মওলানা সাহেব
সুর করে
শায়েরি বলছেন
আমার সামনে
বসে,
‘কোই
ভিরানি সি
ভিরানি হ্যায়
দাশত কো
দেখ্ কে
ঘর ইয়াদ
আয়া।’
‘শূন্যতার
মাঝেও শূন্যতার
বাস
মরু শূন্য
প্রান্তর দেখে
বাড়ির কথা
মনে পড়ে।’
ভূ ভারতের
সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক
বাদশাহ আকবরের
নির্মাণ করা
জামা মসজিদের
ধূসর পাথরের
মেঝের ওপর
কারপেট পাতা।
প্রচণ্ড গরমে
এখন মওলানা
সাহেবের সুরেলা
শায়েরি একদম
হূদয়ের গভীর
অবধি শীতল
হাওয়া বইয়ে
দিচ্ছে, যেন
কেউ ঝিরিঝিরি
জল ছিটিয়ে
দিচ্ছে মিহরাবের
সামনে থেকে
পেছনে; পবিত্র,
পাপী, ভালো,
মন্দ যেকোনো
মানুষের জন্য
মমতার স্পর্শ।
মওলানা সাহেব
শায়েরি পেশ
করার আগে
একই মসজিদ
মাদ্রাসার একটি
বাচ্চা বুলবুলি
পাখির মতো
মিঠে আওয়াজে
সবে আমাকে
গজল শুনিয়ে
গেল। সে
গজল এখন
ভাসছে লালচে
রঙা স্যান্ডস্টোনের
দেয়ালের কারুকাজের
ফাকফোঁকরে আরো
মিঠে সুরের
কোনো পাখির
ডাক হয়ে।
আর মিহরাবের
সুনিপুণ নীল,
লাল নকশা,
আরবি আয়াতের
মাঝে সুরের
বন্যা হয়ে
উড়ে উড়ে
জুড়িয়ে দিচ্ছে
প্রাণ। সত্যি
বলতে কি
যেমন সুরেলা
মওলানা সাহেবের
আওয়াজ তার
চেয়েও বেশি
জাদুকরী মিহরাবের
কারুকাজ। ভারতের
প্রায় সব
বড় বড়
মসজিদ দর্শন
আমার নসিবে
রেখেছেন পরওয়ারদিগার,
কিন্তু মিহরাবের
মোহময় রঙের,
শিল্পের আবরণে
এ মসজিদ
সবাইকে ছাড়িয়ে
গিয়েছে।
এ জগতের
নাম তাই
শান্তি। বাদশাহ
আকবর নিজেও
চেয়েছিলেন এমনই
একটি সাম্রাজ্য
হোক তার।
তিনি তা
প্রতিষ্ঠা করেছিলেন
এই ভূমিতে,
ফতেহপুর সিক্রি
নাম যার।
ভারতের উত্তর
প্রদেশের এক
অজানা, নিভৃত
এলাকা।
বালক বয়সে
পিতৃহারা বাদশাহর
প্রথম জীবনটা
কেটেছিল আপন
রাজত্ব গুছিয়ে
নিতে। রাজ্য
গুছিয়ে তবে
তিনি মনোযোগ
দিলেন রাজধানীর
দিকে। সেভাবে
নির্দিষ্ট কোনো
প্রাসাদও ছিল
না বাদশাহর।
আগ্রা থেকে
প্রায় ৪০
কিলোমিটার দূরে
এক নিরালা
স্থানে তিনি
রাজধানী গড়লেন
১৫৭১ সালে।
জায়গাটির নাম
ছিল সিক্রি।
রাজধানী হওয়ার
পর নাম
হলো ফতেহপুর
সিক্রি।
এখানেই বাস করতেন বাদশাহর আধ্যাত্মিক সুফি গুরু শেখ সালিম চিশতি। বাদশাহর তখন অবধি কোনো পুত্র সন্তান ছিল না। হুজুর সালিম চিশতির ভবিষ্যদ্বাণীতে বাদশাহর মাড়ওয়ারি হিন্দু বেগম জোধা বাইয়ের কোলে এলেন শাহজাদা। নাম রাখা হলো গুরুর নামে, সালিম। বড় হয়ে সালিম হলেন বাদশাহ জাহাঙ্গীর। বেগম জোধা বাইয়ের নামকরণ পরে হলো মরিয়ম উজ জামানি। কিন্তু বাদশাহর প্রধান মহিষী ছিলেন রুকাইয়া সুলতান বেগম। পুত্রসন্তানের জনক হওয়ার পর বাদশাহ নগর গড়ে তুললেন ফতেহপুর সিক্রিতে।
আমি এখন
যেখানে বসে
আছি সে
প্রাঙ্গণে আছে
সালিম চিশতির
মাজার শরিফ।
মসজিদের সামনে
বিশাল চৌকোণ
উঠোন আর
উঠোনকে ঘিরে
রেখেছে দেয়াল।
দেয়ালের ভেতরের
অংশের লাগোয়া
বারান্দায় ছাদ
করে দেয়া,
বিভিন্ন দেশের
বিভিন্ন বয়সের
মানুষ এখন
এই বিকাল
ছুঁই ছুঁই
সময়ে এসে
জমা হয়েছেন
সালিম চিশতির
কাছ থেকে
দোয়া পাওয়ার
জন্য, মানত
পূর্ণ হওয়ার
আশায়। মসজিদের
সামনে চারকোনা
জলাধার, মুসল্লিদের
ওজু করার
জন্য সবুজ
জল আরো
হাতছানি দিচ্ছে
মসজিদের ছায়া
নিজ গায়ে
ফেলে।
দরগাহ প্রাঙ্গণের
একপাশে সুউচ্চ
দরজা বা
তোরণ, যার
নাম ‘বুলন্দ
দরওয়াজা’।
এ প্রাঙ্গণকে
অনেকেই বুলন্দ
দরওয়াজা নামেও
চেনেন। ১৮০
ফুট উঁচু
এই তোরণ
পার হয়ে
তবেই ভেদ
করা যায়
ভেতরের রহস্য।
দরজার সামনে
জুতো খুলে
রেখে ভেতরে
পীর আউলিয়াকে
স্মরণ করতে
করতে খেয়াল
হলো যে
জায়গাটি পাহাড়ের
বেশ উঁচু
জায়গায় নির্মাণ
করা হয়েছে।
তোরণের গায়ে
তিমুরিদ বা
মোগল স্থাপত্যকলা
আর নকশায়
ফুল-লতা-পাতার
কারুকাজ, মাঝখানে
কোরআনের আয়াত
আয়তাকারে লেখা।
স্যান্ডস্টোনের তোরণ,
মাঝে কাঠের
বিশাল দরজা।
দরজা গলে
ভেতরে হেঁটে
গেলে পা
পড়বে স্যান্ডস্টোনের
লাল মেঝের
নমনীয়তায়, যদিও
গরমে গোলাপি
লাল রঙা
পাথর তেতে
উঠেছে, তবুও
সালিম চিশতির
কাছে মানত
করতে খালি
পায়ে হেঁটে
যাওয়ায় এটুকু
যে কেউ
হাসিমুখে মেনে
নেয়।
সালিম চিশতির
মাজার শরিফ
সাদা মর্মর
পাথরের কারুকাজে
খচিত এক
বিশাল নক্ষত্র
যেন। চারপাশে
লাল স্থাপনা,
লাল মেঝে
আর ঠিক
মাঝখানে শ্বেতশুভ্র
বসনের ভবনে
ঘুমান আউলিয়া।
ভবনের মাথায়
গম্বুজ আর
চারপাশে জালের
মতো দেখতে
মর্মর পাথরের
দেয়ালে কারুকাজ।
এখানকার ভাষায়
এই দেয়ালের
কারুকাজকে বলা
হয় ‘ঝারোখা’।
ভেতরে তখন
সব ধর্মের
মানুষের ভিড়।
মাজারের ঝারোখায়
লাল সুতো
বেঁধে মানত
করছে নারী-পুরুষ।
ইচ্ছা পূরণ
হবেই। যেমন
পূরণ হয়েছিল
বাদশাহ আকবরের
আকাঙ্ক্ষা। বাইরে
খোলা প্রাঙ্গণে
বাঁধাই করা
আরো অনেক
কবর, সালিম
চিশতির পুরুষ
আত্মীয়দের। আউলিয়ার
মাজারের পেছনে
ছাউনি দেয়া
ঘরে ঘুমাচ্ছেন
নিশ্চিন্তে আউলিয়ার
পরিবারের নারীরা।
এই কবরগুলোর
মাঝেই মেঝেতে
নিচের দিকে
একটা দরজা
নেমে গিয়েছে।
অবাক হওয়ার
মতোই কথা,
কবরস্থানে সুড়ঙ্গ
আসবে কেন?
শাহজাদা সালিম
বা জাহাঙ্গীরের
বাইজি প্রেমিকা
আনারকলিকে প্রেমের
অপরাধে যখন
বাদশাহ আকবর
মাটিতে পুঁতে
ফেলার আদেশ
দেন তখন
আনারকলির মা
তার প্রাণভিক্ষা
করেন। বাদশাহর
দয়া হয়।
তিনি মুক্ত
করেন বাইজিকে,
কিন্তু শর্ত
ছিল চলে
যেতে হবে
অনেক দূরে,
শাহজাদার নাগালের
বাইরে। এই
মাজার শরিফে
একটি দীর্ঘ
সুড়ঙ্গ ছিল
যার একটি
পথ নিয়ে
যায় আগ্রা,
আরেকটি দিল্লি
ও তৃতীয়টি
লাহোর। বলা
হয়ে থাকে,
আনারকলি লাহোরের
পথ ধরে
উধাও হয়ে
গিয়েছিলেন। আর
এখন সুড়ঙ্গের
দরজা তালাবন্ধ।
সুড়ঙ্গও বন্ধ
করে দিয়েছিল
ব্রিটিশ সরকার।
আর আনারকলি-সালিমের
অসম্পূর্ণ প্রেমের
কথা মনে
করে আজও
কোনো প্রেমিক
রেখে যায়
গোলাপ ফুল,
কোনো খুশবু
সেই বন্ধ
দরজার সামনে,
হয়তোবা নিজের
প্রেমকে পাওয়ার
তরে।
সালিম চিশতির
মাজারের সামনের
মর্মর পাথরের
মেঝেতে এখন
কাওয়ালিশিল্পীরা বসে
গেছেন মাজারে
আসা মানুষদের
সংগীতের সাগরে
মতোয়ারা করতে,
ভাসিয়ে নিতে।
এখন সবে
আসরের আজান
পড়েছে। একটু
পরই মাগরিব।
এই সুরেলা
নগরীতে সুরপাগল,
সংগীত অনুরাগী
বাদশাহ আকবর
যেন স্বয়ং
নেমে আসবেন
সুরের পরখ
করতে। শিল্পী
আর মাতোয়ারাদের
পেছনে ফেলে
আমি চললাম
বাদশাহি দরওয়াজা
পার হয়ে
সম্রাট আকবরের
প্রাসাদের দিকে।
বাদশাহ আকবর
নির্মাণ করেছিলেন
প্রাচীর ঘেরা
একটি নগরী।
এই রাজপ্রাসাদের
বাইরেও অনেক
ভগ্নপ্রায় স্থাপনা
আছে, আগ্রা
থেকে ফতেহপুর
সিক্রি আসার
পথে এমন
স্থাপনাই সন্ধান
দেবে বাদশাহর
সৌর্যের। পথের
ফেরে কাটাতে
গিয়ে দেখা
হয়ে যেতে
পারে কোনো
ময়ূর-ময়ূরীর
সঙ্গে। কল্পনায়
নয়, সত্যিকারের
ময়ূর। বাইরে
মনের আনন্দে
চড়ে বেড়ানো
ময়ূর সেই
বাদশাহি আমলেও
চড়ে বেড়াত
বাদশাহ-বেগমের
নিজস্ব বাগানে।
ফতেহপুর সিক্রির
প্রাসাদ প্রাঙ্গণে
প্রবেশের পর
ভবনগুলো শুরু
হয়েছে রানীদের
প্রাসাদ দিয়ে।
সব প্রাসাদ
লাল রঙা
স্যান্ডস্টোনে নির্মিত।
ইতিহাসবিদদের মতে
বাদশাহর মুসলমান
ও হিন্দু
বেগম ছিলেন
২০ জনের
মতো। আর
উপপত্নী ছিল
২০০-এর
কাছাকাছি। বিশাল
প্রাসাদ প্রাঙ্গণে
ঢুকেই দেখা
হয়ে গেল
বাদশাহর প্রিয়
বেগম জোধা
বাইয়ের প্রাসাদের
সঙ্গে। জোধা
বাই ছিলেন
জয়পুরের রাজকন্যা।
জয়পুরের সঙ্গে
রাজনৈতিক সম্পর্ক
আরো জোরদার
করার জন্য
বাদশাহ বিয়ে
করেন এই
রূপসী রাজকন্যাকে।
তবে উদার
দিল বাদশাহ
কখনো কোনো
হিন্দু রানীকে
ধর্মান্তরিত করার
ইচ্ছা পোষণ
করেননি। তারা
ধর্ম পালনের
ক্ষেত্রে ছিলেন
স্বাধীন। জোধা
বাই মোগল
সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী
উপহার দেয়ার
পর সম্রাট
সিদ্ধান্ত নেন
ফতেহপুর সিক্রিতে
রাজপ্রাসাদ তৈরির।
রানীর মহল
সুবিস্তৃত। লাল
স্যান্ডস্টোনে সামনের
প্রাসাদটি দ্বিতল।
দোতলায় বারান্দা
আর প্রাসাদের
শরীরে স্যান্ডস্টোনে
খোদাই করেছেন
শিল্পী ইসলামিক,
মোগল, রাজস্থানী
আর গুজরাটি
কারুকাজ। সম্রাট
আকবরের সময়
এ প্রাসাদের
দেয়ালে শোভা
পেয়েছিল স্বর্ণের
কাজ করা
চিত্র আর
কুলুঙ্গিতে থাকত
স্বর্ণের দেবদেবীর
মূর্তি, সঙ্গে
নানা নকশা।
রানী জোধা বাইয়ের প্রথম প্রাসাদ পার হলে অন্দরমহলের উঠোন। বিশাল উঠোনের মাঝখানে রানীর পূজার জন্য একটি তুলসী গাছ এখনো দাঁড়িয়ে আছে, পাতায় পাতায় দুলে দুলে সুঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। চৌকোণ আঙিনার তিনদিকে তিনটি প্রাসাদ আর একদিকে মন্দির। রানীর গ্রীষ্মের প্রাসাদ, শীতকালের জন্য প্রাসাদে ছিল আলাদা আলাদা ব্যবস্থা আর সেই সঙ্গে মন্দিরের কারুকাজ ভোলার নয়। ইসলামী আর হিন্দু স্থাপত্যকলা দিয়ে নির্মিত এ মন্দিরে প্রবেশ করলে মনে হবে যেন সব মানুষের একটিই ধর্ম, মনুষ্যত্ব। প্রাসাদগুলো বাইরের দিক থেকে দেখতে একই রকম। চারকোনা লালরঙা দালান, মাথায় গম্বুজ আকারের অসংখ্য ছাতা সারি সারি, স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় ‘ছাতরি’। এই ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে কখনো রানী হাওয়া খেতেন, কখনোবা প্রাসাদের ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে শুনতেন ভজন আর কীর্তন। কখনো উড়ে আসা চন্দনা পাখির সঙ্গে জমাতেন মান-অভিমানের আসর। আজও জোড়ায় জোড়ায় চন্দনা উড়ে বেড়ায় রানীর প্রাসাদে, কেউ না থাকলে হয়তোবা গানও গায় রানীর জন্য।
রানী জোধা
বাইয়ের প্রাসাদ
থেকে বেরোলে
পড়বে রানীর
জন্য আলাদা
করে নির্মিত
রন্ধনশালা। নিরামিষভোজী
বা শুদ্ধ
শাকাহারী রানী
জোধার রসুইঘরের
ভেতর আর
বাইরের দেয়ালে
খোদাই করা
কারুকাজ। প্রাসাদ
বা অন্য
কোনো দালানে
এখন কোনো
আসবাব নেই।
কালের নিয়মের
সঙ্গে সঙ্গে
হারিয়ে গিয়েছে।
খুব অল্প
কিছু ভারতের
বিভিন্ন জাদুঘরে
সংরক্ষিত আছে
আর কিছু
মূল্যবান জিনিসপত্র
ইংরেজরা নিয়ে
গিয়েছে।
রসুইঘর আর
রানীর প্রাসাদ
পেরোলে অন্যান্য
হিন্দু রানীর
প্রাসাদ, আরেকটু
ভেতরে মুসলমান
রানীদের প্রাসাদ।
তবে আকারে
বা ঐশ্বর্যে
এদের কেউই
জোধা বাইয়ের
প্রাসাদকে ছাড়িয়ে
যেতে পারেনি।
রানীদের মহলের
পেছনে বিস্তীর্ণ
খোলা মাঠে
এখনো দু-একটা
ইমারত সময়ের
সঙ্গে প্রতিযোগিতা
করে দাঁড়িয়ে
নিজের অস্তিত্বের
জানান দিচ্ছে।
এই মাঠে
ছিল মিনা
বাজার। তখনকার
দিনে রাজপরিবারের
হিন্দু-মুসলমান
যেকোনো নারীকেই
কঠিন পর্দা
প্রথা পালন
করতে হতো।
মহলের বাইরে
কেউ যেতেন
না। মিনা
বাজার ছিল
প্রাসাদের জেনানাদের
মনোহারী জিনিসপত্রের
বাজার। রানী,
শাহজাদীরা বাইরে
যেতে পারেন
না তো
কি হয়েছে,
বাইরের বাজারের
পসরা সাজিয়ে
ব্যাপারিরা আসতেন
ভারতের বিভিন্ন
রাজ্য, ইরান,
তুরান, আফগানিস্তান,
ইউরোপ থেকে
নানা মন
ভুলানো, মন
রাঙানো গহনা,
পোশাক, প্রসাধন
আরো কত
কি নিয়ে!
সেসব পোশাক
আর প্রসাধনে
রাজকীয় নারীরা
আরো মেলে
ধরতেন নিজেদের।
সময় কাটাতেন
পাশা খেলে,
নাচ-গানে
বা পান-তামাকের
আসরের গালগল্পে।
জেনানা মহল
ছাড়িয়ে দূর
থেকে ভেসে
আসা বেগমের
চুড়ির রিনিঝিনি
আওয়াজ বা
কোনো ইরানি
আতরের খুশবুকে
পাশ কাটিয়ে
চললাম ‘দিওয়ান-ই
আম’ বা
সম্রাটের আমজনতার
জন্য দপ্তরের
দিকে। চারকোনা
বিশাল খোলা
বাগান মাঝখানে
আর চারপাশে
ঘিরে আছে
বারান্দা। বারান্দার
স্তম্ভে কারুকার্য,
রাজকীয় তার
পেশকাশ।
দক্ষিণ বারান্দায়
সম্রাটের আসন,
যেখানে বসে
সম্রাট আকবর
জনসাধারণের আর্জি
শুনতেন। প্রজা
অন্তঃপ্রাণ বাদশাহ
কোনো প্রজাকে
ফিরিয়ে দিতেন
না। এ
কারণে ইতিহাসে
বাদশাহকে বলা
হয় ‘আকবর
দ্য গ্রেট’।
দিওয়ান-ই
আম প্রাঙ্গণ
পেরিয়ে আরো
এগোলে সম্রাটের
হাম্মাম বা
স্নানের পুকুর।
দেখতে অবশ্য
আজকের দিনের
সুইমিং পুলের
মতো। সেখানে
ঠাণ্ডা ও
গরম পানিরও
ব্যবস্থা ছিল।
এসব পেরিয়ে
আরেকটু এগোলে
দেখা মিলবে
বাদশাহর একান্ত
নিজস্ব দরবার
মহল ‘দিওয়ান-ই
খাস’।
বাইরে থেকে
প্রত্যেকটি দোতলা
মহল দেখতে
প্রায় একই
রকম। সাধারণ
দোতলায় ঝুল
বারান্দা আর
ছাদে গম্বুজ
আকারের দুটো
ছোট ছাতরি।
তবে এ
খাসমহল বা
বাদশাহর দরবার
ছিল শুধু
বিশেষ ব্যক্তিদের
জন্যই। দোতলার
মধ্যখানে একটি
আসন ছিল
বাদশাহর জন্য।
একটি স্তম্ভের
ওপর ছিল
সে আসন।
ভেতর মহল
স্যান্ডস্টোনের কারুকাজে
সমৃদ্ধ। বাদশাহর
আসনে যে
কারুকাজ খোদাই
করা তা
ইসলামিক আর
হিন্দু কারুশৈলীর
এক অপূর্ব
মেলবন্ধন।
দিওয়ান-ই
খাসের ডান
পাশের ভবনটির
নাম ‘আঁখ
মিচৌলি’ মানে
লুকোচুরি। লুকোচুরি
খেলার জন্যই
এ ভবন
নির্মাণ। একেকটি
কক্ষ থেকে
কয়েকটি পথ
বেরিয়েছে। আবার
মিলেছে অন্য
পথে। প্রাসাদের
নারীদের মনোরঞ্জনের
জন্য অনন্যসাধারণ
ভবনটি এক
তলা।
আঁখ মিচৌলি
ভবনের পাশের
ভবনটির নাম
‘খাজানা’
বা রাজকীয়
কোষাগার। সম্রাটের
ধনদৌলত থাকত
সে ভবনে।
স্বর্ণ, রুপার
মুদ্রা বা
অন্যান্য মূল্যবান
বস্তু রাখার
জন্য নির্মাণ
করা হয়েছিল
এ একতলা
ভবনটি।
আরো খানিক
এগোলে দেখা
মিলবে ‘পঞ্চ
মহল’-এর।
পঞ্চ মহল
ছিল শুধুই
প্রাসাদের নারীদের
জন্য। গরমকালে
যখন প্রচণ্ড
খরতাপে শরীর
জুড়ায় না
প্রাসাদে, মন
ছুটে চলে
কোনো ঝরনাধারার
পানে তখন
বেগম আর
শাহজাদীরা হাওয়া
খেতে চলে
আসতেন এই
পাঁচতলা মহলে,
ঝরনার হাওয়া
বেশুমার মিলবে
এখানে প্রতি
তলায়। মহলে
কোনো দেয়াল
নেই। পুরোটাই
একেকতলার স্তম্ভের
ওপর দাঁড়িয়ে
আছে। আর
নিচ থেকে
যতই ওপরে
যায় মহল,
ততই প্রস্থে
ক্ষীণ হতে
থাকে এর
স্থাপত্যকলা। এখন
শূন্য এ
মহলের শূন্যতা
কমাতে পায়রা
উড়ে যায়
ঝাঁকে ঝাঁকে
আকাশে। মহলের
কোটরে কোটরে
বাসা বাঁধে,
উড়ে উড়ে
কোনো শাহজাদীর
হাত থেকে
খাবারের আশায়।
পঞ্চ মহলকে পাশ কাটিয়ে খুব বেশি দূরের পথ নয়, সামনেই বাদশাহ আকবরের প্রাসাদ। প্রাসাদের সামনে একটি জলাধার। জলাধারের সবুজ জলের ঠিক মধ্যখানে দ্বীপের মতো একটুখানি খোলা বৈঠকখানা, যেন জলে ভাসছে। চারদিক থেকে চারটি সরু সেতু করে দেয়া আছে সেই আসনে গিয়ে বসার জন্য। এই শুকনো খটখটে মাটিতে এক টুকরো জলাধারের মাঝখানে বসে শীতলতা ধার করে নেয়া যেন বাদশাহ আকবরের সাম্রাজ্যের পূর্ণতা প্রাপ্তির একাংশ। বাদশাহ আকবর এখানে নিয়মিত আসন গ্রহণ না করলেও সাম্রাজ্যের সুর সম্রাট মিয়া তানসেন এখানে বসে গান গাইতেন, সুরের সঙ্গে সোহাগ করতেন। এই সেই স্থান যেখানে বসে সুরের তরঙ্গে যোগাযোগ করতেন দূরের আকাশের মেঘেদের সঙ্গে। রাগ মেঘ মালহার গেয়ে তিনি প্রচণ্ড দাবদাহের দিনে আকাশ থেকে ঝরিয়ে দিতেন অঝোর ধারা, ধরনি তৃপ্তিতে আকণ্ড পান করত। অথবা এই অলৌকিক জলাধারে রাগ দীপক রেওয়াজ করতে করতে সন্ধ্যাবেলায় জ্বলে উঠত প্রদীপ, মহলে মহলে কোনো দ্বীপশিখা ছাড়াই, তানসেনের কণ্ঠের মোহমায়ায়। এমনই জাদুকরী কণ্ঠের, জাদুর মানুষ মুগ্ধ করতেন সম্রাটকে।
জলাধারের দিকে
মুখ করা
সম্রাট আকবরের
ব্যক্তিগত প্রাসাদ।
সম্রাটের শোয়ার
ঘর। ভেবেছিলাম
প্রাসাদ হবে
অনুপম রূপে
রূপকথার আখ্যান
অথবা বিভিন্ন
দামি পাথর,
মণিমানিক্যে ভরপুর
এক জৌলুশময়
ভবন। আমার
সব আশায়
জল ঢেলে
দিল প্রাসাদের
অন্দরমহল। নিতান্তই
সাধারণ মানুষের
বাড়ি দেখতে
এমন হয়।
চারদিকে স্যান্ডস্টোনের
দেয়াল। দেয়াল-ছাদ
কোথাও নেই
কোনো কারুকাজ,
নেই কোনো
আভরণ। আগ্রা,
সিক্রি বা
সিকান্দারা গ্রামের
যেকোনো সাধারণ
ঘরের মতো
বাদশাহর নিজস্ব
কক্ষ। ভারত
উপমহাদেশে মোগল
সালতানাতের সবচেয়ে
প্রভাবশালী, প্রতিপত্তিশীল,
বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান,
বীর, দয়ালু,
প্রজা অন্তঃপ্রাণ
মোগল বাদশাহর
আবাস নিতান্তই
সাধারণ প্রজার
মতোই। ভারতের
যেকোনো ছোট
জেলার রাজার
প্রাসাদও এর
চেয়ে অনেক
গুণ আড়ম্বরপূর্ণ।
কক্ষের মাঝখানে
স্যান্ডস্টোনের তৈরি
একটি উঁচু
বিছানা, এছাড়া
লক্ষণীয় আর
কিছুই নেই।
যেকোনো বেগমের
মহলও বাদশাহর
মহলের চেয়ে
বেশি জাঁকজমকপূর্ণ,
আভিজাত্যে ভরপুর।
সম্রাট আকবরের
প্রাসাদের পাশে
আরেকটি প্রাসাদ,
নাম তার
‘শিশ
মহল’ বা
কাচের প্রাসাদ।
মহলটি আমার
খুব পছন্দ
হয়েছিল। মেঝে
থেকে ছাদ
অবধি আগাগোড়া
সূক্ষ্ম কারুকাজে
খোদাই করা
দেয়াল, দেয়ালের
মাঝে ছোট
ছোট ফোকর।
একসময় এ
ফোকরগুলো কাচে
আবৃত ছিল।
রাতে কক্ষের
মাঝখানে আলো
জ্বললে কাচে
কাচে প্রতিফলিত
হয়ে হাজার
গুণে আলোকিত
হতো চারপাশ।
এ মহল
তখন হয়ে
যেত লাল
ঘোমটা দেয়া
রূপের রানী,
একটু অবগুণ্ঠন
সরে যায়
তো ছলকে
ওঠে ইন্দ্রপুরীর
চকমকে রূপ
লক্ষ কোটি
গুণে। বাদশাহ
আকবরের সাদাসিধে
প্রাসাদ দর্শনের
শোক শিশ
মহল দেখে
কিছুটা হলেও
কম হয়েছে।
সন্ধ্যা হয়ে
আসছে। ফতেহপুর
সিক্রি বন্ধ
হতে চলেছে।
আমাকে ফিরে
যেতে হবে
আগ্রা। কারণ
বাদশাহ আকবরের
সমাধি দেখে
না গেলে
এ ভ্রমণ
অধুরা রয়ে
যাবে। আগ্রায়
পৌঁছে অবশ্য
কর্তব্য হলো
মোগলাই খাবারের
স্বাদ নেয়া।
শুধু ভারত
নয় সমগ্র
দুনিয়ায় মোগলাই
খাবারকে সবাই
কদর করে
এর স্বাদ
ও সুঘ্রাণের
জন্য। আগ্রার
সন্ধ্যাকে আরো
আমোদপূর্ণ করে
দিল মিহি
করে কাটা
বাদাম পেস্তায়
সজ্জিত মোরগ
মোসাল্লাম, হালকা
আঁচে ভাজা
শামি কাবাব,
পারাঠা আর
বেরেস্তার পরতে
শাহি মোগলাই
বিরিয়ানি এবং
অবশ্যই শেষ
পাতে রুপালি
তবক দেয়া
ফিরনি।
পরদিন ভোরে
চললাম সিকান্দারা,
সম্রাট আকবরের
সমাধিসৌধে। আগ্রা
থেকে ছয়
কিলোমিটার দূরে।
মোগল সম্রাটরা
ভারত উপমহাদেশে
বিভিন্ন খাবার
সঙ্গে করে
নিয়ে এসেছিলেন।
সকালে জিলিপি
কচুরি, পুরি
জিলিপি বা
সিঙ্গাড়া জিলিপি
না হলে
কারো কারো
নাশতা করাই
হয় না।
এ রকম
একটি বিখ্যাত
দোকান থেকে
সিঙ্গাড়া জিলিপি
নিয়ে খেতে
খেতে চললাম
বাদশাহ আকবর
দর্শনে।
বাদশাহ নিজ
জীবদ্দশায় এ
সৌধের কাজ
শুরু করেছিলেন,
কিন্তু আচানক
১৬০৫ সালে
সাধারণ আমাশয়ে
ইন্তেকাল করার
কারণে সৌধটি
আধা নির্মিত
অবস্থায় রয়ে
যায়। পরে
সম্রাট জাহাঙ্গীর
পিতার সমাধিসৌধের
বাকি কাজ
শেষ করেন।
বাদশাহ আকবর
অমর হতে
চেয়েছিলেন, যার
নিদর্শন মেলে
এই সৌধের
বহিরাবরণে। স্যান্ডস্টোনে
খোদাই করা
ফুল-লতা-পাতা,
আরবি আয়াত
আর লাল-সাদার
আলপনা সবকিছু
ছাপিয়ে এক
আমির দিল
বাদশাহর অমর
জীবনের নিশানা
দিয়ে যায়
আজও। বাইরে
লাল আয়তাকার
দালানের চার
কোনায় চারটি
সাদা মিনার,
ভেতরে বাদশাহ
থাকেন ঘুমিয়ে।
ভেতরের দেয়াল
আর ছাদের
কারুকাজ আরো
সুনিপুণ ঐশ্বর্যময়।
বাদশাহ আকবরের
সমাধিসৌধ পুত্র
বাদশাহ জাহাঙ্গীর
নির্মাণ করেছিলেন
ইসলামিক, পারসিয়ান
স্থাপত্যকলা অনুসরণ
করে। আর
সমাধিসৌধের ভেতরের
কারুকাজ স্যান্ডস্টোনের
ওপর নিখুঁত
হাতের উদ্ভাবনীতে
করা হলেও
আগ্রার তাজমহলের
চেয়ে নকশার
প্রতিভায়, দক্ষতায়
কম কিছুতেই
নয়। চারপাশে
ফুলের বাগান
মাঝখানে জগৎ
আলো করা
সৌধ। সম্রাট
আকবর এভাবেই
থাকতে চেয়েছিলেন
জনসাধারণের মাঝখানে,
জনগণের একজন
হয়ে।
ফাতিমা জাহান:
পুরাকীর্তি
ও প্রাচীন
সভ্যতা অনুসন্ধানী
লেখক
আলোকচিত্র: লেখকের তোলা





