বিদ্রোহ দমাতে সৈন্যরা কামান দাগাচ্ছে

বেসামরিক জনতার ওপর গুলিবর্ষণ, ঢাকার একাংশ আগুনে জ্বলছে

২৮ মার্চ ১৯৭১ সিডনি শনবার্গের দুটি প্রতিবেদন নিউইয়র্ক টাইমস প্রকাশ করে। একটির শিরোনাম ‘বিদ্রোহ দমাতে সৈন্যরা কামান দাগাচ্ছে’, অন্যটি ‘পূর্ব পাকিস্তানে কামানের বিরুদ্ধে লাঠি ও বল্লম’। শনিবার (২৭ মার্চ ১৯৭১) সকালে যে ৩৫ জন সাংবাদিককে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহিষ্কার করা হয়, সিডনি শনবার্গ তাদের একজন। প্রথম সংবাদটি তিনি ভারতের বোম্বে থেকে টেলিগ্রাম করে পাঠিয়েছেন। দ্বিতীয়টি দিল্লি থেকে।

বিদ্রোহ দমাতে সৈন্যরা কামান দাগাচ্ছে

সিডনি এইচ শনবার্গের বিশেষ প্রতিবেদন

সাড়ে সাত কোটি মানুষের এ প্রদেশের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন নস্যাত্ করতে পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কামান ও ভারী মেশিনগান ব্যবহার করছে।

কোনো রকম সতর্কতা সংকেত না দিয়েই বৃহস্পতিবার শেষ রাতে তারা আক্রমণ শুরু করে। সেনাবাহিনীতে যাদের প্রাধান্য, সেই পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকার রাস্তায় নামে; তাদের লক্ষ্য স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান ঘাঁটিগুলো অবরোধ— যেমন একটি ঘাঁটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বেসামরিক জনতার ক’জন নিহত হয়েছেন আর জখম ক’জন, তা জানার কোনো উপায় নেই। যদিও ঢাকায় আঘাত হানার আগে দেশের ভেতরে বেসামরিক জনতা ও পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর আসছিল, সেখানে কী ঘটছে, তারও কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না।

ঢাকা শহরের উত্তরাংশের হোটেল থেকে শহরের বিভিন্ন অংশে ভয়ঙ্কর অগ্নিশিখা দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের ব্যারাক। এটি পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বাঙালি জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত প্যারামিলিটারি বাহিনী। বেশ কটি স্থানে আগুন তখনো জ্বলছে, বিক্ষিপ্ত গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসছে। হোটেলের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে একজন পাকিস্তানি অশ্রু সংবরণ করতে করতে বলল, ‘হায় আল্লাহ, হায় আল্লাহ, সৈন্যরা তাদের হত্যা করছে, তাদের জবাই করছে।’

বাড়ি ঘরে আগুন

সামরিক ট্রাকবহরের প্রহরায় এয়ারপোর্ট যাওয়ার পথে সাংবাদিকরা দেখলেন, সৈন্যরা রাস্তার দু’পাশের বস্তিতে আগুন দিচ্ছে। সেখানে দরিদ্র বাঙালিদের বাস, যাদের কেউ কেউ স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের জোরদার সমর্থক।

বৃহস্পতিবার রাতে যখন সামরিক অভিযান শুরু হয়, সৈন্যরা অটোমেটিক রাইফেল, মেশিনগান ও রিকয়েললেস রাইফেল দিয়ে বিভিন্ন বাড়ির ওপর গুলিবর্ষণ করে বিজয়ধ্বনি দিয়ে শহরের বিভিন্ন অংশে আগুন ধরিয়ে দেয়।

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থানরত বিদেশী সাংবাদিকরা কী ঘটছে জানার জন্য যখন বাইরে যেতে চান, নতুন করে ব্যাপকভাবে বলীয়ান সৈন্যরা বলপূর্বক তাদের আবার ভেতরে ঢুকিয়ে দেয় এবং তাদের জানায়, যদি কেউ হোটেল ভবনের বাইরে পা দিতে চান, তাহলে তাকে তখনই গুলি করা হবে। হোটেলের সন্নিকটে আগুন বাড়তে থাকে এবং রাত ১টা নাগাদ আগুন গোটা শহরেই ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

রাত ১টা ২৫ মিনিটে হোটেলের সব ফোন ডেড। বাইরের মিলিটারি গার্ডদের নির্দেশে টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ঠিক একই সময় টেলিগ্রাফ টাওয়ারের বাতিও নিভে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও শহরের অন্যান্য অংশ থেকে ভারী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসতে থাকে।

বাজারে আক্রমণ

(ইন্টারকন্টিনেন্টাল) হোটেলের সামনে দিয়ে রাত প্রায় ২টা ২৫ মিনিটে মেশিনগানবাহী একটি জিপ এগিয়ে এসে বাম দিকে মোড় নিয়ে একটি বাজারের সামনে থামে। মেশিনগান দোতলার জানালা বরাবর তাক করা। এক ডজন সশস্ত্র সৈন্য হেঁটে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। তাদের একটি দল বহন করছে এক ধরনের রকেটজাতীয় অস্ত্র।

দোতলা থেকে চিত্কার ভেসে আসে ‘সব বাঙালি এক হও’। সৈন্যরা ভবনটির ওপর নির্বিচারে অবিরাম গুলিবর্ষণ করতে থাকে। সৈন্যরা তার পর বাজারের গাঘেঁষা কানাগলিতে গুলি করতে করতে এবং রাস্তা আটকে রাখা একটি গাড়ি উল্টে দিয়ে এগোয়। সৈন্যদের গুলির ফ্লাশলাইটে দৃশ্যগুলো হোটেলের ১০ তলায় থেকে সাংবাদিকরা দেখছেন— এ এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য।

সৈন্যরা যখন গুলি করতে করতে এগোচ্ছে, প্রায় ২০০ গজ দূরে ১৫-২০ জন যুবক তাদের মুখোমুখি হয়ে চিত্কার করে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। কিন্তু মনে হলো তারা নিরস্ত্র, তাদের হাত খালি।

সৈন্যরা তাদের জিপের মেশিনগান যুবকদের দিকে তাক করল, তার পর গুলি চালাল। স্বয়ংক্রিয় রাইফেল হাতে সৈন্যরাও তাদের সঙ্গে যোগ দিল। যুবকরা রাস্তায় দু’পাশে ছায়ায় ছিটকে পড়ল। ততক্ষণে তারা আহত না নিহত, এখান থেকে বলা অসম্ভব।

সৈন্যরা এবার তাদের দৃষ্টি ফেরাল কানাগলির দিকে। তারা গাড়ির স্পেয়ার পার্টসের গ্যারেজে আগুন ধরিয়ে দিল, আপাতদৃষ্টিতে তাদের মূল লক্ষ্য ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য পিপল’ পত্রিকার অফিস ও প্রেসের দিকে এগোনো। পত্রিকাটি শেখ মুজিবের জোরদার সমর্থক, একই সঙ্গে সেনাবাহিনীকে বিদ্রূপ করে যাচ্ছে।

সৈন্যরা পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা উর্দুতে চিত্কার করে সতর্ক করে দিচ্ছে— ভেতরে কেউ থাকলে যেন আত্মসমর্পণ করে, নতুবা গুলি করে হত্যা করা হবে। কোনো সাড়া নেই। ভেতর থেকে কেউ বেরিয়ে এল না। সৈন্যরা দ্য পিপল অফিস ভবন তাক করে রকেট নিক্ষেপ করল, সঙ্গে চলল ছোট অস্ত্র ও মেশিনগানের গুলি। তার পর ভবনে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ছাপাখানা ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি ভেঙে চুরমার করতে লাগল।

আরো এগিয়ে তারা সব দোকানপাট ও বাজারের ছাপড়ায় আগুন ধরিয়ে দিল। অগ্নিশিখা দোতলা ভবনের ওপর দিয়ে দৃশ্যমান হলো। ভোর ৪টার কিছু পর গোলাগুলি কিছুটা কমে আসে, কিন্তু থেকে থেকে কামানের গোলা ও মেশিনগানের গুলির শব্দ ভেসে আসে। হোটেলের পাশঘেঁষে চলে যায় দূর থেকে আসা ট্রেসার বুলেট।

ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস সদর দফতরের দিকে আরেকটি বিশাল গনগনে আগুন চোখে পড়ে। ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে ভোরের আবছা আলোয় চোখে পড়ল, চীনে তৈরি ছয়টি টি-৫১ হালকা ট্যাংকে চড়ে সৈন্যরা শহরে ঢুকেছে এবং প্রধান রাস্তাগুলোয় টহল দিতে শুরু করেছে।

থেমে থেমে গুলি এবং মাঝে মাঝে কামানের বিস্ফোরণ গতকাল থেকে চলে আসছে, আজ ভোরেও ছিল; যখন সাংবাদিকদের বহিষ্কার করা হচ্ছে, তখন শোনা যাচ্ছে।

গতকাল সকাল থেকে মাথার ওপর হেলিকপ্টার ঘুরছে, আপাতদৃষ্টিতে লক্ষ্যবস্তুর ওপর আক্রমণের জরিপ চালাচ্ছে। (সত্তরের) নভেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর দুর্গতদের ত্রাণসহায়তা পৌঁছানোর জন্য সৌদি আরব চারটি হেলিকপ্টার দিয়েছিল। সামরিক অভিযানের জন্য সেই হেলিকপ্টার এখন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে।

ইয়াহিয়া পশ্চিম পাকিস্তানে

সকালে সেনাবাহিনীর দখলে চলে যাওয়া ঢাকা রেডিও থেকে ঘোষণা করা হয় প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তানে পৌঁছেছেন এবং রাত ৮টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন।

ওই দিনই সকাল ৮টার পর পরই একটি কালো ১৯৫৯ মডেলের শেভ্রোলে, সঙ্গে জিপ ও ট্রাকে সশস্ত্র সৈন্যের বহর নিয়ে হোটেলের সামনে এল। পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার জন্য এ গাড়ির বহর জুলফিকার আলী ভুট্টো ও তার সঙ্গীদের এয়ারপোর্টে নিয়ে যাবে।

শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের জন্য যে স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়েছেন, পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক নেতা ভুট্টো তার বিরোধিতা করছেন। সাধারণভাবে এটাই সবাই মনে করছেন, ভুট্টোর এ বিরোধিতা পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সমর্থন ও কর্মকৌশলে এ সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে।

মিস্টার ভুট্টো অবগত যে, বর্তমান সংকটের জন্য বাঙালিরা তাকেই দায়ী মনে করে। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে সামরিক ও বেসামরিক বডিগার্ড পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি হোটেলের লবিতে এলেন। তাকে সন্ত্রস্ত মনে হলো, তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্ন উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমার কোনো মন্তব্য নেই।’

সকাল ১০টায় রেডিও নতুন সামরিক আদেশের ঘোষণা দিল।

যখনই কোনো সাংবাদিক সেনা কর্মকর্তাদের কাছে কোনো তথ্য জানতে চান, তাদের রূঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়। কূটনৈতিক মিশনে পৌঁছার সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো। এক দল সাংবাদিক যখন সামনের দরজা দিয়ে একজন ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কথা বলতে বেরিয়ে এলেন, ক্যাপ্টেন ভয়ঙ্কর ক্ষুব্ধ হলেন। তাদের ভেতরে ঢোকার হুকুম দিয়ে পেছন থেকে বললেন, ‘আপনাদের কীভাবে সামলাতে হবে আমি জানি। আমি আমার নিজের মানুষদের হত্যা করতে পারি। আমি আপনাদেরও হত্যা করতে পারব।’

অল্পক্ষণের মধ্যেই সামরিক সরকার হোটেলে হুকুম পাঠাল, সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটের মধ্যে হোটেল ত্যাগ করার জন্য সব বিদেশী সাংবাদিককে তৈরি থাকতে হবে। সাংবাদিকরা তাদের ব্যাগ গুছিয়ে নিলেন, বিল শোধ করলেন। প্রেসিডেন্টের ভাষণের ঠিক পর পর ৮টা ২০ মিনিটে সামনে-পেছনে সৈন্যবোঝাই পাঁচটি ট্রাকের প্রহরায় তারা এয়ারপোর্টের দিকে বেরিয়ে পড়লেন।

যাওয়ার ঠিক আগমূহুর্তে একজন সাংবাদিক দায়িত্বপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেলকে জিজ্ঞেস করলেন, বিদেশী সাংবাদিকদের কেন চলে যেতে হবে?

‘আমরা চাচ্ছি আপনারা চলে যান, কারণ থাকাটা আপনাদের জন্য ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।’ হোটেলের সব কর্মচারী এবং হোটেলে অবস্থানকারী অন্য বিদেশীরা বিশ্বাস করে, সাংবাদিকরা একবার চলে গেলেই শুরু হবে হত্যাযজ্ঞ।

হোটেলের একজন কর্মকর্তা বললেন, ‘এটা আর হোটেল থাকবে না, এটা হয়ে উঠবে রক্তাক্ত হাসপাতাল।’

এয়ারপোর্টে সাংবাদিকদের লাগেজ খুব কড়াভাবে চেক করা হচ্ছে, বাইরে গোলাগুলির শব্দ; কিছু টেলিভিশন ফিল্ম, বিশেষ করে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের ফিল্ম বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

পূর্ব পাকিস্তানে কামানের বিরুদ্ধে লাঠি ও বল্লম

সিডনি এইচ শনবার্গের বিশেষ প্রতিবেদন

নয়াদিল্লি, ২৮ মার্চ (১৯৭১): লাঠি-বল্লম ও স্থানীয়ভাবে তৈরি রাইফেল দিয়ে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বোমারু বিমান, বোমা, ট্যাংক ও ভারী কামান সজ্জিত পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন জোরদার করে তুলছে।

প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য অহিংস আন্দোলন চলাকালে তিন রাত আগে সরকারি বাহিনী বেসামরিক জনগণের ওপর অতর্কিতে আক্রমণ চালালে তা প্রতিরোধ আন্দোলনে রূপ নেয়।

গত ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে জিতে পূর্ব পাকিস্তানিরা সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতা দাবি করলে, তা প্রতিহত করতে সেনাবাহিনী নামে। পূর্ব পাকিস্তান সামরিক আইন প্রশাসনের গণসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক অবাধ্য বেসামরিক জনগণকে সামাল দিতে সেনাবাহিনীর কী ভূমিকা হবে, সে সম্পর্কে বিদেশী সাংবাদিকদের ব্রিফিং দিচ্ছিলেন। লম্বা পশ্চিম পাকিস্তানি এ অফিসার বলেন, ‘কখন সেনাবাহিনী তলব করা হয়? এটাই হচ্ছে শেষ ভরসা। হত্যা করার জন্যই সেনাবাহিনী গুলি করবে।’

তার মন্তব্য ছিল ভবিষ্যদ্বাণীর মতো। দুই সপ্তাহ পর গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকার রাস্তায় যে বেরিয়েছে এমন যে কাউকে, জানালা দিয়ে যে প্রতিবাদী স্লোগান দিয়েছে এমন সবাইকে গুলি করে হত্যা করেছে। বাঙালিদের স্বশাসনের আন্দোলন গুঁড়িয়ে দিতে পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক জনতার ওপর সেনাবাহিনী কামান, মেশিনগান, রিকয়েললেস রাইফেল ও রকেট হামলা চালিয়েছে।

এখন এটা নিশ্চিত মনে হচ্ছে, হাজার হাজার বাঙালিকে খুন করা হবে। কিন্তু তাদের স্বশাসন আন্দোলন এবং তাদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাদের যে আনুগত্য ও আত্মত্যাগ, তাতে এক হাজার মাইল দূর থেকে এসে কার্যত কোনো বিদেশী সেনাবাহিনী অনির্দিষ্টকাল পূর্ব পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে কিনা, এখন সে প্রশ্ন উঠে এসেছে।

সেনাবাহিনী এসেছে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে, বড় বড় সব ব্যবসাও সেখানে কেন্দ্রীভূত; সেখানে মাথাপিছু আয় বেশি আবার দ্রব্যমূল্য পূর্ব পাকিস্তানের চেয়ে কম। সাড়ে পাঁচ কোটি পশ্চিম পাকিস্তানির জন্য সবকিছুই সাড়ে সাত কোটি পূর্ব পাকিস্তানির চেয়ে উত্তম।

পূর্ব পাকিস্তানিরা যারা বাঙালি হিসেবে পরিচিত, শহর ছেড়ে তারা গ্রামে এবং আরো অভ্যন্তরে চলে গেছে।

বর্তমান সংবাদদাতাসহ বিদেশী সাংবাদিকদের শনিবার পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের শরীর ও লাগেজ তল্লাশি করে ছবির ফিল্ম ও নোটবই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

পূর্ব পাকিস্তানে উপস্থিত বৈদেশিক মুদ্রা ও করের অধিকাংশই পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন প্রকল্প এবং যে সেনাবাহিনী জাতীয় বাজেটের ৬০ ভাগ ভোগ করে, তাদের পেছনে ব্যয় হতো।

সেনাবাহিনীর ১০ ভাগেরও কম সদস্য বাঙালি।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অধিকাংশ অস্ত্র সংগৃহীত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ব্লক ও কমিউনিস্ট চীন থেকে। এখন পর্যন্ত বড় শক্তিগুলোর কোনোটিই পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর অভিযান নিয়ে কোনো সমালোচনা করেনি।

ঢাকায় রাজনৈতিক আলোচনায় কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়েছে। আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পরই সেনাবাহিনীর আকস্মিক আক্রমণ। কিন্তু যেসব টুকরো খবর আসছে, তাতে এটা স্পষ্ট, পাকিস্তানি ক্ষমতাশালীরা কখনই শেখ মুজিবকে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য লক্ষণীয় পরিমাপের স্বায়ত্তশাসন প্রদান করবে না।

প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান, যিনি একজন পরিচ্ছন্ন জেনারেল হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং বাঙালিদের অসন্তোষের বিষয়গুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, তিনি হঠাত্ আমূল বদলে গেলেন। বললেন, জাতীয় সংসদের অধিবেশনে নবনির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে একটি সমঝোতা চুক্তি করতে শেখ মুজিব রাজি না হওয়ায় আলোচনা ভেঙে যায়। কিন্তু শেখ মুজিব জানতেন, অধিবেশন বসার আগে লিখিতভাবে সে সমঝোতা চুক্তিটি পেতে হবে।

আলোচনা ১০ দিন ধরে টেনে নেয়া হলো। বাঙালিরা বলাবলি করতে শুরু করল, আলোচনা যখন এত দিন গড়িয়েছে, নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে।

এ সময় শেখ মুজিব ও তার আওয়ামী লীগ কার্যত জনগণের নিরঙ্কুশ সমর্থন নিয়ে অসহযোগিতার অহিংস আন্দোলন চালিয়ে সামরিক আইন প্রশাসনের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করছেন।

শেখ মুজিবের অনুসারীরা কতগুলো সরকারি দফতর দখল করে নিয়েছে, কতগুলো বন্ধ করে দিয়েছে, হুকুম অমান্য করছে— এর মধ্যে একটি হচ্ছে প্রতিরক্ষা দফতরের বেসামরিক ব্যক্তিদের কাজে যোগদান-সংক্রান্ত— হয় কাজে যোগ দিন, নতুবা ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করুন।

বাঙালি জাতির জন্য বাংলাদেশ— সবুজ, লাল ও সোনালি পতাকা উড়িয়ে জঙ্গি ছাত্র ও শ্রমিকরা সম্পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানাচ্ছে, কেবল স্বায়ত্তশাসন নয়।

কিন্তু বাঙালিদের উচ্ছল দিন শিগগিরই ঘনিয়ে এল। প্রথম দিকে আলোচনায় কিছু অগ্রগতির খবর থাকলেও তা শ্লথ হয়ে এল এবং সেনা অভিযানের আশঙ্কা ও আতঙ্ক ছাপিয়ে উঠল।

প্রতিদিন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য আসছে। বাঙালিদের অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, ইচ্ছে করে সমঝোতা আলোচনা দীর্ঘ করা হচ্ছে, যেন এর মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত সরকার পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক প্রস্তুতি ও সেনা মোতায়েন আরো জোরদার করতে পারে।

বিভিন্ন শহরে নাগরিকদের সঙ্গে সেনা সংঘর্ষের খবর আসছে এবং অনেক মৃত্যু সংবাদও পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার (২৫ মার্চ ১৯৭১) সন্ধ্যা ৭টার আগে বিতরণ করা একটি বার্তায় শেখ মুজিব দেশে ‘ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে’, বলে নিন্দা জানিয়েছেন। আর এর ৪ ঘণ্টা পরই সৈন্যবাহিনী রাস্তায় নেমে আসে এবং গুলিবর্ষণ করতে থাকে।