আমাদের রোমাদের ভেতর কেউ মারা গেলে আমরা পাহারা দিতাম। তখন মরদেহ রাখার মতো কোনো ঘর ছিল না। বাড়িতেই শুইয়ে রাখা হতো আর রোমারা একসঙ্গে সারা রাত বসে থাকত।
প্রথমে প্রার্থনা শুরু করত ওরা, তারপর সবসময়ই মৃত মানুষের চোখে টাকা রেখে দিত। ছোট ছিলাম, তাই ওরা কাজটা কেন করছে জানা ছিল না। আমাদের অজানা ছিল যে, কাজটা করার কারণ ওরা মারা যাওয়ার পর কবর দেয়া হলে যেন পরকালেও ওদের হাতে টাকা-পয়সা থাকে। তখন কথাটা জানতাম না আমরা। তাছাড়া সবাই ভিন্ন ভিন্ন গল্প শোনাত আমাদের। একেক রোমার বেলায় একেক রকম ছিল সেটা। কোথাও মরদেহের চোখের পাতায় পয়সা রাখা হতো, আবার কোথাও পাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্যই টাকা রাখত ওরা। তো এমনই ছিল ব্যাপারটা। তারপর প্রার্থনা করত ওরা এবং মদ খেত। একটা অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়েই মৃতকে বিদায় জানাত। তখনকার দিনে কেউ মারা গেলে বেশির ভাগই দুদিন থেকে যেত।
মৃতদের কথা আর আমার চাচা মারা যাওয়ার পর আমার কাছে এলে কেমন লেগেছিল, সেটাই তোমাদের বলতে চাই। বাড়ির ভেতর উঠোনে লুটিয়ে পড়েছিল সে। ওকে ঘরে নিয়ে আসে ওরা, বিছানায় মারা যায় ও। এক বা দুই মাস পর ওকে স্বপ্নে দেখি। ঘুমিয়ে ছিলাম, আবার ঘুমোতে পারছিলাম না, উঁহু! ঠিকমতো ঘুম হচ্ছিল না আমার। আচমকা মনে হলো কেউ একজন আমার হাত ধরেছে; হাতটা উষ্ণ কম্বলের নিচে ছিল। সহসা মনে হলো যেন আমার খুব কাছে থেকেই শীতল হাতে আমার হাত ধরেছে ও। তারপর সে বলল, ‘ভয় পেও না। তোমার কোনো ক্ষতি করব না। স্রেফ তোমার দেখভাল করছি আর তুমি কেমন আছ, কী করছ, তাই জানতে চাইছি।’ বেঁচে থাকতে চাচা সবসময়ই ওর কাছে তামার পয়সা থাকার কথা বলত আমাকে। ওই টাকার জন্যই সবসময় চিৎকার করে জ্বালাতাম ওকে: ‘চাচা, আমাকে পয়সাগুলো দিয়ে দাও!’ সে সবসময় বলত, ‘বাছা রে, আমি মারা যাওয়ার পর টাকাটা তোমার হয়ে যাবে। এটা তোমারই টাকা। তোমার চাচি তোমাকেই দিয়েছে এগুলো।’ আমার কাছে আসার পর টাকার স্বপ্নই দেখলাম আমি। চাচা জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার চাচি কি যে টাকা তোমার বলেছিলাম, সেটা তোমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে?’
সকালে চাচিকে কথাটা বললাম, কিন্তু আমার কথা বিশ্বাস করল না সে। কিন্তু তারপর আমার অন্য চাচা এসে একই কথা বলল ওকে। তামার টাকাটা আমাকে দেয়া হয়েছে কিনা, ওকেও জিজ্ঞেস করেছে চাচা।
এমনকি আজো ব্যাপারটা তেমনই আছে। আমার খারাপ অবস্থা হলে বা আমি অসুস্থ হলে সবসময় আমাকে সাহায্য করতে আশপাশেই থাকে ওরা। আমি দুর্দশায় পড়লে বা সমস্যার মুখোমুখি হলেও আমাকে সান্ত্বনা দিতে কাছাকাছি থাকে।
আগের দিনে মৃতরা আমার কাছে আসতে পারে, একথা বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু মৃতরা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারে না, কারণ ওরা তোমার কাছে আসার মানে ওরা তোমাকে ভালোবাসে। সে কারণেই কাছে আসে ওরা। আর তাই কারোই মৃতদের ভয় পাওয়া উচিত না। সবাই নিজেদের স্বজনদের কাছে ফিরে যেতে ভালোবাসে, ওরা কেমন আছে জানার জন্য। হয়তো সবসময়ই আমাদের সঙ্গেই আছে ওরা।
অবশ্য আগের দিনে ওরা ফিরে এসে আমাকে সান্ত্বনা দিতে বা কিছু জানাতে পারে, বিশ্বাস করিনি। কিন্তু ওরা সবসময়ই আমার দিকে, আমার লোকদের দিকে খেয়াল রেখেছে। ব্যাপারটা বিশ্বাস করতাম না, কিন্তু এখন এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।






