ভাইকিংদের চিত্রায়ণে এ ভারসাম্যের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্ক্যান্ডিনেভীয় ইতিহাসে ভাইকিংরা একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক প্রতীক। তবে সিনেমা ও সিরিজে তাদের সময় অনুসারে নতুনভাবে ব্যাখ্যা ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।
চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে ভাইকিংদের উপস্থাপন সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে। একসময়ের নিষ্ঠুর ও রক্তপিপাসু যোদ্ধার প্রচলিত ধারণা থেকে সরে এসে আধুনিক নির্মাতারা তাদের সংস্কৃতি, সমাজ ও পুরাণকে আরো গভীরভাবে তুলে ধরেছেন। এতে ভাইকিংদের শুধু যোদ্ধা নয়, বরং বণিক, অভিযাত্রী ও ধর্মপ্রচারক হিসেবেও দেখানো হয়েছে।
ঐতিহাসিক ড্রামাগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে বহুবারই ভাইকিংদের দেখা গেছে। এর অন্যতম উদাহরণ টেলিভিশন সিরিজ ভাইকিংস (২০১৩-২০)। সিরিজে কিংবদন্তি ভাইকিং নেতা রাগনার লথব্রক এবং তার বংশধরদের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। গল্পের কিছু উপাদান বাস্তব, অনেকটাই সৃজনশীল স্বাধীনতা থেকে তৈরি। কিছু ঐতিহাসিক অসংগতিও আছে। তবে সিরিজটি ভাইকিং যুগের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে জীবন্ত করে তোলে। এতে তাদের তুলনামূলক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো, নৌদক্ষতা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে নর্স ধর্ম, বিশ্বাস ও খ্রিস্ট ধর্মের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে এতে গভীরভাবে অনুসন্ধান করা হয়েছে।

‘দ্য ভাইকিংস’-এর পোস্টার ছবি: সিনে ম্যাটেরিয়াল
এছাড়া সিরিজে ভাইকিংদের নৌচালনার অসাধারণ দক্ষতা এবং নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কারের আগ্রহকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিপজ্জনক সমুদ্র পাড়ি দিয়ে তাদের লংশিপের অভিযাত্রা দেখানো হয়েছে অত্যন্ত জীবন্তভাবে। এটি অজানা ভূখণ্ডে পৌঁছে তাদের বিজয় ও বাণিজ্যের নতুন সুযোগ খুঁজে পাওয়ার দৃঢ় সংকল্পের প্রতিফলন। সমুদ্রযাত্রা তাদের লুণ্ঠন ও বিজয় অভিযানেরও অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল। সিরিজটিতে উপকূলীয় গ্রাম ও শহরে তাদের নাটকীয় হামলার দৃশ্য দেখানো হয়েছে, যেখানে ভাইকিংদের যুদ্ধ দক্ষতা ও শত্রুদের মধ্যে সৃষ্ট আতঙ্ক স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
একইভাবে, ‘দ্য লাস্ট কিংডম’ (২০১৫ থেকে–বর্তমান), ইংল্যান্ডে ভাইকিংদের আক্রমণের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। বার্নার্ড কর্নওয়েলের দ্য স্যাক্সন স্টোরিজ (২০০৪-২০) অবলম্বনে নির্মিত সিরিজটি একই সঙ্গে এটি তাদের অভিযানের ফলে সৃষ্ট সাংস্কৃতিক বিনিময়কেও গুরুত্ব দেয়।
চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে ভাইকিংদের উপস্থাপন প্রায়ই নাটকীয়তার খাতিরে ঐতিহাসিক নির্ভুলতা থেকে বিচ্যুত হয়। ঐতিহাসিক নাটকগুলো যতটা সম্ভব সময় ও ঘটনার সত্যতা বজায় রাখার চেষ্টা করলেও অনেক ক্ষেত্রেই সেখানে কালগত অসামঞ্জস্য ও অতিসরলীকরণ দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে ভাইকিংদের শিংযুক্ত শিরস্ত্রাণের কথা বলা যায়। উনিশ শতকের রোমান্টিক কল্পনার প্রভাবে এ ধারণা জনপ্রিয় হলেও বাস্তবে এমন শিরস্ত্রাণ ব্যবহারের কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।

মার্ভেলের সিরিজে থর চরিত্রে ক্রিস হেমসওয়ার্থ ছবি: মার্ভেল
অনেক চলচ্চিত্রে ভাইকিংদের ভয়ংকর যোদ্ধা ও নির্মম লুণ্ঠনকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে। এমনিতে অভিযাত্রী হিসেবে তাদের খ্যাতি আছে। সে খ্যাতিকে কাজে লাগিয়েই ভাইকিংদের এমন চিত্রায়ণ হয়েছে। এর অন্যতম উদাহরণ রিচার্ড ফ্লেইশার পরিচালিত ১৯৫৮ সালের দ্য ভাইকিংস। কার্ক ডগলাস ও টনি কার্টিস অভিনীত চলচ্চিত্রটি মহাকাব্যিক যুদ্ধ এবং অতিরঞ্জিত চরিত্রের মাধ্যমে ভাইকিংদের উপস্থাপন করেছে। সিনেমায় একটি আকর্ষণীয় গল্প আছে। তবে ঐতিহাসিক সত্যতা থেকে অনেকটাই সরে গিয়ে ভাইকিংদের কেবল লুণ্ঠনকারী হিসেবে তুলে ধরেছে। ফলে অভিযাত্রী, বণিক ও বসতি স্থাপনকারী হিসেবে তাদের বহুমাত্রিক পরিচয় আড়াল হয়ে গেছে।
আধুনিক সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় অনুসন্ধানেও ভাইকিংদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। জন ম্যাকটিয়ারনান পরিচালিত ‘দ্য থার্টিনথ ওয়ারিয়র’ (১৯৯৯) এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। মাইকেল ক্রাইটনের উপন্যাস ‘ইটার্স অব দ্য ডেড’ অবলম্বনে সিনেমাটি নির্মিত। এক আরব কূটনীতিককে একদল ভাইকিং যোদ্ধার সঙ্গে অতিপ্রাকৃত শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেখা যায়। এতে সাংস্কৃতিক সংঘাত ও সহযোগিতার বিষয়টি দক্ষতার সঙ্গে উপস্থাপিত হয়েছে। এখানে ভাইকিংরা যেমন ‘অন্য’ বা অপরিচিতের প্রতীক, তেমনি সম্ভাব্য মিত্রেরও প্রতীক, যা সমকালীন বহুসংস্কৃতিবাদ ও জোট গঠনের আলোচনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
আসরার আবেদিন: লেখক










