‘আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,

আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ।’

যতটা মনে করতে পারি বিদ্রোহী কবিতার এ দুটি লাইন থেকেই সম্ভবত আমার বেদুইন শব্দটির সঙ্গে পরিচয়। পরবর্তী সময়ে নিজে পর্যটক হওয়ার দরুন লাইনটির সঙ্গে এক ধরনের একাত্মতা অনুভব করি। সেই একাত্মতা আরো নিবিড় ও গভীর করে কবিগুরুর চরণ কটি—

‘ইহার চেয়ে হতেম যদি

আরব বেদুয়িন!

চরণতলে বিশাল মরু

দিগন্তে বিলীন।’

সেই কিশোর বয়স থেকেই জেনেছিলাম বেদুইনদের বসবাস আরবের মরুভূমিতে। তাদের জীবন নিয়ে রয়েছে নানা রোমান্টিক গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনী। কবিতা ও গল্পে তাদের যাপিত জীবনকে যতই মধুর আবরণে উপস্থাপন করা হোক না কেন, বাস্তবতায় তা কঠিন সংগ্রামের।

ইতিহাস বলছে, এ যাযাবর অধিবাসীরা নিজেদের অভিহিত করে ‘Heirs of Glory’, তারাই প্রকৃত আবর। বাইবেলে বেদুইন সম্প্রদায়ের উল্লেখ আছে। বেদুইনরা প্রাচীনকালে ছিল প্রকৃতি পূজারি। প্রাচীন নানা ধর্মের মতো তারা মূর্তি পূজাও করত। এরপর একসময় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আরবে ইসলামের প্রচার শুরু করলে বেদুইনদের অনেক গোত্র ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।

আমার গদ্যে আমি আলাপ করব বেদুইন নারীদের নিয়ে। বেদুইনরা গোষ্ঠীবদ্ধভাবে বসবাস করে এবং তা পিতৃতান্ত্রিক সমাজ। পরিবারে বহু বিবাহের প্রচলন রয়েছে। পিতৃতান্ত্রিক পরিবার হওয়ার কারণে পুরুষ সদস্য পরিবারের প্রধান কর্তা। বেদুইনদের মূল পেশা পশুপালন ও বিক্রয় করা। ছোট ছোট দলে বিভক্ত থাকার কারণে কোন দল কী পশু পালন করছে, তার ভিত্তিতে গোষ্ঠীর নামকরণ হয় বলেই জেনেছি, যেমন যারা উট পালন করে তারা বসবাস করে সাহারা, সিরিয়া ও আরবের মরু অঞ্চলে। যারা গবাদিপশু পালন করে তারা দক্ষিণ সুদানে বাস করে, তাদের ডাকা হয় বাগারা। ভেড়া পালনকারীদের অবস্থান জর্ডান ও সিরিয়ায়।


বেদুইনদের সমাজ নিয়ন্ত্রিত হয় কিছু নিয়মনীতি দিয়ে। সেই নিয়মগুলোকে বলা হয় ‘কোড অব অনার’। সমাজ নিয়ন্ত্রণের চারটি কোড অব অনার রয়েছে সারাফ, ইর্দ, দিয়াফা ও হামাসা। ইর্দ হলো নারীদের অনার কোড। একজন নারী তার ইর্দ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু ইর্দ আর সতীত্ব এক নয়। সতীত্ব শারীরিক আর ইর্দ মানসিক। বেদুইনরা বিশ্বাস করে একজন নারীর ইর্দ হারালে তা ফিরে আসে না।

ব্যক্তির নামকরণের ক্ষেত্রেও তাদের কিছু নিয়মাবলি আছে। প্রথমে ব্যক্তির নিজস্ব নাম, তারপর বাবার নাম এবং পরে অবশ্যই পূর্বপুরুষের নাম যুক্ত করতে হয়। নারীরা বিয়ের পরেও বাবার পদবি ব্যবহার করে।

আগেই বলেছি, বহুবিবাহ বেদুইনদের সমাজে একটি গ্রহণযোগ্য বিষয়। একজন পুরুষ সাধারণত তার চাচাতো বোনকে বিয়ে করে। নিজস্ব গোত্রের বাইরে বিয়ের রীতির খুব বেশি প্রচলন নেই। আর নারীকে অধিক সন্তান জন্ম দিতে হয়, কারণ যে গোত্রের সদস্য সংখ্যা যত বেশি, সেই গোত্র তত বেশি শক্তিশালী।

পোশাকের ক্ষেত্রে অঞ্চলের আবহাওয়া প্রভাব ফেলে। আরবের পোশাকের নকশা করার ক্ষেত্রেও পরিবেশের কথা মাথায় রাখা হয়েছিল। প্রাচীনকালে পোশাক পরিধানের প্রয়োজন অনুভব করার পর যাযাবর বেদুইনরা বুঝেছিল পশুর চামড়া একত্রে সেলাই করে পোশাক তৈরি করা সম্ভব। পরে সময়ের সঙ্গে পোশাক উন্নত হয়। তবে তীব্র রোদ ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে আমরা দেখি পোশাকগুলো ঢিলেঢালা করে তৈরি করা হতো। আরো পরে বেদুইন নারীদের পোশাকের নকশার ক্ষেত্রে অঞ্চলভিত্তিক সংস্কৃতি প্রাধান্য পায়। একটা সময়ে নারীরা এমন পোশাক তৈরির চেষ্টা করতে, যাতে তাদের চেনা কঠিন হয়। মূলত শরীরের অবয়ব ঢেকে রাখা মূল উদ্দেশ্য ছিল। সর্বসাধারণ লম্বা ঝুলের সাধারণ পোশাক পরত। তবে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষিত হয়।

আরবে যেকোনো ধরনের পোশাকে একটি আঞ্চলিক পরিচয় দেয়া হয়। এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞ ড. আলবাশাম বলেন, ‘পোশাকে বিভিন্ন উপাদানের ব্যবহার এবং বিন্যাস লক্ষ করেই বলা যায় সেটি কোন অঞ্চলের। মধ্য আরবের নজদ অঞ্চলে নারীদের পোশাক ‘থোব আলতুর’-এ (থোব বলতে মূলত আরবের প্রচলিত লম্বা ঝুলের আলখাল্লা বোঝায়) বক্ষ, কোমর, গলা এবং হাতায় স্বর্ণ ও রৌপ্যের জটিল অলংকরণ করা হতো। পূর্বাঞ্চলে পোশাকের রঙের ক্ষেত্রে একই ধরনের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। এ অঞ্চলে জনপ্রিয় ‘থোব আলনাশাল’-এর বিচিত্র রঙ মূলত ভারতের নারীদের পোশাক থেকে অনুপ্রাণিত। এমনকি ভারত থেকে নানা সময়ে আরবের ব্যবসায়ীরা এ পোশাকের কাপড় আমদানি করত। দক্ষিণাঞ্চলে লাল, নীল, সবুজ, হলুদের জ্যামিতিক আকার দিয়ে ‘আসিরি কাত’ নামে এক ধরনের নকশা করা হয়। নারীদের হাতে করা এ নকশা মূলত বাড়ির প্রবেশপথে সাজানো হলেও আরবের দক্ষিণাঞ্চলের পোশাকে এ নকশার উপস্থিতি লক্ষণীয়। ‘থোব মুজানাব’-এ আসিরি কাতের পাশাপাশি কোমরে রুপার অলংকার ব্যবহার করতে দেখা যায়।

উত্তরাঞ্চলে তুলনামূলক ঐতিহ্যবাহী পোশাকের ব্যবহার দেখা যায়। এদের পোশাকের ঝুল তুলনামূলক লম্বা। হেজাজে নারীদের শতশত প্রকারের পোশাক রয়েছে। ‘থোব মোবগির’ নানা ধরনের কাপড়, স্বর্ণের নকশা ও নকশাদার ঘোমটার সমন্বয়ে তৈরি। সমব মিলিয়ে বেদুইনদের পোশাকের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় নানা দেশের পোশাকের সঙ্গে এর নকশায় নতুন উপাদান যুক্ত হয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নকশায় পরিবর্তন এলেও ঐতিহ্য, অলংকরণ প্রভৃতি পুরনো সময়ের মতো রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।


নারীদের ক্ষেত্রে অবশ্যই রক্ষণশীল বেদুইন সমাজ। বাইরে কাজ করার অনুমতি নেই। তার পরও প্রথা ভেঙে একজন নারী বেদুইন বেরিয়ে এসেছিলেন। ২০১৯ সালে সেই খবর দেখেছি পত্রিকায়। খবরটি আমার জন্য দারুণ চমকপ্রদ ছিল, কারণ উম্ম ইয়াসির নামের ৪৭ বছর বয়সী একজন নারী বেদুইন গাইডের কথা পড়ে দারুণ আপ্লুত হয়েছিলাম। তার বয়স, কাজের ধরন মুগ্ধ হওয়ার মতো। কারণ মিসরের সিনাই উপদ্বীপের বেদুইন নারীরা কঠোরভাবে রক্ষণশীল। তারা কখনই ঘরের বাইরে কাজ করে না। আগন্তুকের সঙ্গে তাদের কথা বলা বা দেখা হওয়া রীতিমতো বিরল ঘটনা। সেখানে উম্ম ইয়াসিরের বিদেশী পর্যটক দলের গাইড হওয়া বিস্ময়কর ঘটনা।

বেদুইন নারীদের বিষয়ে অল্পবিস্তর যেটুকু জেনেছি, তা লীলা আবু লুগোধের একটি গবেষণাপত্র থেকে। লীলা আবু লুগোধ একজন ফিলিস্তিনি-আমেরিকার নৃতত্ত্ববিদ। ‘Writing Women’s World : Bedouin Stories’ গবেষণাপত্রে পড়ে জেনেছি, নারী শিক্ষার প্রচলন নেই বেদুইন সমাজে। যখন কোনো মেয়ে শিশু শিক্ষাগ্রহণ করতে চায়, তখন তার পরিবার তাকে গোত্রের নেতার কাছে নিয়ে যায়। গোত্রের নেতা অনুমতি দিলেই কেবল মেয়েটি স্কুলে যেতে পারে। যারা পড়াশোনা করতে চায়, সেই মেয়ে শিশুগুলোকে সাধারণত অলস হিসেবে অভিহিত করা হয়। সমাজে এটি সম্মানহানিকর ও লজ্জার বিষয়ও বটে। এখন অবশ্য অবস্থা কিছুটা ভিন্ন হয়েছে, মেয়ে শিশুরা অনুমতিক্রমে ঘরকন্নার সব কাজ সেরে স্কুলমুখী হতে পারে।

ঘরের কাজ শেষ করার পর নারীদের একমাত্র বিনোদন রেডিও শোনা। সমাজে কিছু প্রতিবাদী মেয়ে শিশু থাকে, যারা পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে শিক্ষাগ্রহণ করতে চায়। সে বিষয়কে রোধ করার জন্য মেয়ে সন্তানের পিতারা মেয়েদের জন্মনিবন্ধন করেন না। পাবলিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে গেলে জন্মনিবন্ধন প্রয়োজন হয়।

নিবন্ধন ছাড়া মেয়ে শিশুটি স্কুলে যেতে পারে অতিথি শিক্ষার্থী হিসেবে। এভাবে তিন বছর অতিথি শিক্ষার্থী হিসেবে সময় অতিবাহিত করার পর স্কুলের শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধনের সুযোগ পায় শিশুটি। এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে বেদুইন সমাজে শিক্ষাগ্রহণ করার জন্য একটি মেয়ে শিশুকে কী রকম প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

বিয়ের বিষয়ে নারীদের মতামত দেয়ার কোনো অধিকার নেই। ১৫ বছর বয়সেই মেয়েদের বিয়ের জন্য তৈরি হতে হয়। বিয়ের বিষয়ে পিতার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। মেয়েটি জানেও না কার সঙ্গে তার বিয়ে হচ্ছে। যেহেতু চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গেই মেয়েদের বিয়ের প্রচলন রয়েছে, অনেক কিশোরী সহোদর ভাই মনে করে বিয়েতে অসম্মতি জানায়। পরিবারের প্রধান শাস্তিস্বরূপ সে মেয়েটিকে তখন একজন বয়স্ক লোকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে বাধ্য করে।

প্রাচীনকাল থেকেই বেদুইন নারীদের এ রকম নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই যেতে হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, যেখানে আরবের মূল ধারার নারীদেরই শিক্ষাগ্রহণ ও নিজের সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়ে বাধ্যবাধকতা বিরাজমান, সেখানে মরুবাসী বেদুইন সম্প্রদায়ের নারীদের কথা বলাই বাহুল্য। তবে আশার কথা হচ্ছে উম্ম ইয়াসিরের মতো বেদুইন নারীরা আলোর পথ দেখাচ্ছে। রক্ষণশীল সৌদি আরবে নারীদের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পাল্টাচ্ছে। দেশটিতে প্রথমবারের মতো উটের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় নারীরাও তাদের উট নিয়ে অংশ নিয়েছে। দারুণ ব্যাপার হলো, তারা তাদের ঘোড়ায় চড়ে অনুষ্ঠানে যোগ দেয়।

আরবে বেদুইনদের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। তারা এখন অনেকেই শহরমুখো! এ সম্প্র্রদায় পশুপালন থেকেও বিরত এখন। মূলত গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে বেদুইনরা যাযাবর জীবন ছেড়ে দিতে থাকে। ঐতিহ্যস্বরূপ তারা তাদের সাংস্কৃতিক ব্যাপারগুলো ধরে রাখার প্রয়াস করে। মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন শিল্পের অন্যতম মূল আকর্ষণ বেদুইনদের সঙ্গে স্বল্প সময়ের জন্য বসবাস করা। মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোয় রয়েছে অনেক বেদুইন ক্যাম্প, যেখানে বিশ্বের নানা দেশ থেকে পর্যটকরা যান বেদুইন হওয়ার স্বাদ নিতে।

 

এলিজা বিনতে এলাহী: পর্যটক ও শিক্ষক