আমেরিকান মনোবিদ আব্রাহাম মাসলোর বহুল আলোচিত চাহিদার সোপান তত্ত্বে আমরা মানুষের মূল জৈবিক চাহিদাগুলোকে ছাপিয়ে আরো জটিল কিছু চাহিদার উল্লেখ দেখতে পাই। মানসিক তুষ্টি ও আত্মোপলব্ধির চাহিদা সেসবের অন্যতম। মাসলোর সোপানের ভিতে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির প্রশ্নটা রয়ে গিয়েছে। তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা যতই কাটাছেঁড়া করুন না কেন, এ কথা নিশ্চিত, মৌলিক কয়েকটি চাহিদা পূরণেই মানুষের মন তৃপ্ত হয়ে ওঠে না। তার প্রয়োজন হয় আরো বেশি কিছুর, যেমন সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন। হয়তো এখান থেকেই ক্লাবগুলোর উৎপত্তি।

ক্লাব—বাংলায় একে সভা, সমিতি, সংঘ যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এর গঠন যতটা সহজ শোনায়, ইতিহাস, রাজনীতি, সময় পরিক্রমা ইত্যাদির আলোকে দেখলে হয়তো আলোচনাটা হয়ে উঠবে জটিল। যেমন ‘লেডিস ক্লাব’ বা নারীদের জন্য অথবা নারীদের নিয়ে গঠিত ক্লাবগুলোর কথাই ধরা যাক।

ক্লাব মানেই একই আগ্রহের বা কাছাকাছি সামাজিক অবস্থানের কিছু মানুষের একত্রিত হওয়া। আবার কিছু ক্লাব এ সাধারণ ছাঁচের বাইরে গিয়ে বৈচিত্র্যকে আহ্বান করেও গড়ে উঠতে পারে। লেডিস ক্লাবগুলোর যাত্রার গল্পটা তেমনই।

আজকের আলোচনার প্রসঙ্গ ভারতীয় উপমহাদেশে লেডিস ক্লাবগুলোর উৎপত্তি ও বিস্তার। এ যুগে অঞ্চলটিতে ক্লাবের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। নিছক বিনোদনের উদ্দেশ্যেই বেশির ভাগ ক্লাব গড়ে উঠেছে। তবে এ কথা বলতেই হবে, উপমহাদেশের ক্লাব সংস্কৃতিতে নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণের ধরন আজও বেশ ভিন্ন; যেমন ভিন্ন এ দুই জেন্ডারের মানুষের সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত।

এ ভিন্নতা আসলে শুরু থেকেই ছিল। বেঞ্জামিন বি কোহেনের লেখা In the club: Associational life in colonial South Asia বইতে এ সম্পর্কে বেশকিছু তথ্য পাওয়া গিয়েছে। সেখান থেকেই জানা যায়, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে যখন উপমহাদেশে সুসংগঠিত সামাজিক ক্লাবগুলো গড়ে ওঠে, তখনো সেখানে নারীদের পদচারণা শুরু হয়নি। এ অঞ্চলে সুসংগঠিত লেডিস ক্লাবগুলোর উৎপত্তি ও বিস্তার ঘটে বরং উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে।

উনিশ শতকের শেষ ভাগে ভারতীয় ও ইউরোপিয়ান দুই অঞ্চলের পুরুষদের জন্যই বিপুলসংখ্যক ক্লাব গড়ে ওঠে। সে সময়ের পুরনো ও জানাশোনা ক্লাবগুলোর কথা বলতে গেলে উল্লেখ করতে হয় কলকাতার বেঙ্গল ক্লাব, মুম্বাইয়ের বাইকুলা ক্লাব অথবা মাদ্রাজ ক্লাবের নাম। তবে তখনো নারীদের সুসংগঠিত ক্লাব গড়ে উঠতে দেখা যায়নি। এদিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘরের আঙিনার ভেতর ও বাইরে উচ্চকিত হচ্ছিল নারীদের কণ্ঠস্বর। তত্কালীন সমাজ ব্যবস্থায় গৃহে আবদ্ধ নারীরা যখন বাইরের জগতেও তাদের উপস্থিতি জানান দিতে শুরু করল, তখন তাদের জন্য আলাদা ক্লাব প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনীয়তা সামনে চলে আসে।

তবে সে সময় বিদ্যমান পুরুষের ক্লাবগুলোর পথ ধরেই নারীদের ক্লাবগুলো গঠন করা হলেও ধরনধারণে এ দুই জেন্ডারের মানুষের ক্লাবগুলো একটি অন্যরটি থেকে আলাদাই ছিল। যেখানে পুরুষরা তাদের ক্লাবে যোগাযোগ স্থাপনের পাশাপাশি বিভিন্ন বিনোদনমূলক কার্যক্রম ও খেলাধুলার আয়োজন করত, সেখানে নারীদের ক্লাবগুলো এগিয়ে গিয়েছে বিচিত্র উদ্দেশ্য নিয়ে। ঘর সামলানোর খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং এতে নিজেদের পটু করে তোলা নিয়েও আলোচনা হতো কিছু ক্লাবে। তবে ভিন্ন চিত্রও দেখা গিয়েছে।


এখানে এ ক্লাবগুলো সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে কিছু কথা উল্লেখ করতে হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কালপর্বে যখন এ অঞ্চলে নারীদের সংগঠিত ক্লাবগুলো গড়ে উঠল, তাতে যেমন অংশগ্রহণ ছিল ভারতীয় নারীদের, তেমনই ছিল ইউরোপীয় নারীদের। কিছু ক্লাবে আবার এ দুই প্রান্তের, দুই সংস্কৃতির নারীদের মেলবন্ধনও রচিত হয়েছে। যেমন, ‘নীলগিরি লেডিস ক্লাব’ গঠনের উদ্দেশ্যই ছিল ভারতীয় ও ইউরোপীয় নারীদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন। যদিও সামাজিক পদমর্যাদা বা শ্রেণীগত পার্থক্য কতটা সংকুচিত করতে পেরেছিল, সে প্রশ্ন রয়েই যাবে।

সে সময় ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাসকারী নারীরা হোক ভারতীয় অথবা ইউরোপীয়, দুই গোষ্ঠীর জীবনেরই বেশির ভাগ সময় ঘরের ভেতরেই কাটত। তাই সামাজিক যোগাযোগের পাশাপাশি ঘর ও সন্তানের দেখাশোনা, খাওয়া-দাওয়া, গৃহকর্মীবিষয়ক আলোচনা ইত্যাদি নিয়েও মত্ত থাকতেন লেডিস ক্লাবের সদস্যরা। অনেকে আবার তাদের ‘উদারপন্থী’ পুরুষ সঙ্গীদের মানসিক চাহিদা মেটাতে বৃহত্তর পরিসরে মানিয়ে নেয়ার কলাকৌশলও শিখে নিতেন ক্লাবগুলোয়। ‘দ্য প্রিন্সেস অব ওয়েলস লেডিস ক্লাব’ নামের সে সময়কার একটি ক্লাবে ঘরের পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে সেলাই-খোরাইয়ের শিক্ষাও দেয়া হতো, কিছু নারীর ক্ষেত্রে যা হয়ে উঠত ঘরে কাজ করে আয়ের একটা উৎস।

সময় যেতে যেতে বদলেছে এসব ক্লাবের কার্যক্রম। আরো বিস্তৃত হয়েছে সদস্যদের চিন্তাভাবনা। ফলে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো নিয়েও সেসব ক্লাবে আলোচনা হতে থাকল।

ক্লাবগুলোয় কোনো না কোনো সাধারণ আগ্রহের জায়গা থেকে সদস্যরা এতে অন্তর্ভুক্ত হলেও এদের কয়েকটি বিচিত্র পরিসর থেকেও নারীদের একত্রিত করেছে। এক ধর্মের, একই শ্রেণীর নারীরা যেমন নিজেদের একত্রিত করেছে, অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের ও শ্রেণীর নারীদেরও একত্রিত হতে দেখা গিয়েছে।

তবে ধরন আর উদ্দেশ্য যেমনই হোক, অন্য সব ক্লাবের মতো এ ক্লাবগুলোর অনন্যতা ছিল কাছাকাছি ধ্যানধারণার নারীদের পরস্পরের কাছাকাছি নিয়ে আসা। এ ক্লাবগুলো গড়ে ওঠার আগ পর্যন্ত নারীরা কেবল পুরুষদের ক্লাবে অতিথি হিসেবেই যেত। উনিশ শতকের শেষ ভাগে এসে বেশির ভাগ ক্লাবে নারী ও শিশুদের প্রবেশাধিকার দেয়া হয়েছিল। মারগারেট ম্যাকমিলানের উইমেন অব দ্য রাজ বই থেকে জানা যায়, বারগুলো সবসময়ই নারীদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল—‘নারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ’—এমন সাইনবোর্ড টানানো থাকত নির্দিষ্ট জায়গায়। যদিও এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে নারীদের জন্য ক্লাবে একটি আলাদা জায়গা বরাদ্দ করা হতো, কিন্তু সেটি এতটাই অন্ধকারাচ্ছন্ন ও সাধারণ চেহারার হতো যে একে অনেকেই ‘মুরগিখানা’ নামেও ডাকত। নারীদের জন্য অবশ্য সুইমিং পুল, লাইব্রেরি ব্যবহারের সুযোগ থাকত। নোটিস বোর্ডে নারীদের কেনার জন্য বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্যের বিজ্ঞাপন দেয়া থাকত। অর্থাৎ পুরুষদের ক্লাবে নারীরা পুরোপুরি নিজেদের স্বাধীনতাকে উপভোগ করতে পারছিল না। এরপর নিজেদের জন্য আলাদা ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হলে এ নারীরা তার চেয়ে কিছুটা বাড়তি স্বাধীনতা ও স্বকীয়তার স্বাদ পায়। তবে সামাজিক বাধার কারণে নারীরা এ স্বাধীনতা পুরুষদের মতো করে পায়নি। যদিও সামাজিক বাধা পেরুনো যে দূরুহ ব্যাপার ছিল তা বলাই বাহুল্য।

সে সময় উপমহাদেশীয় কিছু নারীদের ক্লাব গঠিত হয়েছিল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ চর্চার উদ্দেশ্যেও। যেমন ১৮৬৫ সালে বাঙালি ব্রাহ্মণ নারীদের গঠিত ব্রাহ্মিকা সমাজের কথা উল্লেখ করা যায়। অন্যদিকে ১৮৭৯ সালে গঠিত বঙ্গ মহিলা সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয় একদমই ভিন্ন উদ্দেশ্যে—সেটি হলো সমাজের বিস্তৃত পরিসরে মেয়েদের অংশগ্রহণকে বাড়িয়ে তোলা। আগ্রহী মেয়েদের একত্রিত করে সেখানে সভা অনুষ্ঠিত হতো, হতো আলোচনা ও প্রতিবেদনের উপস্থাপন।

বিশ শতকের শুরুর দিকে কিন্তু সামাজিক অঙ্গনে নারীদের পদচারণা হয়ে উঠল আরো বিস্তৃত। সে সময় গড়ে উঠেছিল উইমেনস ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন, ন্যাশনাল কাউন্সিল অব উইমেন ইন ইন্ডিয়া, অল ইন্ডিয়া উইমেনস কনফারেন্সের মতো সংগঠনগুলো। এগুলোর সদস্যরাও ক্লাবে সম্মিলিত হতেন ।

এভাবেই ভারতীয় উপমহাদেশে যাত্রা লেডিস ক্লাবের, যা অনেক নারীর জন্যই হয়ে উঠেছিল সে সময়কার সামাজিক পরিসরে আত্মবিকাশের একটি মাধ্যম।

 

দেবযানী মোদক: লেখক