খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝিতে উত্তর ব্রিটন থেকে সাহারা, আটলান্টিক থেকে মেসোপটেমিয়াসহ ভৌগোলিকভাবে বিশ্বের বৈচিত্র্যময় এক বিশাল অঞ্চল রোমানরা নিয়ন্ত্রণ তথা শাসন করত। সেখানে সাধারণভাবে জনসংখ্যা ৭৫ মিলিয়নে উন্নীত হয়েছিল। ধীরে ধীরে পুরো সাম্রাজ্যের সব মুক্ত-স্বাধীন বাসিন্দাই রোমান নাগরিকত্বের অধিকার লাভ করেছিল। কাজেই বিস্ময়ের কিছু নেই যে ইংরেজ ইতিহাসবিদ এডওয়ার্ড গিবন ওই যুগকে কেন আমাদের মানজাতির ইতিহাসে ‘সবচেয়ে সুখী’ কালপর্ব হিসেবে মূল্যায়ন করেছিলেন।

রোমান সভ্যততার উত্থান-পতনে জলবায়ু যে একটি প্রধান ভূমিকা রেখেছিল, এটি তা প্রমাণ করে। সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতারা-নির্মাতারা অনবদ্য সময় থেকে লাভবান হয়েছিল। আর সেটি হলো একটি কৃষিভিত্তিক সমাজে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের উষ্ণ, ভেজা ও স্থিতিশীল আবহাওয়া অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার জন্য যথেষ্ট উপযোগী ছিল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল রাজনৈতিক ও সামাজিক দরকষাকষিতে পৃষ্ঠপোষকতা জুগিয়েছিল, যার দ্বারা রোমান সাম্রাজ্য এর বিশাল ভূখণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল। বলা চলে, অনুকূল জলবায়ু সাম্রাজ্যটির অন্তর্নিহিত কাঠামো গড়ে তোলায় সহায়তা করেছিল।

এ অনুকূল জলবায়ু ব্যবস্থার পরিসমাপ্তি তাত্ক্ষণিকভাবেই রোমের মৃত্যুঘণ্টা বাজায়নি। বরং ঠিক তখনই কম অনুকূল জলবায়ু এর শক্তির অবক্ষয় ঘটিয়েছিল, যখন সাম্রাজ্যটি জার্মান, পার্সিয়ানসহ আরো সাংঘাতিক শত্রুদের দ্বারা বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। জাস্টিনিয়ান রাজত্বের সময় ষষ্ঠ শতকে জলবায়ুর অস্থিতিশীলতা চরমে উন্নীত হয়েছিল। ক্রনোলজিস্ট ও আইস-কোর বিশেষজ্ঞরা তাদের গবেষণায় খ্রিস্টীয় ৫৩০ ও ৫৪০-এর দশকে আগ্নেয়গিরির প্রচুর উদগিরণের কথা উল্লেখ করেন, যেমনটা কয়েক হাজার বছর অতীতেও ঘটেছিল। উদগিরণের এ ধ্বংসাত্মক ধারাবাহিকতা একটি যুগের সূচনা করেছিল, যাকে আমরা বলি ‘লেইট অ্যানটিক লিটল আইস এজ’ নামে, যখন অনেকটা শীতল তাপমাত্রা অন্তত ১৫০ বছরের জন্য স্থায়ী হয়েছিল।

জলবায়ুগত অবনতির এ ধাপ রোমের উন্মোচনে চূড়ান্ত প্রভাব ফেলেছিল। এটি আরো বড় ধরনের বিপর্যয়ের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। আর তা হলো বিউবোনিক প্লেগের প্রথম মহামারীর প্রাদুর্ভাব।

জীবতাত্ত্বিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়া ছিল রোমের ভাগ্যললাটের জন্য আরো ভয়াবহ পরিণামের। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যটির উল্লেখযোগ্য সব অগ্রগতি সত্ত্বেও সংক্রমিত রোগের কারণে মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু ২০-৩০ বছরে থেমে গিয়েছিল। বলা চলে, সংক্রমিত রোগই সেখানে মানুষের মৃত্যুর শীর্ষ কারণ ছিল। তবে রোমানদের কাবু করা রোগের শ্রেণীবিন্যাস স্থির কিছু ছিল না এবং এখানেও নতুন সংবেদনশীলতা ও কৃেকৗশল বিবর্তনমূলক ইতিহাসের (আমাদের নিজস্ব প্রজাতি এবং আমাদের মিত্র অণুজীব ও জীবাণু উভয় ক্ষেত্রে) ডিনামিকস বোঝার উপায় মৌলিকভাবে পরিবর্তন করছে।

ব্যাপকভাবে নগরায়িত, পারস্পরিকভাবে আন্তঃসংযুক্ত রোমান সাম্রাজ্য তার অণুজীব বাসিন্দাদের জন্য ছিল আশীর্বাদস্বরূপ। শিগেলোসিসের মতো পাকস্থলির আন্ত্রিক রোগ ও প্যারাটাইফয়েড জ্বর খাদ্য ও পানিদূষণের মাধ্যমে ছড়িয়েছিল এবং ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে এসব রোগ ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছিল। জল নিষ্কাষণের নালা ও মহাসড়ক-সংলগ্ন পয়প্রণালি ব্যবস্থা ছিল সবচেয়ে নিকৃষ্ট ধরনের ম্যালারিয়ার জীবাণুর আবাস। সময়ের আবর্তনে রোমানরা স্থল ও সমুদ্রপথের মাধ্যমে বিভিন্ন সমাজের সঙ্গেও ব্যাপকভাবে সংযুক্ত হয়েছিল, যেমনটা আগে কখনো ছিল না। ফলে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় জীবাণুর গমনাগমন বেড়ে অপ্রত্যাশিত পরিণাম সৃষ্টি করেছিল। যক্ষ্মা ও কুষ্ঠরোগের মতো ধীর হন্তারকরা রোমানদের উন্নয়নকৃত আন্তঃসংযুক্ত শহরগুলোয় বিস্তারের সহায়ক পরিবেশ পেয়েছিল।

তবে রোমের জীবতাত্ত্বিক ইতিহাসে সবচেয়ে চূড়ান্ত ফ্যাক্টর ছিল মহামারী ঘটাতে সমর্থ নতুন নতুন জীবাণুর আবির্ভাব। আলোচ্য সাম্রাজ্য এ ধরনের তিনটি আন্তঃমহাদেশীয় রোগের ঘটনায় পর্যুদস্ত হয়েছিল। অনুকূল জলবায়ু ব্যবস্থার অবসানের সঙ্গে অ্যান্টোনিন প্লেগের আবির্ভাব হয়েছিল এবং সম্ভবত এটি ছিল স্মলপক্স ভাইরাসের বৈশ্বিক যাত্রাও। এ মহামারী থেকে সাম্রাজ্যটি ঘুরে দাঁড়িয়েছিল বটে; কিন্তু এর আগের প্রভুত্বমূলক আধিপত্য আর কখনো ফিরে পায়নি। তারপর মধ্য তৃতীয় শতাব্দীর প্লেগ অব সিপ্রিয়ান নামের অজানা উৎসের একটি রহস্যময় রোগের তাণ্ডব পুরো সাম্রাজ্যটিকে একটি বিশৃঙ্খল, বিপর্যস্ত অবস্থায় নিপতিত করেছিল।

যদিও তা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, তবে নতুন ধরনের সম্রাট, নতুন ধরনের অর্থ, নতুন ধরনের সমাজ, খ্রিস্টধর্ম নামের নতুন ধর্মের আবির্ভাবে পুরো সাম্রাজ্যই গভীরভাবে বদলে গিয়েছিল। সবচেয়ে নাটকীয় বিষয় হলো ষষ্ঠ শতকে জাস্টিনিয়ানের নেতৃত্ব পুনরুদ্ধারকৃত সাম্রাজ্য বিউবোনিক প্লেগের মুখোমুখি হয়েছিল। এর ক্ষতি ছিল অপূরণীয়-অপরিমাপযোগ্য; সম্ভবত এতে অর্ধেক জনসংখ্যাই মারা গিয়েছিল।

মানুষ ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থার মধ্যকার ব্যতিক্রমী জটিল সম্পর্কে দ্য প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান একটি ঘটনা সমীক্ষা। দুষ্ট জীবাণু, ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস ব্যাকটেরিয়াম, সুনির্দিষ্টভাবে কোনো প্রাচীন নেমেসিস নয়। ঠিক চার হাজার বছর আগে বিবর্তিত হয়ে, নিশ্চিতভাবে মধ্য এশিয়ায় এটি ছিল একটি বিবর্তনমূলক নবাগত জীবাণু, যখন তা প্রথম প্লেগ মহামারী ঘটিয়েছিল। রোগটি সামাজিক কলোনি কিংবা মারমত (কাঠবিড়ালিজাতীয় প্রাণী) ও খরগোশের মতো প্রাণীর আবাসস্থলে স্থায়ীভাবে বিরাজমান। তবে ঐতিহাসিক প্লেগ মহামারীগুলো ছিল বড় বড় দুর্ঘটনা; এসব দুর্ঘটনার সঙ্গে অন্তত পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি যুক্ত: ব্যাকটেরিয়া, তীক্ষ দন্তবিশিষ্ট প্রাণী, জীবাবাস-পোষকের বিস্তার (ব্ল্যাক রেট, যা মানুষের কাছাকাছি বাস করে), জীবাণু ছড়ানো মাছি এবং যুদ্ধে অংশ নেয়া বা মারা পড়া সৈনিক।

জিনগত সাক্ষ্য-প্রমাণ ইঙ্গিত দেয় যে প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান সৃষ্টিকারী ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস অণুজীবের উত্পত্তি ঘটেছিল পশ্চিম চীনের কাছাকাছি কোথাও। ভূমধ্যসাগরের দক্ষিণ তীরে এটি প্রথম আবির্ভূত হয়েছিল এবং খুব সম্ভব সমুদ্রবাহিত বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সিল্ক ও মসলার মারফতে রোমান ভোক্তাদের কাছে পৌঁছেছিল। এটি ছিল প্রাথমিক বিশ্বায়নের একটি বড় দুর্ঘটনা। একবার যখন সাম্রাজ্যের জীবাণু মূষিকজাতীয় প্রাণীর (রডেন্ট) আবাসে, সাম্রাজ্যের শস্য মজুদের বৃহৎ ভাণ্ডারগুলোর কাছে পৌঁছেছিল, তখন মৃত্যুহার থামানো অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়েছিল।

প্লেগ মহামারী ছিল আশ্চর্য প্রাতিবেশিক জটিলতার একটি ঘটনা। এটি সংঘটনের জন্য যেমন একটি দৈব সংযোগ প্রয়োজন ছিল, তেমনি বৈশ্বিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কের মাধ্যমে রোমান মজুদভাণ্ডারগুলোয় জীবাণুর প্রবেশ করা কিংবা সাম্রাজ্যের ভেতরে ইঁদুরের বিস্তারের মতো ভৌত মানবপরিবেশের অপ্রত্যাশিত পরিণামও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।

মহামারী আমাদের কাঠামো ও সুযোগ, প্যাটার্ন ও দৈব ঘটনার মধ্যকার তফাত গুলিয়ে দেয়। এখানেই রোমের একটি বড় শিক্ষা নিহিত। মানুষই প্রকৃতি গড়ে, সর্বোপরি প্রাতিবেশিক অবস্থার মধ্যেই মানবসমাজের বির্বতন ঘটে। কিন্তু প্রকৃতি আমাদের ইচ্ছার প্রতি অন্ধ এবং অন্য অণুজীব ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা আমাদের নিয়ম মানে না। জলবায়ু পরিবর্তন ও রোগের বিবর্তন এভাবে মানব ইতিহাসের ওয়াইল্ড কার্ডে পরিণত হয়েছে।

আমাদের পৃথিবী এখন প্রাচীন রোম থেকে খুব ভিন্ন। আমাদের এখন জনস্বাস্থ্য, জীবাণু তত্ত্ব ও অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ আছে। আমরা রোমানদের মতো অসহায় হব না, যদি আমাদের চারপাশের গভীর হুমকিগুলো চিহ্নিত করতে যথেষ্ট চালাক-চতুর হয় এবং সেগুলো প্রশমনে বিদ্যমান হাতিয়ারগুলো ব্যবহার করি। তবে রোমের পতনে প্রকৃতির কেন্দ্রিকতা মানবসমাজগুলোর ভাগ্য পরিবর্তনে ভৌত ও জীবতাত্ত্বিক পরিবেশের ক্ষতি পুনর্বিবেচনার যুক্তি প্রদান করে।

আধুনিক যুগ থেকে একটি অনতিক্রম্য বিভাজনে দাঁড়িয়ে আমরা সম্ভবত রোমানদের ততটা একটি প্রাচীন সভ্যতা হিসেবে নয়; বরং আমাদের আজকের পৃথিবীর রূপকার-নির্মাণকারী হিসেবে দেখতে পারি। তারা একটি সভ্যতা তৈরি করেছিল, যেখানে বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক, সংক্রামক রোগ ও বাস্তুতান্ত্রিক অস্থিতিশীলতা ছিল মানবসমাজের ভাগ্য নির্ধারণে চূড়ান্ত শক্তি। রোমানরাও ভেবেছিল যে তারা প্রাকৃতিক পরিবেশের চপল ও উন্মত্ত শক্তি। ইতিহাস আমাদের সাবধান করে যে তাদের ধারণা ভুল ছিল।

 

কায়াল হার্পার: ‘দ্য ফেইট অব রোম: ক্লাইমেট, ডিজিজ অ্যান্ড দি এন্ড অব অ্যান এম্পায়ার’ গ্রন্থের লেখক