ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেডের জীবন খানিকটা তাঁর সময়কার অনেক উচ্চবিত্ত ইংরেজ সন্তানের জীবনের মতোই বিচিত্র। ইংল্যান্ডে ধনতন্ত্রের বিকাশ এবং তারই সূত্র ধরে পৃথিবীব্যাপী তার বাণিজ্য ও সাম্রাজ্য বিস্তারের পটভূমিকা মনে রাখলে এই বৈচিত্র্য অভাবিত বা আকস্মিক বলে বোধ হবে না। বরং তা যেন একটি সাধারণ প্যাটার্নে বাঁধা। প্রথমে ভালো পাবলিক স্কুলে, তারপর অক্সফোর্ড বা ক্যামব্রিজে উচ্চতর পর্যায়ে শিক্ষা, ক্বচিত্ লন্ডনের কোনো ‘বার’-এ একটু আইন জেনে নেয়া, তারপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরি নিয়ে প্রাচ্য দেশ যাত্রা, আর সেখানে বেশ উঁচু ও দায়িত্বপূর্ণ পদে কাজকর্ম করে দেশে ফেরা এবং সচ্ছল জীবন ও শৌখিন রাজনীতিতে জাঁকিয়ে বসা। পরবর্তীকালে বিভিন্ন লেখকের রচনায় যেসব ‘নাবোব’ বা ‘পাক্কা সাহিব’-দের দেখা পাই, তাদেরই মতো এদের জীবনও একই ধারাবাহিকতার পুনরাবৃত্তি। ব্যতিক্রমের মধ্যে হ্যালহেড লিখেছিলেন একটি অপরিচিত প্রাচ্য ভাষার ব্যাকরণ। আর শেষ জীবনের সুখ-দুঃখের হিসাব তাঁর ক্ষেত্রে একটু আলাদা। ব্যাকরণ রচনাও এমন কিছু ব্যতিক্রম নয়। হ্যালহেডেরই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র, তাঁর অগ্রজ বন্ধু উইলিয়াম জোন্স লিখেছিলেন ফারসি ভাষার ব্যাকরণ, হ্যালহেডের বাইটি ছাপানোর সাত বছর আগে। তাঁর আরেক জ্যেষ্ঠ শুভার্থী, মহারাজ নন্দকুমারের বিচারকর্তা স্যার ইলাইজা ইম্পের অনায়াস দক্ষতা ছিল ফারসি ও উর্দুতে। ইংল্যান্ডের পাবলিক স্কুলে যারা পড়ত, গ্রিক লাতিন না শিখে উপায় ছিল না তাদের, বহু ভাষাবিদ হওয়ার প্রস্তুতি ওই স্কুলজীবন থেকেই শুরু হতো। তার বাইরে কে কোন ভাষা শিখছে, তা অবশ্য তাদের ব্যক্তিগত প্রবণতা, দূরদর্শিতা ও জীবনের বিস্তারমান ছকের ওপর নির্ভর করত। যা-ই হোক, হ্যালহেডের আগে কোনো ইংরেজ বাংলা ভাষার ব্যাকরণ রচনা করেননি। এই পথিকৃতের গৌরবের জন্যই আমরা পৃথিবীর এই ভূভাগে তাঁকে আজ শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি।
অক্সফোর্ডশায়ারের ওয়েস্টমিনস্টারে ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে হ্যালহেডের জন্ম। অর্থ-প্রতিপত্তি বা আভিজাত্যের বিচারে তাঁর পরিবার নগণ্য ছিল না। অলিভার ক্রমওয়েলের শাসনে ইংল্যান্ডের হাউজ অব কমন্সের স্পিকার ছিলেন যিনি, মায়ের দিক থেকে সেই লেনথালের বংশে তাঁর জন্ম। ঠাকুরদা ন্যাথানিয়েল হ্যালহেড ছিলেন এক্সচেঞ্জ অ্যালির দালাল— এই সূত্রেই তাঁর ঐশ্বর্য। বাবা উইলিয়াম হ্যালহেড ১৮ বছর ধরে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ডিরেক্টরের পদে আসীন ছিলেন। সুতরাং নীল রক্ত ও সুউচ্চ জীবিকা— এ দুয়েরই সম্মিলন ঘটেছিল হ্যালহেড পরিবারে। এ ধরনের পরিবারের পুত্রসন্তানদের ক্ষেত্রে যা স্বাভাবিক তা-ই হলো— হ্যালহেডকেও এক মূল্যবান শিক্ষা পদ্ধতির হাতে সঁপে দেয়া হলো। তিনি গেলেন তাঁর অঞ্চলের নামি এবং নাক উঁচু পাবলিক স্কুল হ্যারোতে। বাবা উইলিয়াম তখন হ্যারোতেই থাকতেন।
ওই স্কুলে তখন যিনি হেডমাস্টার, তাঁর নাম সামনার। সামনার নিজে ক্লাসিকস অর্থাত্ গ্রিক লাতিনে অসাধারণ পণ্ডিত ছিলেন, তাঁর বন্ধু ছিলেন প্রখ্যাত মনীষী ড. জনসন। তখনকার পাবলিক স্কুলগুলোয় শিক্ষা বলতে মুখ্যত বোঝাত ক্লাসিকসের অর্থাত্ গ্রিক-লাতিনের মহত্ সাহিত্য পড়তে পারার শিক্ষা। সামনারের তত্ত্বাবধানে হ্যালহেড ও তাঁর সহপাঠীদের গ্রিক-লাতিনের ভিতটি যে বিশেষ পোক্ত হবে, তাতে আর সন্দেহ কী? তাঁর সহপাঠী ছিলেন রিচার্ড ব্রিনসলি শেরিডান, পরে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ পাদে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় কমেডি লেখক। প্রকৃতপক্ষে ওই সময়কার সবচেয়ে সমর্থ নাট্যকার। বলা বাহুল্য, তখন স্কুলে সে আমুদে ও হইহইপ্রিয় ইংরেজ বালক মাত্র। সামনারের সঙ্গে তাঁর বাবার আলাপ ছিল। কাজেই সেদিক থেকে অসুবিধা ছিল, হেডমাস্টার তাঁর ওপর একটু বিশেষ নজর রাখতেন। পড়াশোনায় একটু মন দিতে হতো। বন্ধু হ্যালহেডের সঙ্গে মিলে ষষ্ঠ শতাব্দীর গ্রিক লেখক আরিস্তেনেতুসের পত্রিকা-সাহিত্য— অর্থাত্ চিঠির আকারে গদ্যে লেখা কিছু কাহিনী কবিতায় অনুবাদের প্রস্তুতি শুরু করেন। আরিস্তেনেতুসের পত্রিকা বা এপিসলস নামে চিঠি, আসলে গল্প, প্রাচীনদের লেখা বৃত্তান্ত থেকে নেয়া। অনুবাদে হাত বেশি ছিল হ্যালহেডের, কাব্য রূপদানে সম্ভবত শেরিডানের। এও অনুমানমাত্র। এর বিপক্ষে বলা যায় যে, হ্যালহেডেরও কবিতা রচনার অভ্যাস ছিল, পরে শুভানুধ্যায়ী ওয়ারেন হেস্টিংসের সম্মানেও তিনি কিছু কবিতা রচনা করেছিলেন, এ প্রবন্ধে তাঁর একটি কবিতাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। যা-ই হোক, বইটি যখন বের হয় তখন তার মুখবন্ধের নিচে স্বাক্ষর হিসেবে দুজনেরই নামের আদ্যাক্ষর উত্কীর্ণ ছিল— এইচ. এস। লক্ষ করতে হবে যে, হ্যালহেডেরই রচয়িতার প্রাথমিক সম্মান। আমাদের ধারণা, অনুবাদে অগ্রগণ্য বা সামগ্রিক ভূমিকার জন্যই তাঁর এই আপেক্ষিক গৌরব। বইটি যখন প্রথম ছাপা হয়ে বের হলো, ১৭৭১ খ্রিস্টাব্দে, তখন দুজনেই অবশ্য কলেজে পড়ছেন।
নিছক ভৌগোলিক কারণেই অর্থাত্ কাছাকাছি বলেই হ্যারোর বেশির ভাগ ছাত্র অক্সফোর্ডে পড়তে আসত— আরেক উন্নাসিক পাবলিক স্কুল, ইটনের ছেলেরা যেমন যেত ক্যামব্রিজে। স্কুল শেষ করে ১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দে হ্যালহেড অক্সফোর্ডের ক্রাইস্ট চার্চ কলেজে ভর্তি হলেন এবং এখানেও তাঁর ক্লাসিকস পড়ারই পূর্বানুবৃত্তি চলতে লাগল। এখানে বন্ধু তত্ত্বোপদেশক ও পথনির্দেশক হিসেবে যাঁকে পেলেন, তাঁরও নাম ভারতবর্ষে সুপরিচিত— মনস্বী উইলিয়াম জোন্স। জোন্স হ্যালহেডের চেয়ে বছর পাঁচেকের বড়। একই স্কুলে— হ্যারোতে— তিনিও লেখাপড়া শিখেছেন। জোন্সের প্ররোচনায় হ্যালহেড আরবি শিখতে শুরু করলেন। জোন্স নিজে আরবি শিখছিলেন মির্জা নামে সিরিয়ার এক আরবের কাছ থেকে। লন্ডন থেকে নিজের খরচে তাঁকে তিনি অক্সফোর্ডে নিয়ে এসেছিলেন। হ্যালহেড কি এই মির্জারই কাছে আরবি পাঠ নিতে লাগলেন? এ রকমই অনুমান করছি, নইলে আরবি শেখার অন্য কোনো সুযোগ অক্সফোর্ডে তখন ছিল বলে মনে হয় না।
বলা বাহুল্য, বন্ধু ও সহাধ্যায়ী শেরিডানও অক্সফোর্ডে পড়ছেন। দুজনের সাহিত্যকর্মে যুগ্ম ভূমিকা অব্যাহত আছে। আরিস্তেনেতুসের অনুবাদটি যখন বের হলো, তখন বিন্তু শেরিডানের সঙ্গে হ্যালহেডের আকৌশোর সখ্যে একটি নতুন মাত্রা সংযোজন হলো। বন্ধু হয়ে উঠলেন প্রণয়প্রতিপক্ষ।
একটু পিছিয়ে ঘটনাটি অনুধাবন করা যাক। শেরিডানরা জন্মসূত্রে আইরিশ, বাবা দ্বিতীয় টমাস শেরিডান জন্মেছিলেন ডাবলিনে। তিনি অভিনেতা হিসেবে বেশ নাম করেছিলেন, পরে জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ায় ছেলেদের বাগ্মিতা শিখিয়ে বেশ ভালোই উপার্জন করতেন। শেরিডানের মা, বিয়ের আগে যাঁর নাম ছিল ফ্রান্সেস চেম্বারলেন, তাঁরও খ্যাতি কম ছিল না। ‘দ্য ডিসকভারি’ নামে জনপ্রিয় কমেডি, ‘মেমোঅর্স অব মিস সিডনি বিডালফ’ নামে উপন্যাস ইত্যাদি লিখেছিলেন তিনি। ১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সেস মারা গেলেন, আর ১৭৭০-এর শেষ দিকে টমাস ছেলেমেয়েদের নিয়ে ব্রিস্টলের কাছাকাছি বাথ শহরে এসে বসবাস শুরু করলেন। অক্সফোর্ড থেকে বাথের দূরত্ব মাইল ষাটেক, দক্ষিণ-পশ্চিমে। শেরিডান ছুটিতে কখনো কখনো এসে পরিবারের সঙ্গে মিলিত হতেন। হ্যালহেডও হয়তো আসতেন। না এলেও বাথে বন্ধুর সঙ্গে চিঠিপত্রে সর্বদা যোগাযোগ রাখতেন।
এই বাথে লিনলি পরিবারের সঙ্গে শেরিডানদের ঘনিষ্ঠতা হলো। কর্তা টমাস লিনলির সংগীতজ্ঞরূপে বেশ খ্যাতি ছিল। শেরিডানের মাকে আগে গান শিখিয়েছিলেন তিনি। এই টমাস লিনলির মেয়ে এলিজাবেথ অ্যান লিনলি। শেরিডানরা যে বছর বাথে আস্তানা নিলেন, সে বছর এলিজাবেথ ১৬ পূর্ণ করে ১৭ বছরে পা দিয়েছেন। যেমন অসামান্য সুন্দরী, তেমনি কিন্নরীর মতো তাঁর কণ্ঠ। এ দুয়ের সুমিল হলে যা হয়— তাঁর ভক্ত ও স্তাবকের সংখ্যা শহর ভর্তি, সারা শহরই যেন তাঁর প্রণয়মুগ্ধ। বাথসুন্দরীদের মধ্যে তিনি কমনীয়তমা— সেই ‘টোস্ট অব বাথ’-এর ভুবনমোহন সৌন্দর্যের আভাসটি শেরিডানের জীবনীকার টমাস মোরের কথায় ফুটেছে ভালো:
‘The young Maid of Bath appers indeed to have spread gentle conquests, to an extent almost unparalleled in the annals of beauty.’
এই তির্যক সংযত উচ্ছ্বাসের মধ্যে অত্যুক্তির পরিমাণ যে কম, তার প্রমাণ পাই এক শেরিডান পরিবারেই তাঁর দু-দুটি গুণগ্রাহীকে দেখে। হ্যালহেডের বন্ধু রিচার্ড, আর তাঁর বড় ভাই চার্লস। রিচার্ড প্রথম প্রথম নিজের হূদয়বাসনার কথা এলিজাবেথকে জানাননি। বন্ধু বা সহচরের মতো কাছাকাছি থেকেছেন, অন্যান্য প্রণয়প্রার্থীর ব্যবহার লক্ষ করেছেন। এলিজাবেথকে নিয়ে দু-একটি ঘটনাও ঘটে গেছে এর মধ্যে— বাগদান করার পরে একটি বিয়ে তিনি নাকচ করেছেন। এটি নিয়ে পরে নাট্যকার ও হাস্যাভিনেতা স্যামুয়েল ফুট ‘দ্য মেড অব বাথ’ নামে কমেডিও লিখেছিলেন। সব ঘটনার মধ্যে থেকে এলিজাবেথ অবশ্য অম্লানরূপে ও অনাহত মর্যাদা নিয়ে বেরিযে আসতে পেরেছেন। তখনই তিনি গান গেয়ে বছরে প্রায় হাজার পাউন্ড রোজগার করেন।
অক্সফোর্ডে গানের আমন্ত্রণ পেয়ে গেছেন এলিজাবেথ, বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যাপেলে ‘ওরাটোরিয়ো’ গান গাইছেন। নাটকীয় উত্থান-পতনপূর্ণ সেই ধর্মসংগীত সভায় হ্যালহেডও একজন শ্রোতা। গান তাঁর কানের মধ্য দিয়ে মর্মের কেন্দ্রে পৌঁছে গেল। শেরিডান হয়তো এলিজাবেথের গুণের বিষয়ে আগেই হ্যালহেডকে জানিয়ে থাকবেন, কিন্তু গান শুনে তাঁর সম্বিত লোপ পেল যেন। যত দূর মনে হয়, শেরিডান সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না, তাই তাঁর কাছে লেখা একটি চিঠিতে হ্যালহেডকে সেই আত্মবিস্মরণকারী সুরম্য অভিজ্ঞতায় আপ্লুত বর্ণনা করতে দেখি:
‘I am petrified, my very faculties are annihilated with wonder; my conception could not form such a power of voice, such a melody, such a soft yet so audible a tone. Oh Dick, I wished myself hanged for not being able to commit my ideas to paper.’
কিন্তু হ্যালহেড যতই সুহূত্তম শেরিডানের কাছে চিঠিতে উচ্ছলিত হূদয়াবেগ ঢেলে দেন, আশ্চর্যের কথা এই যে, শেরিডান কিন্তু বন্ধুর কাছে নিজের অনুরাগের ছিটেফোঁটা আশাও দেন না। আর এলিজাবেথকে হ্যালহেড যেসব চিঠি লেখেন, সেসবের শান্ত-সংযত সৌজন্যের জবাবই কেবল পান তিনি, কোনো রকম আশ্বাস তাঁর কাছে পৌঁছায় না।
বছরখানেকের মধ্যেই প্রত্যাখ্যান একটি নাটকীয় ঘটনার আকার নিয়ে স্পষ্টতর হয়ে দেখা দিল হ্যালহেডের কাছে। বাথের প্রণয়প্রার্থীদের তাড়নায় এলিজাবেথ অতিষ্ঠ হয়ে প্যারিসে পালালেন। সঙ্গে বিশ্বস্ত পরিচারিকা ও হ্যালহেডের বন্ধু শেরিডান। বিদেশে পূর্ণ সাহচর্যে এত দিনের বন্ধুত্ব সহজেই প্রেমে পরিণত হলো এবং এলিজাবেথ ও শেরিডানের বিয়ে হতেও দেরি হলো না।
প্রণয়পরীক্ষায় হ্যালহেডের (এবং অন্য প্রতিযোগীদের) চূড়ান্ত পরাজয় ঘটল। নানা দিক ভেবে দেখলে এ ফল অপ্রত্যাশিত নয়। অনিন্দ্যসুন্দর দেহরূপে এবং ব্যক্তিত্বে শেরিডান মানুষকে আকর্ষণ করতেন অনেক বেশি, আর আমুদে এ মানুষটির সঙ্গও অনেক বেশি সুখদায়ক ছিল।
সবচেয়ে বড় কথা, এলিজাবেথের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ তাঁর ছিল অনেক বেশি। অক্সফোর্ড থেকে চিঠি লিখে আর কালেভদ্রে বাথে বেড়াতে এসে হ্যালহেড কী করে তাঁর সঙ্গে পাল্লা দেবেন? এলিজাবেথ শেরিডানকেই কাছ থেকে দেখেছেন, ফলে তাঁকে যাচাই করার অবকাশও তাঁর বেশি ছিল। কবিত্ব, হূদয়বত্তা ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়তার অতিরিক্ত আকর্ষণ তো ছিলই। মেজর ম্যাথিউজের সঙ্গে শেরিডান দুবার ডুয়ালও লড়েছিলেন এলিজাবেথ প্রসঙ্গে। নাটকীয়তার বাইরেও নিশ্চয়ই মানুষটি গ্রহণযোগ্য ছিলেন।
এসবের মধ্যে প্রণয়পর্বের এই পরিসমাপ্তির আগে হ্যালহেড- শেরিডানের সাহিত্য-সহযোগ কিন্তু থেমে থাকেনি। দুজনে একসময় Herman’s Miscellany নাম দিয়ে একটি সাহিত্য সাময়িকী বের করার পরিকল্পনা করেছিলেন। নামটি নিয়ে দুই বন্ধুতে একটু তর্ক হয়েছিল, হ্যালহেডের পছন্দ ছিল The Reformer নামটি। যা-ই হোক, প্রথম সংখ্যাটির পাণ্ডুলিপি পুরো তৈরি হয়ে গেল কিন্তু তা আর ছাপাখানার মুখ দেখল না। তাছাড়া হ্যালহেড এ সময় ‘ইখিওন’ নামে একটি প্রহসন লিখেছিলেন বলে জানা যায়। শেরিডান এটিকে আদ্যোপান্ত দেখে দিলেন শুধু নয়, ঢেলেও সাজালেন। বইটির নাম বদলে রাখলেন ‘জুপিটার’। শেরিডান বইটি নিয়ে তখনকার প্রসিদ্ধতম দুই অভিনেতা ডেভিড গ্যারিক আর স্যামুয়েল ফুটের দরজায় বেশ কিছুদিন ঘুরলেন, কিন্তু কেউ সেটি অভিনয়ের বিষয়ে উত্সাহ দেখালেন না। হ্যালহেডের নাট্যকার হওয়ার আশা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হলো। এছাড়া দুই বন্ধু কবিতা আর অনুবাদের একটি সংকলন বের করার কথা ভাবছিলেন। আর এক খণ্ড ক্রেজি টেলস বের করার কথা। প্রণয়-প্রতিদ্বন্দ্বিতা এসে পড়ায় সেসব পরিকল্পনায় ছেদ পড়ল। এলিজাবেথ আর শেরিডানের ফ্রান্সে পালানোর পর হ্যালহেডের জীবনের একটি পর্ব শেষ হলো।
অনেকেই প্রণয়জনিত মনোভঙ্গের সঙ্গে হ্যালহেডের ভারতবর্ষে চাকরি নিয়ে দেশত্যাগের সংকল্পকে কার্যকারণ সূত্রে জুড়ে দিয়েছেন। আমাদের মনে হয়, এ দুয়ের যোগ আপতিকমাত্র, তার বেশি নয়। প্রাচ্য দেশে চাকরি নিয়ে আসার কথা হ্যালহেড নিশ্চয়ই বেশ আগে থেকে— অক্সফোর্ডে উইলিয়াম জোন্সের প্রভাবে আসার পরেই ভাবতে শুরু করেছিলেন। নইলে অনর্থক আরবি ভাষা শিখতে যাবেন কেন? তখন প্রাচ্য দেশ বা প্রাচ্য ভাষা সম্পর্কে সাধারণভাবে ইউরোপের ধারণা বেশ অস্পষ্ট ছিল, ফলে লোকে ভাবত আরবি বা ফারসি শিখলে প্রাচ্যভূমির যেকোনো দেশে তা ব্যবহার করা যাবে। ভারতবর্ষের অনেক আঞ্চলিক ভাষাকেও তখনকার একাধিক ইংরেজ মুর গোষ্ঠীর ভাষা বলে মনে করতেন। কাজেই হ্যালহেড ভেবেছিলেন আরবি ভাষা পরে কাজে লাগবে। যা-ই হোক, ১৭৭২-এ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিভিল সার্ভিসে রাইটারের বা মুহুরির চাকরি পেলেন তিনি। এ কাজে মাইনে যেমনই হোক, স্বাধীন ব্যবসা করার সুযোগ ছিল। ফলে অনেকে ঘুষ দিয়েও এ চাকরি বাগানোর চেষ্টা করতেন— কাগজে ঘুষের প্রস্তাব নিয়ে প্রকাশ্য বিজ্ঞাপনও বেরুত।
ওই বছরের মাঝামাঝি হ্যালহেড কলকাতায় আসার জন্য জাহাজে চড়ে বসলেন। নভেম্বরে জাহাজ এসে বন্দরে ভিড়ল। পথের সময়টুকু তিনি নানা ভাষা চর্চা করেছেন, উইলিয়াম জোন্সের একটি চিঠি থেকে এ খবর পাওয়া যাচ্ছে। জোন্সের ফারসি ভাষায় সেই ব্যাকরণটি এ সময়ে তাঁর নিত্যসঙ্গী ছিল। তাই স্বাভাবিকভাবেই অনুমিত হয় যে, মুখ্যভাবে তিনি শিখছেন ফারসি। জোন্সের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল, তিনি সম্ভবত ফারসি শিখতেও হ্যালহেডকে উত্সাহ দিচ্ছিলেন— ভারতবর্ষে চাকরির সুবিধা হবে বলে।
পরিণামে দেখি, যে কাজ এখানে প্রথম জুটল, তা ফারসি থেকে অনুবাদের। এ কাজের মাইনে হ্যালহেডের যোগ্য ছিল না। অন্যদিকে স্বাধীন ব্যবসা-বাণিজ্য করার যে সুযোগ ছিল, তাতেও তিনি তেমন সুবিধা করতে পারেননি বলে মনে হয়। অর্থকষ্ট ও তত্প্রসূত হতাশা চলছে। বন্ধু স্যামুয়েল পারকে চিঠিতে কলকাতা আসার ঠিক এক বছর পরেই জানাচ্ছেন, প্রচুর যত্ন ও অধ্যবসায় সত্ত্বেও ‘ইভ্ন এ ডিসেন্ট সাবসিসট্যান্স’ উপার্জনে তিনি বিফল হয়েছেন। ওই চিঠিতেই তাঁর বিজ্ঞ স্বীকারোক্তি— ‘I have studied the Persian Ianguage with the atmost application in vain.’
কিছু পরে একটু সুরাহা হলো। ওয়ারেন হেস্টিংস এ সময় হিন্দু ও ইসলামী আইনের দটি আকর গ্রন্থ সংকলনের সংকল্প নেন। সংস্কৃতে এ ধরনের বই নেই, কাজেই ১১ জন পণ্ডিতকে দায়িত্ব দেয়া হলো। তাঁরা খান বাইশেক প্রাচীন গ্রন্থ থেকে হিন্দু আইনের একটি আকর গ্রন্থ প্রস্তুত করে দিলেন। তার নাম হলো ‘বিবাদ ভঙ্গার্ণব’। সংস্কৃত থেকে সোজাসুজি ইংরেজিতে অনুবাদের যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি তখনো কোম্পানির কর্মচারীদের মধ্যে ছিলেন না; সংস্কৃত থেকে ইংরেজিতে সরাসরি অনুবাদ প্রথম করেন চার্লস উইলকিনস (ভগবদ্গীতা, ১৭৮৫-তে মুদ্রিত)। কাজেই আইন গ্রন্থটিকে প্রথমে ফারসিতে অনুবাদ করা হলো। ফারসি অনুবাদে প্রায় দুই বছর লাগল (মে ১৭৭৩ থেকে ফেব্রুয়ারি ১৭৭৫)। তারই সঙ্গে সঙ্গে হেস্টিংসের immediate authority-তে হ্যালহেড তাঁর ইংরেজি অনুবাদ সমাধা করলেন। কিছু আগে থেকেই হেস্টিংস ও হ্যালহেডের সৌহার্দের সূত্রপাত। এ সময় (ডিসেম্বর ১৭৭৪) কলকাতার কোর্ট অব রিকোয়েস্টে কমিশনার হওয়ার জন্য হ্যালহেডের কাছে আমন্ত্রণ আসে। কিন্তু হ্যালহেড তা সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। পণ্ডিত অমূল্য বিদ্যাভূষণ এ খবর দিয়ে আরো জানিয়েছেন যে, ১৭৭৫-এর শেষে হ্যালহেড সুপ্রিম কোর্টে দোভাষীর কাজ পান, উইলিয়াম চেম্বার্সের বদলি হিসেবে। যা-ই হোক, অনুবাদকর্ম সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে হেস্টিংস জানালেন যে, তা ‘executed with great Ability, Diligence and Fidelity...’ অবশ্য অনুবাদের সঙ্গে হ্যালহেডের নিজস্ব সংযোজনও কিছু আছে। মুখবন্ধেই দেখতে পাচ্ছি, তিনি বলছেন যে ইহুদি আইন (Laws of Moses) ও হিন্দু আইনে প্রচুর সাদৃশ্য লক্ষ করেছেন এবং ফলে তিনি Everywhere produced instances of similitude between the Mosaical and the Hindoo Dispensation.’
এটুকু তাঁর মৌলিক দান বলে স্বীকার করতেই হবে। ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে লন্ডন থেকে বইটি প্রকাশিত হলো। কালক্রমে একাধিক মুদ্রণ হলো এর। পরে রবিনে এর ফরাসি অনুবাদও করেছিলেন।
বাংলা হ্যালহেড কখন থেকে শিখতে শুরু করলেন? ১৭৭৩-এর ৫ নভেম্বর বন্ধু পারের কাছে ওই চিঠিতে যে আক্ষেপ করছেন, তাতে শুধু ফরাসি শেখার কথাই আছে। ধরে নেয়া যায়, তখনো তিনি বাংলা Gentoo Laws-এ যাকে তিনি বলেছেন ‘the modern jargon of Bengal’ পৃ. (xxii) তা শিখতে আরম্ভ করেননি। ড. কাইউম অনুমান করেছেন, ১৭৭৪ সালে হ্যালহেডের বাংলা শেখার সূত্রপাত। এ অনুমান সঙ্গত বলেই মনে হয়। সংস্কৃত হয়তো এর একটু আগে শেখা ধরেছেন। জেন্টু লজের ভূমিকার ২৩ থেকে ৪৭ পৃষ্ঠায় তিনি হিন্দু ভারতের সভ্যতা সম্পর্কে তাঁর অধ্যয়নের দৃষ্টান্ত রেখেছেন ২৪ আর ২৫ পৃষ্ঠার মধ্যে নাগরী আর বাংলা বর্ণমালার চমত্কার প্রতিলিপি উদ্ধার করেছেন এবং প্রায়ই সংস্কৃত শ্লোক তুলে সংস্কৃত ভাষা ও শাস্ত্রের নানা প্রসঙ্গের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। তাছাড়া ৭ থেকে ২৩ পৃষ্ঠার মধ্যে এ বইয়ে ব্যবহূত সংস্কৃত, ফারসি ও বাংলা শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দের গ্লসারিও দিয়েছেন। বাংলাদেশের সামাজিক সাংস্কৃতিক তথ্যাবলির সঙ্গে তাঁর ইতস্তত পরিচয়ের ইঙ্গিতও এ শব্দরাশিতে ছড়িয়ে রয়েছে। তবে কাইউম যথার্থই লক্ষ করেছেন যে, বাংলা শব্দগুলোর প্রতিবাণীকরণে বেশ ত্রুটি আছে। অর্থাত্ শব্দগুলোর ঠিক বাংলা উচ্চারণ তখনো হ্যালহেডের অধিগত হয়নি। মুনশির কাছেই তিনি বাংলা শিখেছেন, তবে সম্ভবত হিন্দু পণ্ডিতের কাছে পরে অন্তত তিনটি বাংলা বই যত্ন নিয়ে পড়েছিলেন। এই বই তিনটি হলো— কৃত্তিবাসী রামায়ণ, কাশীরাম দাসের মহাভারত এবং ভারতচন্দ্রের কালিকামঙ্গল— বিদ্যাসুন্দর। তাঁর বাংলা ব্যাকরণের প্রায় সব উদ্ধৃতি এ তিনটি বই থেকে। ১৭৭৪-৭৫ থেকেই নিশ্চয়ই ব্যাকরণ রচনার কথা ভাবছিলেন হ্যালহেড। কারণ এ সময়েই উইলিয়াম বোল্টস নামক এক ডাচ ভাগ্যান্বেষীকে লন্ডনে বাংলা হরফ তৈরির অনুরোধ করে পাঠান। বোল্টস তাতে করুণভাবে ব্যর্থ হয়ে হ্যালহেডের আক্ষেপের কারণ হন।
যা-ই হোক, ১৭৭৮-এ তাঁর ‘এ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’ বেরুল। রচনার পেছনে এবং প্রকাশে হেস্টিংস এবং কোম্পানির উত্সাহ ও সহায়তা দুই-ই ছিল। এ বইয়ের সঙ্গে সঙ্গেই সাহিত্য বা ভাষা-সংক্রান্ত হ্যালহেডের যাবতীয় কাজ প্রায় শেষ হয়ে গেল। এর পরে তাঁর মনোযোগের এলাকায় এল ইতিহাস, রাজনীতি এবং অস্পষ্ট ধর্মতত্ত্ব।
বইটি প্রকাশের পর ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দেই একটিমাত্র সূত্রে হ্যালহেডের ইংল্যান্ডে ফেরার খবর পাই। এ খবর যদি সত্য হয়, তাহলে হ্যালহেড এরই মধ্যে বিয়ে করেছিলেন, এমনটি হওয়া সম্ভব। বিদ্বান ও হেস্টিংসের প্রীতিভাজন হিসেবে তাঁর সামাজিক সম্মান যে বেশ উঁচু ছিল, তা এ বিয়ে থেকে বোঝা যায়। কেননা যিনি তাঁর সহধর্মিণী হলেন, সেই এলেনা লুইজা রিবো ছিলেন চুঁচুড়ার ডাচ গভর্নরের মেয়ে। এলেনার সৌন্দর্যের খ্যাতি ছিল না কিন্তু স্বামীর দুর্দিনে তিনি তাঁর যোগ্য সঙ্গিনী ও নির্ভর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
১৭৭৮ থেকে ১৭৮৪-এর মধ্যে হ্যালহেড কী করেছেন, তা আমাদের জানা নেই। তাঁর তিনটি পুস্তিকা ছাপা হয়েছিল এর মধ্যে। কিন্তু কোথায় সেগুলো প্রকাশিত হয়, তা জানা যায়নি। একটি খবর থেকে অনুমান হয়, হ্যালহেড ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে অসুখ-বিসুখে ভুগছিলেন। ভারতবর্ষে প্রত্যাবর্তন করার পর তিনি হূতস্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করেন। ১৭৮৪-তে (বা হয়তো তার একটু আগে) সস্ত্রীক ফিরলেন ভারতবর্ষে। ‘ক্যালকাটা রিভিউ’র জীবনীকার লিখেছেন যে, এ যাত্রায় ভারতবর্ষে তাঁর যোগ্য পদ তিনি পাননি। ফলে হতাশ হয়ে ১৭৮৫-তেই দেশে ফিরে গেলেন। বিদ্যাভূষণ শারীরিক বিকলতাকেও কারণ হিসেবে নির্দেশ করেছেন। ওই বছর ফেব্রুয়ারি নাগাদ দিনেমার জাহাজ ‘দ্য হাসার’-এ হ্যালহেডরা দেশের উদ্দেশে যাত্রা করলেন— এ খবর যথার্থ, কিন্তু মনোবেদনা নিয়ে ফিরলেন কিনা, তা বলা মুশকিল। কেননা হেস্টিংসের চিঠিগুলো থেকে সংবাদ পাই, হ্যালহেড তাঁর খুব কাছাকাছি আছেন, হেস্টিংসকে পদত্যাগ না করতে অনুরোধ করছেন নিজের ও বন্ধুদের হয়ে, বছরের শেষে ওই গভর্নর জেনারেল বন্ধুর সঙ্গে উত্তর প্রদেশ ও বিহার অঞ্চলে কর্মসূত্রে ভ্রমণ করছেন। সম্ভবত এ সময়েই এবং যত দূর অনুমান হয় হেস্টিংসেরই নির্বন্ধে অযোধ্যার কুখ্যাত নবাব আসফ-উদ্-দৌলার (১৭৭৫-এ নবাবত্ব, মৃত্যু ১৭৯৭) বা Nabob Vizier-এর ইংল্যান্ডের এজেন্টের চাকরিটি তাঁর হয়। হ্যালহেড দেশে ফিরে কী করবেন, হেস্টিংস তারও পরিকল্পনা করছেন লক্ষৌয়ে বসে, হ্যালহেড তা নিয়ে ব্যস্ত। সম্ভবত ইংল্যান্ডেও হেস্টিংস উঁচু মহলে জানিয়ে দিয়েছেন হ্যালহেডের দেশে ফেরার সম্ভাবনার কথা এবং তাঁর “extraordinary abilities and past services are to be rewarded by the first vacant seat on the Board of Revenue.”–এই মর্মে তদিবর করছেন। হেস্টিংসও উচ্ছ্বসিত হয়ে স্ত্রী মেরিয়ানকে হ্যালহেড সম্বন্ধে লিখছেন–“I wish he was there, but I hope to precede him. His talents were always of the first Rate; but they are improved far beyound what you know them, and I shall still require them in Aid of Scott’s Exertions.”
দেশে ফিরে আসফ-উদ্-দৌলার এজেন্টের কাজ করছেন হ্যালহেড আর রিভিউর জীবনীকারের মতে, সংস্কৃত ও ফারসি গ্রন্থাবলি প্রকাশ করে বিদজ্জনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁর শরীর আর তেমন সেরে ওঠেনি। ১৭৮৬ সালে বাবা উইলিয়ামের মৃত্যু হওয়ায় পারিবারিক বিষয়কর্মেও বোধহয় তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাছাড়া হেস্টিংসের বিরুদ্ধে তখন ভারতবর্ষে নানা অন্যায় ও দুর্নীতির অভিযোগ বা Impeachment-এর তোড়জোড় চলছে। হ্যালহেড বন্ধুর পক্ষে তাঁর প্রত্যুত্তর তৈরি করার আংশিক দায়িত্বও পেয়েছেন। গ্রিয়ারের সাক্ষ্যে জানতে পারছি যে, বেনারসের রাজা চৈত সিং-সংক্রান্ত অভিযোগের প্রত্যুত্তর রচনার দায়িত্ব বর্তেছিল হ্যালহেডের ওপর। এ কাজে তাঁর অবিমিশ্র সফলতা ঘটেনি।
কিছুদিন পরে স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার ইচ্ছো হলো হ্যালহেডের। তাই ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে প্রথমে তিনি লিস্টার কেন্দ্র থেকে হাউজ অব কমন্সের নির্বাচনে দাঁড়ালেন। এখানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন স্যামুয়েল স্মিথ। কিছুদিন চেষ্টা ও খরচপত্র করার পর জয়ের সম্ভাবনা কম দেখে শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতা করলেন না, নাম প্রত্যাহার করে হ্যাম্পশায়ারের লাইমিংটন থেকে ১৭৯১-এ এমপি নির্বাচিত হলেন। কয়েক মাস আগেই ফরাসি বিপ্লব ঘটে গেছে। হ্যালহেড সে বিপ্লবকে সমর্থন করেছিলেন। ফলে তখনকার পিট (ছোট) মন্ত্রিসভার এ সম্পর্কে নীতি তাঁর অনুমোদন পায়নি।
আরেকটি কারণে হ্যালহেড ইংল্যান্ডের রাজতন্ত্র ও পার্লামেন্টের বিরাজভাজন হয়েছিলেন তাঁর পার্লামেন্টারিয়ান জীবনের শেষ পর্বে। ১৭৯৫-এর জানুয়ারি নাগাদ তিনি এক গুরুর পাল্লায় পড়েছিলেন। এ গুরুর নাম রিচার্ড ব্রাদার্স। নিরামিষাশী, নীতিগত কারণে ইংল্যান্ডের রাজার বেতন গ্রহণ না করে সত্যাগ্রহ করেছিলেন তিনি। ১৭৯৩ নাগাদ তিনি নিজেকে ‘ঈশ্বরের ভ্রাতুষ্পুত্র’ বলে ঘোষণা করলেন। হ্যালহেড অবশ্য সেটা ব্যাখ্যা করলেন এই বলে যে, রিচার্ড আসলে ঈশ্বরের ভাই ডেভিডের বংশধর। যা-ই হোক, জানা গেল এ মহাপুরুষ লন্ডনের ইহুদিদের কাছে তাদের প্রিন্স বলে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। তার পরেই তিনি নিজেকে সারা পৃথিবীরই প্রিন্স রূপে ঘোষণা করলেন এবং দাবি করলেন যে, রাজা তৃতীয় জর্জকে তাঁর সিংহাসন ছেড়ে দিতে হবে। পৃথিবীর অধিরাজ হয়ে তিনি হ্যালহেডকে ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেল অথবা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বোর্ড অব কন্ট্রোলের ডিরেক্টর করে দেবেন— এ রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ প্রতিশ্রুতিতেই হ্যালহেড ভুলেছিলেন, না ব্রাদার্সের প্রাচ্য ধরনের ভক্তিবাদ ও মরমিয়া তত্ত্ব তাঁর প্রাচ্যমুখী চিত্তকে আকর্ষণ করেছিল, তা এখন নিশ্চয় করে বলা শক্ত। তিনি পার্লামেন্টকে ধরে বসলেন ব্রাদার্সকে হাউজ অব কমন্সে ডেকে এনে তাঁর অলৌকিক জ্ঞান প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে। ৩১ মার্চ এই মর্মে ওজস্বী বক্তৃতা করলেন পার্লামেন্টে— বয়োজ্যেষ্ঠ শুভকামী স্যার ইলাইজা ইম্পের বারণ শুনলেন না। তার পরই রাজদ্রোহের অপরাধে ব্রাদার্সকে গ্রেফতার করা হলো। ২১ এপ্রিল হ্যালহেড আবার পার্লামেন্টে প্রস্তাব আনলেন, ব্রাদার্সের গ্রেফতারি পরোয়ানার একটি নকল তাঁকে দিতে হবে। তাঁর ৩১ মার্চের প্রস্তাবটির ভাগ্যে যেমন ঘটেছিল, এটিরও তা-ই ঘটল, কোনো সমর্থক জুটল না। এর কিছু পরেই হ্যালহেড রাজনীতি থেকে অবসর নিলেন।
এ সময়টা আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধব সবাই তাঁকে অর্ধোন্মাদ ভাবছেন। আত্মীয়রা ভাবছেন, হ্যালহেডকে ঘরে আটকে রাখতে পারলে ভালো হয়। তবে তাঁর ওপর ব্রাদার্সের সম্মোহনের আয়ু ছিল ওই এক বছরই। এর পরেই গুরুকে (গুরু অবশ্য তাঁর চেয়ে ছয় বছরের ছোট) ত্যাগ করেন। কিন্তু এ অধ্যায়টি এসে রাজনীতিক ও লেখক হিসেবে হ্যালহেডের প্রতিষ্ঠার সমাপ্তি ঘটায়। আরো ৩৫ বছর বেঁচে ছিলেন হ্যালহেড কিন্তু ১৭৯৫-এ ব্রাদার্সের ওকালতি করে গোটা নয়েক পুস্তিকা ছাপিয়ে সেই যে কলম ছাড়লেন, আর তা ধরলেন না।
এ সময় থেকে তাঁর অন্য ধরনের দুর্দিনও ঘনিয়ে এল। লন্ডনের হারলি স্ট্রিটে বাস করছেন তখন। স্বভাবত অমিতব্যয়ী হ্যালহেড একটি হঠকারী বিনিয়োগের ফলে প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে গেলেন। ফরাসি দেশে বিপ্লবী সরকার ১৭৯৩-এ কিছু কাগজের নোট ও ঋণপত্র বাজারে ছাড়েন। প্রতিশ্রুতি ছিল, সরকারের বাজেয়াপ্ত করা জমি বন্ধক রেখে ওই ঋণপত্র দেয়া হবে। অর্থাত্ ওই জমিই ঋণপত্রের জামিন। নেকার নামে একজনের প্ররোচনায় হ্যালহেড ৩০ হাজার পাউন্ড খাটিয়ে এই ফরাসি ঋণপত্রের কেনাবেচার ব্যবসা ধরলেন। বিপ্লবী সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসাও চুকল, ওই বিপুল পরিমাণ অর্থের সম্পূর্ণ জলাঞ্জলি ঘটল।
নিরুপায় হ্যালহেড দীর্ঘদিনের বন্ধু ওয়ারেন হেস্টিংসের কাছেই হাত পাতলেন। হেস্টিংস তাঁকে ফেরালেন না, বন্ধুদের তিনি কখনো বিমুখ করেননি। তাছাড়া কৃতজ্ঞতার দাবিও যে ছিল, তা আমরা জানি। হেস্টিংসকে যখন ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে অভিযুক্ত (Impeach) করার কথা হয়, তার পেছনে অন্যতম প্রধান চক্রী ছিলেন হ্যালহেডেরই আকৈশোর বন্ধু এবং ঘটনাচক্রে প্রণয়-প্রতিদ্বন্দ্বী সেই শেরিডান। অন্যভাবে হেস্টিংসের সমর্থন ছাড়াও হ্যালহেড তাঁকে এ কাজ থেকে প্রতিনিবৃত্ত করার জন্য তাঁর বাড়িতে গিয়ে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু শেরিডান তাঁর কথা রাখেননি, তাঁর ব্যবহারে দীর্ঘ সখ্যের প্রাক্তন উত্তাপের কোনো চিহ্ন ছিল না, তাতে ‘artificial reserve and cold arrogance’ হ্যালহেডকে ব্যথিত করেছিল। এ সূত্রেই শেরিডানের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের ছেদ ঘটে— পরে তাঁদের দেখাসাক্ষাতে হূদ্যতায় ছোঁয়া তেমন একটা থাকত না বলে শোনা যায়।
আমাদের ব্যবহূত সূত্রগুলোয় হ্যালহেডের শেষদিকের জীবনযাত্রারও কোনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। বিদ্যাভূষণ বলছেন, ‘১৭৯৬ সাল হইতে ১৮০৮ সাল পর্যন্ত তিনি সামাজিক কোন কার্যে যোগদান করেন নাই। এমনকি বড় একটা কাহারও সঙ্গে মেশেনও নাই।’ তবে ১৮০৫ খ্রিস্টাব্দের বড়দিনের উত্সবে স্যার ইলাইজা ইম্পের সাসেক্সের বাড়িতে হেস্টিংস ও হ্যালহেডের উপস্থিত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। সে-ই বোধহয় পুরনো বন্ধুদের শেষ সামাজিক সাক্ষাত্। হ্যালহেডের সাংসারিক দুর্গতি আরো বেশ কয়েক বছর চলে। ক্রমবর্ধমান বধিরতার জন্য তাঁর জীবিকার অন্বেষণ বারবার বিফল হয়। বিদ্যাভূষণ জর্জ ক্যানিংয়ের কাছে ১৮০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তাঁর চাকরির দরখাস্ত করার কথা লিখেছেন। ক্যানিং অসামর্থ্য জানিয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁর উত্তর দেন। এ সময় তাঁর স্ত্রী এলেনার সেবা ও সাহচর্য তাঁকে অনেকখানি আশ্রয় দেয়। সন্তানহীন এ দম্পতির সংসারে পারস্পরিক নির্ভরতার ওই মূল্যটুকু কম ছিল না। হ্যালহেড নিজেও ভেঙে পড়েননি। রিচার্ড ব্রাদার্স পর্বের উন্মত্ততা দীর্ঘদিন কেটে গিয়ে তাঁর মধ্যে এখন এক ধরনের সহিষ্ণুতা ও নির্বেদ তৈরি হয়েছিল। অন্তত এ সময়ে লেখা তাঁর একটি কবিতায় এর প্রকাশ দেখি—
‘I ask not life, I ask not fame,
I ask not gold’s deceitful store;
The charm of grandeur, wealth and name,
Thank Heaven! are charms to me no more.
To do thy will, O God, I ask,
By faith O’er life’s rough sea to swim,
With patience to work out my task,
And leave the deep result to him.’
(১৮০৬, ৩ জুলাই)
অবশেষে ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে হেস্টিংসেরই সুপারিশে ইন্ডিয়া অফিসে একটি ভালো কাজ পেলেন। পায়ের নিচে একটু শক্ত মাটি পাওয়ামাত্র হ্যালহেড হেস্টিংসের অর্থের ঋণ সম্পূর্ণ পরিশোধ করলেন।
বিদ্যাভূষণের সংগৃহীত খবর থেকে জানতে পারি যে, ব্রাদার্সের সূত্রে গুরুভাই জন ব্রাইটকে ছাড়া ১৭৯৬ থেকে ১৮০৪-এর মধ্যে তিনি চিঠিপত্রও কম লিখতেন। ১৮০৮ থেকে সামাজিক চিঠিপত্র লেখা আবার একটু আধটু শুরু করেন, মূলত হেস্টিংস ও ইম্পেকে। শেষদিকে প্রায় সম্পূর্ণ বধির হয়ে গিয়েছিলেন। কবিতা লিখতেন অবসর মতো, তাঁর কাগজপত্রে অনেক অমুদ্রিত কবিতা পাওয়া গেছে। স্বনামে- বেনামে অনেক সংবাদপত্রে লিখতেন হ্যালহেড, মর্নিং ক্রনিকলে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর একাধিক রচনা। তাঁর ভারতীয় পুঁথির সংগ্রহও ছিল বেশ সমৃদ্ধ।
কেমন মানুষ ছিলেন হ্যালহেড? আবেগপ্রবণ, একটু অতিবেদনাশীল হয়তোবা। বিদ্যাভূষণ জানিয়েছেন, ‘কোন সামান্য কারণেই তিনি মনে বড়ই ব্যথা পাইতেন। মনে হাজার কষ্ট থাকিলেও তিনি বন্ধুদিগের প্রীতি সম্পাদন করিতে পারিতেন।’ ইলাইজা ইম্পের ছেলে হ্যালহেড সম্পর্কে ‘অসাধারণ লোক’-জাতীয় প্রশংসাবাক্য ব্যবহার করেছেন, আর বলেছেন, (বিদ্যাভূষণ ৭১২ পৃষ্ঠা) ‘এত রকম বিষয়ের আলোচনা একসঙ্গে করিতে পারেন, (হ্যালহেড ছাড়া) এমন লোকের সঙ্গে তাঁর আর জানাশোনা নাই বলিলে অত্যুক্তি হয় না। তাঁহার প্রতিভা সর্বতোমুখী। প্রতিভা তাঁহার যেমন উজ্জ্বল ছিল, হূদয়ও তাঁহার তেমনই মধুর ছিল।’
১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি সারের ওয়েস্ট স্কোয়ারে বাংলা ব্যাকরণ রচয়িতা এই সিভিল সার্ভেন্ট ভাষাবিদের মৃত্যু হয়। পিটারশ্যামে তাঁর পরিবারের অন্যদের সমাধিক্ষেত্রেই তাঁকেও সমাধি দেয়া হলো। আর যে ভাষার ব্যাকরণ তিনি রচনা করে ভাষাচর্চার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে রইলেন, সেই ভাষার মানুষের কাছে তাঁর মৃত্যুসংবাদ পৌঁছল ঠিক সাত মাস পরে।






