ঢাকা সব সময়েই দুটি ব্যাপারে খুব উত্তাল। এক: সংগীত, আর: রাজনীতি। লীলাদির নেতৃত্বে আমি তখন রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে মনে মনে তার শরিক হয়েছি। লীলাদি সেই সময়ে লীলা নাগ ছিলেন, পরে অনিল রায়কে বিবাহ করে লীলা রায় হন। এই রকম একজন মহীয়সী মহিলা সারা জগতেই দুর্লভ। লীলাদির বৈশিষ্ট্য ছিল সব দিক থেকেই তিনি বিশেষ। যেমন দেখতে সুন্দর, তেমনি লালিত্যপূর্ণ ব্যবহার, তেমনি ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব, সাহসিকতা, সুদৃঢ় আদর্শবাদ। আমি ছোট মেয়ে, তাঁর কাছাকাছি যাবার মতো সাহস, যোগ্যতা বা বয়স কিছুই নেই, কিন্তু পুজো করতে তো কেউ বাধা দিতে পারে না? আমি লীলাদিকে একলব্যের মতো পুজো করতাম। মেয়েদের জন্য লীলাদি স্কুল করেছিলেন, লাঠিখেলা, ছোরাখেলার আখড়া করেছিলেন, অনাথ নারীদের জন্য সমিতি করেছিলেন, আরো কত যে তার সমাজসেবার তালিকা ছিল সব আমি জানি না। একদিন সেই লীলাদি গাড়ি করে এসে আমাদের বাড়ির দরজায় থামলেন। আমাদের দরজায় স্বয়ং লীলাদি এসে থেমেছেন এ রকম একটি অভাবিত সৌভাগ্যকে আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। বললেন, আমাকে নিতে এসেছেন। কী কারণে নিতে এসেছেন, সে বিষয়ে তিনি আমার মায়ের সঙ্গে কথা বললেন, আমিও অবশ্য শুনলাম এবং যথেষ্ট উত্তেজিতও হলাম। মনে মনে বললাম মা যেন অমত না করেন। তা তিনি করলেন না। আমাকে যেতে অনুমতি দিলেন। আমি গিয়ে গাড়িতে উঠলাম। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনা ঘটে গেছে তখন। দাবানলের মতো সমস্ত দেশে ছড়িয়ে পড়েছে তার প্রতিক্রিয়া। প্রতিদিন খবরের কাগজে বেরুচ্ছে তার বিবরণ। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে সেই বিবরণ পড়তে-শুনতে। পুলিশের অত্যাচারে সারা বাংলার কিশোর, তরুণ, যুবক সব বিধ্বস্ত। দোষী-নির্দোষ নির্বিশেষে ঘরে ঘরে ছেলেরা ধরপাকড়ের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে। কারো ঘরে শান্তি নেই। সেই ধরপাকড় স্বাধীনতা-পরবর্তী ধরপাকড় নয়, সেই ধরপাকড়ের চেহারা আলাদা, যে চেহারা এখনকার ছেলেমেয়েরা কল্পনা করতে পারবে না। ইংরেজ আমলের পুলিশি অত্যাচারের অমানুষিক নৃশংসতা ও বর্বরতা ব্যাখ্যা করলে তাদের সভ্য জাতি বলে গণ্য করতে দ্বিধা হতো। সেই অত্যাচার আমি নিজের চোখে দেখেছি। অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অন্যতম নায়ক অনন্ত সিং ধরা পড়েছেন তখন, তাঁর ফাঁসি হবে। ফাঁসি রদ করবার জন্য মামলা চালানো হচ্ছে কিন্তু টাকার দরকার। সেই টাকা তুলতে অনন্ত সিংয়ের দিদি ঢাকা এসেছেন। লীলাদি সেই টাকা তুলে দেবার ভার নিয়েছেন। এবং সেই কারণেই নবাব বাড়ি যাবেন গান শুনিয়ে টাকা তুলতে। গাড়ি সেদিকেই ছুটল, আমাদের নিয়ে বাড়ির অন্দরমহলের দেউড়িতে গিয়ে ঢুকল। কোন মঞ্জিলে গেলাম, তা আমার জানা নেই, লীলাদি যেখানে নিয়ে যাচ্ছেন, সেখানেই যাচ্ছি অন্ধের মতো। মেঝেতে পাতা মখমলের গদিতে বসানো হলো আমাদের। তবকমোড়া সন্দেশ আর শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করা হলো। তার পর পর্দা সরিয়ে বেগম সাহেবা এলেন। সঙ্গে তিন-চারজন দাসী এবং সুন্দরী। সুসজ্জিতা অল্প বয়স্ক কয়েকজন মেয়ে বউ। এবার লীলাদির হুকুমে ঘোড়ার গাড়ির ছাদ থেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসা হারমোনিয়ামটিও এল। গান শুনে টাকা দেবেন বেগম সাহেবা। শোনানো হলো গান। একটার পর একটা, একটার পর একটা, পরিশ্রমে আমি ঘেমে গেলাম। বেগম সাহেবা মুদ্রিত চক্ষে শুনতে শুনতে এক সময়ে চোখ খুলে বললেন, “কেয়াবাত্ কেয়াবাত্”, আমিও নিষ্কৃতি পেলাম। তিনি ভাঙা বাংলায় বললেন, ‘আমি বহুত্ খুসি হয়েছি।’ খুশি হয়ে উনি কত টাকা দিয়েছিলেন, সেটা আমার জানবার কথা নয়, তবে উপঢৌকন যা দিয়েছিলেন, তা চোখে দেখলাম। তার মধ্যে ঝুড়িভর্তি আম আর লিচুর কথাই মনে আছে। কেননা ওই আম আর লিচুর কিছু ভাগ আমাকেও দেয়া হয়েছিল।
তারও পরে আরো দু’চার জায়গায় গান করতে হয়েছে আমায়। শেষে শোনা গেল অনন্ত সিংয়ের দিদির হাতে লীলাদি ১০ হাজার টাকা তুলে দিতে পেরেছেন। সেই থেকে আমার জীবনে অনন্ত সিং একটা নাম, একটা ইতিহাস, একটা অপার্থিব অস্তিত্ব। ফাঁসির হুকুম তাঁর রদ হয়েছিল, কিন্তু দ্বীপান্তর হলো।
স্বাধীনতার পূর্ববর্তী অধ্যায়ের এই অনন্ত সিং পরবর্তী অধ্যায়ে ছাড়া পেয়ে গেলেন। যত স্বাধীনতা সংগ্রামীকে ইংরেজরা আবদ্ধ করেছিল, প্রত্যেকেই অবশ্য কারাপ্রাচীরের অন্তরালে থেকে স্বাধীনতার পরে মুক্ত জীবনে ফিরে এসেছিলেন। তারই বেশ কয়েক বত্সর বাদে আবার অনন্ত সিংয়ের নাম খবর কাগজের শিরোনাম হলো। চমকিত হয়ে পড়লাম তিনি নাকি ডাকাতি করে বেড়াচ্ছেন, একটি মেয়ে তাঁর সঙ্গিনী, যার নাম কল্পনা।
কয়েক সপ্তাহ খুব হইচই চলল তাই নিয়ে, তার পরেই সব চুপ। এসবের বছরখানেক বাদে এক সকালে একজন ভদ্রলোক দেখা করতে এলেন আমার সঙ্গে। উদ্দেশ্য ছবির জন্য গল্প কেনা। ভদ্রলোক বেশ মোটাসোটা এবং বয়স্ক, হাস্যবিহীন মুখশ্রী। বেশি বাক্য ব্যয় করলেন না, যে বইখানা চান, তার নাম বললেন আর কত দিতে হবে জিজ্ঞেস করলেন। এতই কাটছাঁট ভঙ্গি ছিল যে, আমিও সহাস্যে আপ্যায়ন করতে না পেরে তেমনি স্বল্প বাক্য প্রয়োগে দামটা বললাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, ‘প্রডিউসার কে?’ বললেন, ‘আমি।’ ‘আপনার নামটা জিজ্ঞেস করতে পারি কি?’ খুব সংক্ষেপে, খুব তাড়াতাড়ি উচ্চারণ করলেন, ‘অনন্ত সিং।’ সঙ্গে সঙ্গে আমার মধ্য বয়সের বুকের মধ্যে কিশোরীকালের মেয়েটি লাফিয়ে উঠে এল। রুদ্ধশ্বাসে বললাম, ‘আপনি অনন্ত সিং। মানে সেই অনন্ত সিং, যিনি—’ ‘হ্যাঁ, আমিই।’ বলেই উঠে দাঁড়ালেন, যেতে যেতে বললেন, ‘নমস্কার। চলি। জানিয়ে দেব এই দাম আমি দিতে পারব কিনা।’ বলেই প্রতিনমস্কারটা দেখলেন কি দেখলেন না, দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। আমি অনেকক্ষণ মুহ্যমানের মতো দাঁড়িয়ে থেকে দৌড়ে বারান্দায় এলাম, ঝুঁকে দেখতে চেষ্টা করলাম। তিনি আমাদের ২০২ নম্বর রাসবিহারী অ্যাভিনিউর বাড়ির গলি থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় থেমে থাকা একটা মস্ত গাড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। একটি মেয়ে ভেতর থেকে দরজা খুলে দিল, কী বলতে বলতে উঠে গেলেন।
আমার মর্ত্যের ঈশ্বরকে স্বর্গের ঈশ্বর এই ভাবেই আমার সঙ্গে সাক্ষাত্কার ঘটালেন।
আমি তখন ইডেন স্কুল ছেড়ে দিয়ে লীলাদির স্কুলের ছাত্রী। মনেপ্রাণে লীলাদির শিষ্য। রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছে। দু-চারটা মিটিং-মিছিলে যোগ দিতে পেরে ধন্য হয়েছি, রবীন্দ্রনাথের ক্ষণিকার কবিতা মুখস্ত করে তার মর্ম গ্রহণও করেছি। কিন্তু মা-বাবার যন্ত্রণায় গান ছাড়তে পারছি না। গানের ভক্ত এক ভদ্রলোক আবার কোথা থেকে একদিন এক ওস্তাদ ধরে নিয়ে এলেন গান শোনাতে। এলাহবাদের ওস্তাদ, নাম ভোলানাথ মহারাজ। ঢাকার সবচেয়ে রহস্যময় পুরী মাইলজোড়া দেওয়াল ঘেরা ‘বলদা’র জমিদার বাড়ির অতিথি তিনি। এই বাড়ি সম্পর্কে ঢাকাবাসীদের অনেকের মনে অনেক রকম ধারণা। রটনাও অনেক রকম। জমিদারটি গান পাগল। একই বাড়িতে দুই পত্নী নিয়ে বাস করেন, মহল আলাদা। বড় পত্নীর একটি ছেলে আছে, কিন্তু পত্নীটি শুচিবাইগ্রস্তা। ছোট পত্নীটিকে তিনি প্রেম করে বিবাহ করেছেন, কিন্তু লোকেরা নানা রকম বলে। যত বড় শহরই হোক, মফস্বল শহর তো বটেই? কে আর কাকে না চেনে। সবাই সকলের হাঁড়ির খবর জানতে উত্সুক। যতটুকু জানে, তার বেশি মিশেল দিয়ে নিন্দে ছড়ায়। ‘বলদা’র জমিদার বাড়ি নিয়ে নানা কেচ্ছা ছড়াবে, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কেউ কোনো দিন সেই জমিদারকে চর্মচক্ষে দেখেনি। বাড়ির ভেতরে কী হচ্ছে, না হচ্ছে জেলখানার প্রাচীরের মতো উঁচু প্রাচীরের ভেতর উঁকি মেরে কেউ তা দেখতে পায়নি। তাই বলে তো আর পরোপকারীরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না? তার এ-ও জানে, জমিদার বাড়ির ভেতরেই দেহোপজীবিনীদের জন্য আলাদা আলাদা কটেজ করে দিয়েছেন তিনি। মাইনে দিয়ে রাখেন, যেদিন যার কাছে খুশি, সেদিন তার কাছে যান। বাড়ির ভেতরে নন্দন কাননের মতো কানন করেছেন, মধ্যে মধ্যে সেই কাননে উত্সবের বাজনা শোনা যায়, আলোর রোশনাই দেওয়াল টপকিয়ে রাস্তার ওপর ছিটকে আসে। লোক জমে যায় কিন্তু বিশাল ফটকজুড়ে দুদিকে দুটো দারোয়ান বন্দুক নিয়ে পাহারা দেয়ায় কোনো ফাঁকেই ঢুকে পড়তে পারে না বা দেওয়াল বেয়ে উঠে দেখে কিছু খবর সংগ্রহ করবে তাও পারে না। সেই বাড়ির ভেতর থেকে ওস্তাদ এসেছেন, আমারও কৌতূহল উপচে পড়ল। শোনা গেল ছোট বউকে গান শেখান তিনি। বউকে গান শেখাবার জন্য জমিদার প্রত্যেক বছর দিল্লি, লখনৌ থেকে বড় বড় ওস্তাদ আনিয়ে নেন। প্রচুর মাইনে দেন, থাকবার জন্য কোয়ার্টার দেন। কিন্তু নিয়ম আছে একটি, দেওয়ালের বাইরে বেরুতে পারবেন না। যদি বা বেরোন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফিরতে হবে এবং অন্য কোনো ছাত্র-ছাত্রীকে গান শেখাতে পারবেন না। বলা যায় একেবারেই চাকরি। তবে যা মাইনে দেন, এক বছরের চুক্তি এবং থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নিয়ে প্রচুর। সুতরাং অন্যত্র গিয়ে উপার্জনের ধান্দা করবার দরকার হয় না কোনো। এই ভদ্রলোক আমাকে খুব ভালোবাসেন, আমার গান বিষয়ে তিনি মোহান্ধ। কী করে কোথায় এই ওস্তাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, অমনি আমার কথা বলে গান শোনাতে নিয়ে এসেছেন। আসল মতলব দু-চারখানা ঠুংরি-টপ্পা ফাঁকতালে শিখিয়ে নেয়া। সেই মতলব তাঁর হাসিল হলো।
আমরা যখন প্রথম ঢাকা এসেছিলাম, মেহেদী হোসেন নামে একজন বিখ্যাত ওস্তাদ ছিলেন সে পাড়ায়। ঠুংরিতে তিনি বিশেষ পারদর্শী, সারা ভারতে বড় বড় সংগীত সম্মেলনীতে গান গেয়ে বেড়ান। সব ওস্তাদ তাঁকে একবাক্যে মানেন, চারু দত্তও মানতেন। বিকালবেলা বাবা আপিস থেকে এলে চা-জলখাবার খাওয়া হলে আমি আর বাবা বাড়ির সামনের জমিটুকুতে যখন বাগান করতাম, খোলা গেট দিয়ে দেখতে পেতাম, সরু পাজামা আর হাঁটু পর্যন্ত লখনৌর কাজ করা পাঞ্জাবি আর টুপি পরে হাতে ছড়ি নিয়ে তিনি হাঁটতে বেরিয়েছেন। মধ্যে মধ্যে সন্ধ্যাবেলা মা আমাকে বারান্দায় গান অভ্যাস করতে বসিয়ে দিতেন। এই রকমই এক সন্ধ্যায় তিনি ঢুকে এসেছিলেন বাড়ির মধ্যে। আমার মা-বাবা কৃতার্থ হয়ে তাঁকে বহু সম্মান দিয়ে আদর করে বসালেন। চা-খাবার খাওয়ালেন, তিনিও সানন্দে তা গ্রহণ করে বসে গেলেন আমাকে গান শেখাতে। তাঁর পাজামা-পাঞ্জাবি মলিন ছিল, সর্বাঙ্গে দারিদ্র্যের ছাপ ছিল, যা ছিল না তার নাম ‘লোভ’। সংগীতে শিল্পের এমন একটা স্তরে তিনি বিচরণ করতেন, যেখানে অর্থবিত্ত তাঁকে ছুঁতে পারত না। মেহেদি রাঙা দাড়ির ফাঁকে তাঁর হাসিটি সব সময়ই অমলিন। আমাকে গান শেখানোটা বোধহয় তিনি ধর্মজ্ঞান করতেন। যখনি সময় পেতেন, হাজির হতেন, বারান্দায় দাঁড়িয়ে মিষ্টি করে ডাকতেন, খোকিই!
মা সন্ত্রস্ত হয়ে ঘোমটা টানতেন, সেবাযত্নের ব্যবস্থা করতেন, বাবা নম্র ভঙ্গিতে বেরিয়ে এসে বলতেন, ‘আসুন ওস্তাদজি, আসুন।’
মেহেদী হোসেনের ডাক শুনতে আমার খুব ভালো লাগত, গান শুনলে পাগল হয়ে যেতাম, কিন্তু শিখতেই বড় আপত্তি। ভালোবাসার গায়ে ওইটিই কলঙ্ক হয়ে দেখা দিত। বেশ কয়েক মাস বাদে বাবা একদিন খুব লজ্জা লজ্জাভাবে গেট পর্যন্ত বিদায় দিতে গিয়ে কিছু টাকা তাঁর হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, ‘সামান্য গুরুদক্ষিণা।’
‘কেয়া!’ ভুরু বাঁকিয়ে চোখ কুঁচকে বললেন, এই গানের পাখিটাকে আমি আকাশে ওড়াব আশুবাবু, এর সঙ্গে কোনো পয়সার সম্বন্ধ নেই। তাহলে আমার অধর্ম হবে। আমি পতিত হব।
সেই সময়ে অভাব তাঁর শিল্পকে ছুঁতে পারত না। সংগীত, সাহিত্য, চিত্রকলা— এসব বিদ্যা নিয়ে যাঁরা মাতাল হয়ে থাকতেন, অভাব তাঁদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকত। সারা পৃথিবীর ইতিহাসই তার সাক্ষী। এক একটা প্রতিভাকে তার দারিদ্র্য এবং দুর্নাম, এই দুটি শত্রুর সঙ্গে যত যুদ্ধ করতে হয়েছে, সেই যুদ্ধের কোনো শেষ দেখে যাননি তাঁরা। মৃত্যুর পরে লক্ষ লক্ষ টাকার মালিক হয়েছে তার পরিবার।
সেই মেহেদী হোসেন অবশ্য বেশি দিন আসতে পারেননি। বৃদ্ধ ছিলেন, অসুস্থ ছিলেন, আমাকে কেউ কিছু না বললেও আমি বুঝতে পেরেছিলাম, তাঁর অসুখটা ছিল ফুসফুসে।
নীলফামারী থেকে আমার মা একটি রাজবংশী ছেলে নিয়ে এসেছিলেন কাজের জন্য। তার বোধহয় ১৫-১৬ বছর বয়স ছিল। মনে হয় সে-ই বলেছিল। সেই মেহেদী হোসেনের শেখানো একটা গানই আমি শুনিয়েছিলাম ভোলানাথ মহারাজকে, শুনে তিনি অবাক হয়ে বলেছিলেন, ‘এই ঘরানার গান তোমাকে কে শেখাল?’ বলে তিনিও আমাকে গান শেখাতে লাগলেন। বললেন, ‘হারমোনিয়ামে এসব হয় না, তানপুরা চাই। তবলার সঙ্গত চাই।’
এর পরে বাবা এক জোড়া বাঁয়া-তবলা কিনে আনলেন একদিন, কিন্তু তানপুরা কেনার সামর্থ্য হয়নি। দেখা গেল ভোলানাথ নিজেই নিজের তানপুরাটা নিয়ে গাড়ি করে এসেছেন। সেই তানপুরাটা তিনি যাবার সময় আমাকে উপহার দিয়ে গিয়েছিলেন। মাথায় হাতির দাঁতের কাজ করা একটা অংশে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল ‘ভোলানাথ মহারাজ’। সেই তানপুরা আমার প্রাণ হলো। যত দিন গান করেছি, সেই তানপুরাতেই করেছি।
ভোলানাথ মহারাজ বাইরে বেরিয়ে সর্বদাই ফিরতে দেরি করেন দেখে একদিন জমিদারের কাছে তাঁর তলব পড়ল। তিনি হাজির হয়ে বললেন, ‘আমি একটি ছোট লেড়কিকে গান শেখাই, তাকে শিখিয়ে আমার দিল খুব খুশ হয়। এই দোষে তুমি যদি আমাকে ছাড়িয়ে দাও, আমি এখুনি চলে যাব।’
জমিদার বললেন, ‘আমার স্ত্রী ভারতের অনেক বড় বড় ওস্তাদের কাছে তালিম নিয়ে গলা তৈরি করেছে, সেই ছোট মেয়ে কি তার চেয়ে ভালো গায়?’
ভোলানাথ বললেন, ‘সে ভগবানের আশীর্বাদ পেয়েছে, যা তোমার স্ত্রী পায়নি। এর বেশি আমি কিছু বলতে চাই না।’
জমিদার বললেন, ‘তার গান তুমি আমাকে শোনাতে পারো?’
‘তুমি যদি বলো, তা হলে আমি চেষ্টা করতে পারি।’
‘কিন্তু এখানে নিয়ে আসতে হবে।’
‘তার বাবা-মাকে বলি।’
বললেন। বাবা রাজি হয়ে নিয়ে গেলেন আমাকে। ভোলানাথ সঙ্গে আছেন। দেউড়ি দিয়ে ভেতরে ঢুকতে আমার বুক কাঁপছিল। জীবন্ত থেকেই একটা কিংবদন্তি হয়ে যাওয়া বাড়ি, তার উপরে স্বয়ং জমিদারের অনুরোধ, এ কি সোজা কথা। কম্পাউন্ডে খানিকটা ঢুকে গেলে বাঁদিকে সত্যি ছোট ছোট বিলিতি ধরনের কটেজ, যে রকম রটনা শোনা গিয়েছিল। অনেক দূর হেঁটে গেলে তবে আসল বাড়ি। মস্ত বাড়ি, এ মাথা ও মাথা হাঁটতে পায়ে ব্যথা হয়ে যাবে। লোক দাঁড়িয়েছিল, আমাদের নিয়ে দোতলার একটা অংশে উঠে এল। যে ঘরে ঢুকে এলাম, বোঝা গেল সেটাই ছোট বউয়ের গান শেখার ঘর। কোনো আসবাব নেই, শুধু দেওয়াল থেকে দেওয়াল পর্যন্ত পুরু পারস্য গালিচা পাতা, আর সংগীতের যন্ত্রপাতি।
কার্পেটের উপরেই মাঝখানে ফরাস। মখমলের বড় তাকিয়া আছে ঠেসান দেবার জন্য। আর কোনায় কোনায় বড় বড় ডালার মতো ফুলদানিতে সুগন্ধ ফুল। ঘরটা ম-ম করছে গন্ধে। তখনো সকাল পার হয়ে যায়নি, ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা আবহাওয়া। ঘরে এসে বসবার সঙ্গে সঙ্গে জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী এসে বসলেন, আমি উন্মুখ হয়ে তাকিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম কী না কী দেখব। কত যে হতাশ হলাম, বলতে পারি না। রঙ ময়লা, মাথার চুল পাতলা, মোটা একজন অতি সাধারণ মানুষ। পরনে হালকা সবুজ রঙের ভারি সিল্কের লুঙ্গি, গায়ে ফতুয়া। একটু পরে তার স্ত্রীও এলেন। ফর্সা, কোঁকড়া কোঁকড়া চুল, কপালে মস্ত গোল সিঁদুরের ফোঁটা, সিঁথিতে দগদগে সিঁদুর, হাতে শাঁখা লোহা এবং ঝকঝকে গোছাভর্তি সোনার চুড়ি, গলায় মোটা হার, কানে চাকার মতো পাশা। চোখ সার্থক হলো। এবার গান। কে আগে গাইবে, তাই নিয়ে একটু তালবাহানা হলো। তারপরে শুরু হলো। মহিলা বড় বড় ওস্তাদের কাছে তালিম নিয়েছেন, নিয়মিত সকালে-বিকালে ৫-৬ ঘণ্টা অভ্যাস করেন। গলা বেশ তৈরি, তাল-মানও দুরস্ত, তবে যাকে ঈশ্বরদত্ত ক্ষমতা বলে, সেই রকম কিছু নেই তাঁর। গান শেষ হবার পরে দেখা গেল তিনি বিরাট ভোজের আয়োজন করেছেন। সুতরাং খেতেও হলো। অবশ্য ভাত নয়। লুচি মিষ্টি মাংস দই ফল ইত্যাদি। ভাতের বাড়া।
নরেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর চেহারা যেমনই হোক, আমার তাঁকে খুব ভালো লাগল। তিনি যে একজন বিশেষ মানুষ, এ বিষয়ে আমার মনে একটুও সন্দেহ রইল না। আমাকেও তিনি সুনজরে দেখলেন, স্বরচিত বই দিলেন অনেকগুলো, সবই চটি চটি নাটকের বই। বললেন, আমার রঙ্গমঞ্চ আছে, এই সব নাটক সেই স্টেজেই অভিনীত হয়। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা সব এই কম্পাউন্ডেই থাকে, কটেজগুলো তাদের বাসস্থান। সবাই মাইনে করা। মাঝে মাঝেই দলবদল হয়। ডিরেক্টর, সুরকার এবং লেখক তিনি নিজে। নাট্য মঞ্চটিও দেখালেন, সংগ্রহশালা দেখালেন, আর দেখালেন তাঁর বাগান। নন্দনকাননেও বোধহয় এত রকম গাছ নেই, এত রকম ফুল নেই, ক্যাকটাসের এত সংগ্রহ নেই। বিদায় দিতে দিতে বাবাকে বললেন, ‘খুব ভালো মেয়ে, খুব ভালো মেয়ে, আমার যদি একটা এ রকম মেয়ে থাকত।’ মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বললেন, ‘আমি লোক ভালোবাসি না, আপন মনে থাকতে ভালোবাসি। একজন-দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে, আমার তাতেই চলে যায়। তোমার মতো একটা ছোট মেয়েকে বন্ধু হিসেবে পেলে মন্দ হয় না।’ হেসে বাবার দিকে তাকালেন, ‘একদিন ওকে নিয়ে আসুন না আমার নাটক দেখতে।’
বাবা মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বেরিয়ে এলেন। কিন্তু আর কোনো দিন আমাদের যাওয়া হয়নি। ওই প্রথম, ওই শেষ। পরের দিন ভোলানাথ এসে বললেন, ‘আমার আরজি মঞ্জুর। আমি এখন নিয়মিত ওকে গান শেখাব।’
ভোলানাথ মহারাজ অবশ্য তার পরে আর মাত্র তিন মাস ছিলেন। তাঁর চাকরির মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে চলে গেলেন। যাবার সময় তানপুরাটা নিলেন না। বললেন, ‘না বেটি, ওটা তুই রাখ।’
নরেন চৌধুরী বিষয়ে আরো অনেক গল্প প্রচলিত ছিল। ওই তো সাধারণ চেহারা আর ওই তো পোশাক, ওই পোশাকেই তিনি জগত্ জয় করেন। সর্বত্র ওই পোশাকে যান।
তার কয়েক বত্সর পর একটা ভীষণ ঘটনা ঘটল তার বাড়িতে। আমরা তখন বনগ্রাম পাড়ার বাড়ি বদলে ঢাকার সবচেয়ে ভদ্রপাড়া উয়ারীতে এসেছি। নরেন চৌধুরীর ছেলের বয়স তখন উনিশ-কুড়ি হবে। ঢাকা কলেজের ছাত্র। আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে কোথায় টেনিস খেলতে যায়। খুব সুন্দর দেখতে স্বাস্থ্যে, ঝলমলে চেহারা, রোজ দেখি। আমাদের উল্টো দিকের বাড়ির বন্ধু টুকু বলে ও ইচ্ছে করে এই রাস্তা দিয়ে যায়। দেখিস না যাবার সময় কেমন বেল বাজায়। এ কথায় আমি অখুশি হই না। বরং মনে মনে ভাবি একদিন ডাকব, বাড়িতে ডেকে এনে আদর-অভ্যর্থনা করব। বলব, এত বছর হয়ে গেল তবু ওর বাবার কথা আমি ভুলিনি। শুধু তাই নয়, মাঝে মাঝেই মনে পড়ে। মাকে বলেওছিলাম। মা বলেছিলেন, আচ্ছা। এ রকম ভাবতে ভাবতেই একদিন সকালে খবরের কাগজ খুলে কেঁদে ফেললাম। লেখা আছে বলদার জমিদার বাড়িতে খুন। জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর একমাত্র পুত্রকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
হত্যা তখন এ রকম জল-ভাত ছিল না। আমার জীবনে ও রকম একটা খবর অবশ্যই প্রথম। আমার বাপ-ঠাকুরদার জীবনেও বোধহয় প্রথম। তাও কিনা একটি পরিচিত ছেলেকে।
বিশদভাবে লেখা আছে, ছেলেটি তার নিজের মহলে নিজের শয়নকক্ষে যখন নিদ্রায় মগ্ন, তখন কেউ ঘরে ঢুকে গলায় রামদা দিয়ে কোপ বসিয়ে পালিয়ে যায়। কাণ্ডটি গভীর রাতে ঘটে বলেই সন্দেহ। সকালে তার মা রোজ এসে তার কপালে পুজোর ফুল ছুঁইয়ে যান, সেদিন এসে দেখেন রক্তের ঢল বয়ে যাচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি—
ছেলের জন্য নরেন্দ্রনারায়ণ খোদ বাড়ির সঙ্গে গলির মতো সেতু যোগ করে অপূর্ব একটা আলাদা অংশ তৈরি করে দিয়েছিলেন। আর্কিটেক্ট তিনি নিজে। ঝোলানো বাগান ছিল সেখানে। আমরা যেদিন গিয়েছিলাম, সেদিন এই অংশটা আঙুল দিয়ে নির্দেশ করে দেখিয়েছিলেন তিনি। এই ছেলেই তার একমাত্র সন্তান, এই বিশাল সম্পত্তির একচ্ছত্র উত্তরাধিকারী। এই সাংঘাতিক নৃশংস হত্যাকাণ্ডে ঢাকা শহর তোলপাড়। মামলা চলেছিল অনেক দিন ধরে, হত্যাকারীকে শনাক্ত করা হয়েছিল। তার পর কী হলো মনে নেই।
আমাদের বনগ্রামের বাড়িটা ছাড়তে আমরা বাধ্য হয়েছিলাম। তবলা বাজিয়ে কোনো ভদ্রঘরের মেয়ে গান করছে, এ রকম উদ্ভট অসভ্য ব্যাপার সহ্য করতে কোনো কোনো প্রতিবেশী রাজি হয়নি শেষ পর্যন্ত। অবশ্য আশপাশের অনেক ভদ্র অধিবাসী আমাকে খুব ভালোবাসতেন। একেবারে সংলগ্ন অধিবাসী ছিলেন আমার মায়ের পিত্রালয়ের আত্মীয়। এরাই ছিলেন প্রধান শত্রু। নচেত্ তার পাশের বাড়ির কর্তা সারদা গাঙ্গুলী মশাই আমাকে ‘মা’ বলতে অস্থির। খুব গান ভালোবাসতেন। শুধু তিনিই নন তার সারা পরিবারের সঙ্গেই আমাদের সম্পর্ক অতি নিকট ছিল। সারদা গাঙ্গুলী রোজ সকালবেলা বাজারে যেতেন, সঙ্গে তার ছোট্ট কুকুরটিও থাকত। সেই কুকুরটির মুখে বাজারের থলিটিও ধরা থাকত। যাবার পথে ডেকে বলতেন, মা জননী কী করছো?
সারদা গাঙ্গুলীর ভাগ্নে ছিলেন ভাওয়ালের রাজা। সেই রাজার মৃত্যু নিয়েও মামলা চলছিল তখন। রাজা দার্জিলিং ভ্রমণে গিয়েছিলেন। সঙ্গে স্ত্রী তো আছেনই, তা ব্যতীতও রাজপরিবারের উপযুক্ত সাঙ্গোপাঙ্গও আছে। সেখানে গিয়ে রাজার অসুখ করল। তিনি মারা গেলেন। দার্জিলিংয়ের শ্মশানেই নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। অত্যন্ত ঝড়বৃষ্টির রাত ছিল, সাংঘাতিক ঠাণ্ডা ছিল, সম্ভবত না পুড়িয়েই ফেলে রেখে এসেছিল, হঠাত্ কয়েক বত্সর বাদে দেখা গেল ভাওয়ালের রাজা ফিরে এসেছেন। ম্যানেজার এবং রানী প্রচণ্ডভাবে আপত্তি জানিয়ে বলল, ‘এ জাল রাজা, একে আমরা চিনি না। আমরা নিজেরা রাজাকে আগুন জ্বেলে পুড়িয়েছি, সে কী করে ফিরে আসতে পারে?’
মামলা তাই নিয়েই। এই লোকটি আসল রাজা অথবা নকল রাজা। তার চুলচেরা বিচারের জন্য চেনাজানা সব আত্মীয়-পরিজনকে ডাকা হচ্ছে, প্রজাদের মধ্যেও বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কেউ বলছে এই আমাদের রাজা, কেউ বলছে তা কী করে হয়? যাকে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, সে কি ফিরে আসতে পারে?
চেহারার মিল আছে, তাই সম্পত্তির লোভে এই পরিচয় নিয়ে এসে ঢুকেছে।
কারো কারো মনে রাজার মৃত্যু নিয়ে আগাগোড়াই একটা সন্দেহ ছিল। রাজার মৃত্যু, ওই রকম ঝড়জলের মধ্যে তাকে নিতান্ত দীনের মতো, কাউকে কোনো খবর না দিয়ে কতগুলো অপরিচিত লোক দিয়ে দাহ করতে পাঠানোটা তাদের বিবেচনায় অস্বাভাবিক বলে বোধ হচ্ছিল। তা ব্যতীত রানীর সঙ্গে ম্যানেজারের সম্পর্ক নিয়েও অনেক কানাঘুষা ছিল। তাদের রকম-সকম কেউ সুনজরে দেখছিল না। মৃত রাজা ফিরে এসে বলেছেন, তাকে শ্মশানে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে একজন সন্ন্যাসী তুলে নিজের ঘরে নিয়ে যান। তিনিই তাকে বাঁচান। গৃহে আর ফিরবেন না ভেবেই এত দিন আসেননি কিন্তু এখন মনে হচ্ছে দোষীদের সাজা হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
আবার ঢাকা সরগরম। কানু বিনে গীত নেই, সকলের মুখে ভাওয়াল কেস আর ভাওয়াল কেস। তারই মধ্যে সারদা গাঙ্গুলী একদিন কোর্টে গিয়ে আইডেন্টিফাই করে এলেন। এই লোকটিই যে তার ভাগ্নে এবং ভাওয়ালের রাজা, এ বিষয়ে তার কোনো সন্দেহ নেই, বললেন। অনেক বছর ধরে মামলা চলেছিল। শেষে প্রমাণিত হলো সত্যি সত্যিই তিনি রাজা।
ঝড়ের রাতে শীতে শহরে ভাড়া করা লোকেরা তাকে না পুড়িয়েই ফেলে রেখে এসেছিল। বিষই খাওয়ান বা কড়া ডোজে ঘুমের ওষুধই দিন, যে করেই হোক আয়ু থাকলে মরে না, তার প্রমাণ দিয়েই রাজা সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছেন। সন্ন্যাসীর শিকড়বাকড় ঝাড়ফুঁকও নিশ্চয় কাজে লেগেছে। সেবাযত্ন তো বটেই।
এর মধ্যে আমার আরো দুখানা রেকর্ড বেরোল। একখানাতে স্বরচিত গান, স্বরচিত সুর। লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা লেখা গানের আকৃতিতে প্রকাশ পেল। আরো একটু নাম ছড়াল। নানা উপলক্ষেই ঢাকাতে খুব গানবাজনার রেওয়াজ। ঝুলনের সময় যে কত বাঈ আর বাঈজি আসে, তার ঠিক নেই।
ঝুলনের আয়োজন সব সাহা বণিকদের বাড়িতেই হয় সাধারণত। লালমোহন সার ঠাকুরবাড়িই ছিল তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত। আমরা রাত্তিরে খেয়েদেয়ে গেলাম সেখানে। বহু জনসমাগম হয়েছে। অভ্যর্থনা করার জন্য লোক দাঁড়িয়ে আছে দেউড়িতে। ‘আসুন আসুন আশুবাবু আসুন’ বলে আমাদের অভ্যর্থনা করে ভেতরে নিয়ে গেলেন। বাইরে দাঁড়িয়ে অনেক লোক শোনে কিন্তু ভেতরে যাবার অনুমতি পায় শুধু আমন্ত্রিতরা। মহিলাদের জায়গা দোতলায়। ছেলেদের জায়গা একতলায়। চকমিলানো মস্ত উঠোনে আসর পাতা হয়েছে। মাঝখানে গাইয়ে বাজিয়েদের জায়গা রেখে চারদিকের ঘোরানো বারান্দায় শ্রোতারা ঘিরে বসেছে। দোতলায়ও চারদিকে ঘোরানো বারান্দা, সামনে চিক ফেলা। সেখানে বসেছে মেয়েরা। আমাকে ও মাকে সেখানে নিয়ে গেল, বাবাকে নিয়ে গেল উঠোনে। ঢপ গানের আসরের চাইতে এই আসরের ধরনটা একটু আলাদা আলাদা লাগছিল। গানের মেয়েও কিছু বেশি। ঢপওয়ালির সঙ্গে ছুকরি মেয়েরা থাকে, দোহার ধরে তারা, কিন্তু সকলের ভঙ্গিই ভক্তির ভঙ্গি। এই আসরেও বয়স্ক মহিলা ওই একজনই আর সব ছুকরি। কিন্তু বয়স্ক মহিলাও যেমন চটুল, ছুকরিরাও তেমনি চটুল। আমার মা একটু উশখুশ করছিলেন। গান আরম্ভ হয়ে গেল। বাঈ উঠে দাঁড়াল। কর্তাব্যক্তিরা সব ফুলবাবু হয়ে একেবারে সামনে বসেছে। চওড়া পাড়ের পাতলা কোচান ধাক্কা পাড় ঢাকাই ধুতি আর ধবধবে সাদা বিলিতি আদ্দির গিলে করা পাঞ্জাবি পরা সব বাবু। গা থেকে ভুর ভুর করে আতরের গন্ধ বেরুচ্ছে। রুপোর গোলাপদানে গোলাপজল ছিটোনো হচ্ছে। রুপোর থালাভর্তি তবকমোড়া পান আর এলাচ লবঙ্গ। বাঈ উঠে দাঁড়িয়েই গালে হাত দিয়ে গলার সুরকে উদারা মুদারা ছাড়িয়ে একেবারে তারার শেষ প্রান্তে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাল, তার পরেই জলতরঙ্গের মতো দ্রুত গিটকিরি দিয়ে ফিরে এল সুরে। এবার পায়ের ঘুঙুরে বোল তুলে ছোট ছোট হাততালিতে তালের বয়ানটা মুখে উচ্চারণ করে বুঝিয়ে দিতে লাগল দুই ধারে বসা দুই তবলিয়াকে। সঙ্গে সঙ্গে তারা চাটি দিল তবলায়, মুখের ‘ধা আ আ ধিন ধিন ধা’ বোলের সঙ্গে তবলার বোল মিশে এক অপূর্ব মাদকতা সৃষ্টি করল। তার পরই গান ধরল বাঈ, ‘সামো ঝুলামেভি রাধেকে না ঝুলাতে হ্যায় বাকি সখিয়ো আপন গালে লাগাতো হ্যায়—’ মাঝখান থেকে ধরল গানটা। আমি মুগ্ধ, মা বিরক্ত। মা কেন বিরক্ত আমি বুঝিনি। কাজরি গাইছে, দারুণ মিষ্টি সুর, আস্তে আস্তে মেয়েগুলো উঠে দাঁড়াল। কোমর দোলাতে লাগল, বাঈ যেখানে ছেড়ে দিচ্ছে, তারা সেখানে সুরটা লুফে নিয়ে ধরছে। ঘাগড়া ছড়িয়ে নাচছে সঙ্গে সঙ্গে। ফুলবাবুরা আতরের গন্ধ ছড়িয়ে ফুল কোচা নেড়ে কখনো ‘হায় হায়’, কখনো ‘মারদিস’ এইসব বুলি আউড়ে নিজেদের খুশি জানাচ্ছে। গান শেষ করে বসে পড়ল বাঈ, এবার ছুকরিরা নাচে-গানে ঘুঙুরের শব্দে, রইস রইস বাবুদের ঘাগরার আঘাতে কাত করতে লাগল আর বাবুরা ছুড়ে ছুড়ে টাকা দিতে লাগল।
এবার মা একেবারে উঠে পড়লেন। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এসে এদিক ওদিক তাকালেন, কাউকে দিয়ে বাবাকে ডেকে পাঠাবার জন্য। কাউকেই পাওয়া যাচ্ছিল না। একটু বাদে বাবা নিজেই এলেন। এলেন বাইরের দিক থেকে। আমাদের দেখে বললেন, ‘তোমরা এত দেরি করলে কেন? আমি কখন লোক পাঠিয়েছি তোমাদের ডাকতে।’ মা বললেন, ‘কই আমাদের তো কেউ ডাকেনি। আমি তো নিজে চলে এলাম। তোমাকে ডাকবার জন্যই লোক খুঁজছিলাম। কী কাণ্ড। কত কষ্টে একটা ঘোড়ার গাড়ি ধরেছিলাম, চলে গেল দেরি দেখে। চলো বেরই তো, তার পর দেখি কিছু পাওয়া যায় কিনা।’
বেরুলাম। কিছু পাওয়া গেল না। হেঁটে হেঁটে বাড়ি এলাম। আসলে সেদিন ওখানে ঢপ গান ছিল না। বাইজি নাচের আসর ছিল। আমরা ভুল খবর পেয়ে গিয়েছিলাম। মা-বাবা ওই আসরকে অত্যন্ত অপাঙেক্তয় বলে ভাবছিলেন। নিজেরা তবু বড়, কিন্তু মেয়ে নিয়ে বাবা-মা ওই আসরে বসে বাইজি নাচ দেখবেন, অসত্ চরিত্র ধনী বাবুদের বেলেল্লাপনা দেখবেন, এর চেয়ে নোংরা আর কিছু ভাবতে পারছিলেন না। আমার ওসব কথা জানা ছিল না, বোধ ছিল না, গানগুলো আমার ভীষণ ভালো লাগছিল, মনে মনে সুর আওড়াতে আওড়াতে ভাবছিলাম কীর্তন গান না হয় না-ই হলো তাতে কী? এই গান কি কম সুন্দর, কম মিষ্টি? বরং কীর্তনের চেয়ে অনেক ভালো। কী ছোট ছোট মুড়ালি তান মীড় গমক, আর গলা কী, যেন তারের যন্ত্র। আমার মনের মধ্যে ওই সুরগুলো কেবল ওঠাগড়া করতে লাগল। গানের গল্প আমার জীবনে এত বেশি যে, না বলে পারছি না। প্রকৃতপক্ষে বিবাহপূর্ব জীবনটা গান দিয়েই ভরা ছিল।
এই সময়েই সাহিত্যিক এবং সুরকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র দিলীপকুমার রায় ঢাকা ভ্রমণে এলেন। দিলীপকুমার রায় সংগীত জগতের এক মূর্তিমান বিস্ময়। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তিনি খ্যাতনামা ব্যক্তি। তাঁর পারিবারিক পরিচয় থেকে শুরু করে সর্ব বিষয়েই ঈশ্বর তাঁকে অকৃপণ হাতে ঢেলে দিয়েছেন। অত্যন্ত রূপবান, কণ্ঠস্বরের লালিত্য গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজার মতো তাঁর তুলনা তিনিই। জ্ঞানের পরিধি বিরাট। গলার মডোলেশন (ভয়েস কন্ট্রোল) যাকে বলে, যা তখন কেউ জানত না, দিলীপকুমার রায়ই তার প্রবর্তক। গলাকে প্রয়োজনে হাওয়ার মতো বইয়ে দেয়া, মৃদঙ্গের বোলের মতো গুড় গুড় করে তোলা, মীড়ে গমকে মূর্ছনায় অর্থবহ করা— এইসব কারুকর্ম তাঁর কণ্ঠস্বরে অনায়াসলভ্য ছিল। পণ্ডিত জগতেও তিনি একজন বিশেষ ব্যক্তিত্ব তখন, অনেকগুলো ভাষা জানতেন, অনেকগুলো দেশের সঙ্গে ছিল তাঁর প্রত্যক্ষ পরিচয়, সর্বোপরি গুণগ্রাহিতায় তাঁর সমতুল্য ব্যক্তি একমাত্র বুদ্ধদেব বসু ছাড়া আর কাউকেই আমি দেখিনি। সততা, সহূদয়তা, বিদ্যা-বুদ্ধি, সৌন্দর্য— সব বিষয়েই এ রকম একজন ব্যক্তি সারা বিশ্বে দুর্লভ। বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক বন্ধু সত্যেন্দ্রনাথ বসুর বাড়িতে এসে অতিথি হয়েছেন।
ঢাকা শহর নামেই ঢাকা কিন্তু কিছুই চাপা থাকে না। এই খবরটাও ঢাকা রইল না। অমনি চঞ্চল হয়ে উঠল সংগীতপিপাসুরা। সত্যেন বসুর বাড়ির গেট ছাত্রদের ভিড়ে ভরে গেল। আমিও খবরটা পেয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠলাম।
সেই সময়ে যে তিনটি যুবক সারা বাংলার গর্ব বলে আলোড়ন তুলে ফেলেছিল, তার মধ্যে একজন সুভাষচন্দ্র বসু, একজন নজরুল ইসলাম আর একজন দিলীপকুমার রায়। এই তিনজনের নাম সকলের মুখে মুখে, ঘরে ঘরে। আমার আগ্রহ দেখে বাবা বললেন, ‘আমি খবর নেব কীভাবে গান শোনার সুযোগ ঘটতে পারে। নিশ্চয়ই নানা জায়গায় গানের আসর বসবে, কোথাও না কোথাও শোনা যাবে।’ কিন্তু বাবা যা খবর আনলেন, তা মোটেও আশাপ্রদ নয়। প্রথম গানের জলসা বসছে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর বাড়িতে। যে বাড়ি আমাদের অনধিগম্য। ঢাকার ‘এলিট’রা সব যাবেন সেখানে। বলতে গেলে সেই আসর সারা রমনা পাড়ার সব অধ্যাপকের জন্যই হচ্ছে। আর যাঁরা আমন্ত্রিত, তাঁরা জজ, ম্যাজিস্ট্রেট, ব্যারিস্টার। সুতরাং এখানে আমাদের কোনো আশা নেই। দ্বিতীয় আসর কোনো এক জমিদার বাড়িতে, তাদেরও আমরা চিনি না। তবে শোনা গেছে খুব শিগগিরই নদীর ধীরে মুকুল সিনেমায় পাবলিকের জন্য গান হবে। বাবা বললেন, তখনই আমাদের নিয়ে যাবেন সেখানে। তা মন্দ নয়। যেখানেই হোক গান শুনতে পেলেই হলো, দেখতেও চাই। এসব মানুষকে দেখাও তো কম কথা নয়? মন শান্ত করেই ছিলাম। অশান্ত হলাম সত্যেন বসুর নিজে লেখা একটা চিঠি পেয়ে। বাবাকে লিখেছেন, ‘আপনি সপরিবার এলে খুশি হবো।’ উনি কতটা খুশি হয়েছিলেন জানি না, আমরা যে কত খুশি হয়েছিলাম, কত সম্মানিত বোধ করেছিলাম, তার কোনো বর্ণনা নেই। ঢাকা শহরে সত্যেন বসু একটা কিংবদন্তি। তাঁর প্রতিভা বিষয়ে কত কত মানুষের কত শ্রদ্ধা উদ্বেলিত! তাঁর বাড়িতে যাব, তাঁকেও দেখব, এর চেয়ে আনন্দ আর কী বেশি হতে পারে? অনেকক্ষণ পর্যন্ত প্রায় বিশ্বাসই হচ্ছিল না। নিমন্ত্রণ সেই সন্ধ্যাতেই, ঠিক ঠিক সময়েই আমরা ঘোড়ার গাড়ি করে গেলাম সেখানে। প্রথমে বাগান আর বাড়ি দেখে মোহিত হলাম। পরে সত্যেন বসু আর দিলীপ রায়কে দেখে চোখ সার্থক করলাম। বিখ্যাত ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার এবং সেখানেই প্রথম বিখ্যাত আর একজন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ঘোষকেও দেখি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখন এই সব রত্ন নিয়ে সমৃদ্ধ ছিল।
বাংলা ভাষায় সংগীত সুধা বলে একটা শব্দ আছে। দিলীপ রায়ের গান ছিল এই শব্দের আভিধানিক বিকল্প। শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল শ্রবণ কোনো পার্থিব জগতের সুধারসে আপ্লুত নয়, যার নাম স্বর্গসুধা, সেই সুধাই দিলীপ রায়ের কণ্ঠস্বরের মহিমায় মর্মস্থানে গিয়ে প্রবিষ্ট হচ্ছে। অভিভূত হয়ে সেই সুধাপান করেই জীবন ধন্য করলাম। আসর ভাঙতে বেশ রাত হলো।
বেলা মানে ৮টা। আমি আর বাবা গেট দিয়ে ঢুকছি, দেখলাম দিলীপদাও একটি সদ্য যুবকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে গেটের কাছে এসেছেন। যুবকটিকে বিদায় দিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, ‘কী রকম কবি কবি চেহারা করে ফেলেছে দেখেছ?’
আমি বললাম, ‘কে?’
দিলীপদা বললেন, ‘দেখলে না? তোমার পাশ দিয়েই তো বেরুল। চেন না?’
‘না তো।’
‘বলছ কী! ঢাকার মেয়ে আর ঢাকার সবচেয়ে সেরা ছেলেটিকেই চেন না? বুদ্ধদেব বসুর নাম শুনেছ তো? না কি তাও জান না?’
‘ওমা, এই নাকি বুদ্ধদেব বসু?’ আমি একেবারে সচকিত।
‘এর আগে দ্যাখোনি কোনোদিন? আলাপ নেই?’
‘না।’
‘ঠিক আছে আমি একদিন আলাপ করিয়ে দেব। দুর্দান্ত ছেলে।’
উত্ফুল্ল হলাম। আমি জানতাম পুরানা পল্টনে একটা টিনের ঘরে বুদ্ধদেব বসু থাকেন। প্রচণ্ড আড্ডা হয় সেখানে। আড্ডায় সদস্য পরিমল রায়, অমলেন্দু বসু, মন্মথ ঘোষ, অনিল ভট্টাচার্য, অজিত দত্ত, সুকুমার বসু প্রমুখ, এঁরা সকলেই বিশেষ, তখনো বিশেষ ছিলেন, পরবর্তী জীবনেও বিশেষ। এই বিশেষ দলটি ঢাকার যুবক-যুবতীদের কাছে আলোচনার বিষয়। ‘একখানা হাত’ কবিতাটি লিখে বুদ্ধদেব আমাদের মনে অনেক রোমাঞ্চ জুগিয়েছেন। ‘রমাকে আমন্ত্রণ’ পড়ে সকলেরই রমা হবার সাধ হয়েছে। অজিত দত্ত আর বুদ্ধদেবের সম্পাদনায় ‘প্রগতি’ বেরুচ্ছে তখন। বুদ্ধদেবের দেব আর অজিত দত্তর দত্ত মিলিয়ে দেবদত্তের নামে অনেক লেখা বেরুচ্ছে। একদিন সন্ধ্যাবেলা পুরানা পল্টনের মাঠে বেড়াতে গিয়ে বুদ্ধদেব বসুর আড্ডাখানা এবং বাসস্থান টিনের ঘরটাও দেখে এসেছি, উঁকিঝুঁকিও মেরেছি। সেই বুদ্ধদেব বসুকে দেখেও দেখলাম না, সেটা যত দুঃখ তার চেয়ে অনেক বেশি সুখ হলো দিলীপদা তার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবেন জেনে।
বনগ্রাম পাড়াটা বড্ডই নিম্ন-মধ্যবিত্ত পাড়া। মেলামেশার লোক বলতে গেলে ছিলই না সেখানে। বিশেষত আমার বয়সী কোনো মেয়ে। বন্ধুর অভাবে আমি নিঃসঙ্গ বোধ করতাম। দিলীপদা একটা ঢেউয়ের মতো বয়ে গেলেন আমার জীবনে। দিলীপদা থাকতে আজ এখানে গান, কাল সেখানে গান, এখানে খাওয়া, সেখানে যাওয়া— এইসব করে করে কী সুন্দর কেটে যেত দিন। দিলীপদা চলে যাবার পরে সেই দিন আর কাটতেই চায় না। দিলীপদা যে চলে গেছেন, সেই দুঃখ আর যেতে চায় না।
বিকালবেলাটা আমার কোনো দিনই ভালো লাগে না। সন্ধ্যা হয়ে আসে আসে সময়টাতে কেন যে আমার মন বিষাদে ভরে যায়, কে জানে। তেমনই এক বিষণ্ন বিকালে মন খারাপ করে দোতলার ঝোলানো বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলাম। একটি ফিটন এসে আমাদের দরজায় থামল। যাক, কেউ এসেছে। নির্জন বিকালের দারুণ কষ্ট এবার কিছুটা উপশম হবে। খুশি হয়ে উঠলাম। তাড়াতাড়ি দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে দরজা খুলে দেখলাম, বাঙালির তুলনায় একটু বেশিই স্বাস্থ্যবান এবং সুশ্রী এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন দরজায়, এক মুখ হেসে গায়ের গেরুয়া চাদর সামলাতে সামলাতে আমাকে ঠেলেই প্রায় ঢুকে এলেন ঘরে। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, ‘তুমিই নিশ্চয় রানু? বল ঠিক ধরেছি কিনা? তুমিই মণ্টুর ছাত্রী তো?’ মন্টু মানে দিলীপদা। দিলীপদার ডাক নাম মন্টু।
আমার বুকটা ধড়াস করে কেঁপে উঠল। মনে মনে বললাম, ‘তবে কি ইনিই তিনি?’
আমি নজরুল ইসলামকে কখনো দেখিনি। তাঁর কথা শুনেছি অনেক, কিন্তু চেহারার বর্ণনা কেউ দেয়নি। তবু খুব আশ্চর্যভাবেই মনে হলো এঁর নামই নজরুল ইসলাম। আমি রোমাঞ্চিত বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে বললাম, ‘আপনি— আপনি কি—’
‘আমি নজরুল ইসলাম।’ খোলা গলায় হাসলেন। নজরুল ইসলামের বয়স তখন ৩২-৩৩ অথবা কিছু বেশি। যৌবন তার চোখে-মুখে, সারাক্ষণ হাসিতে সমস্ত শরীরে নদীর স্রোতের মতো বহমান, বেগবান। সেই বয়সে যাঁরা তাঁকে দেখেছেন শুধু তাঁদেরই বোঝানো যাবে কী দু’কূলপ্লাবী আনন্দধারা দিয়ে গড়া তাঁর চরিত্র। মস্ত বড় বড় কালো টানা চোখ, এলোমেলো ঘন চুলের বাবরি, তীক্ষ নাসিকা, ঘষা তামার মতো রঙ, সহজ-সরল অদাম্ভিক ব্যবহার, উদ্দাম হাসি, উচ্ছ্বাসপ্রবণতা— সবটা মিলিয়ে একটা ব্যক্তিত্ব বটে। আর তাঁর ধুলোয় লুটিয়ে পরা গেরুয়া চাদর!
ওঁর ঢাকা আসার গল্পটাও ওঁর চরিত্রের উপযোগীই ছিল। উনি নাকি ফুটবল খেলা দেখতে গিয়েছিলেন গড়ের মাঠে। ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান নিয়ে বেদম তর্ক করতে করতে কোন বন্ধুর পাল্লায় পড়ে চলে এসেছেন শিয়ালদহ স্টেশনে। দেখলেন ঢাকা মেল দাঁড়িয়ে আছে ছাড়ার অপেক্ষায়। অমনি মনে হলো, মেলটা যখন দাঁড়িয়ে আছে একবার ঢাকা গিয়ে বেড়িয়ে এলে তো হয়। যেই ভাবা, অমনি কাজ। তাড়াতাড়ি টিকিট কিনে উঠে পড়লেন। কিছুদিন আগে দিলীপদা এসে ঘুরে গেছেন, ফিরে গিয়ে অনেক গল্প করেছেন, তখন থেকে কৌতূহল। এই স্বর্ণসুযোগ কি আর ছাড়া যায়?
আমি যে দেখেই নজরুল ইসলাম বলে মনে করতে পারলাম তার একটা কারণ ছিল। ঝাপসা ঝাপসা শুনেছি নজরুল ইসলাম নাকি ঢাকা এসেছেন। ঠিক খবর কেউ বলতে পারছিল না। নজরুল ইসলামের গানে তখন সারা দেশে পাগল। যার কোনো সুর নেই, সেও মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে আবেগ সহকারে ‘কে বিদেশী বন উদাসী’ টানে। তাছাড়া একটা লড়াই ফেরতা লোক তো বটে। বিপ্লবাত্মক বক্তৃতা দিয়ে ফাটিয়ে দিচ্ছেন দেশ, ছেলেরা উদ্বুদ্ধ হয়ে ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার হে,’ গাইতে গাইতে জেলের ফটকে ঢুকছে, প্রেমের গান গেয়ে এ-দিকে আমিও রাতারাতি এত নাম কিনে ফেলেছি যে, ভক্ত সংখ্যা প্রায় অগণন।
নজরুলের কোনো সংলাপের বালাই আছে বলে মনে হলো না। বসবার ঘরে একটা তক্তপোশ পাতা ছিল, না বলতেই বসে পড়লেন সেখানে। মা-বাবাও এসে দাঁড়িয়েছেন দরজায়, তাঁদের আপ্যায়ন করে বললেন, ‘আসুন আসুন। আপনাদের কথা আমি সব শুনেছি মন্টুর কাছে। কিচ্ছু অচেনা মনে হচ্ছে না। পরশু এসেছি বুঝলেন? আমার বন্ধু আছে এখানে, তার বাড়িতে উঠেছি।
কাজী মোতাহার হোসেন, সে তো আপনাদের ভীষণ চেনে। মন্টুর সঙ্গে অনেক দিন এসেছে। এসে থেকেই বলছি, চল চল, আগে ওই মেয়েটির গান শুনি, মন্টু বলেছে সে নাকি আমার গান এত সুন্দর করে গায় যে তার জন্য আমিই বিখ্যাত হয়ে যাচ্ছি—’ বলতে বলতে কী হাসি। ঘর একেবারে ভরে গেল। হাসি থামলে বললেন, ‘লেখাপড়ার লোকদের যা হয়, এখন বন্ধুর কলেজ, তখন বন্ধুর ছাত্র আসার সময়, এখন অমুক বইটা শেষ না করে নড়তে পারছে না— ওই বন্ধুর ভরসা ছেড়ে নিজেই দেখুন কেমন বাড়ি চিনে চলে এলাম।’
এই মানুষের আগমনে মা-বাবা বিহ্বল। কী করবেন ভেবে পান না। বসার ঘর থেকে দোতলার ঘরে নিয়ে এলেন। একটু বাদেই হারমোনিয়াম বেরুল। তারপর গান আর গান আর গান। দিলীপদার কাছে ওঁর যত গান শিখেছি, সব শোনানো হলো। মাথা নাড়ছেন আর বলছেন, ‘অভোলন অভোলন।’
নজরুল ইসলামের গানের গলাটা ভাঙা ভাঙা ছিল। সেই ভাড়া ভাড়া স্বরটাই ছিল ওঁর কণ্ঠস্বরের আসল বৈশিষ্ট্য। কী মিষ্টি সে সুর, কী মন মাতানো! তবে গানের সময়ে তাঁকে দেখাও গানের একটা অঙ্গ। সুরের তরঙ্গে তার সারা শরীর যেন তরঙ্গায়িত হয়ে উঠত। চোখের মণি জ্বলজ্বল করত, গানের প্রতি ভালোবাসার আবেগ লাবণ্যের আধার হয়ে ধরা দিত। গানের প্রাণ যেন মূর্ত হয়ে সারা ঘরের সব আবহাওয়াকে আনন্দসাগরে ভাসিয়ে রাখত। আমার মা-বাবা দুজনই সংগীতপিপাসু, নজরুলেরও যেমন গান পেলে সময়ের জ্ঞান থাকত না, আমার মা-বাবাও তাই। প্রথমদিনের পরিচয়েই নজরুল তাঁদের সময়ের কথা ভুলিয়ে দিয়ে একান্ত কাছের মানুষ হয়ে গেলেন, কখন ঘড়ির কাঁটা বেলা ৬টা থেকে রাত ১০টায় এসে কাঁপতে লাগল কারোই মনে রইল না সে কথা।
নজরুল ইসলামের স্মৃতি মানেই হাতে হারমোনিয়াম, পাশে বাটাভরা পান, ভাসা ভাসা গলায় আশ্চর্য সুর। মুখে একই সঙ্গে হাসি আর গান এবং তা অনর্গল। সেদিন চলে যাবার পরেও অনেকক্ষণ একটা আনন্দের সতেজ হাওয়ায় ঘরটা ভরে থাকল।
পরের দিন সকালেই আবার এলেন। এটা আমরা আশা করিনি। একেবারে ছটফট করতে করতে এসেছেন। রাত জেগে নতুন গান লিখেছেন তিনি, না শিখিয়ে থাকতে পারছেন না। ‘এসো এসো শিগগির এসো, হারমোনিয়াম নিয়ে বোসো।’ আমরা তখন সবে চা খাচ্ছি, আমার চেহারায় তখনো ঘুম ঘুম ভাব। বসে গেলেন সঙ্গে। ‘দিন দিন তাড়াতাড়ি চা দিন। বেলা বাড়বার আগেই পালিয়েছি। উঃ কী করে ছেলেগুলো! ওদের পাল্লায় পড়লে উপায় আছে, ঠিক কোথাও না কোথাও ধরে নিয়ে যাবে। রাত্তিরে একটা গান লিখেছি, সুরটা তুলে নাও তাড়াতাড়ি, আবার ভুল হয়ে যাবে।’
সকালটা ঝক ঝক করতে লাগল। আবার হারমোনিয়াম আবার পানের বাটা আবার ঘন ঘন চা। গানটা হলো ‘আমার কোনকূলে আজ ভিড়লো তরী, এ কোন সোনার গাঁয়/আমার ভাটির তরী আবার কেন উজান যেতে চায়।’ দেখা গেল তখনো তার বয়ান সঠিক নয়, সুরেরও হেরফের হচ্ছে। ঠিক করছেন গাইতে গাইতে শেখাতে শেখাতে।
অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন তখন বর্ধমান হাউজে ছিলেন। অত্যন্ত ভালো মানুষ। দিলীপদার সঙ্গে দু-চার দিন এসেছেন আমাদের বাড়ি। দাবা খেলতে খুব ভালোবাসতেন। দিলীপদা চলে যাবার পরে নিজেই আসতেন, আমার মা-বাবার সঙ্গে একটা বিশেষ সৌহার্দ্য তৈরি হয়ে গিয়েছিল। নজরুল তাঁর বাড়িতেই উঠেছেন। সেইখান থেকে খুব ভোরে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসতেন। বলতেন, ‘মর্নিংওয়াক হয়ে যাচ্ছে নিজে থেকে। মনে মনে একটা গান তৈরি করতে করতে হাঁটি, কখন যে পথ ফুরিয়ে যায় বুঝতেই পারি না।’ যে মানুষ যুদ্ধে গিয়েছেন, জেল খেটেছেন, জেলের নিঃসঙ্গ কুঠুরির অন্ধকারে নির্বাসিত হয়েছেন, অনশন করেছেন, গায়ে গেরুয়া চাদর, মাথায় গান্ধী টুপি আর খদ্দরই যার একমাত্র ভূষণ— সেই মানুষই আবার কবিতার কম্পন সংগীতের ঝঙ্কারে পাগল করে দিচ্ছেন মানুষকে। তাঁকে নিয়ে যে দেশ উন্মত্ত হয়ে উঠবে, তাতে আর সন্দেহ কী? এসেছিলেন দু-চার দিনের জন্য কৌতূহল মেটাতে, কিন্তু থেকে গেলেন অনেক দিন। আমাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অচ্ছেদ্য হলো, একাত্ম হলো অচিরে, আমাদের বাড়িরই আর একজন মানুষ হয়ে গেলেন।
সেবার ঢাকা গিয়ে নজরুল ইসলাম যেদিন ঢাকা ছেড়ে ফিরে গেলেন, তার দু’দিন আগে সন্ধ্যাবেলা আমাদের বাড়িতে তাঁর গান আর আবৃত্তির একটি আসর বসেছিল। আসর ভাঙতে সামান্য দেরি হলো। সকলে চলে গেল মা নজরুলকে খেতে দিলেন। রাত ১০টা বেজে গেল। বাবা বললেন, ‘আপনি অপেক্ষা করুন, আমি সাইকেল নিয়ে গিয়ে একটা গাড়ি ডেকে আনি।’ উনি বললেন, ‘পাগল নাকি? আপনি গিয়ে আমার জন্য গাড়ি ডেকে আনবেন? সে কখনো হয়?’
বাবা বললেন, ‘পাড়াটা দেখছেন তো এইটুকু রাত্রিতেই কেমন থমথমে চুপচাপ হয়ে যায়? এখন কাছে পিঠে কোনো গাড়ি পাবার সম্ভাবনা নেই, বড় রাস্তার মোড়ে একটা ঘোড়ার গাড়ির আস্তাবল আছে, ভাড়া বেশি দিলে চলে আসবে।’
নজরুল হেসে খুন, ‘আমার কি রানুর মতো ভূতের ভয় আছে নাকি যে রাত বেশি হয়েছে বলে, পাড়া চুপ হয়ে গেছে বলে হেঁটে যেতে ভয় পাব?’ গানের কলি ভাঁজতে ভাঁজতে নেমে গেলেন রাস্তায়।
মা দোতলায় এসে বিছানা পাততে পাততে বাবাকে বললেন, ‘জানো, আজ ও বাড়িতে’— এই বলে ইঙ্গিতে পাশের বাড়িটা দেখিয়ে দিলেন, (অর্থাত্ তাঁর পিত্রালয়ের পরশ্রীকাতর আত্মীয় বাড়িটা) ‘সারাদিন ধরে কী যে পরামর্শ চলছিল, কে জানে, কেবল বারান্দায় এসে এসে কয়েকটা ছেলে আমাদের বাড়িটা দেখছিল, পাণ্ডা দেখলাম গুণ্ডার সর্দার সেই অমুক সাহাটা—’
যখন দিলীপদা এসেছিলেন, তখন ওঁরা একদিন দিলীপদাকে নিজের মেয়েদের গান শোনাবার জন্য নিমন্ত্রণ করে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, দিলীপদা সেই নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তারপর থেকে ও বাড়ির সর্বময়ী কর্ত্রী বয়স্ক সুন্দরী আত্মীয়টি আর আমাদের সঙ্গে কথা বলতেন না। কর্তা এবং কন্যাদেরও বলতে দিতেন না। অতি পাশাপাশি বাড়ি, চোখাচোখি হয়ে যাবার সম্ভাবনায় বারান্দায় একটি চটও ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। বাবা বলেছিলেন, ‘বেশ হলো। তোর মায়ের পিত্রালয়ের আত্মীয় প্রীতিটা একটু কমবে এবার।’ আমার বাবা ওদের ধরন-ধারণ, কথাবার্তা, জীবন-যাপনের প্রণালি কিছুই বিশেষ পছন্দ করতেন না।
মায়ের কথা শুনে বাবা বললেন, ‘ওই গানটান হচ্ছিল তো, লোকজন এসেছিল, ওদের বলা হয়নি, তাই উকিঝুঁকি মেরে দেখছিল।’
বলতে বলতেই নিঃশব্দ পাড়া ভেদ করে একটা কোলাহল ভেসে এল। সঙ্গে সঙ্গে মা ব্যাকুল হয়ে বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে নজরুলকে ওরা আজ কিছু করবে, আমি দেখেছি নজরুল বেরুল, আর ওদের বাড়ি থেকেও বেরিয়ে পড়ল কয়েকটা ছেলে—’
বাবা গেঞ্জি গায়েই দৌড়ে নিচে নেমে গেলেন, চটি পায়েই দরজা খুলে ছুটলেন। আমি আর মা উত্কণ্ঠিত উদ্বেগে ঝোলানো বারান্দায় যত দূর চোখ চলে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম।
খানিকক্ষণ পরেই দেখতে পেলাম বাবা আর নজরুল হেঁটে হেঁটে আসছেন। বাবা নজরুলকে ধরে ধরে আনছেন।
মায়ের মনে যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, সেটাই ঘটেছে। নজরুল যখন বনগ্রামের মোড় পেরিয়ে একটা আরো নির্জন রাস্তায় পৌঁছেছেন, বোধহয় সেটা ঠাটারি বাজারের মোড়, সেই মুখটাতে যেতেই জনা সাত-আট ছেলে লাঠি দিয়ে পেছন থেকে প্রচণ্ড জোরে মাথায় আঘাত করতে করতে বলল, ‘দিলীপ রায়ের টাক মাথাটা ফাটাতে পারিনি, এবার তোর বাবরি চুলের মাথাটা আর আস্ত রাখব না।’
নজরুল আচমকা আঘাত পেয়ে মুহূর্তের জন্য বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলেন বটে, পরক্ষণেই ঘুরে দাঁড়িয়ে একটা ছেলেকে ধরে ফেলে তার হাতের লাঠি দিয়েই তাকে ধরাশায়ী করে সমানে সেই লাঠি বন বন করে ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, ‘কে আসবি আয়, ক’টা আসবি আয়—’ লাঠিখেলা, ছোরাখেলায় দক্ষ মেরুদণ্ড সিধে একটা যুদ্ধফেরতা মানুষের সম্মুখে এই শৃগাল-শূকরের দল কি কখনো দাঁড়াতে পারে? তবু যতক্ষণে তিনি ওই ছেলেটাকে পিটিয়ে হাতের সুখ করেছেন, ততক্ষণে এরাও এলোপাতাড়ি যে যেভাবে পারে মেরেছে তাঁকে। তার পর লাঠি ঘোরানো দেখে মাটিতে পড়ে থাকা ছেলেটাকে তুলে নিয়ে পালিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে ঘটে গেছে ব্যাপারটা। বাবা গিয়ে যখন পৌঁছেছেন, তখন লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতেই পথ হাঁটছেন নজরুল। বর্ধমান হাউজে যাবেন।
‘নজরুল, আমি—’ বাবার গলা পেয়ে থেমে গেলেন তিনি, বাবা তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘কোথায় যাচ্ছেন? আমার সঙ্গে চলুন।’
নজরুল হেসে বললেন, ‘আপনার বাড়ি যাই বলে ওরা আমাকে মেরেছে, রানুকে নিয়ে অনেক কুিসত কথা বলেছে, এখন যদি আবার ওখান যাই, এই শূকর সন্তানগুলো তো বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেবে। আপনি কেন এলেন? কী সাহসে এলেন? ওরা কোথায় লুকিয়ে আছে ঠিক নেই আপনাকে খুন করে ফেলবে ওরা। আমি ওদের সঙ্গে যুঝতে পারব, আপনি পারবেন না।’
বাবা বললেন, ‘পারি না পারি, সেটা আমি দেখব। আমি আপনাকে ছেড়ে যাব না।’
‘আমিও আপনার সঙ্গে যাব না। রাত ১০টা পর্যন্ত থেকেছি বলেই, যেসব জঘন্য ভাষা প্রয়োগ করেছে, সারা রাত থাকলে কি উপায় রাখবে? না না, আপনি ফিরে যান আমি যাব না।’
বাবা জোর করে ধরে নিয়ে এলেন। কী করে এবং কী দুরন্ত সাহসে যে উনি অত দূর হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছিলেন, তা উনিই জানেন।
বাড়িতে এনে বাবা বিছানায় শুইয়ে দিলেন, মা লণ্ঠন কাছে নিয়ে কোথাও জখম হয়েছে কিনা, দেখবার জন্য ঝুঁকে পড়েই শিহরিত হলেন। হাতে, পায়ে, মাথায়, পিঠে— সর্বত্র গভীর আঘাতের চিহ্ন মোটা মোটা হয়ে রক্ত জমে ফুলে উঠেছে। কী করে যে সেই রাতটা আমরা কাটিয়ে ছিলাম, আমরাই জানি। মা ওঁকে একটা হোমিওপ্যাথি ওষুধ খাইয়ে দিলেন, আমাদের পরিচারিকা পুনার মা, যে ওঁকে কালো কৃষ্ণ বলেছিল, সে চোখ মুছতে মুছতে সমস্ত আহত জায়গা নারকেল তেল দিয়ে ভিজিয়ে দিল, মা বাতাস করতে লাগলেন, আমি আর বাবা প্রায় অচেতনের মতো মেঝেতে বসে রইলাম। রাত ভোর হয়ে গেল।
তার মধ্যে অবশ্য নজরুল ঠাট্টা-তামাশা করে আমাদের ভারী মন হালকা করার চেষ্টা করেছিলেন, ফলশ্রুতি শুধু অশ্রুর বন্যা। লজ্জা, দুঃখ, অসম্মান কী না নিহিত ছিল তার মধ্যে? একাদিক্রমে অতগুলো দিন ও রকম একটা অনাবিল আনন্দের মধ্যে কাটিয়ে ঢাকা এসে যে মন বসতে চাইবে না, সে কথা বলাই বাহুল্য।
(প্রতিভা বসুর ‘জীবনের জলছবি’ গ্রন্থের ঢাকার স্মৃতিচারণমূলক অংশ সংকলিত)






