ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ভাইসরয় তো এসেছিলেন অনেকেই, কজনের কথাই বা আমরা মনে রেখেছি। কিন্তু একজন জর্জ নাথানিয়েল কার্জন অব কেডলস্টোন তথা লর্ড কার্জনের কথা কিন্তু আমরা ভুলিনি, তা সেটা তার মস্তিষ্কপ্রসূত কুখ্যাত বঙ্গভঙ্গ কিংবা তার নামাঙ্কিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত কার্জন হলের জন্যই হোক না কেন।

লর্ড কার্জন একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ, প্রশাসক ও কূটনীতিবিদ ছিলেন, এটা আমাদের অনেকেরই জানা। পাশাপাশি তিনি ইতিহাস, ভূগোল ও রাজনীতি বিষয়ে প্রচুর লেখালেখি করেছেন, বিশেষ করে রাশিয়া ও পারস্য বিষয়ে তার অগাধ পাণ্ডিত্য বিষয়েও নিশ্চয়ই কেউ কেউ অবগত আছেন। কিন্তু তিনি যে বহুভাষাবিদ, সাহিত্যের নিবিড় পাঠক ও একজন দরদি অনুবাদকও ছিলেন, এ কথা হয়তো আমরা অনেকেই জানি না। আমারো সেটা জানা হতো না, যদি না এই সেদিন লর্ড কার্জনের War Poems and Other Translations বইটি হাতে না আসত। 

এ বই প্রকাশ হয়েছিল ১৯১৫ সালে, যখন প্রথম মহাযুদ্ধ চলছে বেশ জোরেশোরেই। লর্ড কার্জন তখন ব্রিটিশ সরকারের হাউজ অব লর্ডসের নেতা ও ওয়ার কেবিনেটের সদস্য। তখন একদিন অবজারভার পত্রিকায় তার চোখে পড়ে বেলজিয়ামের বিখ্যাত কবি এমিল কামায়ের্টসের (Emile Cammaerts) গোটা সাতেক কবিতা, যার ছত্রে ছত্রে উদ্ভাসিত কবির দেশাত্মবোধ, তরুণ সৈনিকদের প্রতি মমত্ববোধ এবং সর্বোপরি যুদ্ধের বিষাদ, বেদনা ও বীভৎসতা লর্ড কার্জনকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। তিনি তাত্ক্ষণিকভাবে সে কবিতাগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করে একই অবজারভার পত্রিকায় পাঠিয়ে দেন। সেগুলো ছাপা হওয়ার পর পাঠকমহল থেকে প্রভূত প্রশংসা ও সাড়া পান তিনি। মূলত সে পাঠকদের প্রেরণা ও অনুরোধেই এরপর তিনি আরো অনেক কবিতা অনুবাদ করেন। তার মধ্যে বেলজিয়ামের কবিতা তো ছিলই, আরো ছিল ফরাসি, ইতালীয়, গ্রিক, লাতিন এমনকি ফারসি কবিতা। তবে শুধু ইংরেজিতেই নয়, তিনি বেশকিছু কবিতা ইংরেজি থেকে লাতিনেও তরজমা করেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ, উইলিয়াম কলিন্স, লর্ড বায়রন, লর্ড টেনিসন প্রমুখ।

লর্ড কার্জন শুধু কবিতা অনুবাদ করেই তৃপ্ত হননি। তিনি অনুবাদ সাহিত্য ও অনুবাদতত্ত্ব নিয়ে প্রচুর চিন্তাভাবনা করেছেন। তারই প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই বইটির সুলিখিত ভূমিকায়, যা গ্রন্থটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণও বটে। সে নাতিদীর্ঘ ভূমিকার একটি উদ্ধৃতি অনুবাদ বিষয়ে লর্ড কার্জনের অবস্থানকে বুঝতে সাহায্য করে, যা অদ্যাবধি বহু অনুবাদকেরই শিরোধার্য—

The translator, should, I think, remember that the work is not primarily his, but that of another man, of whose ideas he is merely the vehicle and interpreter; and, while endeavouring to convert them into the idiom and metrical form of another language, often with some loss, rarely with any gain in the process, he should as far as possible subordinate himself to the conception and thought and even defer, where possible, to the technique of the original writer.

অনুবাদ প্রক্রিয়ার এ অনিবার্য loss তথা ক্ষতির দৃষ্টান্তের কথাই আমরা সবসময় শুনে থাকি, কিন্তু কার্জনের এ ভূমিকা থেকে অন্তত একটি gain তথা লাভের বিষয়ে আমরা অবগত হতে পারি। সেটি হচ্ছে লর্ড বায়রনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তিনি তার নিজেরই অমর মহাকবিতা Abt Vogler-এর প্রকৃত অর্থ বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন Professor Jebb অনূদিত Greek Pindaric Ode পাঠ করে।

এখানে তার করা একটি ভারতীয় প্রেমগীতি ও বিখ্যাত ফরাসি প্রতীকবাদী কবি পল ভের্লেইনের একটি রোমান্টিক কবিতার ইংরেজি অনুবাদের চটজলদি বঙ্গানুবাদ পেশ করা হলো—

একটি ভারতীয় প্রেমগীতি

 

 

আমি তোমার গলার হারের জন্য আকাশের সব তারা খসিয়ে নিতাম

আমি তোমার শয্যার জন্য পৃথিবীর সব গোলাপের পাপড়ি ছিঁড়ে আনতাম

আমি তোমার সুগন্ধির জন্য প্রাচ্যের সব মসলা ছিনতাই করতাম

এবং পশ্চিমের সপ্তার্শ্চয, সবটুকু দিয়ে তোমাকে সমৃদ্ধ করে তুলতাম।

 

আমি সমুদ্র সেচে তার দুর্লভতম মুক্তোদের নিয়ে আসতাম

তাকে গলিয়ে নিয়ে, রক্তবর্ণ সুরার জন্য তোমার তৃষ্ণা মিটাতাম

আমি পৃথিবী খনন করে তার সবটুকু স্বর্ণ তুলে আনতাম

অতঃপর সম্পদহীনা তোমার দুহাতে তা তুলে দিতাম।

 

আমি সূর্যরশ্মিদের কুচকাওয়াজ করিয়ে তোমাকে পাহারা দেওয়াতাম দিনের বেলায়

আমি সব পাপিয়া পাখিকে খাঁচায় বন্দি করতাম তোমাকে ঘুম পাড়াবে বলে

কিন্তু ঘুমে কিংবা জাগরণে তুমি তো কেবল প্রণয় চেয়েছ

পার্শ্বে কিংবা বক্ষে শায়িতা, প্রিয়তমা, আমি তাই তোমাকে কেবল ভালোবাসা দিই।

নির্বাক প্রণয়

পল ভের্লেইন

 

আমার হূদয়ে অশ্রু ঝরে

শহরবন্দরে বৃষ্টি পড়ে যেমতো,

হায় আমার হূদয় কেন

আজ এমন ব্যথায় অবনত?

 

মাটিতে ও ঘরের ছাদে নেমে আসা

হে বৃষ্টির কোমল নির্ঝর!

বিষণ্ন হূদয়কে আবিষ্ট করা

হে বৃষ্টির সুমিষ্ট স্বর!

 

আমার অশান্ত হূদয়ে

অকারণে কান্না ঝরে অনিবার;

তোমার এ শোক অর্থহীন, হে হূদয়,

কিছুই জানে না যে দেশদ্রোহিতার!

 

সেই বেদনাই তীব্রতম

যার কারণ অজানা,

প্রেমহীন, ঘৃণাহীন, আমার

হূদয়ে আজ তেমনই বেদনা!

 

আলম খোরশেদ: অনুবাদক, প্রাবন্ধিক ও শিল্পসংগঠক