[প্যারিসে থাকাকালীন গোলাম আম্বিয়া লুহানী তার মাকে বেশকিছু চিঠি লিখেছিলেন। এতে তার আর্থিক ও শারীরিক দুরবস্থার কথা আছে। সেই সঙ্গে লুহানীর মায়ের কাছে লুহানীর স্ত্রী গ্যাব্রিয়েলের পাঠানো কয়েকটি চিঠি থেকেও লুহানীকে নতুন করে জানা যায়। সে রকমই দুটি চিঠি যুক্ত করা হলো। এগুলো নেয়া হয়েছে মতিউর রহমান রচিত ‘গোলাম আম্বিয়া লুহানী: এক অজানা বিপ্লবীর কাহিনী’ বই থেকে]
মায়ের কাছে লেখা লুহানীর চিঠি
৫ ফেব্রুয়ারি ১৯২৪
১৪৪ বিআইএস বুলভার মঁপানাস
প্যারিস ১৪, ফ্রান্স
মোবারক জোনাবেষু,
মা, আপনার ১৫ জানুয়ারি তারিখের পত্র প্রাপ্ত হইয়া ও পড়িয়া অত্যন্ত দুঃখিত হইলাম।
আমি বার্লিন হইতে অত্যন্ত কাতর অবস্থায় প্যারিস আসিয়া আপনাকে ৫০০ টাকার জন্য টেলিগ্রাম পাঠাই। আমার শারীরিক অবস্থা শোচনীয়।
আজ মাস ৩/৪ হইল আমার ফুসফুসে ক্ষয়কাশ (Tuberculosis) দেখা গিয়াছে। প্রায়ই শরীরে জ্বর থাকে। ভালো স্বাস্থ্যকর স্থানে ও ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে থাকিলে বাঁচিতে পারি।
আপনার চিঠির ভাবে বোধ হয়—আমাকে বাঁচান হইতে [...] আমাকে ভারতবর্ষে ফিরাইয়া আনা—আপনি বেশি প্রয়োজনীয় মনে করিলে আপনি আমার আসার খরচ দিতে প্রস্তুত আছেন; অথচ আমার বাঁচিয়া থাকার জন্য ৫০০ টাকার দরকার তাহা পাঠাইতে আপনি ও আমার ভাইয়েরা অক্ষম কিবা অনিচ্ছুক। জানি না ১০/১২ বৎসরের অনুপস্থিতিতে মাতৃ ও ভ্রাতৃহৃদয়ে এতদূর কাঠিন্য হইতে পারে। সম্ভবত আমি মরিয়া গেলে দুনিয়াতে এমন কোনো লোক নাই যাহার বিশেষ কিছু আসে যায়। আমি প্রায় মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়াইয়া আপনাকে টাকার জন্য টেলিগ্রাম পাঠাই, তাহার উত্তরে আপনি কেবল ইহাই লেখেন যে, আমি আমার ভাইদের সঙ্গে চিঠি আদান-প্রদান করি না এবং আমি যথাসময়ে ভারতবর্ষ ফিরিয়া আসি না। একজন মানুষ নদীতে ডুবিয়া যাইতেছে, আমি কিনারায় দাঁড়াইয়া—তাহার সঙ্গে তর্কবিতর্ক ও কর্তব্যবিচার করিতে চান।
আমার স্বাস্থ্য ভালো হইলে আমি নিজে চেষ্টা করিয়া [...] আমি পূর্বে যেসব রাজনৈতিক কারণে ভারতে ফিরিতে [...] কারণ এখন অবর্তমান। এমতাবস্থায় ফিরিয়া [...] কিন্তু শরীরের অবস্থা এতই খারাপ যে ভবিষ্যৎ [...] ও অবান্তর বলিয়া প্রতীয়মান হয়।...
উপরোক্ত ঠিকানায় আমি থাকি না। আমার কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা নাই। আমি এখানে কয়দিন, ওখানে কয়দিন করিয়া থাকি। তবে চিঠিপত্র ইত্যাদি উপরোক্ত ঠিকানায় পাঠাইলে আমি যথারীতি প্রাপ্ত হইব।
আর কী লিখিব? কী ভাবেন, কী মনে করেন কিছুই বুঝিতে পারি না। আশা করিতেও ভয় হয়। সম্ভবত আপনি ও অপর যাহারা আপনাকে আমার সম্বন্ধে উপদেশ দেয়—বুঝেন না যে বিদেশে সাহায্যাভাবে মরণ কী ব্যাপার। আশা করি মৃত্যু ঘটিলে তাহা সম্যকরূপে বুঝিতে পারিবেন। অধিক বুঝাইবার আর ক্ষমতা নাই।
আপনি আমার ভক্তি গ্রহণ করিবেন। শ্রেণিমতো সকলকে আমার আদাব ও ভালোবাসা জানাইবেন।
আপনার স্নেহের
মাজু
লুহানীর মায়ের কাছে লেখা লুহানীর স্ত্রী গ্যাব্রিয়েল লুহানীর চিঠি
২ প্যাসেজ ডানজিগ
প্যারিস ১৫, ফ্রান্স
৬ ফেব্রুয়ারি ১৯২৪
শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় আম্মা,
আপনার অপূর্ব চিঠিটি এবং আমার প্রিয় ছোট্ট বোনের চিঠিটিও অনেক আগেই পেয়েছি। জীবনে আমি যত চিঠি পেয়েছি, এটি নিঃসন্দেহে সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর। যখনই ওগুলো পড়ি, আমার চোখে পানি এসে যায়, চিঠিগুলোয় চুমু খেতে থাকি।
দুঃখের বিষয়, যে প্রিয় মা নামে সম্বোধনের অনুমতি আপনি আমাকে দিয়েছেন, যা উচ্চারণ করে আমি আশীর্বাদধন্য হই, আপনাকে জানাতে আত্মাত খুবই কষ্ট হচ্ছে যে, শিগগিরই আপনাকে মা ডাকার অধিকার আমার থাকবে না। সে কারণেই আপনার চিঠির উত্তর দিতে আমার এত দেরি হয়ে গেল। মাজু প্রতিদিন [...]। আমরা ভালো বন্ধু [...] আমার ঠিকানায় সব সময়ই সুন্দর চিঠিগুলো পাঠাতে [...]
আমার প্রিয় ও প্রদ্ধেয় আম্মা, দীর্ঘ ৮ মাসের মতো হয়ে গেল আমি আর মাজু আর স্বামী-স্ত্রী নই। আমার প্রিয় স্বামী এখানেই আছে, কিন্তু আমার সঙ্গে সে থাকে না। সে অসুস্থ। আপনি যেসব টেলিগ্রাম পেয়েছেন, যেগুলো আপনাকে যে পাঠিয়েছে সে আমিই। আমি তাকে প্রতিদিন দেখতে যাই এবং যত দূর পারি তার দেখাশোনা করি। তবে যতটুকু করি তা-ও আমার জন্য যথেষ্ট নয়। আমি শিগগিরই আমার প্রিয় ছোট্ট বোনটির কাছে লিখব। আশা করি, আমার বিলম্ব সে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে।
আমি অন্য আরেকজনের কৃপায় এখন বেঁচে আছি। [...] যদি আমি আমার প্রাদ্ধেয় স্বামীর সঙ্গে বাস করতাম তাহলে আমাদের দুজনকেই উপোস থাকতে হতো। কিন্তু যেমনটি আছি, আমি তাকে একটু সাহায্য করতে পারি, কিন্তু খুবই সামান্য সাহায্য [...]
এ কারণে প্রিয় মা আমার, আমি আপনাকে আপনার ছেলে মাজুকে সাহায্য করার জন্য অনুরোধ করছি, যাতে সে এখানে ইউরোপের কোনো একটা স্যানিটোরিয়ামে ভর্তি হতে পারে। তাহলে সে (সুস্থ হয়ে) ভারতে আপনার কাছে যেতে সমর্থ হবে। কিন্তু আমার ভয় জলবায়ুর পরিবর্তন তার জীবনের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে কি না।
আমি আমার স্বামীকে ভালোবাসি এবং তাকে আমি এতটাই ভালোবেসেছি যে আমার সন্দেহ। [...]। অন্য কারও পক্ষে এর চেয়ে ভালোবাসা সম্ভব (কি না)। এটা ভেবে আমার মন ভেঙে গেছে যে আমি কখনো ভারতে আপনাদের মতো সবচেয়ে সুন্দর সবচেয়ে আধ্যাত্মিক মানুষগুলোর দেখা পাব না। আসার অভয়ের অভয়লে হারার এক স্বর্গের মতো। কিন্তু ঈশ্বর চান না আমি সেখানে আদি এবং আমার প্রিয়তম মা, প্রিয়তম ছোট বোনটির সাক্ষাৎ পাই। ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন। আপনার দীর্ঘ জীবন ও উন্নতি কামনা করি।
আপনার শ্রদ্ধাশীল কন্যা
জি লুহানী
নোট: ১৯২৪ সালে যখন এসব চিঠি লেখা হয় তখন লুহানী ও গ্যাব্রিয়েলের মধ্যে দাম্পত্য সংকট চলমান। লুহানীরও আর্থিও স্বাস্থ্যগত অবস্থা ভালো ছিল না। তিনি টাকা চেয়ে মায়ের কাছে বেশ কয়েকটি চিঠি লেখেন। পরের বছর এসব সংকট কমে আসে। পরবর্তী সময়ে গ্যাব্রিয়েলের লেখা চিঠিগুলোতে এর প্রমাণ মেলে।









