এমন সময় বাতাসে একটি গাছ থেকে কয়েকটি পাতা উড়ে এসে ফুটন্ত পানির পাত্রে পড়ে। পাতাগুলো পানির সংস্পর্শে আসতেই পানির রঙ বদলে যায় এবং সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। কৌতূহলী রাজা সেই পানি পান করেন এবং লক্ষ করেন, এটি পান করার সঙ্গে সঙ্গে তার ক্লান্তি দূর হয়ে শরীর ও মন এক অদ্ভুত সতেজতায় ভরে উঠেছে। সেটিই ছিল বুনো চা গাছ বা ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস। এভাবেই পৃথিবীতে চায়ের প্রথম কাপটি তৈরি হয়েছিল।
অন্য গল্পে আছে, রাজা শেননং গভীর বনে ভেষজ উদ্ভিদ ওষুধ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে কোনো এক বিষাক্ত লতাপাতায় অসুস্থ হন। সে সময় বাতাসে ভেসে আসা আরেকটি পাতা তার মুখে পড়ে। শেন পাতাটি চিবিয়ে খাওয়ার পর সুস্থ হয়ে ওঠেন।
এভাবেই চা আবিষ্কারের গল্পগুলো গ্রন্থিত হয়েছে প্রাচীন চীনা ঔষধি উদ্ভিদবিষয়ক বই Shennong Ben Cao Jing বা শেননংয়ের ভেষজ গ্রন্থে। এছাড়া চীনা মিথ লোককথায় চা নিয়ে এ রকম অনেক গল্প বহুল প্রচলিত।
লোক বিশ্বাস যা-ই হোক ঐতিহাসিকভাবে চায়ের জন্মস্থান চায়নাকেই ধরা হয়। প্রথমদিকে এটি ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হতো, পরে ধীরে ধীরে পানীয় হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং ক্রমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যায়।
ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে ওলন্দাজ বণিকেরা চীন থেকে চা ইউরোপে আমদানি করে। পরবর্তী সময়ে ইউরোপীদের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চা পৌঁছায়। বাংলাদেশ ও আসামে ব্রিটিশরা চা নিয়ে আসে। পরীক্ষামূলকভাবে চট্টগ্রামে চায়ের সূচনা হলেও দেশে চায়ের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয় ১৮৫৪ সালে। সিলেটের মালনীছড়ায় স্থাপিত বাংলাদেশের প্রথম চা-বাগানটির মালিকানা ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। এরপর একে একে বাড়তে থাকে চা-বাগানের সংখ্যা। এসব বাগান তৈরি ও পরিচর্যার জন্য ভারতের আসাম, ওড়িশা, বিহার, উত্তর প্রদেশসহ বিভিন্ন এলাকার প্রান্তিক মানুষকে চা শ্রমিক হিসেবে নিয়ে আসা হয়। দেশে বর্তমানে চা বোর্ডের নিবন্ধিত ১৬৮টি চা-বাগানের মধ্যে ১৩৪টি সিলেট বিভাগের তিন জেলায়। এসব চা-বাগান গড়ে ওঠে যে ব্রিটিশ সাহেবদের হাত ধরে তাদের অনেকেরই আর মাতৃভূমিতে ফেরা হয়নি। মহাকালের সাক্ষী হয়ে সবুজ চা-বাগানের ভেতর বিভিন্ন কবরে শুয়ে আছেন তারা।
চা-বাগানে কর্মরত টি প্লান্টার ব্রিটিশ সাহেব, তাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজন মারা গেলে নির্দিষ্ট জায়গায় কবর দেয়া হতো। এর মধ্যে কয়েকটি কবরস্থান বা সিমেট্রি এখনো টিকে আছে। সিলেট অঞ্চলে সবচেয়ে বড় ইংরেজ কবরস্থান শ্রীমঙ্গলের জেমস ডিনস্টন সিমেট্রি।
শ্রীমঙ্গল শহর থেকে সম্প্রতি এক দুপুরে বের হলাম। এলাকাটি জেমস ফিনলে চা কোম্পনির চা-বাগানই বেশি। চা-বাগানের সবুজ আর নৈসর্গিক আঁকাবাঁকা পথের দুই ধারেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নানা নিদর্শন চোখে পড়ে। ফিনলে কোর্ট, শতবছর পুরনো ব্রিটিশদের হাতে গড়া কালিঘাট ডাকঘর, সেই সময়ে নির্মিত সাহেবদের বাংলোসহ নানা স্থাপনা।
কালিঘাট চা-বাগান, ফুসকুড়ি চা-বাগান পরেই খেজুরিছড়া চা-বাগান। সেখানে পৌঁছার পর পথের ডানপাশে সুন্দর গোছানো কবরস্থানটি চোখে পরে। এ অঞ্চলে ইংরেজদের সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত কবরস্থান এটি। শতাধিক বছর ধরে জেমস ফিনলে চা কোম্পানি এ সিমেট্রি রক্ষণাবেক্ষণ করছে। সবুজ চা-বাগানের মাঝে ধবধবে সাদা কবরগুলো ঐতিহাসিক নিদর্শনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

শ্রীমঙ্গলের ডিনস্টন সিমেট্রি
জেমস ফিনলে চা কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, ১৮৮০ সালের দিকে মৌলভীবাজার এলাকায় ব্রিটিশ টি প্লান্টার বা চা-কররা আসেন এবং বাণিজ্যিক চা-বাগান শুরু করেন। তাদের কেউ মৃত্যুবরণ করলে ডিনস্টন সিমেট্রিতে সমাহিত করা হতো। এ সিমেট্রিতে কবর আছে ৪৬টি। এর মধ্যে ৪১ জন ইংরেজ ও নয় শিশুর সমাধি রয়েছে। পাঁচটি সমাধিতে কোনো নাম-পরিচয় উল্লেখ নেই। প্রতীকী কবর আছে দুটি। ১৮৯৬ সালের জুলাইয়ে জাহাজে করে যুক্তরাজ্য যাওয়ার পথে মারা যান রামসান্টার এবং ১৯০২ সালের এপ্রিলে পানিতে ডুবে মারা যান এফডব্লিউ এলান। তাদের দুজনের মরদেহ পাওয়া যায়নি। স্মৃতিরক্ষার্থে তাদের বন্ধুরা ডিনস্টন সিমেট্রিতে দুটি প্রতীকী কবর তৈরি করে।
এ সমাধিক্ষেত্রে সর্বপ্রথম সমাহিত করা হয় রবার্ট রয় বেইলি নামের এক ব্রিটিশ নাগরিককে। ১৮৮৫ সালের ৩০ আগস্ট ৩৮ বছর বয়সে তিনি ডিনস্টন চা-বাগানে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ শাসনামলের একজন স্কটিশ চা-কর বা টি প্লান্টার। সিলেট অঞ্চলের চা শিল্পের প্রসারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি স্কটল্যান্ড থেকে এসেছিলেন ডিনস্টন টি এস্টেটে কাজ করার জন্য। ব্যবস্থাপক হিসেবে প্রায় সাড়ে চার বছর দায়িত্ব পালন করেন। ডিনস্টন নামকরণ স্কটল্যান্ডের বিখ্যাত শিল্প শহর ডিনস্টনের নামানুসারে করা হয়েছিল। সেই সময় স্কটল্যান্ডের অনেক উদ্যোক্তা সিলেটের চা শিল্পে বড় বিনিয়োগ করেছিলেন, রবার্ট রয় বেইলি ছিলেন তাদের অন্যতম প্রতিনিধি।
১৮৯৬ সালের জুনে শিশু উইলিয়াম জন ও ডেভিড সহাবি নামে দুজনকে সমাহিত করা হয়। ১৯১৮ সালের ১৮ মে চা-কর জর্জ উইলিয়াম পিটারের সহধর্মিণী মেরি এলিজাবেথ পিটার মারা গেলে তাকে এখানে শায়িত করা হয়। পরের বছর ১৯১৯ সালের ২ অক্টোবর জর্জ উইলিয়াম পিটারও মারা যান। পাশাপাশি কবরে শুয়ে আছেন এ দম্পতি। শ্রীমঙ্গল লাগোয় হবিগঞ্জের দারাগাঁও চা-বাগানে কাজ করতেন অ্যাডওয়ার্ড ওয়ালেস। ১৯১৯ সালের ২০ জানুয়ারি ২৫তম জন্মদিনে মারা যান তিনি। তাকেও এ সমাধিতে সমাহিত করা হয়।
শ্রীমঙ্গলের রাজঘাট চা-বাগানে গিলবার্ড হেনরি টেট নামে এক ব্রিটিশ চা-কর চা চাষ করেন। ১৯৩৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর মারা যান তিনি। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৩৫ বছর। স্ত্রী দুই সন্তান তখন ছিলেন স্কটল্যান্ডে। স্বামীর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েন হেনরির স্ত্রী এবং মৃত্যুর পর স্বামীর পাশে থাকার ইচ্ছা পোষণ করেন। হেনরির স্ত্রীর শেষ ইচ্ছানুযায়ী মৃত্যুর পর ওনার দেহাবশেষ স্বামীর কবরের পাশে রাখা হয়। গিলবার্ডের ছেলে পিটার টেইট বাবার সমাধির পাশে মায়ের দেহাবশেষ রেখে যান।
১৯৩৯ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার একটি বিমান মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগর বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন কিংবা অবতরণের সময় শ্রীমঙ্গলের উদনাছড়া চা-বাগানে বিধ্বস্ত হয়। এ দুর্ঘটনায় নিহত হন বিমানের দুজন পাইলট। তাদের মরদেহ ডিনস্টন সিমেট্রিতে সমাহিত করা হয়। এর কয়েক বছর পরে আমেরিকার সামরিক বাহিনী দুই পাইলটের দেহাবশেষ উঠিয়ে নিজ দেশে নিয়ে যায়। বিধ্বস্ত হওয়া এ যুদ্ধবিমানের অংশ সংরক্ষিত আছে শ্রমিঙ্গলের টি রিসোর্ট অ্যান্ড টি মিউজিয়ামে।
এ সমাধিক্ষেত্রে নাম পরিচয়হীন একটি কবরের গায়ে লেখা in Loving Memory of my dearest husband. নিচে সই করা jcg.
জানা যায়, করুণ এপিটাফটি লিখে গেছেন এক ইংরেজ বধূ। জেসিজি ওনার নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। জেসিজির স্বামী ওই ব্রিটিশ নাগরিক ডিনস্টন বা লাগোয়া কোনো চা-বাগানে কর্মরত অবস্থায় মারা যান। মৃত্যুর খবর শুনে ওনার স্ত্রী জেসিজি ব্রিটেন থেকে শ্রীমঙ্গলে আসেন। কিন্তু ততদিনে তার স্বামীকে সমাহিত করা হয়ে গেছে। শোকাভিভূত স্ত্রী নতুন কবর দেখেই চিনেছিলেন এটি তার স্বামীর। কিন্তু পৃথিবীর মানুষের কাছে স্বামীর পরিচয় গোপন রেখে শুধু নিজের ভালোবাসাটুকু খোদাই করে লিখে গেছেন।
ডিনস্টন সিমেট্রি এখন মৌলভীবাজারে ঘুরতে আসা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে সংরক্ষিত।
ফিনলে টি কোম্পানির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার গোলাম মোহাম্মদ শিবলী জানান, এ সিমেট্রি শুধু সমাধিসৌধ নয়, এটি ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি জীবন্ত অধ্যায়। ঐতিহ্যবাহী স্থানটি চা শিল্পের ইতিহাসের পাশাপাশি সিলেট অঞ্চলের ঐতিহাসিক নিদর্শন। ডিনস্টন সিমেট্রির ইতিহাস মনকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। অনেক বিদেশী নাগরিক তাদের স্ত্রী-সন্তানকে রেখে চাকরি করতে এখানে এসেছিলেন। মৃত্যুর পর তাদের দেহ এখানেই সমাহিত করা হয়েছে।
সিলেট অঞ্চলে ইংরেজ টি প্লান্টারদের আরো কয়েকটি সিমেট্রি রয়েছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার লংলা চা-বাগান সিমেট্রি ও কিলজুরিছড়া সিমেট্রি। লংলা সিমেট্রি ঐতিহাসিক। এখানে ২৮টি সমাধি রয়েছে। শ্বেত পাথরের কারুকার্যময় এপিটাফ লেখা আছে অনেক কবরে। কুলাউড়া উপজেলার টিলাগাঁও ইউনিয়নের লংলা চা-বাগানের রাবার বাগানে অবস্থিত এটি। ডানকান ব্রাদার্সের চা-বাগান লংলার ঐতিহাসিক এ সমাধিক্ষেত্রে বিলির্ড এলার্ম জনস, আরপি উলাগান এইচ, পিটার রবার্ট, মার্টিন জ্যাক, এন্ড্রু মার্টিনসহ অনেক টি প্লান্টারের সমাধি রয়েছে। কলেরায়, বজ্রপাতে কেউবা সাপের কামড়ে মারা যান তখন।
রয়েল পরিবারের একজন টি প্লান্টারের দুই শিশুপুত্র পিটার রবার্ট ও এন্ড্রু ব্রুয়েল পাঁচদিন ব্যবধানে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাদের জোড়া কবরের গায়ে বাবার শোকগাঁথা খোদাই করা আছে।
এছাড়া কমলগঞ্জের শমসেরনগর সিমেট্রিতে নামহীন ১৬টি কবরের পাশাপাশি নথিভুক্ত বেশকিছু কবর রয়েছে। জুড়ী উপজেলার ফুলতলা টি এস্টেট সিমেট্রি ও রাজকী চা-বাগান সিমেট্রিতে বেশকিছু কবর সংরক্ষিত আছে। তবে এ উপজেলার কাপনা পাহাড় চা-বাগান সিমেট্রি বর্তমানে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তাছাড়া হবিগঞ্জের বেগম খান সিমেট্রি, সিলেটের লালাখাল চা-বাগান সিমেট্রি ও মনিপুর চা-বাগান সিমেট্রিতেও ইংরেজ সাহেবদের কিছু কবর আছে।
সিলেটের চা-বাগানগুলোয় ব্রিটিশ অভিজাত পরিবারের সদস্যরাই টি প্লান্টার হিসেবে কাজ করতেন। তারা প্রায় সবাই ব্রিটিশ রানীর খেতাবপ্রাপ্ত ছিলেন। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বিদেশের বাজারে চা পাঠানো হতো। এজন্য ১৮৯২ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি ঘটিত হয়। উপমহাদেশের প্রায় সবকিছুতেই ছড়িয়ে ছিটেয়ে রয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নিদর্শন।
আমাদের সকালটা শুরু যে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে, সে চা আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন যেসব ভিনদেশী, তাদের অনেকেরই আর ফেরা হয়নি বাড়ি। স্নিগ্ধ সবুজ চা পাতার নিচেই শুয়ে আছেন তারা। তাদের শেষ আশ্রয়টুকু এখন ইতিহাসের অংশ। ঐতিহাসিক এসব স্থানকে সংরক্ষণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে আমাদের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সুযোগ রয়েছে।
আহমদ আফরোজ: কবি ও সাংবাদিক










