বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপ্রতি খন্দকার মোশতাক আহমদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম স্থপতি। ১৯৪২ সাল থেকে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে রয়েছেন। উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য বিভিন্ন সময়ে তিনি সাত বছরেরও অধিক কাল কারা নির্যাতন ভোগ করেন। (কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার) সুন্দলপুর ইউনিয়নের দশপাড়া গ্রামে ১৯১৯ সালে খন্দকার মোশতাক আহমদের জন্ম। তিনি তার পিতামাতার চতুর্থ পুত্রসন্তান। পিতা মরহুম হজরত খন্দকার কবিরউদ্দিন আহমাদ একজন সিদ্ধপুরুষ এবং মাতা মরহুমা বেগম রাবেয়া খাতুন একজন ধর্মপ্রাণ মহিলা ছিলেন।
খন্দকার মোশতাক তার প্রারম্ভিক শিক্ষা লাভ করেন কলকাতায়। পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এলএলবি ডিগ্রি নেন।
উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি কুমিল্লায় কারাবরণ করেন। খন্দকার মোশতাক ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, গণ-আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ইত্যাদিতে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দান করেন। তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের একজন ধারক ও বাহক। তিনি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একজন আস্থাবান ব্যক্তিত্ব। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অবহেলা ও অসম বণ্টনের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন প্রতিবাদী কণ্ঠ।
ভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন একজন অগ্রসেনা এবং ভাষা আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সদস্য। এজন্য ১৯৫২ সালে তিনি কারানির্যাতন ভোগ করেন।
খন্দকার মোশতাক আওয়ামী মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। পাকিস্তান হওয়ার পর প্রথম উপনির্বাচনে তিনি টাঙ্গাইলে জনাব সামসুল হকের পক্ষে প্রচার অভিযানের দায়িত্বে ছিলেন। সেজন্য তিনি টাঙ্গাইলে গ্রেফতার ও কারারুদ্ধ হন।
১৯৫৪ সালে খন্দকার মোশতাক পূর্ব পাকিস্তান ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক ৯২-ক ধারা জারি হওয়ার পর তিনি আবার কুমিল্লায় কারারুদ্ধ হন। মুক্তি পাওয়ার পর তাকে যুক্তফ্রন্টের সংসদীয় দলের চিফ হুইপ নিযুক্ত করা হয়। প্রায় এক বছর সংসদ অধিবেশন না ডাকার প্রতিবাদে তিনি চিফ হুইপ পদ থেকে ইস্তফা দেন। এরপর ১৯৫৮ সালে তদানীন্তন সামরিক জান্তা মার্শাল ল জারি করে পাকিস্তানে সব রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা নিষিদ্ধ করে দেয়। তখন অন্যান্য রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে খন্দকার মোশতাক কারারুদ্ধ হন।
১৯৬৪ সালে রাজনৈতিক কর্মতৎপরতার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার পর খন্দকার মোশতাক আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি ছয় দফার পক্ষে দেশব্যাপী আন্দোলন ও জনগণকে সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী ব্যাপক সফর শুরু করেন। এ সময় তিনি গ্রেফতার হয়ে পাবনা, রাজশাহী ও ঢাকা জেলে অন্তরীণ থাকেন এবং প্রায় তিন বছর পর ১৯৬৯ সালে মুক্তি পান। ওই বছরই আইয়ুব খানের একনায়কত্বমূলক শাসনের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক সংগ্রাম গড়ে তোলার জন্য পাকিস্তানের আটটি রাজনৈতিক দল মিলে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদ (ডাক) গঠন করে। খন্দকার মোশতাক পূর্ব পাকিস্তান ‘ডাক’-এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। ‘ডাক’-এর আহ্বায়ক হিসেবে তিনি ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খান আহূত গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেন।
১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে খন্দকার মোশতাক দাউদকান্দি-হোমনা নির্বাচনী এলাকা থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সত্তরের নির্বাচনের সময় তিনি আওয়ামী লীগের অন্যতম সহসভাপতি ও দলের সংসদীয় বোর্ডের সদস্য ছিলেন।
ঢাকা হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের একজন বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মোশতাক দুবার পাকিস্তান বার কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন। এর মধ্যে জেলে আটক থাকাকালে একবার নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় খন্দকার মোশতাক মুজিবনগরে গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র এবং আইন ও সংসদীয় মন্ত্রী ছিলেন।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে ‘সংবিধান খড়সা প্রণয়ন কমিটির’ অন্যতম সদস্য হিসেবে তার বিরাট অবদান ছিল। তখনো আওয়ামী লীগ সংসদীয় বোর্ডের তিনি অন্যতম সদস্য ছিলেন।
১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি দাউদকান্দি নির্বাচনী এলাকা থেকে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সালে খন্দকার মোশতাক বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানিসম্পদ ও বিদ্যুৎ মন্ত্রী ছিলেন এবং পরে বাণিজ্য ও বৈদেশিক বাণিজ্য মন্ত্রী হন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খন্দকার মোশতাক আহমদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করেন এবং ওই বছরের ২ নভেম্বর রাতে এক সামরিক অভ্যুত্থানের পর তিনি পদচ্যুত হয়ে বঙ্গভবনে অন্তরীণ থাকেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে তাকে মুক্ত করা হয়। তখন দেশবাসীর বিপুল সমর্থন থাকা সত্ত্বেও তিনি পুনঃ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেননি।
পরবর্তী পর্যায়ে দেশে রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্ম শুরু হলে ১৯৭৬ সালের ২২ অক্টোবর খন্দকার মোশতাক ‘ডেমোক্রেটিক লীগ’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং দলের প্রতিষ্ঠাতা-আহ্বায়ক হন।
জয়নুল আবেদিন: বাংলাদেশ সাঁটলিপি একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও অধ্যক্ষ।
[জয়নুল আবেদিন রচিত ও ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত ‘দাউদকান্দি দর্পণ’ শীর্ষক গ্রন্থ থেকে গৃহীত]









