রাজনৈতিক অবস্থান
সাম্রাজ্য বিস্তার,
ধর্মীয় সহিষ্ণুতা,
সুশাসনের উদ্যোগ,
সাংস্কৃতিক অভিরুচি
বিশ্বসেরা সৌধ
নির্মাণে আগ্রহ
ও ঐকান্তিকতা—যদি
এসব নিয়ে
বিচার কর
হয়, তাহলে
মোগল সাম্রাজের
সঙ্গে উসমানিয়া
সাম্যাজ্যের অনেক
মিল পাওয়া
যায়। মোগল
রাজধানী প্রতিষ্ঠিত
হয়েছে চারটি
স্থানে: আগ্রা,
ফতেহপুর সিক্রি,
লাহোর ও
শাহজাহানাবাদ বা
দিল্লি আর
উসমানীয় রাজধানী
তিনটি স্থানে:
প্রুসা, আদ্রিয়ানোপোল
ও কনস্ট্যান্টিনোপোল।
তবে রোমান
ও বাইজেন্টাইন
সাম্রাজ্যে যথেষ্ট
বস্তুগত উন্নতি
হওয়ায় উসমানিয়া
সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা
লগ্নেই উন্নততর
সভ্যতা ও
উন্নয়নের উত্তরাধিকারী
হয়েছে, পক্ষান্তরে
মোগলদের হাতেই
তাদের সাম্রাজ্যের
উল্লেখযোগ্য স্থাপনাগুলো
নির্মিত হয়েছে।
আবার উসমানিয়া
সাম্রাজ্যের রাজধানী
কনস্ট্যান্টিনোপোল, রোমান
বাইজেন্টাইন ও
উসমানিয়া তিনটি
সাম্রাজ্যের রাজধানী
থাকার গৌরব
অর্জন করেছে।
বিভিন্ন ধরনের
রাজনৈতিক সামাজিক
ও কৌশলগত
কারণে এবং
কখনো শক্তিধর
সম্রাটদের খেয়ালের
বসেও রাজধানী
স্থানান্তরের ঘটন
ঘটেছে। বিংশ
শতকেও কয়েকটি
দেশের রাজধানীর
স্থান বদল
হয়েছে। মিসরের
প্রশাসনিক রাজধানী
প্রাচীন কায়রো
থেকে দূরে
৭০০ বর্গকিলোমিটার
স্থানে সরিয়ে
নেয়া হচ্ছে;
নাইজেরিয়া ১৯৯১
লাগোস থেকে
আবুজা শহরে
রাজধানী সরিয়ে
এনেছে। ২০০৫
সালে মিয়ানমার
রাজধানী রেঙ্গুন
থেকে নেপিডোতে
নিয়ে এসেছে;
১৯৫৯ সালে
পাকিস্তানের রাজধানী
করাচি থেকে
ইসলামাবাদে স্থানান্তরিত
করার সিদ্ধান্ত
হয় এবং
পরবর্তী এক
দশকে স্থানান্তর
সম্পন্ন হয়।
ব্রাজিলের রাজধানী
রিও ডি
জেনিরো থেকে
১৯৬০ সালে
ব্রাসিলিয়ায় এসেছে।
কাজাখস্তান, তানজানিয়া,
আইভরি কোস্ট
রাজধীন বদলেছে।
২০০ বছরের
পুরনো রাজধানী
সেইন্ট পিটার্সবার্গ
ছেড়ে রুশ
বিপ্লবের পর
পর রুশরা
তাদের রাজধানী
স্থানান্তর করেছে
মস্কোয়।
আবার গত
আট হাজার
বছরেও পরিবর্তিত
হয়নি সিরিয়ার
রাজধানী, সেটি
এখনো দামেস্কে।
সাত হাজার
বছরের পুরনো
এথেন্সই গ্রিসের
রাজধানী।
মোগল শাসনের টাইমলাইন
বাবর (১৫২৬-১৫৩০)
তৈমুর
ও চেঙ্গিসের
বংশধর বাবুর
১৫২৬ সালে
পানিপথের প্রথম
যুদ্ধে ইব্রাহিম
লোদিকে পরাজিত
করে ভারত
অধিকার করে
নেন। চাগতাই
তুর্কি ভাষায
তিনি আত্মজীবনী
তুজুক-ই-বাবরি
রচনা করেন।
১৫৩০ সালে
তার মৃত্যু
হয়।
হুমায়ুন (১৫৩০-১৫৫৬)
বাবরের
পুত্র। সুরী
বাদশার শের
শাহ চৌশা
ও কনৌজের
যুদ্ধে হুমায়ুনকে
পরাজিত করে
তাকে রাজ্যহারা
করেন। ১৫
বছর প্রবাস
জীবনের পর
সেনাপতি বৈরাম
খানকে নিয়ে
সাম্রাজ্য উদ্ধার
করেন। ১৫৫৬
সালে সাধারণ
দুর্ঘটনায় তার
মৃত্যু ঘটে।
তার সৎ
বোন গুলবদন
বেগম তার
শাসনকালের কাহিনী
নিয়ে লিখেছেন
হুমায়ননামা।
আকবর (১৫৫৬-১৬০৫)
শ্রেষ্ঠ
মোগল সম্রাট
হিসেবে সমাদৃত
আকবর যখন
ক্ষমতাসীন হন
তার বয়স
তখন ১৩
বছর। বয়স
১৮ তে
পৌঁছতেই অভিভাবক
বৈরাম খানকে
প্রত্যাখান করেন,
একের পর
এক ষড়যন্ত্র
মুলোৎপাটন করে
এবং যুদ্ধ
জিতে সাম্রাজ্যে
বিস্তৃত করেন।
তার বিখ্যাত
নবরত্ন সভার
সদস্যদের মধ্যে
ছিলেন টোডরমল,
আবুল ফজল,
ফৈজি, বীরবল,
তানসেন, মোল্লা
দুপেয়াজা প্রমুখ।
তার শাসনামলে
আগ্রা, ফতেহপুর
সিক্রি ও
লাহোর ভারতের
রাজধানী ছিল।
জাহাঙ্গীর (১৬০৫-১৬২৭)
তিনি
শাসক ও
যোদ্ধা হিসেবে
তেমন খ্যাতিমান
নন, তার
স্ত্রী নূরজাহান
তার সাফল্যের
অন্যতম সহায়ক
শক্তি।
শাহজাহান (১৬২৮-১৬৫৮)
তাজমহল
তাকে বিশ্বখ্যাত
করেছে। সাম্রাজ্য
বিস্তারে সফল,
সুশাসক। কিন্তু
তার পুত্রদের
ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ
তাকে বিপর্যন্ত
করে ফেলে,
শেষ জীবন
কাটে কারাবন্দি
হয়ে। শাহজাহানাবাদ
তার হাতে
রাজধানী হয়ে
ওঠে।
আওরঙ্গজেব (১৬৫৮-১৭০৭)
জিন্দাপীর
নামে খ্যাত
আওরঙ্গজেবের হাতে
ভ্রাতৃহত্যার নির্মম
ঘটনা ঘটে।
তবে শাসক
হিসেবে, যোদ্ধা
হিসেবে অসাধারণ
কৃতিত্বের অধিকারী।
তিনি বড়
সমাজ সংস্কারক,
সতীদাহে কোনো
নারীকে কেউ
বাধ্য করলে
তার জন্য
মৃত্যুদণ্ডের বিধান
করেছিলেন।
১৫২৬ থেকে
১৭০৭ এ
সময়টায় দক্ষিণ
এশিয়ার সবচেয়ে
বড় রাজনৈতিক
শক্তি হয়ে
ওঠে মোগল
শাসকরা; তাদের
সাম্রাজ্যের বিস্তার
৩০২ মিলিয়ন
বর্গকিলোমিটার আর
লোক সংখ্যা
১০ থেকে
১৫ কোটি।
মোগলদের ভারত
জয়ের এবং
সাম্রাজ্যে বিস্তারের
বড় সূত্র
ছিল তাদের
আধুনিক রণাঙ্গন
কৌশলে এবং
আধুনিক (সে
সময়ের তুলনায়)
অস্ত্রের ব্যবহার।
পানিপথের প্রথম
যুদ্ধে বাবর
বিস্ফোরক ব্যবহার
করেছিলেন। নাগরিকের
জন্য সুশাসন
ও রাষ্ট্রের
সুরক্ষার জন্য
ইম্পেরিয়াল ক্যাপিটাল
গুরুত্বপূণ হয়ে
ওঠে। অ্যামোস
র্যাপোপোর্ট তিনটি
বিষয়ে বিবেচনা
করেছে: ১.
প্রশাসনিক ও
অর্থনৈতিক কেন্দ্রিকতা,
২. ভৌগোলিক
ও কৌশলগত
শ্রেষ্ঠ অবস্থান;
৩. জাতীয়
পরিচিতি মর্যাদা
ও ক্ষমতার
প্রশ্নে সর্বোত্তম
বিনিয়োগ বিবেচনা।
একই সঙ্গে
অগণতান্ত্রিক শাসকের
বেলায় রাজধানী
হতে হবে
জনবিচ্ছিন্ন স্থানে।
কেবল স্বৈরশাসক
ও তার
রক্ষক ও
সমর্থকরা রাজধানীতে
অবস্থান করবেন।
সেখান থেকে
একই সঙ্গে
অন্যান্য বল
প্রয়োগ করা
হবে এবং
অন্যায়ভাবে আর্থিক
শোষণ চালানো
হবে।
মোগল শাসকের
অন্যতম বৈশিষ্ট্য
ছিল (একটি
দুর্লভ বৈশিষ্ট্যও)
লুট করে
সম্পদ নিজ
দেশে নিয়ে
না যাওয়া।
মোগলরা ভাগ্যন্বেষণে
এবং রাজ্য
দখল করতে
ভারতে এসেছেন,
সম্পদ বৃদ্ধি
করেছেন, আয়েসি
জীবনযাপন করেছেন
(ব্যতিক্রম আওরঙ্গজেব),
উপার্জিত ও
আদায়কৃত অর্থে
ভারতবর্ষের সৌধ
ইমারত নির্মাণ
করেছেন, রাস্তাঘাট
করেছেন, পুকুর
খনন করে
পানির কষ্ট
দূর করেছেন;
সেনাবাহিনী পালন
ও অস্ত্রশস্ত্রের
পেছনে যথেষ্ট
অর্থব্যয় করলেও
তাদের ব্যবহার
করেছেন ভারত
সাম্রাজ্য বিস্তারে
এবং সাম্রাজ্যের
প্রতিরক্ষায়। মোগল
সম্রাটরা সামান্য
সম্পদও তাদের
পিতৃভূমিতে বা
মায়ের পূর্ব
পুরুষদের দেশে
কিংবা অন্য
কোথাও পাঠাননি।
তারা সমাহিত
হয়েছেন ভারতবর্ষেই।
মোগলরা তাদের
রাজধানীকে বরাবরই
‘হাইয়েস্ট
অর্ডার’ সেন্টার
এ পরিণত
করেছে। কিন্তু
আবেগ ও
খামখেয়ালিপনাও ছিল
নতুবা আগ্রা,
ফতেহপুর সিক্রি
এবং দিল্লি
যেকোনো একটি
স্থানকেই দীর্ঘমেয়াদি
পরিকল্পনার আওতায়
আরো বৃহৎ
রাজধানীতে পরিণত
করা সম্ভব
ছিল। এর
বিপক্ষ যুক্তিও
গ্রহণযোগ্য, রাজধানী
পরিবর্তনে নগরের
বিকাশ বেড়েছে,
নাগরিকের ভৌত
সুবিধে এবং
পৌরষেবা অনেকাংশে
বেড়ে গেছে।
ছয়জন সম্রাটের
আমলে রাজধানী
আগ্রা থেকে
দিল্লিতে গিয়েছে,
আগ্রা থেকে
ফতেহপুর সিক্রিতে
এসেছে, ফতেহপুর
সিক্রি থেকে
লাহোর গিয়েছে,
লাহোর থেকে
আগ্রায় ফিরেছে
এবং আগ্রা
থেকে আবার
দিল্লিতে ফিরে
এসেছে।
পরিব্রাজক বার্ণিয়ের
উল্লেখ করেছেন
এক সময়
দুটি কেন্দ্র
থেকে রাজধানীর
কাজ করা
হতো, দিল্লি
ও আগ্রা
এবং আগ্রা
ও ফতেহপুর
সিক্রি। ভ্রাম্যমাণ
রাজধানী হিসেবে
দাক্ষিণাত্যের উত্তরাঞ্চলে
আওরঙ্গাবাদ এবং
কাশ্মীরের বিভিন্ন
স্থান বেছে
নেয়া হয়েছে।
বড় বড়
তাঁবু নগরীও
স্থাপন করা
হয়েছে। সম্রাট
আকবর তার
শাসনামলে ৬০
ভাগ সময়ই
তার রাজধানীর
বাইরে কাটিয়েছেন,
জাহাঙ্গীর তার
২২ বছর
শাসনের ১৪
বছরই ছিলেন
আগ্রার বাইরে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষক কার্লা
এম সিনোপলি
মোগল রাজধানী
স্থানান্তরের তিনটি
ব্যাখ্যা দিয়েছেন:
১. সাম্রাজ্যের
স্থিতিশীলতা বিনষ্টকারী
রাজনৈতিক, সামরিক
ও বস্তুগত
পরিস্থিতি
২. অর্থনৈতিক
ও জনসংখ্যাজনিত
পরিস্থিতি
৩. আদর্শগত
অবস্থান
সম্রাট আকবরের
ইম্পোরিয়াল ক্যাম্প—ভ্রাম্যমাণ
রাজধানী স্থাপনে
কেবল তাঁবু,
মালপত্র এবং
অবস্থানকালীন প্রয়োজনীয়
দ্রব্যাদি বহন
করতে ৫০
হাজার ঘোড়া
ও ষাঁড়ের
প্রয়োজন হতো।
দুই হাজার
সৈন্য এবং
বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের
একটি অগ্রগামী
বাহিনী আগেই
নির্ধারিত স্থানে
হাজির হয়ে
ক্যাম্প স্থাপন
করত। বার্ণিয়ার
লিখেছেন যে
এ ক্যাম্পে
দিল্লির সব
মানুষ বসবাস
করছে। তার
বর্ণনায় বাহুল্য
থাকলেও এটা
সত্যি বিপুলসংখ্যক
মানুষ বিভিন্ন
কাজে সম্রাটের
সফরসঙ্গী হতেন।
আকবর যখন
নতুন রাজধানী
আগ্রা স্থাপন
করেছেন, পুরনো
সব গুঁড়িয়ে
দিয়ে ‘ক্লিন
স্লেট’ পরিস্থিতি
তৈরি করে
নির্মাণকাজের নির্দেশ
দিয়েছেন। আগ্রার
নাম হয়েছে
আকবরাবাদ—যমুনার
তীরে এমন
সুশৃঙ্খল আধুনিক
নগরী তখনকার
গ্রিক-রোমান
পর্যবেক্ষকের কাছেও
ছিল প্রশংসনীয়
কাজ। আগ্রার
জনসংখ্যা দ্রুত
দুই লাখ
হয়ে গেলে
আর শাহজাহানের
সময় তা
সাত লাখ
ছাড়িয়ে গেল।
আগ্রা-ফতেহপুর
সিক্রি গুজরাট
সংযোজন রয়াল
করিডোর হাইওয়ে
খুলে দেয়া
হলো। সম্রাট
শাহজাহান যখন
দিল্লিকে নতুন
আঙ্গিকে শাহজাহানাবাদে
পরিণত করলেন,
ইংরেজ পর্যবেক্ষক
স্টিফেন ব্লেক
জানালেন ভারতের
রাজধানী সাম্রাজ্যের
কেন্দ্রে আর
শাহজাহানের সিংহাসন
মহাবিশ্বের কেন্দ্রে
অবস্থিত। শাহজাহানাবাদ
নামটিও টেকসই
হয়নি। স্মরণ
করা যেতে
পারে স্বাধীন
ভারত ও
ব্রিটিশ ভারত
ছাড়াও ১৩টি
রাজবংশের রাজত্বকালে
ভারতের রাজধানী
ছিল দিল্লি।
এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা





