পটভূমি

পদ্মা নদীর নাম শোনেনি এমন মানুষ দেশে বোধ করি পাওয়া দুষ্কর। সেই পদ্মা নদীর কোলঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের ঈশ্বরদী। মূলত পদ্মাকে ঘিরেই ঈশ্বরদীতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো স্থাপিত হয়েছিল। ঈশ্বরদী পাবনা জেলার একটি উপজেলা হলেও দেশব্যাপী স্বতন্ত্রভাবে তার গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানে নির্মিতব্য রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ দুটি জাতীয় স্থাপনা রয়েছে এ উপজেলায়। রয়েছে অতীত ঐতিহ্যের হারানো অনেক পরশ।

মাড়োয়ারি, বিহারিদের ব্যবসা-বাণিজ্য

ব্রিটিশ শাসন আমলে ব্যবসা-বাণিজ্যে, বিশেষ করে বাঙালি ও মুসলমানদের তুলনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ ছিল বেশি। বড় বড় ব্যবসা তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। এর মধ্যে মাড়োয়ারিরা ছিল অন্যতম। সবার কাছে ঈশ্বরদী ছিল অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। কারণ তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো ছিল না। একমাত্র নৌপথ ও হেঁটেই ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য খরিদ করে এনে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। আর এ দেশের মানুষের ব্যবসার মূল কেন্দ্র ছিল কলকাতা। সে কারণে ঈশ্বরদীর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। নৌপথে কলকাতা থেকে তারা পণ্য পরিবহন করত। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা হেঁটে কলকাতা থেকে পণ্য খরিদ করতেন।

অষ্টাদশ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত ঈশ্বরদীতে মাড়োয়ারি ও বিহারিদের আধিপত্য ছিল। বড় বড় ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ মাড়োয়ারিদের হাতেই ছিল। তাদের ব্যবসা ছিল টাট বা গদিভিত্তিক। কোনো পণ্য তাদের কাছে পাওয়া যেত না। কিন্তু কোনো গ্রাহক বা ব্যবসায়ী যেকোনো পণ্যের অর্ডার দিলে তারা সেটা ভারতবর্ষের যে স্থানে পাওয়া যায় সেখান থেকে খরিদ করে এনে দিত। তখন গদি বা টাট ব্যবসায় যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে তারা টেলিগ্রাম ও ডাক বিভাগকে কাজে লাগাত। কিন্তু হাজার হাজার টাকার পণ্য সে সময় তারা নৌপথে ঈশ্বরদীতে গ্রাহকের চাহিদামতো আমদানি করত। এদের উপাধি ছিল আগরওয়াল। শম্ভুনাথ আগরওয়াল, গিগা আগরওয়াল, মিসা আগরওয়াল, সমাশেষ আগরওয়ালসহ নামকরা আগরওয়াল ছিল তখনকার স্বনামধন্য মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী। এ সময় তাদের সন্তানদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে ১৯১৭ সালে স্থাপন করে সাঁড়া মাড়োয়ারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। তখন বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন হরিপ্রসাদ ঝুনঝুন আগরওয়াল। এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে, এ ঝুনঝুন আগরওয়ালই বিদ্যালয়টি স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ঈশ্বরদীতেই মারা যান। এরপর তার জ্ঞাতিগোষ্ঠী সব ভারতে চলে গেলেও পরে তারা ঈশ্বরদীর মোহে ফিরে আসার পরিকল্পনা করে। কিন্তু ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের কারণে আর তাদের ফিরে আসা হয়নি। ব্রিটিশ শাসনামলে মূলত সাঁড়াই ছিল ঈশ্বরদীর মূল শহর। সে কারণেই স্কুলটির নামকরণ হয়েছিল সাঁড়া মাড়োয়ারি স্কুল। পরবর্তী সময়ে স্কুলটির উন্নয়ন হওয়ায় বর্তমানে সাঁড়া মাড়োয়ারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু পদ্মার ভাঙনে সাঁড়া নদীতে বিলীন হতে থাকলে ঈশ্বরদী বর্তমান স্থানে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ঈশ্বরদীর আগরওয়ালরা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ভারতমুখী হতে থাকে। তার পরও যারা ঈশ্বরদী তথা দেশমাতৃকার মোহে এ দেশে ব্যবসা পরিচালনা করছিল, যোগাযোগ ব্যবস্থা আগের তুলনায় কিছুটা উন্নতি হওয়ায় টাট ব্যবসায় ভাটা পড়ার কারণে তারা ১৯৬৫ সালের ভেতর সবাই ভারতে পাড়ি জমায়। বর্তমানে ঈশ্বরদীতে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। তাদের পরিত্যক্ত বাড়িঘর যা ছিল সেগুলো ভেঙে সেখানে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। মাড়োয়ারিদের অতীত ঐতিহ্য ঈশ্বরদী থেকে হারিয়ে গেলেও এ বিদ্যালয়ই তাদের পদবির সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে।


এখানকার বিহারিদের ঐতিহ্য ছিল স্মরণীয়। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতের বিহার রাজ্য থেকে এখানে এসে তারা আবাস স্থাপন করে। সে কারণে তাদের বিহারি সম্প্রদায় বলে আখ্যা দেয়া হতো। যদিও তারা মুসলিম পরিবারভুক্ত ছিল, কিন্তু তারাও ছিল সে সময় নামকরা সম্প্রদায়। তারা বড় কোনো চাকরিবাকরি না পেলেও হাতের কাজে ছিল পটু। তাদের হাত ধরেই ঈশ্বরদীতে তাঁত শিল্প গড়ে উঠেছিল। অনেকে গুল-জর্দা তৈরি করত। কেউ কেউ রেলের ছোট পদে চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনের পর অনেকেই এখান থেকে পাকিস্তানসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যায়। ঢাকার মিরপুরে বিহারি সম্প্রদায়ের সঙ্গে এদের একটি বড় অংশ গিয়ে আবাস গড়ে তোলে। বিভিন্ন সময় নানা নির্যাতন সহ্য করেও ঈশ্বরদীর মোহে এখনো বেশকিছু বিহারি এখানে বসবাস করছে। বিহারিদের ভালো কোনো কর্ম না থাকলেও তাঁত শিল্পে তারা ছিল অত্যন্ত পটু। সে কারণে তাদের কর্মসংস্থানের জন্য ১৯৬০ সালে ঈশ্বরদীর পৌর এলাকার ফতে মোহাম্মদপুরে স্থাপন করা হয় বেনারসি পল্লী। খুব অল্প সময়ে ঈশ্বরদীর কাতান-বেনারসি নারীদের কাছে প্রিয় পোশাকে পরিণত হয়। ফতে মোহাম্মদ আলীও ছিলেন একজন বিহারি। তার নামানুসারে এলাকাটির নামকরণ করা হয়েছিল ফতে মোহাম্মদপুর। বর্তমানে তারা বিভিন্ন কর্মসহ মূলত বেনারসি শিল্পে কর্ম করে জীবিকা নির্বাহ করছে।

নীল থেকে আখের চাষ

ব্যবসার মূল কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত ঈশ্বরদী ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই গুরুত্ব বহন করে আসছে। নদীবিধৌত উর্বর ভূমি হিসেবে ঈশ্বরদীর খ্যাতি বহু পুরনো। সে কারণে ঈশ্বরদী নীলকরদের কোপানলে পড়ে যায়। কৃষকদের তারা নীল চাষে বাধ্য করতে থাকে। অন্য কোনো ফসল আবাদ করতে কৃষকদের বাধা দিত তারা। কোনো কৃষক নীল চাষ না করলে তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন করা হতো। তাদের প্রধান কার্যালয় ছিল পাবনা শহরের প্রাণকেন্দ্র কাচারিতে। এভাবেই ঈশ্বরদীর কৃষকরা নীলকরদের কাছে নির্যাতিত হতো। নীল চাষ করে সামান্য যে অর্থ নীলকররা কৃষকদের দিত, তা দিয়েই বহু কষ্টে জীবিকা নির্বাহ করতে হতো। জানা যায়, ১৯০০ সালের প্রথম ভাগে তারা তাদের নীল চাষ ধীরে ধীরে গোটাতে থাকে। ১৯২২ সালে ব্রিটিশ সরকার ভূমি জরিপের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষক ও জমিদারদের নামে তাদের জমি রেকর্ডভুক্ত করে রেকর্ড প্রকাশ করে। তখন থেকে নীল চাষে ভাটা পড়লে ঈশ্বরদীর কৃষকরা আখ চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েন। মাঠকে মাঠ তখন নীলগাছের পরিবর্তে আখ খেতের দেখা মিলতে থাকে। এ আখ থেকে কৃষকরা গুড় তৈরি করে লাভবান হতে থাকেন।

চিনির মূল উপকরণ আখ। উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্থাপিত সুগার মিলগুলো এসব কৃষকের কাছ থেকে আখ কিনে চিনি উৎপাদন করত। কুষ্টিয়া ও নাটোরের লালপুরের চিনিকল ঈশ্বরদীর কাছে হওয়ায় ঈশ্বরদীতে আবাদকৃত আখের চাহিদা দিন দিন বাড়তে থাকে। কৃষকরাও আখ চাষ সম্প্রসারণ করে চলেন। বার্ষিক এ ফসল আবাদে খরচ কম হওয়ায় কৃষকরা লাভবান হতে থাকেন। কিন্তু অনেক কৃষক একবার আখ চাষ করে কেটে বিক্রির পর সেখান থেকে যে আখ হতো সেটাই আবার বিক্রি করত। ফলে মুড়ি আখে রসের ভাগ কম থাকায় চিনি উৎপাদন কম হতো। এ কারণে মিলের কিছুটা ক্ষতি হতে থাকে। সবকিছু বিবেচনায় এনে মানসম্মত উচ্চফলনশীল আখ উদ্ভাবনের লক্ষ্যে সরকার একটি আখ গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। ঈশ্বরদীতে আখ আবাদ বেশি এবং ঈশ্বরদী মিল জোনের আওতাভুক্ত হওয়ায় এখানেই জাতীয় ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৯৫১ সালে প্রায় ২২০ একর জায়গার ওপর ঈশ্বরদীতে স্থাপন করা হয় ইক্ষু বা আখ গবেষণা ইনস্টিটিউট। সে সময় থেকে বিজ্ঞানীরা তাদের নিরলস পরিশ্রম করে একের পর এক আখের জাত উদ্ভাবন করে চলেছেন। এ পর্যন্ত তারা ২৮টি আখের জাত উদ্ভাবন করে অবমুক্ত করেছেন। ঈশ্বরদীতে ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র থাকার কারণে পাবনা জেলায় কোনো চিনিকল না থাকায় ১৯৯৫ সালে পাবনার ঈশ্বরদীর অদূরে স্থাপন করা হয়েছিল পাবনা সুগার মিল। পাবনা সুগার মিলসহ বর্তমানে বেশকিছু চিনিকল সরকার বন্ধ ঘোষণা করায় আখের চাহিদা কমে গেছে। ফলে আখ আবাদও কমেছে এখানে। ইক্ষু গবেষণায়ও ভাটা পড়েছে।


প্রতিষ্ঠানটি শুধু আখ গবেষণা করেই ক্ষান্ত হয়নি। তারা বিভিন্ন চিনি-জাতীয় খাদ্য, যেমন—চিনি, গুড় ও জুসের ওপর গবেষণা চালাচ্ছে। আখ ছাড়া আর কোন কোন পদ্ধতিতে ওই সব খাদ্য তৈরি করা যায়, তা নিয়ে তাদের গবেষণা চলছে। এরই মধ্যে আখের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি গোলপাতা দিয়ে সুগার বিট উদ্ভাবন করে বিএসআরআই-১ ও ২ অবমুক্ত করেছে। তবে প্রচার-প্রচারণা ও সংশ্লিষ্ট অনেকের দক্ষতার অভাবে মানুষের কাছে সেটা সাড়া ফেলতে পারেনি। পায়নি বাজারও।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি তাল, খেজুর, গোলপাতা, স্টেভিয়া পাতা, ষষ্টি মধু ও মধু নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। কিন্তু এক্ষেত্রেও এসব গবেষণা কতটা মানুষের কাজে আসবে সেটা নিয়েই জনশ্রুতি রয়েছে বিভিন্ন মহলে। ইক্ষুর সাথি ফসল হিসেবে একটি প্রকল্পও হাতে নেয়া হয়েছে সম্প্রতি। অতীতের গৃহীত প্রকল্পগুলো সংশ্লিষ্টদের অদূরদর্শিতা ও স্বার্থনীতির কারণে শতভাগ সফলতা না পেলেও সাথি ফসলের প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখতে পাবে, এমন মন্তব্যই রয়েছে ঈশ্বরদীসহ আশপাশের আখচাষীদের।

রেশমি কাপড়ের মূল উপাদান রেশমের সুতা তৈরি হয় পলু নামের এক ধরনের পোকার ডিম থেকে। এ পলু পোকা রেশম বীজাগারে পালন করতে হয়। এদের খাদ্য হচ্ছে তুঁত গাছ ও ওই গাছের পাতা। পোকা পালনকারীকে বলা হয় বসনী। পলু পোকা চাষ বেশ পরিশ্রমসাধ্য। খরচও বেশি। ডিমের ভেতরে পোকা অবস্থানের প্রতিটি ধাপকে একেকটি নামে অভিহিত করা হয়। নির্দিষ্ট সময় ডিমে অবস্থানের পর পোকার মুখ থেকে লালা বের হয়। এ লালা থেকেই উৎপাদন হয় রেশম গুটি। গুটির ভেতর পোকাগুলো দুই সপ্তাহ অবস্থান করে। এরপর গুটি কেটে সুতা বের করতে হয়। একটি পলু পোকা ২৫০-৩০০টি ডিম দেয়। ১০০টি পোকার ডিম থেকে ২০ কেজিরও বেশি সুতা উৎপাদন হয়। এ পোকা পালনের জন্য ঈশ্বরদীতে রয়েছে রেশম বোর্ড। এখানেই আবাদ হয় তুঁতগাছ। উৎপাদন করা হচ্ছে হাজার হাজার পোকা। এ বোর্ডের অধীনে জেলার বিভিন্ন উপজেলার রাস্তার পাশে তুঁত গাছ লাগিয়ে পোকা তৈরির মাধ্যমে জীবিকানির্বাহ করছেন হতদরিদ্র নারীরা। এজন্য কৃষি ব্যাংক থেকে তাদের দেয়া হচ্ছে ঋণ।

পরমাণু বিদ্যুৎ ও পেপার মিল

ঈশ্বরদীতে আরো একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্ম হলেও ঈশ্বরদীর মাটি থেকে চিরতরে মুছে গেছে একসময়ের ঐতিহ্যবাহী নর্থ বেঙ্গল পেপার মিল। পদ্মা নদীতে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য নিষ্কাশনের পরিকল্পনা নিয়ে ১৯৬৪ সালে ঈশ্বরদীতেই স্থাপন করা হয় আণবিক (পরমাণু) শক্তি প্রকল্প। প্রকল্পের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আবাস নির্মাণের জন্য তখন ঈশ্বরদী-কুষ্টিয়া সড়কের নতুনহাটে ৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। আর বর্তমান চলমান বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থানে ২৬০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য। ওই সময় নতুনহাট এলাকায় ৭২টি পরিবার বসবাসের জন্য ৩২টি ইউনিট নির্মাণ করা হয়। কিছু জনবলও নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানকার সিংহভাগ আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দীর্ঘ সময় পর ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কিছু শর্তারোপ করে। বাংলাদেশ সে শর্ত পূরণে সমর্থ হয়। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক এইচই ইউকিয়া আমানো প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সব ধরনের সহযোগিতা দেয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। সে মোতাবেক প্রকল্প এলকায় আরো ১ হাজার ৮৭ একর জায়গা হুকুম দখল করে মোট ১ হাজার ৩৪৭ একর জায়গার ওপর বর্তমানে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে।

ঈশ্বরদীর আরো একটি মৃত স্থাপনার নাম পাকশি নর্থ বেঙ্গল পেপার মিলস। দেশে কাগজ ও হার্ডবোর্ডের চাহিদা পূরণের জন্য পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন ১৯৬৪ সালের এপ্রিলে প্রকল্পটি অনুমোদন করে। এ সময় প্রজেক্ট ইনচার্জ হিসেবে এম ওয়াজির ইমাম দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬৫-৬৬ সালে রূপপুর হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পাশে পাকশি ইউনিয়নের দিয়ার বাঘইল মৌজায় ১৩৩ দশমিক ৭১ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ১৯৬৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সরকার ও দাতাদের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৬৭ সালের ৩ মার্চ মিলের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৯৭০ সালের জুনে নির্মাণকাজ শেষ হয়। দাতা দেশ হিসেবে জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালি আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেয়।

চিনিকলের আখের ছোবড়া নর্থ বেঙ্গল পেপার মিলের মূল কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহূত হতো। এছাড়া সিলেট পাল্প, বিদেশী পাল্প, পাটকাঠি ও গমের নাড়াও কাঁচামালের অন্তর্ভুক্ত ছিল। নর্থ বেঙ্গল পেপার মিল কাগজ সভ্যতার ইতিহাসে অত্যাধুনিক মিল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল। এ মিলের কাগজ উৎপাদন প্রক্রিয়া উন্নত ব্যাগাস জেস্টার পাল্প মিল ওয়াশিং, রিচিং, রিফাইনিং, ওয়েবারজেশন, ডায়িং, ক্যালেন্ডারিং, রিউইনজিং ও ফিনিশিং। প্রতিদিন ছয় টন এবং বছরে ১৫ হাজার টন প্রডাক্ট মিক্সড ভিত্তিতে সাদা, বাদামি, মেনিফোল্ড, ব্লুম্যাচ ইত্যাদি ধরনের কাগজ তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে ১৯৭০ সালের ২৫ জুলাই পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন শুরু হয়। পরীক্ষামূলক সময়ে প্রথমে ২ হাজার ৬৫৭ টন কাগজ উৎপাদন হয়। এরপর ১৯৭১-৭৩ সাল পর্যন্ত মিলটি যুদ্ধকালে নানা কারণে বন্ধ থাকে। ১৯৭৫ সালের মার্চে ১৩১ জন কর্মকর্তা ও ১ হাজার ১৩৮ জন কর্মচারী নিয়ে মিলটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে। পেপার মিলটি চালু অবস্থায় কাঁচামালের স্বল্পতা, শ্রমিক কোন্দল ও সীমাহীন দুর্নীতির বোঝা বইতে না পেরে বেশ কয়েকবার বন্ধ ঘোষণা করা হলেও ৩০ নভেম্বর ২০০২ সালে সরকার মিলটি লে-অফ ঘোষণা করে। মিলটির যন্ত্রাংশ ও জমি নিলামে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে ঈশ্বরদীর মাটি থেকে মুছে যায় তার নাম। চিরদিনের জন্য যবনিকা ঘটে পাকশি নর্থ বেঙ্গল পেপার মিলের।

উপসংহার

না, নর্থ বেঙ্গল পেপার মিলের যবনিকা ঘটলেও ঈশ্বরদীর যবনিকা ঘটেনি। সবার কাছে এক বাক্যে পরিচিত সেই হার্ডিঞ্জ ব্রিজটি ঈশ্বরদীতেই রয়েছে। একসময়ের করালগ্রাসী প্রবহমান পদ্মার বুক চিরে ১৯০৮ সালে শুরু হয়েছিল এ রেল সেতু। হাজার হাজার শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমে ১৯১২ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল। আমরা যেন না ভুলি লালন শাহ সেতুর কথা। সেটাও কিন্তু ঈশ্বরদীতেই। ১৯৬০ সালে ৪১২ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হয়েছিল ঈশ্বরদী বিমানবন্দর। সেটাও এখন বন্ধ সংশ্লিষ্টদের সুষ্ঠু সিদ্ধান্তের অভাবে। ডাল গবেষণা কেন্দ্রটিও এখানেই অবস্থিত। আমাদের দেশের সন্তানদের এগ্রিকালচার ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে (এটিআই) শিক্ষা দিতে চাইলে ঈশ্বরদীতে আসতে হবে। পরমাণু ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) ঈশ্বরদীতে দেখতে পাবেন। লাল সালু কাপড়ের জন্য ঈশ্বরদীর আলহাজ টেক্সাইল মিলের নাম একসময় দেশের মানুষের মুখে মুখে ছিল। প্রতিষ্ঠানটি এখনো থাকলেও তার আগের জৌলুশ নেই। রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) রয়েছে এখানে। রেলের আঞ্চলিক দপ্তরটি রয়েছে ঈশ্বরদীর পাকশিতে। এগুলো ছাড়াও বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনে ভরপুর ঈশ্বরদী।

 

শফিউল আলম দুলাল: সাংবাদিক