২৯ এপ্রিল, ১৮৪১। টাউন হলের সামনে কলকাতার প্রায় সব সাহেব-মেমসাহেবদের ভিড়। সারা দিন গরমের পর সন্ধ্যায় নরম হাওয়া ছড়িয়ে দিচ্ছে গঙ্গা। টাউন হল প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ। সুন্দরী মিসেস টেলরের অভিনয় আছে আজ। অস্ট্রেলিয়ার নামজাদা অভিনেত্রী তিনি। দ্বিতীয় স্বামীকে নিয়ে পালিয়ে এসেছেন কলকাতায়। স্বামী মারা যায় কলেরায় কিছুদিন আগে। কিন্তু ডাকসাইটে সুন্দরী ও গায়িকা অভিনেত্রী হয়ে উঠেছিলেন কলকাতার এলিট মহলের প্রিয় আইটেম। ক্লাব কালচারে চর্চার বিষয় তখন মিসেস টেলর। সেদিন রাতে গানে, নাচে, হাস্যরসে মাতিয়ে দিলেন অভিনেত্রী Mischief-Mistake নাটকে। ‘এঙ্কর’ ‘এঙ্কর’ ‘ব্রেভো’ ‘ব্রেভো’ ধ্বনি উঠল চারপাশে। হাততালি থামতেই চায় না।

গুড়ুম গুড়ুম শব্দে চমকে উঠল বেঙ্গল ক্লাবের চাপরাশি, চাকর, দারোয়ান। দৌড়ে গেল সবাই। ঘরে ঢুকে দেখে রক্তাক্ত পড়ে আছে মি. কক্স। মি. হ্যামিলটন কক্স ছিলেন ক্যালকাটা ফায়ার ইনসিওর কোম্পানির কর্মচারী। তার থেকেও বড় বিষয় ছিল, স্বামীহারা মিসেস টেলরের বিশেষ অন্তরঙ্গ বন্ধু। পরিণয়ের পরিণতির আগেই এ কাণ্ড! টাউন হলের কয়েক পা অদূরেই তখন সাহেবদের বেঙ্গল ক্লাব। টাউন হলের শো শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মি. কক্স চলে আসেন তার ভাড়া নেয়া ঘরে বেঙ্গল ক্লাবে। এর পর পরই অসাধারণ খাবার ও পানীয়ের স্বাদ নিতে অন্যান্য সবাই চলে আসবে ক্লাবে। তাই আগেই চলে আসেন কক্স সাহেব। তারপর নিজের মাথায় নিজেই গুলি করেন বলে খবরে প্রকাশ পায়। কলকাতার ক্লাব কালচারে পরস্ত্রীর প্রতি প্রেম, আত্মহত্যা, ডুয়েল ইত্যাদি নিত্যদিনের মুখরোচক অ্যাপেটাইজার ছিল তখন সান্ধ্য ডিনারের টেবিলে।

এ ঘটনার ১৪ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয় বেঙ্গল ক্লাব। ৮ ফেব্রুয়ারি ১৮২৭ এ ক্লাবের প্রতিষ্ঠার দিন। তার আগে ২৬ নভেম্বর ১৮২৬ সেই টাউন হলে বসল এক সভা। লেফটেন্যান্ট জেনারেল জন ফিঞ্চ ডাকলেন এ সভা। কলকাতার সাহেবদের বিশেষ করে মিলিটারি উচ্চপদস্থ অফিসারদের ডাকা হলো এ সভায়। যোগ দিয়েছিলেন কলকাতার সম্ভ্রান্ত ও উচ্চপদস্থ কোম্পানির ব্রিটিশ কর্মচারীরা। তাদের আক্ষেপদীর্ণ চাহিদা ছিল—একটা কফি হাউজ নেই, নেই পানশালা, নেই ক্লাব, যেখানে দুদণ্ড আড্ডা মারা যাবে। সাহেবদের জিরানিয়া দরকার এ মশা-মাছি-গরম-কলেরা-জ্বর অধ্যুষিত জঙ্গলা শহরে। সম্ভ্রান্তের আড্ডা সঙ্গে থাকবে পানীয় ও খাদ্য। টাউন হলের প্রথম মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্লাবের প্রথম কার্যকরী অস্থায়ী সেক্রেটারি হলেন বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের মি. পল ম্যরিয়ট উইনচ। প্রথম প্রেসিডেন্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল জন ফিঞ্চ। ১৮২৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ক্লাব কমিটি তৈরি হলো। ওই মাসেরই ৫ ও ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ হলো গেজেট নোটিফিকেশন। গেজেটে প্রকাশ পেল কলকাতার প্রায় সব হোমরা-চোমরা সাহেবদের নিয়ে এক কমিটি। সেখানে প্রথম প্যাট্রন হিসেবে ছিলেন ভারতের জেনারেল তথা কমান্ডার-ইন-চিফ লর্ড কম্বারমেয়ার। মি. প্রিন্সেপ, মি. মেটক্যাফে থেকে শুরু করে ছিলেন সব স্বনামধন্য ব্রিটিশ আধিকারিক। তৈরি হলো ক্লাবের নিয়মকানুন। প্রথমেই ৫০০ জনের মেম্বারশিপ নেয়া হলো মূলত মিলিটারি, সিভিল অফিসার, ব্যবসাদার, বিচারক ও ক্লার্জিম্যান। মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। ক্লাবঘর কোথায় হবে? লালদিঘীর পশ্চিম পাড়ে গর্ডন সাহেবের বিশাল চারতলা বাড়ি ছিল ১৮১৩ সালে তৈরি। সে বাড়ির নিচের তলার একটি অংশ ও দোতলার একটি অংশ বছরে ৮০০ টাকা হিসেবে ভাড়া নেয়া হলো। শুধু দু’দণ্ড আড্ডার জন্য ক্লাব নয়। এখানে বেডরুম ভাড়া নিয়ে থাকার ব্যবস্থা করা হলো। রুম ভাড়া ধার্য হয়েছিল সপ্তাহপ্রতি ৮ শিলিং। (ঐতিহাসিক ডলিরিম্পল তার The Anarchy বইতে একটা হিসাব দিয়ে দেখিয়েছেন ১৭৫৭ সালের ১ শিলিং আজকের দিনে কমবেশি ১০৫ শিলিংয়ের মতো)।


ক্লাব খুলল। ভিড় হচ্ছে। খাবার বিক্রি হচ্ছে ভালোই। সঙ্গে পানীয়। ‘ওয়াইন অ্যান্ড উইন্ড অব গ্যাঞ্জেস’—সাহেবি হুল্লোড়। কিন্তু আফসোস একটাই! বরফ। কলকাতার গরমে নাজেহাল সাহেবরা বরফ কাঙাল হয়ে উঠল। এক টুকরো বরফের জন্য মরিয়া বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে। বেঙ্গল ক্লাবের প্রথম রাঁধুনি তথা স্টুয়ার্ট হলেন থমাস পেইন। তার রান্নার খ্যাতি তখন পৌঁছে গিয়েছে সাগরপাড়ের সব দেশে। ১৮৩১ সালের মে মাসের এক নোটিসে দেখা যাচ্ছে স্টুয়ার্ট পেইন সাহেব নিজের উদ্যোগে বরফ তৈরি করছেন। নোটিসে বলা হচ্ছে—

‘‘ক্লাব অফিসের পাশে মিশন রোয়ের দিকে গোডাউন থেকে বরফ সংগ্রহ করতে পারবেন সকাল ৬টা-৭টা এবং সন্ধ্যায় ওই সময়েই। আগের দিনে অর্ডার অনুযায়ী বরফ দেয়া হবে। সে নোটিস থেকে আরো জানা যাচ্ছে—সুরায় ব্যবহূত বরফের দাম সেরপ্রতি ৮ আনা এবং ‘কুলপি’ তথা ক্রিম বরফের দাম ১ টাকা ৮ আনা প্রতি সের।’’

আর্টিফিসিয়াল বরফ যদিও বেশ দামি, তবে সাহেবদের চাহিদা কম ছিল না। থমাস পেইনের ব্যবসা কিন্তু খুব বেশিদিন স্থায়ী হলো না। ১৮৩৪ সালে চলে এল আমেরিকার জাহাজভর্তি ন্যাচারাল বরফ। বেঙ্গল ক্লাবের কাছেই হেয়ার স্ট্রিটে তৈরি হয়েছে ‘আইস হাউজ’। স্বাভাবিক কারণেই পেইন সাহেবের আর্টিফিসিয়াল বরফ তৈরির চাহিদা পেইনফুললি কমতে থাকল।

আর্টিফিসিয়াল এ বরফ তৈরির কৃতিত্ব বেঙ্গল ক্লাবের হলেও বেঙ্গল ক্লাব চাইছিল অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে। এ সময়ে অর্থাৎ ১৮৩০ সাল থেকেই বেঙ্গল ক্লাবের অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। উইলিয়াম বেন্টিংক তখন প্রথম ভারতের গভর্নর জেনারেল। সে সময় নীল চাষের ব্যবসায় মন্দার ফলে অর্থনৈতিক সমস্যা শুরু হয় ব্রিটিশ মহলে। কারণ সবাই প্রায় প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষভাবে নীলের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। কমে গেল ক্লাবে উপার্জন, লাভ। বাকি পড়ছে ভাড়া। ক্লাব বাড়ি ছেড়ে দিয়ে উঠে গেল তখনকার ‘ট্যাংক স্কোয়ার’, এখনকার লালদিঘীর পাড়ে। খোঁড়াখুঁড়ি চলল কিছুটা। নতুন করে তৈরি করা হলো কিছুটা। বাগান থেকে বেরিয়ে এল বিরাট এক গোখরো সাপ, ‘কিং কোবরা’। পুরোহিত এসে শুরু করল পূজা। সাপ ধীরে ধীরে চলে গেল। কথিত আছে এমন গল্প। তার পর থেকেই বেঙ্গল ক্লাবের লোগোয় দেখা গেল একটি সাপের ছবি। আজও সে লোগো দেখা যায় ক্লাবের সব জায়গায়। ১৮৪৫ অবধি বেঙ্গল ক্লাবের ঠিকানা লালদিঘীর ধারেই। টাউন হলের কাছেই। ১৮৪৫ সালে বেঙ্গল ক্লাবের আবার ঠিকানা বদল হলো। রাসেল স্ট্রিটে ‘হুতোম পেঁচার নকশা’র লেখক সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সম্পাদক কালীপ্রসন্ন সিংহের বিরাট বাড়িটি কিনেছিলেন থমাস ব্যারিংটন ম্যাকলে, সে বাড়িতে উঠে এল বেঙ্গল ক্লাব। ক্লাব কর্তৃপক্ষ ৩০ বছরের লিজ নিল। বেঙ্গল ক্লাবের তখন অর্থনৈতিক অবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। চৌরঙ্গীর দিকে নতুন করে বিল্ডিং তৈরি করল। এ অসাধারণ স্থাপত্য নির্মাণ করেছিলেন ভিনসেন্ট জে ইসচ, যিনি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তার খিলান, মিনারেট, কারুকাজের আদল মনে করিয়ে দেয় রাজকীয় আভিজাত্য।

১৮৫৭ মহাবিদ্রোহের বছর। ১৪ জুন হঠাৎ কলকাতায় সাহেবদের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেল। রটে গেল ব্যারাকপুর থেকে বিদ্রোহী ভারতীয় সৈন্যরা মার্চ করেছে কলকাতা


আক্রমণ করতে। ট্রাংক, সুটকেস, ছেলেপুলে, বউ নিয়ে সাহেবরা কেউ গিয়ে ঢুকল ফোর্ট উইলিয়ামের ভেতরে। আর বেশকিছু সাহেব এসে উঠল জাহাজে আর জাহাজ গিয়ে দাঁড়াল মাঝ গঙ্গায়। কিন্তু লর্ড ক্যানিংয়ের দূরদর্শিতার ফলে ১৩ জুন ব্যারাকপুরের ছাউনিতে বিদ্রোহ দমন করা হয়েছে। সে গল্প আলাদা। কিন্তু বেনারস ও মাদ্রাজের সে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়েছিল সারা দেশে। এতে বহু ইংরেজ সৈনিকের মৃত্যু হয়। ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাতে চলে গেল ভারতবর্ষ। রানী ভিক্টোরিয়া হলেন ভারতের রানী। একটা করপোরেট কোম্পানির দাসত্ব থেকে একটা দেশের দাসত্বে পরিণত হলো একটি দেশ, ভারতবর্ষ। তখন অখণ্ড বাংলার এ ঐতিহাসিক ক্লাবটি নীরবই ছিল। এইচ আর প্যাংকরিজ ক্লাবের ১০০ বছর অতিক্রমের সময় ১৯২৭ সালে লিখেছিলেন একটি বই, A Short History Of the Bengal Club সেখানে বলছেন—‘There is unfortunately no reference in the Club records to the incidents of critical times.’। আভিজাত্যের এক ধরনের নীরবতা থাকে। ছিল। ধনীর আভিজাত্যের দৃষ্টি সর্বকালে সর্বসময়ে সাধারণ মানুষের উতরোলের প্রতি পড়ে না। ব্রিটিশের তৈরি ‘বেঙ্গল ক্লাব’ এ বাঙালি তো দূর অস্ত কোনো ভারতীয় রাজা-জমিদারদেরও প্রবেশাধিকার ছিল না। বাংলায় তখন ‘বাবুবৃত্তান্ত’ শুরু হয়ে গিয়েছে। ব্রিটিশদের গা ঘেঁষাঘেঁষি করে নব্য বাবুর দল ব্যবসা-দালালি-কাটমানিতে ফুলেফেঁপে উঠে ‘বাবু’, ‘রায়বাহাদুর’, ‘রাজা’, ‘প্রিন্স’ ইত্যাদি উপাধি কপালে লাগিয়ে বাগানবাড়ি-বিলাস শুরু করে দিয়েছেন। মচ্ছবের নামে সাহেবদের নেমন্তন্ন করে বেলেল্লাপনার দৃশ্য ইতিহাসের পাতায় কম নেই। তবু ‘বেঙ্গল ক্লাব’-এর গেট ডিঙাতে দেয়নি ক্লাবের দারোয়ান। দ্বারকানাথ ঠাকুর রানীর সঙ্গে নৈশভোজে আমন্ত্রণ পেলেও এ ক্লাবে ঢোকার অনুমতি পাননি। লর্ড মিন্টো স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জিকে বেঙ্গল ক্লাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন নৈশভোজে। ক্লাবের লনে তাঁবু খাটিয়ে হয়েছিল সেই ডিনার-পার্টি, কিন্তু ক্লাবে ঢুকতে দেয়া হয়নি বাঙালি শিল্পপতিকে। জওহরলাল নেহরু কঠোর সমালোচনা করেছিলেন এ নিয়মের স্বাধীনতার ঠিক প্রাক্কালে। লর্ড মাউন্টব্যাটেন বলেছিলেন, ক্লাবের নাম হয় পাল্টাতে, না হয় ভারতীয়দের সদস্য পদ দিতে। স্বাধীনতার এক যুগ কেটে যাওয়ার পর ১৯৫৯ সালে ভারতীয়দের প্রবেশাধিকার ঘটেছিল এ অভিজাত বেঙ্গল ক্লাবে। ঔপনিবেশিক ক্লাব কালচারের মাহাত্ম্য এখানেই। ঔপনিবেশিকতা কোনো জাতি-বর্ণ-রঙ দেখে না। অর্থনৈতিক বৈষম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ব্রিটিশদের ক্লাব কালচারের ইতিহাস শুরু সতেরো-আঠারো শতকে। তখনো সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিক ঢুকতে পারত না সেসব ক্লাবে। ভারত তথা পৃথিবীর সব এলিট ক্লাবেই এ রকম নানা বৈষম্যের নিয়ম চালু আছে আজও, যা ঔপনিবেশিক মানসিকতার সাক্ষ্য বহন করছে। বেঙ্গল ক্লাব তার ব্যতিক্রম নয়। অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার উল্লেখ করে এ লেখা শেষ করব। রয়ে যাবে অনেক না বলা কথা।

আউটরাম ঘাটে বসে আছি এক বন্ধুর সঙ্গে। সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে গঙ্গা। অদূরে দেখা যাচ্ছে খিদিরপুর ডকে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজের মাস্তুল। বিকালের ম্লান আলো ছড়িয়ে পড়ছে। স্যার জেমস আউটরাম ১৯৬০ বেঙ্গল ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০০৭-এর বিকাল। হঠাৎ খবর এল বেঙ্গল ক্লাবের সামনে গণ্ডগোল। ছাত্ররা ভিড় করেছে। পৃথিবী খ্যাত শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন কে ‘বেঙ্গল ক্লাব’ এ ঢুকতে দেয়া হয়নি। কারণ হুসেন সাহেব খালি পায়ে আছেন, তিনি সঠিক জুতো পরেননি। হুসেন সাহেব খালি পায়েই ঘুরে বেড়াতেন সারা পৃথিবী। ওনার যুক্তি, স্বাধীন ভারতের একটি ক্লাবে আমি আমার স্বাধীন পোশাকে প্রবেশ করতে পারব না! না, ক্লাবের ড্রেস কোড আছে। প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী আনন্দশংকরকে বেঙ্গল সুইমিং ক্লাবে একসময় ঢুকতে দেয়া হয়নি পাজামা-পাঞ্জাবি পরেছিলেন বলে। সে নিয়েও হইচই হয়েছিল। কিন্তু আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের গভীরে রয়ে গেছে ঔপনিবেশিক মানসিকতার ঘুণ। নিরন্তর নিরবধি তার কামড় সারা পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে মানুষ উপলব্ধি করছে। কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ ঔপনিবেশিকতার শিকার। ব্রিটিশ ক্লাব কালচারের প্রতিস্পর্ধী বাঙালি ক্লাব কালচার উঠে এসেছিল এক জনচেতনার ধারক হিসেবে। ক্লাবে ক্লাবে আখড়ায় আখড়ায় যে স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তার বীজ বপনের সাহায্যকারী উপাদান ছিল ওই ক্লাবগুলোর উন্নাসিক ঔপনিবেশিক মানসিকতা। অবদান বলতে সেই অগ্নিযুগের বাঙালি তার নিজের জাতীয় সত্তাকে চিনতে পেরেছিল এ ঔপনিবেশিক কালচারের বিরুদ্ধাচরণের মধ্য দিয়ে। এ প্রতিবাদী সমস্বরের উপাদান হিসেবে ক্লাবগুলো কাজ করেছিল তো বটেই। চট্টগ্রামে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে প্রীতিলতার আত্মদান সেই প্রতিবাদের শৃঙ্গ রূপ। ইতিহাস পরিক্রমা তো এ সবটাই দেখায়।

 

রজত চক্রবর্তী: লেখক ও গবেষক