বিকালের আলো পড়তেই ঢাকার স্ট্রিটফুডের দোকানগুলোয় চোখে পড়ে নতুন এক ট্রেন্ড—লাইভ পিৎজা। গরম চুল্লির ওপর ছড়ানো ময়দা, ঝকঝকে টমেটো, ঝরঝরে চিজ। ব্যস কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তৈরি হয়ে আসে সুস্বাদু পিৎজা, যা শুধু পেটই নয়, মানুষের মনকেও আনন্দে ভরিয়ে দেয়। কিন্তু এ জনপ্রিয় খাবারের যাত্রা ঢাকা থেকে শুরু হয়নি। তার সূচনা হয়েছিল বহু আগে নেপলসের এমনই এক ব্যস্ত রাস্তা থেকে। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে পিৎজার জন্ম হয়েছিল সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জন্য। সহজলভ্য, বহনযোগ্য ও হৃদয়গ্রাহী এক স্ট্রিটফুড হিসেবে। নেপলসের রাস্তাঘাটের ছোট ছোট দোকানে আটা-ময়দার ওপর টমেটো, চিজ ও জলপাই তেল মেশিয়ে বানানো হতো পিৎজার ছোট ছোট টুকরো, যা শ্রমিকরা খুব অল্প পয়সার বিনিময়ে কিনে খেতেন। পিৎজার এ সরল অথচ মুখরোচক স্বাদের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক বিশ্বব্যাপী খাদ্য বিপ্লবের বীজ। পিৎজার এ সূচনা কেবল খাদ্যই নয়; এটি ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এক অভিজ্ঞতা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে খাওয়া এ খাবার শ্রমিকদের মধ্যে সংযোগ সৃষ্টি করত, আর নেপলসের রাস্তায় বিক্রেতাদের আওয়াজ হয়ে উঠত এক ধরনের ছন্দ, যে ছন্দের রেশ দেশ-দেশান্তর ভ্রমণ করতে করতে এ ঢাকার রাস্তায় এসে পৌঁছেছে।

নেপলসের বাইরে পিৎজার প্রথম পদক্ষেপ শুরু হয় ধীরে। অর্থনৈতিক সুযোগের খোঁজে দক্ষিণ ইতালীয়রা তাদের সঙ্গে পিৎজার রেসিপি, আটা ও রান্নার স্মৃতি নিয়ে শহর ও দেশের বাইরে চলে যান, তাদের হাত ধরেই নতুন অঞ্চলে এটি ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ইতালীয় অভিবাসনের ঢেউ উত্তর ইতালি ও সমুদ্রপাড় হয়ে অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তারা যে শহরেই বসতি স্থাপন করতেন, সেখানে ছোট পরিবারভিত্তিক ‘পিৎজারিয়া’ গড়ে তুলতেন। পিৎজারিয়া হলো ছোট পরিবারভিত্তিক ছোট রেস্তোরাঁ। প্যারিস, মিলান, নিউইয়র্ক ও বুয়েনস আয়ারসে এ পিৎজারিয়াগুলো শুধু খাবার বিক্রি করত না; তারা বাড়ির স্বাদ এবং ঐতিহ্যকে বিদেশী শহরগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিত। অনেক সময় পিৎজার জন্য ব্যবহার করা উপকরণও স্থানীয় প্রাপ্যতা অনুযায়ী পরিবর্তন হতো, এতে প্রতিটি শহরের পিৎজায় নিজস্ব স্বাদ ও বৈচিত্র্য জন্ম নিত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পর্যটন শিল্প পিৎজার বিস্তারকে এক নতুন গতি দেয়। ইতালি ভ্রমণে আসা পর্যটকরা দেশটির সংস্কৃতি ও রান্নার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় এবং পিৎজাকে নিখুঁত নেপোলিটান অভিজ্ঞতা হিসেবে উপভোগ করে। ফিরে আসা পর্যটকরা, যারা ইতালির স্বাদ পুনরায় অনুভব করতে চায়—ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অন্যান্য দেশে পিৎজারিয়া স্থাপনের প্রেরণা হয়ে ওঠে। এদিকে ইতালিতে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনারা ইতালির পিৎজার চমকপ্রদ স্বাদ দেশে এসেও ভুলতে পারেননি। তারাও স্থানীয়ভাবে পিৎজারিয়া স্থাপনের অনুপ্রেরণা দেন। ধীরে ধীরে শহুরে খাবারের সংস্কৃতিতে এটি অন্তর্ভুক্ত হতে থাকে। তার সঙ্গে পিৎজার রূপ ও শৈলীও বদলে যেতে থাকে। ক্রাস্ট ঘন হয়, চিজের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং ‘‌স্লাইস’ সংস্কৃতি জন্ম নেয়, যা দ্রুত ইতালীয় অভিবাসী অঞ্চল ছাড়িয়ে পুরো আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। ‘ফ্রোজেন পিৎজা’, ‘টেকঅ্যাওয়ে স্ট্যান্ড’ ও ‘শিকাগো ডিপ-ডিশ’-এর মতো আঞ্চলিক উদ্ভাবনগুলো নতুন এক আমেরিকান খাদ্য রেসিপির সূচনা করে।

১৯৮০-এর দশকে বৈশ্বিক ফ্র্যাঞ্চাইজিং পিৎজার বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে। পিৎজা হাট ও ডোমিনোজের মতো কোম্পানি উৎপাদন, ডেলিভারি ও বিপণন পদ্ধতি নিখুঁত করে বেইজিং, হংকং ও মস্কোর মতো শহরে আউটলেট স্থাপন করে, যেখানে পিৎজা আধুনিকতা, যুবসংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক সংযোগের প্রতীক হয়ে ওঠে। এ সময়ে পিৎজা শুধু খাবার ছিল না, এটি একটি সামাজিক অভিজ্ঞতা, যা শহুরে জীবনধারার সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠে। কিন্তু এ শক্তিশালী বৈশ্বিক চেইনগুলো থাকলেও প্রতিটি নতুন পরিবেশে পিৎজার টিকে থাকার জন্য নীতিগত নমনীয়তা অপরিহার্য ছিল। এটি ইতালীয় খাবার হলেও পুরনো ধারায় থাকতে পারেনি। বিশ্বময় ভ্রমণের সময় সেসব অঞ্চলের সঙ্গে তাল মেলাতে পিৎজাকে পরিবর্তন হতে হয়েছে।

ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে পিৎজা রূপ নেয় এক খাদ্যশিল্পের ক্যানভাস হিসেবে। জাপানে মেয়োনেজ, মকাই, স্কুইড ও অন্যান্য সামুদ্রিক খাবার টপিং হিসেবে ব্যবহার করা হয়, আর সাহসী রন্ধনশিল্পীরা সব বাঁধ ভেঙে টেরিয়াকি চিকেন বা ইল (eel) যুক্ত করে ইতালিয়ান রূপের সঙ্গে জাপানি স্বাদের মিশ্রণ ঘটায়। তুরস্কে তাদের নিজস্ব ইতিহাসের সঙ্গে সংযোগ করে ‘লাহমাজুন মসলা’ মিশ্রিত মাংসের পাতলা রুটিকে ‘টার্কিশ পিৎজা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা প্রাচীন রান্না প্রথাকে বিশ্বব্যাপী পিৎজার সঙ্গে যুক্ত করে। ব্রাজিলে নানা রকম পরীক্ষা-নীরিক্ষা চলে পিৎজার ওপর। অবশেষে স্থানীয় চিজ, হার্টস অব পাম, ডিম ও মিষ্টি পেয়ারা পেস্ট দিয়ে পিৎজা অলংকৃত হয়। আর উপসাগরীয় অঞ্চলে শর্মা অনুপ্রাণিত পিৎজাগুলোকে স্থানীয় স্ট্রিটফুডের রেসিপির সঙ্গে আন্তর্জাতিক উপাদান মিলিয়ে তৈরি করা হয়। প্রতিটি সংস্করণ স্থানীয় উপকরণ ও রন্ধনশিল্পীদের কল্পনাশক্তিকে প্রতিফলিত করে। এ সবগুলোই এখন স্বীকৃত ‘পিৎজা’ হিসেবে পরিচিত।

ভারতের বৈচিত্র্যময় খাদ্যসংস্কৃতি পিৎজাকে রঙিন ও মসলাপ্রধান ক্যানভাসে পরিণত করে, যেখানে পনির, তন্দুরি চিকেন, মসলা সস এবং হালাল টপিং ব্যবহার করা হয়। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি যখন দেশজুড়ে পশ্চিমা ফাস্টফুড সংস্কৃতির হাওয়া বইতে শুরু করল, তখনই পিৎজা ভারতবর্ষে জনপ্রিয় হতে শুরু করল। ১৯৯৫ সালে ‘জুবিল্যান্ট ফুডওয়ার্কস’ যখন ‘ডোমিনোজ পিৎজা’কে ভারতে আনার উদ্যোগ নিল, আর ১৯৯৬ সালে নয়াদিল্লিতে খুলল তাদের প্রথম শাখা, তখন যেন শহরের বাতাসে এক নতুন গন্ধ মিশে গেল। প্রথমে মানুষ এটিকে দেখল ‘বিদেশী স্ন্যাকস’ হিসেবে, কিন্তু দ্রুতই পনির, তন্দুরি চিকেন, মসলা সস, দেশীয় ভেজিটেবলের টপিংয়ের উষ্ণ পরিচয়ে পিৎজা হয়ে উঠল ভারতের ঘরোয়া স্বাদ।

বাংলাদেশে পিৎজার যাত্রা একটু পরে শুরু হলেও তার গল্প ঠিক ততটাই আগ্রহজাগানিয়া। ২০০৯ সালে ‘পিৎজা ইন’ ঢাকায় প্রথম আউটলেট খুলল। খুলে গেল নগরজীবনের ভিড়ে নতুন এক স্বাদের ছোট্ট জানালা। কিন্তু আসল ঢেউটি এল ২০১৯ সালে, যখন ‘ডোমিনোজ পিৎজা’ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করল ধানমন্ডিতে। সেই দিন থেকেই ঢাকার বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগল ‘হট অ্যান্ড ফ্রেশ’ পিৎজার গন্ধ, যা একদিকে তরুণদের আধুনিক জীবনধারার প্রতীক, অন্যদিকে কর্মব্যস্ত মানুষ ও পরিবারগুলোর সহজ আনন্দের নতুন ভাষা। গ্লোবাল ব্র্যান্ডের পাশাপাশি স্থানীয় রেস্তোরাঁগুলোও যোগ দিল পিৎজার এ যাত্রায়। ফলে পিৎজা আজ পুরো বাংলাদেশে এমনভাবে মিশে গেছে, যেন এটি শুধু কোনো বিদেশী খাবার নয়; বরং আমাদের নিজেদের অতি পরিচিত স্বাদ।

পিৎজার এ ভ্রমণকালে বিভিন্ন দেশে অসংখ্যভাবে এর ক্রাস্ট, টপিং সবকিছুতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। নেপলস ও ইতালিজুড়ে কারিগররা ধীরে ধীরে এর ঐতিহ্য রক্ষায় সতর্ক হয়ে ওঠে। ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি সংরক্ষণে আন্দোলনও গড়ে ওঠে, যেখানে ময়দা, টপিং ও বেকিং প্রযুক্তিসংক্রান্ত নিয়ম নির্দিষ্ট করা হয়।

এ যাত্রাপথে অসংখ্য গল্প পিৎজার স্থানীয় জীবনযাত্রার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকে তুলে ধরে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে নিউইয়র্কে কারখানার শ্রমিকরা তাদের মধ্যাহ্নভোজে ১০ সেন্টের বিনিময়ে পিৎজা কিনে খেতেন, যা শহরের প্রথম ফাস্টফুডের মধ্যে একটি এবং প্রতিদিনের খাবারের অভ্যাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। টোকিওর প্রথম পিৎজারিয়াগুলো সমুদ্রশৈলীর টপিংস যেমন সিউইড ব্যবহার করে ইতালিয়ান বেজের সঙ্গে জাপানি স্বাদের মিশ্রণ ঘটায় এবং উদ্ভাবনের আগ্রহ দেখায়। সাও পাওলোয় ব্রাজিলের বিখ্যাত পিৎজারিয়াগুলো এখন এক সপ্তাহান্তে এক মিলিয়নের বেশি পিৎজা বিক্রি করে, যা দেশটির পিৎজার প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং স্থানীয় স্বাদে অভিযোজনের ক্ষমতা প্রমাণ করে। এছাড়া বিভিন্ন শহরে ছোট পরিবারভিত্তিক পিৎজারিয়াগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পিৎজার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে, যা দেখায় কীভাবে একটি স্থানীয় খাবার বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলতে পারে।

পিৎজার গল্প খাদ্যের সর্বজনীনতার সাক্ষ্য দেয়। নেপলস থেকে টোকিও, সাও পাওলো থেকে দুবাই বিশ্ব শুধু পিৎজা গ্রহণ করেনি; তারা এটিকে নতুন রূপে রচনা করেছে। প্রতিটি সংস্করণ, টপিং ও আঞ্চলিক রূপ মানুষের সৃজনশীলতা, অভিবাসন এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের গল্প বলে। পিৎজার যাত্রা প্রমাণ করে কীভাবে একটি সাধারণ খাবার সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে, স্থানীয় স্বাদের সঙ্গে মিশে যেতে পারে এবং বছরের পর বছর টিকে থাকতে পারে। পিৎজার ভ্রমণ একটি প্রতীক—ঐতিহ্য এবং উদ্ভাবনের, ইতিহাস ও আধুনিকতার।

আনিকা চৌধুরী প্রিয়ন্তি: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা