ার’-এ মহাজাগতিক তত্ত্বগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। এখানে আবহাওয়া এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ওপর অসংখ্য রচনা উপস্থাপন করেছেন। নিম্ন জগৎ অর্থাৎ পৃথিবীতে কীভাবে বৃষ্টিপাত এবং অন্যান্য আবহাওয়াসংক্রান্ত ঘটনা সংঘটিত হয়, এ সম্পর্কে মহাজাগতিক ধারণাগুলো প্রয়োগ করেছেন। যদিও এ কাজগুলো অ্যারিস্টটল দ্বারা প্রভাবিত, আল-কিন্দি টলেমির মতো অন্যান্য গ্রিক উৎসগুলোও ব্যবহার করেছেন। গ্রিক বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য সম্পর্কে তার বিস্তৃত ধারণা ছিল। উদাহরণস্বরূপ তিনি ইউক্লিড ও টলেমির ধারণাগুলো ব্যবহার করে আলোকবিদ্যা বিষয়ের ব্যাখ্যা করেন।
আল-কিন্দির দৃষ্টিতে মানুষের আত্মা বা মনোবিজ্ঞান
মানব আত্মার তত্ত্ববিদ্যার ওপর আল-কিন্দির দুটি রচনা রয়েছে: দ্যাট দেয়ার আর ইনকরপোরিয়াল সাবস্ট্যান্সেস এবং Discourse on the Soul. এ দুই গ্রন্থ ভিন্ন ভিন্ন গ্রিক উৎসের ওপর নির্ভরশীল এবং উপস্থাপনার ক্ষেত্রেও ভিন্ন। কিন্তু এগুলো থেকে যে মতবাদ উদ্ভূত হয় তা যুক্তিসংগত ও প্রয়োজনীয়।
আল-কিন্দি তার ‘Discourse on the Soul’ রচনায় পুরোপুরি গ্রিক দার্শনিকদের বক্তব্য উদ্ধৃতি আকারে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে প্লেটো, পিথাগোরাস ও অ্যারিস্টটলের বক্তব্য। উপস্থাপনাটি হলো নৈতিক, ধ্যানাত্মক ও যৌক্তিকভাবে চিন্তার রূপ। যেমন সেখানে বলা হয়েছে, আমাদের কার্য হলো আত্মাকে ‘দেহজাত দাগ’ থেকে পরিশোধন করা এবং ধীরে ধীরে জ্ঞানের উচ্চ শিখরে পৌঁছানো।
জ্ঞানচর্চায় আল-কিন্দির প্রভাব
আরবে দর্শন ও জ্ঞানের প্রসারে আল-কিন্দির অবদান সমকালে তুলনাতীত। তবে তার কাজের আশানুরূপ দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তী প্রজন্মে সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয়নি। কিন্তু আল-কিন্দির দ্বারা প্রভাবিত চিন্তাবিদদের মধ্যে মুসলিম সংস্কৃতির আদি বিকাশের সঙ্গে ‘বিদেশী বা গ্রিক' দর্শনের সামঞ্জস্য বজায় রাখার একটি ধারাবাহিক প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এটি আল-কিন্দীয় ঐতিহ্য নামে পরিচিত। জ্ঞানভিত্তিক ধারার এ বৈশিষ্ট্য দশম শতাব্দীজুড়ে চলমান ছিল, যা স্পষ্টতই আল-কিন্দির প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের ছাত্ররা এ ধারার প্রতিনিধিত্ব করেছিল। এ ব্যক্তিত্বদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন আল-কিন্দির দ্বিতীয় প্রজন্মের ছাত্র আল-আমিরি। তিনি একজন সুপরিচিত নব্য-প্লেটোবাদের চিন্তাবিদ। তার সঙ্গে আল-কিন্দির ছাত্র আবু জায়েদ আল-বালখির সম্পর্ক ছিল। এছাড়া আল-কিন্দির দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন ইহুদি চিন্তাবিদ আইজ্যাক ইসরায়েলি; অষ্টম থেকে নবম শতাব্দীর এই ইহুদি দার্শনিক আল-কিন্দির বহু লেখা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নিজস্ব দার্শনিক চিন্তা তৈরি করেন। মিস্কাওয়াইহ ছিলেন দশম শতাব্দীর পণ্ডিত ও ইতিহাসবিদ। তার নৈতিক গ্রন্থে আল-কিন্দির উদ্ধৃতি ব্যবহার করেন।
দশম শতাব্দীর পর আরবি ভাষায় লেখা লেখকদের দ্বারা অথবা ইসলামী পাশ্চাত্যে আল-কিন্দির উদ্ধৃতি খুব কমই পাওয়া যায়। বিপরীতে আল-কিন্দি ল্যাটিন মধ্যযুগীয় লেখকদের জন্য একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। জ্যোতিষশাস্ত্রের ওপর তার রচনাগুলো সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখে। দৃষ্টিভঙ্গি ও জ্যোতিষবিদ্যার ওপর আল-কিন্দির রচনাগুলো মধ্যযুগীয় ইউরোপে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। On the Intellect সহ বহু রচনা ল্যাটিনে অনূদিত হয়। ‘On Rays’-এ আল-কিন্দি যে ধারণা উপস্থাপন করেছিলেন, ‘নির্গত রশ্মির মাধ্যমে প্রকৃতি ও মানুষ ক্রিয়া প্রত্যাশা করে’—এটি মধ্যযুগীয় ইউরোপে বিস্তৃত প্রভাব ফেলেছিল।
আল-কিন্দির অনুবাদগুলো (বিশেষ করে গ্রিক দর্শনের) দশম শতাব্দী পর্যন্ত দার্শনিক পাঠ্যপুস্তক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আল-ফারাবি ও এভারোয়ের মতো দার্শনিকরা যদিও আল-কিন্দির নাম উল্লেখ করেন না, তবু তারা গ্রিক দর্শনের সঙ্গে ইসলামী ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে আল-কিন্দির প্রণীত পথ অনুসরণ করেন।
আল-কিন্দি মধ্যযুগের ইউরোপেও একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। তার বেশ কয়েকটি বই ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। এই বইগুলো রবার্ট গ্রোসেটেস্ট এবং রজার বেকনের মতো পশ্চিমা লেখকদের উপর প্রভাব ফেলেছিল। ইতালীয় রেনেসাঁর পণ্ডিত গেরালোমো কার্ডানো (১৫০১-১৫৭৫) আল-কিন্দিকে বারোজন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতের মধ্যে অন্যতম একজন বলে মনে করতেন।
সৌদি আরবের রিয়াদে ১৯৮৬ সালে রয়্যাল কমিশন ফর রিয়াদ সিটির কূটনৈতিক কোয়ার্টার এলাকায় আল-কিন্দি প্লাজা উদ্বোধন করা হয়।
আল-কিন্দি ছিলেন দার্শনিক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, সংগীতজ্ঞসহ বহুমুখী প্রতিভার পণ্ডিত। তার জীবন ছিল জ্ঞান বিকাশের সংগ্রাম যা আধুনিক বিজ্ঞান, দর্শন ও শিক্ষার ভিত্তি গঠনে ভূমিকা রেখেছে। আজকের বিশ্বে আল-কিন্দির জ্ঞান ও জীবনচর্চা সংশ্লিষ্ট গবেষকদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে ভূমিকা রাখবে।
তথ্যসূত্র
১. পিটার অ্যাডামসন, আল-কিন্দি, গ্রেট মেডিভাল থিংকার্স (ব্রেইন ডেভিস অনূদিত), অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং ফরধাম ইউনিভার্সিটি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০৭।
২. ‘আল-কিন্দি; শীর্ষক সাইটেশন, স্ট্যানফোর্ড এনসাইক্লোপিডিয়া অব ফিলোসফি, ডিসেম্বর ২০০৬।
৩. ‘আল-কিন্দি’ শীর্ষক নিবন্ধ, প্রফেসর ড. নাজির আহমেদ, হিস্ট্রি অব ইসলাম ডটকম।
বাশার খান: সহসম্পাদক বণিক বার্তা








