প্রচলিত ধারণা অনুসারে সায়েন্স ফিকশনের মূল ভিত্তি হচ্ছে বিজ্ঞান। তাই অনেক সাহিত্য সমালোচক মনে করেন, একমাত্র আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠার পর পরই সায়েন্স ফিকশন সাহিত্য রচিত হওয়া সম্ভব। তাই সায়েন্স ফিকশনের জন্ম আধুনিক কালেই। এ গোত্রের সমালোচকদের বক্তব্য অনুসারে সায়েন্স ফিকশন নামে সাহিত্যের জন্ম আজ থেকে ৩০০ বছর আগে। মূলত আধুনিক বিজ্ঞানের যাত্রা থেকেই এ সাহিত্য ধারা ডালপালা মেলতে থাকে। বিজ্ঞানের নতুন নতুন অভিযান থেকে বিস্মিত লেখকরা ভবিষ্যতের বিস্ময়কে তাদের কলম দিয়ে লিখতে চাইলেন। আর এভাবেই বিকশিত হয় সায়েন্স ফিকশন সাহিত্য। দুনিয়া ধ্বংসের পরবর্তী পরিস্থিতি, ভিনগ্রহবাসীর আক্রমণ, রোবট, প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিয়ে শুরু হয় কল্পনা, যা এখনো সমান জনপ্রিয়।
সায়েন্স ফিকশন শুনতে যত আধুনিক বিষয় বলেই মনে হোক না কেন, সাহিত্যের এ ধারা কিন্তু হাজার বছরের পুরনো। দ্বাদশ শতকে ইংল্যান্ডের সাফকের উলপিট গাঁয়ে হাজির হয়েছিল দুই সবুজ চামড়ার শিশু, তাদের ভাষা কেউ বুঝত না। তারা কিন্তু ছিল ভিন গ্রহের বাসিন্দা। একাদশ শতকে পাওয়া যায় এলমার নামের এক সন্ন্যাসীর গল্প, যে নিজের শরীরে একজোড়া পাখা তৈরি করে ম্যালমেসবারি অ্যাবের ছাদ থেকে উড়ে গিয়েছিল। পনেরো শতকের সচিত্র রচনা ভয়নিচ পাণ্ডুলিপির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, পাণ্ডুলিপির ভাষার মর্মোদ্ধার করা এখনো সম্ভব হয়নি। ভাষার চেয়ে এর অলঙ্করণগুলো আরো রহস্যময়, বিভিন্ন ধরনের অপরিচিত উদ্ভিদ আর সুররিয়াল ল্যান্ডস্কেপ নিয়ে পূর্ণ। এ রহস্যময় ভয়নিচ পাণ্ডুলিপির প্রায় প্রতি পাতাতেই বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদের চিত্র আঁকা আছে কিন্তু একটি উদ্ভিদকেও এখনো শনাক্ত করা যায়নি। এগুলো সবই সায়েন্স ফিকশন, মধ্যযুগের সাহিত্য ও সংস্কৃতি ঘাঁটলে এমন অনেক নিদর্শনের দেখা মেলে। আছে রাজদরবারে আনন্দদানকারী রোবট, কাল্পনিক ইউটোপীয় ভবিষ্যতের কল্পনা, সময়কে ছাড়িয়ে ভবিষ্যেক আবিষ্কারের অভিযান।
ফ্যান্টাসি বা রূপকথা নামে জনরার প্রভাব মধ্যযুগের বিজ্ঞানচর্চা ও কল্পনাকে আমলে নিতে চায় না; তাই মধ্যযুগে সায়েন্স ফিকশনের অস্তিত্ব ছিল, সেটা অনেকেই মানতে নারাজ। কিন্তু সে সময়ে সাহিত্যকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এবং সেকালের বিজ্ঞানচর্চা ও আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে মধ্যযুগে এমনকি প্রাচীনকালেও সায়েন্স ফিকশনের অস্তিত্বের বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
সায়েন্স ফিকশনের উৎস নির্ণয় ও শ্রেণিবিভাগ করাটা কঠিন কাজ। সাহিত্যের এ বিভাগটির কোনো প্রতিষ্ঠিত, সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞাও নেই। অনেক বিশেষজ্ঞ সায়েন্স ফিকশনের যাত্রা শুরু ধরতে চান বিশ শতকের শুরুতে। এ সময়ের পাল্প ম্যাগাজিনগুলোতেই সায়েন্স ফিকশনের যাত্রা শুরু হয়। ১৯২৬ সালে অ্যামেজিং স্টোরিজের প্রথম সংখ্যা সম্পাদনা ও প্রকাশ করার সময় হুগো জার্নসব্যাক (১৮৮৪-১৯৬৭) ‘সায়েন্টিফিকেশন’ টার্মটি ব্যবহারের প্রস্তাব করেন। জার্নসব্যাক লেখেন, “‘সায়েন্টিফিকেশন’ বলে আমি জুল ভার্ন, এইচ জি ওয়েলস এবং এডগার অ্যালান পো’দের ঘরানার গল্পকে বোঝাচ্ছি। আকর্ষণীয় কাহিনী, যাতে বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার সঙ্গে সুদূরপ্রসারী রূপকল্প মিশে থাকে। ...এসব গল্প যে পড়তে খুবই আকর্ষণীয় তা-ই নয়, এগুলো সবসময় শিক্ষামূলকও।”
খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে, জার্নসব্যাক সায়েন্স ফিকশনকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে পেছনের দিনের লেখকদের নাম উল্লেখ করছেন। তার এ সংজ্ঞাকে কাজে লাগাতে তাহলে আরো পেছনের দিনে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এবং সেটা মধ্যযুগে।
এ সাহিত্য সমালোচকদের পাশাপাশি বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদরাও মধ্যযুগে বিজ্ঞানের উপস্থিতিকে অবহেলার চোখে দেখেছেন। তাদের অনেকের চোখে মধ্যযুগে বিজ্ঞানের অবদান খুব বেশি নয়। কিন্তু বলাই বাহুল্য, মধ্যযুগ কেবল অন্ধকার, জাদু, কুসংস্কারের কাল নয়; বরং প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের বিজ্ঞানের যে ধারাবাহিক যাত্রাপথ, তারই একটি কালপর্ব। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যথেষ্ট বিকাশ এ পর্বে দেখা যায়।
মধ্যযুগেই কম্পাস, বারুদ আবিষ্কার হয়। ব্লাস্ট ফার্নেস, এক ধরনের যান্ত্রিক ঘড়িও মধ্যযুগে তৈরি হয়। এ যুগে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সেগুলোয় বিজ্ঞানের চর্চা শুরু হয়। প্রাচীনকালের ক্ল্যাসিকাল দুনিয়ার বৈজ্ঞানিক শিক্ষার বিকাশ ঘটানো হয়েছিল। সৃষ্টিতত্ত্বের ব্যাখ্যায় পদার্থবিদ্যায় যুক্ত হচ্ছিল ন্যাচারাল ফিলসফি। কম্পিউটাস নামে একটি গণনা পদ্ধতি দিয়ে সময় ও স্থানের পরিমাপ শুরু হয়েছিল।
গবেষকরা এখন চেষ্টা করছেন মধ্যযুগের বৈজ্ঞানিক তত্পরতা, প্রযুক্তি ও কল্পসাহিত্যের সম্পর্ককে যাচাই করে দেখতে। আর তাতে দেখা যাচ্ছে মধ্যযুগের সাহিত্যে মানুষের কল্পনায় বৈজ্ঞানিক চিন্তার গভীর প্রভাব দেখা যায়। মধ্যযুগে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটকে নিয়ে রচিত পৌরাণিক গাথার পাণ্ডুলিপিতে দেখা যায়, তিনি বিমানের মতো বাহনে স্বর্গে যাত্রা করেছেন আবার আরেক জায়গায় সাবমেরিনের মতো নৌযানে সাগরের তলদেশে যাচ্ছেন। আবার তিনি ড্রাগনের সঙ্গে লড়াই করছেন এমন দৃশ্যও আছে। কোথাও পৌরাণিক জীব গ্রিফিনরা আলেকজান্ডারকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। মধ্যযুগের বিখ্যাত ও রহস্যময় পরিব্রাজক স্যার জন ম্যান্ডেভিলের ভ্রমণবৃত্তান্তে পাওয়া যায় এক রকমের স্বর্ণের পাখির বিবরণ, যেগুলো গ্রেট চ্যানের টেবিলে ডানা ঝাপটাত।
আধুনিক সায়েন্স ফিকশন লেখকদের মতো মধ্যযুগের লেখকরাও কল্পনাকে বিজ্ঞানের যুক্তির মধ্যে স্থাপন করতে চাইতেন। জিওফ্রে চসার আলকেমির প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন উপকরণের এত নিখুঁত বিবরণ দিয়েছেন যে পড়লে মনে হবে নিশ্চিতভাবে তিনি এ চর্চায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন। অবশ্য আগ্রহ থাকার পরও তার ক্যানন’স ইয়েওমান’স টেল-এ তিনি প্রতারক আলকেমিস্টদের ব্যাপারে তার অবিশ্বাসের কথাও জানিয়েছেন।
আধুনিক সায়েন্স ফিকশন মধ্যযুগের অনেক কল্পনাকে গ্রহণ করেছে এবং সেগুলোকে ব্যবহার করে ভিন্ন কোনো দুনিয়া বা বিকল্প ভবিষ্যতের কথা আধুনিক গল্পে তুলে ধরেছে। আর এ উপস্থাপনায় নানা জটিলতাও আছে। উইলিয়াম এম মিলার তার আ ক্যান্টিকল অব লেইবোউইটজ (১৯৫৯) গ্রন্থে মধ্যযুগের ভবিষ্যতের বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। কনি উইলিসের ডুমসডে বুক প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে। বইতে টাইম ট্রাভেল করতে পারা এক গবেষকের দেখা মেলে, যিনি মধ্যযুগের অক্সফোর্ডে ফিরে যান।
মধ্যযুগ ছেড়ে আমরা এবার আরো পেছনে যেতে চাই। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, সেই প্রাচীন যুগেও সায়েন্স ফিকশন রচিত হয়েছে। শুনতে কিছুটা প্যারাডক্সিকাল মনে হতে পারে। আগেই আলোচনা করা হয়েছে, প্রচলিত ধারণায় আধুনিক সায়েন্স ফিকশনের বয়স খুব বেশি হলে ৩০০ বছর, অনেকের মতে তো আরো কম— বড়জোর ১০০ বছর। কিন্তু এখন গবেষকরা দুই হাজার বছর আগেকার নাটক, কবিতায়ও সায়েন্স ফিকশনের অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছেন। এখানেই আরেকটি মনোজ্ঞ বিতর্কের যাত্রা শুরু হচ্ছে। আধুনিককালের সায়েন্স ফিকশনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রযুক্তির ব্যবহার, বর্তমান বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ভিত্তিতে ভবিষ্যেক দেখা। কিন্তু প্রাচীন বা মধ্যযুগে প্রযুক্তির এত বাড়-বাড়ন্ত ছিল না। বৈজ্ঞানিক সূত্রও কম ছিল। সেকালের সায়েন্স ফিকশন ছিল মূলত অসম্ভবের কল্পনা, যাতে দেখা যেত প্যারানরমাল কর্মকাণ্ড, সুপারন্যাচারাল উপাদান এবং জাদু। অর্থাৎ দুই যুগের সায়েন্স ফিকশনের ধারণায় ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এ পার্থক্য তৈরি হয়েছে আধুনিক কালের প্রযুক্তির বিকাশের ওপর ভিত্তি করে এবং সঙ্গত কারণে এ তর্কটাও একটা আধুনিক বিষয়। শিল্প ও ডিজিটাল বিপ্লবে নতুন নতুন প্রযুক্তি মানুষের জীবনে যুক্ত হয়েছে। এগুলোর ব্যবহার আধুনিক সায়েন্স ফিকশনে দেখা যায়। তাই দুই যুগের সায়েন্স ফিকশনের বাহ্যিক কাঠামোয় পার্থক্য থাকলেও উভয়ের অন্তর্গত তাত্পর্য একই। তাহলে প্রাচীনকালে ঠিক কবে সায়েন্স ফিকশন যাত্রা শুরু করেছিল? অনেকে মনে করেন এপিক অব গিলগামেশেই প্রথম সায়েন্স ফিকশনের লক্ষণ দেয়া যায়। এই কাব্যেই প্রথমবারের মতো সায়েন্স ফিকশনের দুটি লক্ষণ দেখা যায়— অমরত্ব ও দুনিয়া ধ্বংস। উল্লেখ্য, এপিক অব গিলগামেশ রচিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব একুশ শতকে। আবার অনেকে মনে করেন সায়েন্স ফিকশনের যাত্রা শুরু খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে, সে আমলের বেশকিছু সাহিত্যকর্মে সাই-ফাইয়ের লক্ষণ প্রকাশিত। ৪১৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিক নাট্যকার অ্যারিস্টোফেনিস তার নাটক ‘দ্য বার্ডস’ লেখেন। ডায়োনাইসিয়া উৎসবে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিল। যেকোনো আধুনিক সমালোচক দ্য বার্ডসকে প্রথম সার্থক রূপকথা হিসেবে বিবেচনা করেন। এখানে পক্ষীজাতীয় হিউম্যানয়েডরা ক্লাউডকাক্কুল্যান্ড নামে একটি ভাসমান শহর নির্মাণ করে অলিম্পাসের দেবতাদের উত্খাত করে মানুষের ওপর প্রভুত্ব করতে অগ্রসর হয়। সমালোচকরা মনে করেন, এটা ছিল এথেনীয়দের যুদ্ধবাজ চরিত্রের প্রতি ব্যঙ্গ। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ভাসমান শহর আধুনিক সায়েন্স ফিকশনের একটি অতি পরিচিত ও ব্যবহূত একটি উপাদান। জেমস ক্যামেরনের অ্যাভাটার সিনেমায় একটি ভাসমান পাহাড় দেখা গিয়েছিল। অন্যদিকে পক্ষীমানবদেরও আধুনিক সায়েন্স ফিকশনে দেখা যায়। পক্ষীমানবদের পাশাপাশি যান্ত্রিক পাখিরাও প্রাচীন সাহিত্যের উপাদান। এভাবে তৈরি করা কোনো স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের উল্লেখ সংস্কৃত শাস্ত্র ঋগ্বেদ থেকে মধ্যযুগের ডাচ কাহিনী দ্য রোমান্স অব ওয়েলয়েনে পাওয়া যায়। আর্কিটাস নামের একজন গ্রিক দার্শনিক ও গণিতবিদ জন্মেছিলেন খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে। তাকেই প্রথম যান্ত্রিক পাখি তৈরির কৃতিত্ব দেয়া হয়। আর্কিটাসের পাখিকে বাষ্পের শক্তি দিয়ে চালনা করা হতো এবং এটা ২০০ মিটার পর্যন্ত উড়তে পারত। শুনতে অতি কল্পনা মনে হলেও আজকের ড্রোনের সঙ্গে আর্কিটাসের পাখির সাদৃশ্য ছিল, সে হিসাবে আড়াই হাজার বছর আগেই মানুষ ড্রোনের কল্পনা করে ফেলেছিল।
ইতিহাসে মানুষের কল্পনায় আধুনিক রোবটের ধারণা সহজলভ্য। আরব্য রজনীর কাহিনীতে রোবট, স্বয়ংক্রিয় ঘোড়ার ধারণা দেখা যায়। চতুর্দশ শতকে ইংরেজি সাহিত্যের জনক জিওফ্রে চসারের লেখা একটি ছোট গল্পের নাম দ্য স্কয়ার’স টেল। এ গল্পে পিতলের ঘোড়ার দেখা পাওয়া যায়। এ ঘোড়া চালকের মৌখিক নির্দেশে তাকে অবিশ্বাস্য গতিতে দুনিয়ার যেকোনো প্রান্তে নিয়ে যেত। এটা আধুনিক কালের স্বয়ংক্রিয় গাড়ির ধারণার কাছাকাছি। এর ১০০ বছর পরে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি এক রোবট নাইটের স্কেচ করেছিলেন। ১৯৫০-এর দশকে ভিঞ্চির নোটবুক ঘেঁটে এ স্কেচ উদ্ধার করা হয়েছিল। এ স্কেচে আর্মার স্যুট ও অভ্যন্তরীণ নানা যন্ত্র ছিল। এভাবে প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য পর্যবেক্ষণ করলে নানা ধরনের বিস্ময়কর উপাদান পাওয়া যায়, যা সায়েন্স ফিকশন সাহিত্য। শিল্প ও ডিজিটাল বিপ্লবের অনেক আগেই সাহিত্যিক, দার্শনিক ও শিল্পীরা ভবিষ্যতের কল্পনা করেছেন, যা আধুনিক প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের ধারণার সঙ্গে দারুণ সাদৃশ্যপূর্ণ। কোয়াড-কপ্টার ড্রোনের পরিবর্তে সেকালে কল্পনার আকাশে উড়ে বেড়াত স্বয়ংক্রিয় পাখি। স্বয়ংক্রিয় গাড়ির পরিবর্তে ছিল মানুষের মন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত রথ, ঘোড়া। উনিশ শতকে রোবট নির্মিত হয়েছে স্টেইনলেস স্টিলে, একুশ শতকে হচ্ছে কার্বন ফাইবারে আর প্রাচীনকালের রোবট তৈরি হতো পিতল দিয়ে। আর যেটি দুই কালেই এক এবং অপরিবর্তনীয় তা হলো, ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের বাঁধনহীন কল্পনা, সম্ভাবনার প্রতিটি বিন্দুকে জাগিয়ে তোলা।
মধ্যযুগে মানুষের কল্পনার দৌড় কেবল বিজ্ঞানকে ঘিরে ছিল তা নয়, বরং সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক ময়দানেও প্রসারিত হয়েছিল। ১৫১৬ সালে ইংরেজ লেখক টমাস মোর লাতিন ভাষায় এক রাজনৈতিক স্যাটায়ার উপন্যাস লিখে ফেলেন, যার নাম ইউটোপিয়া। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে এতে কল্পনার প্রাধান্য ছিল। উপন্যাসে টমাস মোর এক কাল্পনিক দ্বীপের চিত্র এঁকেছেন, যেখানে সাম্যের ভিত্তিতে এক মানবসমাজের কার্যক্রম দেখানো হয়েছে। বলা যায়, এক ধরনের কমিউনিস্ট বা মঠ সমাজ, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পদ নেই। সবকিছুই সামাজিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। পরবর্তীতে আধুনিক কালে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার রাজনীতি তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক প্রতিষ্ঠা দেখা যায়। তাই মধ্যযুগে রচিত টমাস মোরের ইউটোপিয়াকে সায়েন্স ফিকশন না বললেও সোস্যাল সায়েন্স ফিকশন নিশ্চয়ই বলা যায়।
আধুনিক সায়েন্স ফিকশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। অটোমোবাইলের যাত্রা শুরু হয়েছে ১৮৮৫ সালে। ১৯০০ সাল নাগাদ মোটরগাড়ি দুনিয়ায় সহজলভ্য হতে শুরু করে। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের কাল্পনিক যানবাহনের উল্লেখ কিন্তু সেই প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যেই পাওয়া যায়— রোবটচালিত ঘোড়া, যান্ত্রিক পাখি, আকাশে উড়ন্ত কিংবা পানির নিচে চলার মতো যান। প্রাচীন সাহিত্যে উল্লিখিত যানবাহনের অনেকগুলোই আধুনিক কালের বিজ্ঞান বাস্তব চেহারা দিয়েছে। এবার একটু আধুনিক সায়েন্স ফিকশনের দিকে চোখ দেয়া যাক। জুল ভার্নকে আধুনিক সায়েন্স ফিকশনের জনক বিবেচনা করা হয়। তিনি ১৮৫০ থেকে ১৯০৫ সালের মধ্যে ৬০টির বেশি সায়েন্স ফিকশন রচনা করেছেন। জুলভার্ন নিজেকে প্রোফেটিক ফিউচারিস্ট হিসেবে পরিচয় দিতেন। তিনি সে কালের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নিয়ে মাথা ঘামাতেন না, বরং যা লিখতেন তা ছিল তার কল্পনা। জুলভার্নের এই বিশেষত্ব আমলে নিলে প্রাচীন বা মধ্যযুগের সংশ্লিষ্ট সাহিত্যকে সায়েন্স ফিকশন হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কারণ জুলভার্ন যদি কল্পনা থেকে লিখে থাকেন, তার যদি আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট থেকে চিন্তা করতে না হয়, তাহলে প্রাচীন বা মধ্যযুগের লেখকদের তো এ কৃতিত্ব থেকে বঞ্চিত করা যায় না। তারাও পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য না পেলেও নিশ্চয়ই কল্পনা থেকেই লিখেছিলেন।
মধ্যযুগের সায়েন্স ফিকশনের নাম নিলেই অনেকে খাঁটি রূপকথার কথা মনে করেন। কিন্তু প্রকৃত চিত্র মোটেও তা নয়। বরং কৌতূহলী অনুসন্ধান ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ থেকে আমরা মধ্যযুগের সায়েন্স ফিকশন সম্পর্কে নতুন এবং চিন্তা উদ্রেগকারী তথ্য পেতে পারি, যা সে সময়ের বিজ্ঞান ও সমাজ ভাবনাকে বুঝতে সহায়ক হবে। কে জানে মধ্যযুগের সায়েন্স ফিকশনের কল্পনা, কসমোলজি ও প্রযুক্তির ধারণা হয়তো ভবিষ্যতের দিনে সত্য হয়ে দেখা দেবে। বলা ভালো অনেক কিছু বাস্তবে পরিণত হয়েছেও।
সূত্র :
হাউ অ্যানসিয়েন্ট অ্যান্ড মেডিয়েভাল সায়েন্স ফিকশন ইমাজিনড দ্য মোবিলিটি রেভোলিউশন, মাইক বেজমেক
সায়েন্স ফিকশন ওয়াজ অ্যারাউন্ড ইন মেডিয়েভাল টাইম; কার্ল কিয়ারস






