ক্যাপিটাল অন
হুইলস—চাকার
ওপরে রাজধানী।
সম্রাট যেখানে
দরবার করবেন,
যেখান থেকে
রাজকার্য চালাবেন,
সেখানেই সাম্রাজ্যের
রাজধানী, মোবাইল
ক্যাপিটাল। এর
কারণ দুটো:
সাম্রাজ্য প্রতিরক্ষা
ও সাম্রাজ্য
বিস্তার।
আগ্রা থেকে
৩৭ কিলোমিটার
দূরে ফতেপুর
সিক্রিতে মোগল
সম্রাট জালালউদ্দীন
মোহাম্মদ আকবরের
হাতেই নির্মিত
হয়েছিল তখনকার
পৃথিবীর অন্যতম
শ্রেষ্ঠ আলোকজ্জ্বল
রাজধানী শহর।
কিন্তু সেখান
থেকে রাজধানী
লাহোরে কেন
স্থানান্তরিত করতে
হলো? ঐতিহাসিকদের
কাছে এ
এক কৌতূহলোদ্দীপক
প্রশ্ন। গবেষক
মাজিদ শেখের
রচনা অনুসরণ
করে এ
নিবন্ধটি রচিত।
ভারতের ষষ্ঠ
সুরী শাসক
সিকান্দার শাহ
সুরী আকবরের
সেনাবাহিনীকে পরাস্ত
করে লাহোর
পুনরুদ্ধারের চেষ্টা
চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
লাহোরের জন্য
সুরীদের আবেগময়
একটি আকর্ষণের
কারণ সুরী
বংশের প্রথম
শাসক লাহোর
নগর সীমানার
বাইরে মোগল
জেনারেল খিজির
খাজা খানকে
ভালোভাবেই পরাস্ত
করেন। ১৫৫৫
সালে সম্রাট
হুমায়ুন লাহোর
মোগল অধিকারে
আনেন। মোগল
জেনারেলকে তখন
লাহোরের আশা
ছেড়ে দিয়ে
অবরুদ্ধ সম্রাট
আকবরকে উদ্ধার
করতে দিল্লির
দিকে রওনা
হলেন। খলনায়ক
সুরী সেনাপতি
হেমু, এ
কালের ঐতিহাসিকরা
তাকে হেমচন্দ্র
বিক্রমাদিত্য নামে
চিহ্নিত করে
থাকেন। হেমু
দিল্লি ও
আগ্রা দখল
করে নিজেকে
ভারতের সম্রাট
ঘোষণা করেছেন।
হেমু মনে
করতেন সাম্রাজ্য
গড়তে তাকে
লাহোরও অধিকার
করতে হবে।
এদিকে মোগলদেরও
বিভিন্ন ফ্রন্টে
শত্রুর মোকাবেলা
করতে হচ্ছে।
তাদের দিল্লি
ও আগ্রা
উদ্ধার করতে
হবে, লাহোরও
পুনরাধিকার করতে
হবে।
হেমুকে ধরার
জন্য প্রস্তুতি
নিলেন আকবরের
সেনাপতি বৈরাম
খান, কিন্তু
সম্রাট আকবর
বৈরাম খানকে
নিষেধ করেছেন
যেন হিমুকে
হত্যা না
করা হয়।
খবরটি সাধারণ
সৈনিকরাও জেনে
যায়। হেমুই
ছিলেন মুসলমান
শাসনাধীনে শেষ
হিন্দু শাসক।
একইভাবে বৈরামের
খান শেষ
সুরী শাসককে
পরাস্ত করল,
তবে সম্রাট
আকবরের বাধার
কারণে তার
মাথা দেহ
বিচ্ছিন্ন করতে
পারছিলেন না।
শেষমেশ বৈরাম
খান হেমুর
মস্তক বিচ্ছিন্ন
করেন।
আবুল ফজলের আকবরনামায় উল্লেখ করা হয়েছে বৈরাম খান সেনাপতি হিসেবে চরম বাড়াবাড়ি শুরু করেন, সম্রাটের অবাধ্য হয়ে দিল্লির সুবাদারকে হত্যা করলেন এবং খেয়ালের বশে হাতির নিরপরাধ এক মাহূতের মাথাও ধড় থেকে নামিয়ে ফেললেন। সম্রাট বুঝতে পারলেন বৈরাম খান তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছেন। বৈরাম এ ধরনের খুন-খারাবির অনুমোদন নিতেন মুল্লা মীর মোহাম্মদ নামের এ ধর্মীয় নেতার কাছ থেকে। আকবর তাকে অপসারণ করলেন। বাংলার বিদ্রোহী দমনের কথা বলে বৈরাম খান পথ ঘুরে লাহোরের দিকে রওনা হলেন।
কিন্তু লাহোরে
কেন? আবুল
ফজল লিখেছেন,
মনে হচ্ছে
বৈরাম লাহোরের
ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের
সঙ্গে অন্তরঙ্গ
সম্পর্ক স্থাপন
করেছেন। তারা
লাহোরের রাজনীতিতে
অত্যন্ত প্রভাবশালী।
মোগলরা তখন
পশ্চিম রণাঙ্গনে
ব্যস্ত, বৈরাম
নিজের পরিকল্পনা
মতো এগোতে
থাকেন। কিন্তু
ততদিনে নাবালক
সম্রাট আকবর
১৮ বছরে
উত্তীর্ণ হন।
তার কাছে
সরাসরি গোয়েন্দা
রিপোর্ট আসতে
থাকে। বৈরাম
লাহোরভিত্তিক এলাকার
স্বাধীনতা ঘোষণা
করতে পারে
বলে অনুমান
করা হয়।
বাদশাহ তাকে
বার্তা দেন।
এখন থেকে
তিনিই তার
প্রভু। তার
পরিকল্পনা তিনি
জেনে গেছেন,
অহংকারী এই
তুর্কি বৈরাম
খানকে তার
মঙ্গলের জন্য
শেষ সুযোগ
দিতে চাচ্ছেন।
বৈরাম তখনই
পবিত্র মক্কার
দিকে রওনা
দেবেন এবং
বাকি জীবন
প্রার্থনা করে
কাটাবেন। তিনি
তাকে মাসিক
৫ হাজার
টাকা আজীবন
ভাতা দিয়ে
থাকেন।
বৈরাম যখন
দেখলেন তার
সঙ্গে ঘনিষ্ঠ
লাহোরের বণিকরা
গ্রেফতার হতে
শুরু করেছেন,
তিনি দ্রুত
মক্কার দিকে
রওনা হলেন।
কিন্তু জাহাজ
ধরার জন্য
সমুদ্র উপকূলে
পৌঁছার আগেই
একজন আফগান
তার হূিপণ্ড
বরাবর ছুরি
বসিয়ে তাকে
হত্যা করে।
আকবরের রাজসভায়
প্রভাব বিস্তারকারী
ধর্মীয় ব্যক্তিদের
অপসারণ করে
১৫৬২ সালে
একজন হিন্দু
রাজার কন্যাকে
বিয়ে করেন।
এ কথা
অনস্বীকার্য, মোগল
সম্রাজ্য রক্ষায়
ও বিস্তারে
বৈরাম খানের
অবদান স্মরণীয়।
তার এক
অনুগত ক্রীতদাস
সম্রাটকে তীর
নিক্ষেপ করলে
তিনি জখম
হন, এ
ক্রীতদাসকে হত্যা
করা হয়।
সম্রাট জানলেন
বৈরাম খানের
মৃত্যুর খবর
পেয়ে সম্রাটের
বৈমাত্রৈয় ভাই
হাকিম মীর্জা
লাহোর দখলের
জন্য কাবুল
থেকে সসৈন্যে
এগিয়ে আসছেন।
আকবরও একই
সঙ্গে তার
বিশাল বাহিনী
নিয়ে রওনা
হয়ে লাহোর
ও দূরবর্তী
এলাকাগুলোও ঘেরাও
করে ফেললেন।
সন্ত্রস্ত হাকিম
মীর্জা দ্রুত
কাবুল ফিরে
যান।
আকবর লাহোর
পৌঁছার পর
শহরে শান্তি
ফিরে এল,
এখানেই ৬
সেপ্টেম্বর ১৫৬৯
আকবরের পুত্র
সালিম জন্মগ্রহণ
করেন। সম্রাট
দ্রুত আজমিরে
খাজা মঈনউদ্দিন
চিশতিকে শ্রদ্ধা
জানিয়ে লাহোর
ফিরে এলেন।
তিনি শাসন
প্রতিষ্ঠার জন্য
লাহোরকে রাজধানী
করার কথা
ভাবেন। কাবুলের
শাসক ক্রমাগত
ষড়যন্ত্র করতে
থাকে। একটি
শক্তিশালী সশস্ত্র
বাহিনী নিয়ে
১১ মার্চ
১৫৭৯ আকবর
কাবুলে প্রবেশ
করেন এবং
হাকিম মীর্জাকে
হটিয়ে একজন
রাজপুত্রকে কাবুলের
গভর্নর নিয়োগ
করলেন। লাহোরে
ফেরার পথে
তিনি আরো
বেশ ক’টি
অভিযান চালান।
এসব অভিযানে
তার তিনজন
অত্যন্ত দক্ষ
উপদেষ্টা—রাজা
টোডরমল, রাজা
ভগবান দাস
এবং রাজা
বীরবল নিহত
হন। কাশ্মীর
অধিকার করে
জাফরান বাণিজ্য
মোগল অধিকারে
নিয়ে আসেন।
আরো কিছু
লঘু বিদ্রোহ
দমন করে
আকবর সমগ্র
এলাকার রাজস্বের
নিয়ন্ত্রণ তার
সরকারে হাতে
ন্যস্ত করেন।
রাজধানী স্থানান্তরের
আরো বেশি
তাগিদ অনুভব
করেন এবং
১৫৮২ সালে
রাজধানী স্থানান্তরের
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
নেন। আবুল
ফজল লিখেছেন,
ফতেহপুর সিক্রিতে
তিনজন পর্তুগিজ
খ্রিস্টীয় ধর্মগুরু
সম্রাটের সঙ্গে
সাক্ষাৎ করেন
এবং তার
আচরণে মুগ্ধ
হয়ে সম্রাটের
কাফেলার সঙ্গে
তারাও লাহোর
রওনা হন।
কাফেলায় যুদ্ধের
সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি
থাকল। সম্রাটের
চারদিকে দেহের
সামনের অংশ
ধাতব পাত
বেষ্টিত হাতি;
পেছনেই পাঁচ
হাজার হাতি,
সামনে এবং
ডানেও বায়েও
সুরক্ষিত হাতির
বাহিনী। লাহোর
তাকে বিপুল
সম্বর্ধনা দিয়ে
বরণ করে
নিল। সেই
ধর্ম যাজকরা
বলেছেন লাহোর
হচ্ছে আনন্দের
নগরী। রাভি
নদীর ভেতর
একটি দ্বীপে
সম্রাটের আবাসন
নির্মাণ করা
হলো। হাতির
কাফেলা বহন
করে নিয়ে
এল একটি
বিশাল রাজধানী।
আগ্রাতে পানির
অভাব থাকায়
আকবরই রাজধানী
আগ্রা থেকে
ফতেহপুর সিক্রিতে
স্থানান্তর করেন।
প্রশাসনিক প্রয়োজনে
তিনি যখন
রাজধানী লাহোরে
নিয়ে যান
মোগল সাম্রাজ্য
তখন খ্যাতির
শীর্ষে। তবে
তার দৌহিত্র
সম্রাট শাহজাহান
চাইলেন আগ্রা
ও লাহোরের
মাঝামাঝি কোথাও
নতুন রাজধানী
হবে। সেটিই
শাহজানাবাদ বা
দিল্লি। পঞ্চদশ
শতাব্দীতে রাজধানী
দিল্লিতেই ছিল।
সুলতান সিকান্দার
লোদি ১৫০৬
সালে রাজধানী
আগ্রাতে স্থানান্তরিত
করেন। কার্যত
লাহোর সে
১৫৮৬ থেকে
১৫৯৮ পর্যন্ত
মোগল সাম্রাজ্যের
রাজধানী ছিল।
আর ১৫২৪
থেকে ১৭৫২
পর্যন্ত লাহোর
ছিল মোগল
সাম্রাজ্যের অংশ।
কবি জন
মিল্টন (১৬০৮-১৬৭৪)
তার ‘প্যারডাইস
লস্ট’ কাব্যে
লাহোরকে শক্তিশালী
সাম্রাজ্যের সুন্দর
শহর বলেছেন।
ইবনে মোতালিব: লেখক





