বেদুইনরা বিভিন্ন
গোত্রে বিভক্ত।
বর্তমানে বেদুইন
জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই
ইসলাম ধর্ম
মেনে চলে,
যদিও উর্বর
এলাকায় অল্পসংখ্যক
খ্রিস্টান বেদুইন
দেখা যায়।
প্রাক-ইসলামিক
যুগে বেদুইনরা
যাযাবর, যুদ্ধবাজ
সম্প্রদায় ছিল,
যারা স্বাধীন
গোত্রে বসবাস
করত এবং
প্রায়ই একে
অন্যের সঙ্গে
সহিংস বিবাদে
জড়িয়ে পড়ত।
যাযাবর বেদুইনরা
নিজেদের তাঁবুর
মানুষ হিসেবে
পরিচয় দিতে
গর্ব বোধ
করে। কেননা
তারা বাড়িতে
বসবাস না
করে সর্বত্র
ঘুরে বেড়ায়
ও তাঁবুর
নিচে বাস
করে। বেদুইনরা
সর্বদাই মরুভূমির
জাহাজ হিসেবে
খ্যাত উটে
চড়ে বেড়ায়
এবং ভেড়া,
ছাগল, গবাদিপশু
লালনপালন ও
বিক্রয় করে।
বর্তমানে অনেক
বেদুইন যাযাবর
জীবন ছেড়ে
শহরাঞ্চলে থিতু
হয়েছে। তবে
অনেকেই বেদুইন
হিসেবে নিজেদের
পরিচিতিকে ভুলে
যায়নি এবং
নিজেদের জাতিগত
পরিচয় নিয়ে
গর্বিত।
আরব বিশ্বের
বেদুইন সমাজ
পুরুষতান্ত্রিক। তারা
দুটি মৌলিক
সামাজিক শ্রেণীতে
বিভক্ত। এক
শ্রেণী যাযাবর
মেষপালক, যারা
‘আদি’
বেদুইন নামে
পরিচিত। তারা
অনুর্বর মরুভূমিতে
এক জায়গা
থেকে অন্য
জায়গায় ভ্রমণের
সময় পথের
মাঝে অতিক্রমকারী
যেকোনো কাফেলায়
অভিযান চালানোর
জন্য পরিচিত।
তারা শীতের
সময় মরুভূমিতে
চলে যায়
এবং শুষ্ক
গ্রীষ্মের সময়
মরুভূমির প্রান্ত
এলাকায় ফিরে
আসে। অন্যদিকে
দ্বিতীয় দলের
বেদুইনরা কৃষিকাজের
ওপর নির্ভরশীল
এবং তারা
‘ফেলাহিন’
নামে পরিচিত।
ফেলাহিন মরুভূমির
প্রান্ত এলাকায়
স্থায়ীভাবে বাস
করে।
বেদুইন জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য
বেদুইনদের আছে
আচার-আচরণ,
রীতিনীতি ও
ঐতিহ্য। বেদুইনদের
নিজস্ব আরবি
কথ্য ভাষা
আছে, যা
‘বেদাউই’
বা ‘বাদাউ’
ভাষা হিসেবে
পরিচিত এবং
প্রতি অঞ্চলে
বিভিন্ন উপভাষাও
রয়েছে।
বেদুইনরা তাদের জীবনধারা, ভাষা, সামাজিক কাঠামো এবং সংস্কৃতির জন্য স্বীকৃত। তাদের পোশাকের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পুরুষরা লম্বা ‘গাল্লাবেয়া’ পরিধান করে, তার নিচে পাতলা সুতির পাতলুন, মাথায় লাল/সাদা (স্মাগ) বা সাদা (এম্মামা) রুমাল এবং অনেক সময় রুমালের ওপর মাথার চারপাশে কালো কর্ডের ‘আঘেল’ জড়িয়ে রাখে। অন্যদিকে নারীরা রঙিন লম্বা পোশাক পরে এবং যখন তারা বাইরে যায়, তখন তারা একটি পাতলা, লম্বা, কালো কোট (আবায়া) পরে, যা অনেক সময় সূচিকর্ম দিয়ে সজ্জিত থাকে। তারা সবসময় তাদের চুল সাধারণত কালো, পাতলা স্কার্ফ (তারহা) দিয়ে ঢেকে রাখে। তবে আজকাল অনেক ‘সাহসী’ বেদুইন নারীরা ঝলমলে রঙিন পোশাক পরিধান করে।
বেদুইনদের মধ্যে
পারিবারিক বন্ধন
অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ
ও সুদৃঢ়।
এ বন্ধনই
তাদের সমাজকে
রক্ষা করে।
তাদের সমাজে
পারিবারিক আনুগত্যের
ধারণা গভীরে
প্রোথিত। কেননা
পরিবার হচ্ছে
তাদের সমাজের
একটি প্রাথমিক
‘বিল্ডিং
ব্লক’, যা
পরিবারের মধ্যে
ব্যক্তিবাদ ও
স্বনির্ভরতাকে গড়ে
তোলে। তাই
ঘনিষ্ঠ পারিবারিক
বন্ধনের জন্য
শিশুদের সামাজিকীকরণ
ও শিক্ষিত
করা, জীবিকা
উৎপাদন এবং
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য
শিশুদের প্রস্তুত
করার মতো
কাজগুলো পরিবারের
পক্ষে সহজ
হয়ে উঠেছে।
উদাহরণ হিসেবে
উল্লেখ করা
যায়, বেদুইন
সমাজে পারিবারিক
বন্ধনকে মজবুত
করার অন্যতম
পন্থা হলো
পরিবারের সদস্যরা
মিলে একসঙ্গে
চা পান
করা। অনেক
জায়গায় দেখা
গেছে, চা
ছাড়া যেন
সমাজের চাকা
নড়ে না।
ঐতিহ্যবাহী চা
অনুষ্ঠান একটি
শিশুর লালনপালনের
জন্য গুরুত্বপূর্ণ
অংশ হিসেবে
চিহ্নিত করা
হয়, যা
তাকে পারিবারিক
জীবনে অবদান
রাখার মূল্য
শেখায়। শিশুটির
জন্য কাজ
এবং অতিথিদের
আতিথেয়তা প্রদান—উভয়
ক্ষেত্রেই দায়িত্ববোধ
শেখার জন্য
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করে।
আরব বেদুইনরা
অতিথিপরায়ণ। অতিথিদের
প্রতি তাদের
ব্যবহার উষ্ণ,
স্বাগত ও
নম্র। মরুভূমির
কঠোরতার জন্য
তারা কাউকে
ফিরিয়ে দেয়
না। তাই
বন্ধুবান্ধব বা
অপরিচিত অতিথিদের
নিজেদের বাড়িতে
থাকার অনুমতি
দেয়া হয়।
বেদুইন সমাজে
আরেকটি ঐতিহ্য
হলো পোষা
জন্তু-জানোয়ারের
প্রতি অসীম
মমতা। এ
কথা সত্যি,
বেদুইনদের সবচেয়ে
সম্মানিত প্রাণী
আরবীয় উট।
কারণ এ
প্রাণী পানি
ছাড়াই শুষ্ক
অঞ্চলে খুব
দীর্ঘ সময়
টিকে থাকতে
পারে এবং
শুষ্ক মরুভূমিতে
সহজে পরিবহনকাজে
ব্যবহার করা
যায়। এছাড়া
খাদ্য হিসেবে
উটের মাংস
ও দুধ
জনপ্রিয় এবং
উটের চামড়া
দিয়ে ঐতিহ্যবাহী
বেদুইন তাঁবু
তৈরি করা
হয়। বেদুইনরা
উটকে ‘সৃষ্টিকর্তার
কাছ থেকে
দান’ বলে
মনে করে।
তাই তারা
তাদের পশুদের
সুরক্ষিত করার
জন্য অতিরিক্ত
ব্যবস্থা নেয়।
ধর্মীয় ও
বিয়ের উৎসবের
সময় উটের
দৌড় উল্লেখযোগ্য
পর্ব হিসেবে
গণ্য করা
হয়। উট
ছাড়াও ছাগলের
পশম বিশাল
আকৃতির তাঁবুর
জন্য ব্যবহূত
হয়, যা
‘টোপ-আল-শার’
বা ‘পশমের
ঘর’ নামে
পরিচিত। ভেড়ার
পশম দিয়ে
তারা পোশাক
তৈরি করে
এবং ভেড়ার
মাংস খাবার
হিসেবে ব্যবহার
করে।
শিল্প-সংস্কৃতি
বেদুইন
সংস্কৃতি বলতে
শুধু বেদুইন
জনগণের সংস্কৃতিকেই
বোঝায়। তাদের
সংস্কৃতি ঐতিহ্যে
সমৃদ্ধ এবং
অনেক অনন্য
রীতিনীতি ও
ঐতিহ্যগত প্রথা
রয়েছে। তারা
লোকসংগীত, লোকনৃত্য
ও লোককবিতা
অনুশীলনের জন্য
সুপরিচিত।
বেদুইন জাতির
সংগীত আরবীয়
লোকসংগীতের সংরক্ষিত
একটি পুরনো
রূপ। বেদুইন
সংস্কৃতিতে সংগীত
হচ্ছে মরুভূমির
গল্প বলার
একটি পন্থা।
সংগীতশিল্পী ও
তাদের শ্রোতাদের
কল্পনা জাগিয়ে
তোলার জন্য
সংগীত রচনা
করা হয়।
বেদুইন সংগীত
সাধারণত তিন
ধরনের: আল-শি’ইর
আল-নাবাতি
(এসবের বেশির
ভাগই কবিতাসংবলিত
গান), তাঘরুদ
(উটচালকদের গান)
ও আইয়ালা
(যুদ্ধের প্রস্তুতির
সময়ের নৃত্যসংগীত)।
বেদুইনদের গান
সাধারণত দীর্ঘ
হয় এবং
তাতে এক
ধরনের মোনোটোন
থাকে, তবে
শ্রুতিমধুর। তারা
বেশির ভাগ
সংগীতে ‘ক্যাপেলা’
যন্ত্র, যেমন
রেবাব, অউদ
ও দারবুককা
ব্যবহার করে।
রাবাবা হলো
দেড় হাজার
বছরেরও বেশি
পুরনো ধনুকের
মতো কোলে
ধরা এক
তারযুক্ত যন্ত্র,
যা ছাগলের
চামড়া ও
একটি আরব
রেসিং ঘোড়ার
লেজ থেকে
তৈরি করা
হয়। অন্যদিকে
অউদ নাশপাতি
আকৃতির গিটার
এবং তারের
বাদ্যযন্ত্র, যেখানে
১০-১৩টি
তার থাকে।
অউদ বাদ্যযন্ত্রের
পেছনের অংশ
পাতলা কাঠ
দিয়ে বানানো
হয়। দারবুককা
আনুমানিক হাজার
বছরের পুরনো
এক ধরনের
ঢোল, যা
হাতের নিচে
রেখে বাম
পা দিয়ে
বাজানো হয়।
লোকনৃত্য বা স্থানীয় নৃত্য বেদুইনদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, বিশেষ করে প্রায়ই বিয়েতে দেখা যায়। বরের বাড়িতে বিয়ের নাচের শুরুতে বর ও কনেপক্ষের অবিবাহিত পুরুষ সদস্যরা নাচ এবং গান গাওয়ার জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায়। তাদের নাচে স্পষ্টভাবে যৌনতার ইঙ্গিত থাকে না, তবে বিদ্রূপ থাকে।
ভৌগোলিক অবস্থানের
দিক বিবেচনা
করলে বেদুইনদের
লোকনৃত্য পরিবেশনার
মধ্যে তারতম্য
দেখা যায়।
যেমন নেগেভ
(বর্তমানে ইসরায়েলের
অংশ), জর্ডান,
উত্তর সৌদি
আরব, উপসাগরীয়
কয়েকটি রাষ্ট্র
এবং সিরিয়ার
মরুভূমিতে প্রচলিত
বেদুইন লোকনৃত্য
হলো ‘দেহিয়েহ’।
প্রাচীনকালে যুদ্ধের
আগে উপজাতি
সদস্যদের মধ্যে
উৎসাহ জাগিয়ে
তোলার জন্য
এ নৃত্য
অনুশীলন করা
হতো, কিন্তু
বর্তমানে ‘দেহিয়েহ’
নৃত্য বিয়ে,
ছুটি ও
অন্যান্য উদযাপনের
মতো অনুষ্ঠানে
পরিবেশন করা
হয়। অন্যদিকে
লোকগাথা নৃত্য
যা ‘হাগাল্লাহ’
নামে পরিচিত।
এটি পশ্চিম
মিসরের বসতি
স্থাপনকারী বেদুইনদের
মধ্যে প্রায়ই
খেজুর তোলার
সময় বা
সেই অঞ্চলে
বিয়ের মৌসুমে
দেখা যায়।
এছাড়া হাগাল্লাহ
লিবিয়ার বিভিন্ন
এলাকায়ও পরিচিত
লোকনৃত্য এবং
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য
অঞ্চলে হাততালি
নাচের সঙ্গে
সম্পর্কিত।
বেদুইনদের মধ্যে
মৌখিক কবিতা
সবচেয়ে জনপ্রিয়
শিল্পরূপ। কোনো
গোত্রে একজন
কবির উপস্থিতি
সেই গোত্রের
জনগোষ্ঠীর জন্য
অত্যন্ত মর্যাদার
বিষয়। যদিও
কবিতা শিল্পের
একটি মাধ্যম,
তবে কবিতা
তথ্য ও
সামাজিক নিয়ন্ত্রণ
পৌঁছে দেয়ার
অন্যতম উপায়
হিসেবে ব্যবহূত
হয়।
বেদুইনদের মধ্যে
‘আল-তাগরুদা’
এক ধরনের
ঐতিহ্যবাহী উচ্চারিত
কবিতা, যা
পুরুষরা রচনা
ও আবৃত্তি
করে। উটের
পিঠে চড়ে
বেদুইন পুরুষরা
সাধারণত সাত
পঙিক্তর কাব্যিক
শ্লোক উচ্চারণ
করে। তারা
বিশ্বাস করে,
‘আল-তাগরুদা’
আরোহীকে বিনোদন
দেয়। ভ্রমণের
সময় প্রথম
শ্লোকটি দলের
প্রধান ব্যক্তি
আবৃত্তি করে
এবং পরে
দলের অন্য
সদস্যরা বাকি
পঙিক্ত উচ্চারণ
করে। এছাড়া
ক্যাম্পফায়ার, বিয়ে
অনুষ্ঠানে এবং
বিভিন্ন উপজাতীয়
ও জাতীয়
উৎসবে, বিশেষ
করে উটের
দৌড়ের সময়,
প্রতিযোগীদের উৎসাহ
দেয়ার জন্য
উচ্চৈস্বরে কবিতা
আবৃত্তি করা
হয়। উল্লেখ্য,
ইউনেস্কো ‘আল-তাগরুদা’কে
একটি জীবন্ত
মানব ঐতিহ্য
হিসেবে তালিকাভুক্ত
করেছে, যা
আগামী ভবিষ্যৎ
বেদুইন প্রজন্মের
জন্য উত্তরাধিকার
হিসেবে কাজ
করবে।
অন্যদিকে বেদুইন
নারীর মৌখিক
কবিতা ‘নাবাতি’
কবিতা নামে
পরিচিত, যা
যাযাবর জীবনযাত্রাকে
প্রতিফলিত করে
বেদুইন উপভাষায়
রচনা করা
হয়। তবে
নাবাতি কবিতায়
দ্বান্দ্বিক বা
স্থানীয় কবিতাও
অন্তর্ভুক্ত থাকে
এবং আরবি
ভাষায় লিখিত
ধ্রুপদী কাব্যিক
রূপ থেকে
আলাদা।
বেদুইনদের কথা
উঠে এসেছে
বাংলা ভাষাভাষী
কবি-সাহিত্যিকদের
কলমে। রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর বেদুইন
হতে ইচ্ছা
প্রকাশ করেছিলেন,
‘ইহার
চেয়ে হতেম
যদি আরব
বেদুয়িন।’ অন্যদিকে
কাজী নজরুল
ইসলাম নিজেকে
বেদুইন পরিচয়
করিয়ে দিয়েছেন,
‘আমি
বেদুঈন, আমি
চেঙ্গিস, আমি
আপনারে ছাড়া
করি না
কাহারে কুর্নিশ।’
আইন ও
বিচার ব্যবস্থা
বেদুইনদের
মধ্যে ন্যায়বিচারের
ব্যবস্থা বিভিন্ন
গোত্র বা
উপজাতিদের মধ্যে
বৈচিত্র্যময়। এসব
বিচার পদ্ধতির
মধ্যে বেশ
কয়েকটি প্রাক-ইসলামিক
সময় থেকে
প্রচলিত। তাই
এসব ক্ষেত্রে
শরিয়াহ (ইসলামিক
ধর্মীয় আইন)
অনুসরণ করে
না। এছাড়া
এসব ব্যবস্থার
মধ্যে অনেকগুলো
অব্যবহূত হয়ে
পড়ছে। এখন
অধিকাংশ বেদুইন
ন্যায়বিচারের জন্য
শরিয়াহ বা
জাতীয় দণ্ডবিধি
অনুসরণ করে।
বেদুইনদের মধ্যে
নারী ও
পুরুষদের সম্মানের
ওপর ভিত্তি
করে ন্যায়বিচার
নির্ধারণ করা
হয়। কেননা
বেদুইন পুরুষ
ও নারীদের
মধ্যে আলাদা
সম্মান সংকেত
বা নিয়ম
রয়েছে। বেদুইন
পুরুষদের সেই
সম্মান সংকেত
বা নিয়ম
অর্জন করা
যেতে পারে,
বর্ধিত করা
যেতে পারে,
হারিয়ে যেতে
পারে, এমনকি
পুনরুদ্ধারও করা
যেতে পারে।
এ সম্মান
সংকেত বা
নিয়মের মধ্যে
রয়েছে পরিবারের
নারীদের ইজ্জত
রক্ষা, সম্পত্তির
সুরক্ষা ও
উপজাতির সম্মান
রক্ষণাবেক্ষণ এবং
গ্রামের সুরক্ষা
(যদি উপজাতি
বসতি স্থাপন
করে) বজায়
রাখা। অন্যদিকে
একজন বেদুইন
নারী তার
ইজ্জত অক্ষত
রেখে জন্মগ্রহণ
করে, কিন্তু
যৌনসীমা লঙ্ঘন
তাকে দূরে
ঠেলে নিয়ে
যেতে পারে।
নারীর সম্মান
একবার হারিয়ে
গেলে ফিরে
পাওয়া যায়
না।
আতিথেয়তা, সাহসিকতা
ও সম্মান
সংরক্ষণ সম্পর্কিত
বেদুইন রীতিনীতি
প্রাক-ইসলামিক
সময় থেকে
এখনো চালু
আছে। অনেক
বেদুইন আদালতে
নারীদের প্রায়ই
আসামি বা
সাক্ষী হিসেবে
কোনো বক্তব্য
দেয়ার সুযোগ
কিংবা ব্যবস্থা
থাকে না
এবং গ্রামের
প্রবীণ ও
গণ্যমান্য ব্যক্তিরা
বিচারের ফলাফল
নির্ধারণের সিদ্ধান্ত
নেন। ক্ষুদ্র
বেদুইন উপজাতিদের
মধ্যে দ্বন্দ্ব
নিষ্পত্তি উভয়
পক্ষের পরিবারের
মধ্যে আলোচনার
মাধ্যমে (আনুষ্ঠানিকতা
ছাড়া) হতে
পারে। তবে
বৃহত্তর উপজাতিদের
জন্য দ্বন্দ্ব
সমাধানের সামাজিক
প্রটোকল চালু
রয়েছে।
যাযাবর জাতি
হিসেবে বেদুইনদের
কারাগারের কোনো
ধারণা নেই।
ছোটখাটো অপরাধ
প্রধানত জরিমানা
ধার্য করে
নিষ্পত্তি করা
হয়। বেদুইন
গোষ্ঠীগুলো সাধারণত
তাদের সদস্যদের
অপরাধের জন্য
দায় নিতে
বাধ্য থাকে।
তাই যদি
অভিযুক্ত ব্যক্তি
জরিমানা দিতে
ব্যর্থ হয়,
তবে অভিযুক্তের
গোষ্ঠী অন্যান্য
সদস্য অর্থ
প্রদান করতে
বাধ্য থাকবে।
অন্যদিকে গুরুতর
অপরাধের বিচার
হয় শারীরিক
ক্ষত কিংবা
মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে।
শারীরিক শাস্তি
দেয়ার সময়
অভিযুক্তকে একটি
গরম ধাতব
চামচ চাটতে
এবং পরে
পানি দিয়ে
মুখ ধুয়ে
ফেলতে বাধ্য
করা হয়।
যদি জিহ্বা
পুড়ে যায়
কিংবা ক্ষত
চিহ্ন দেখা
যায়, তবে
অভিযুক্তকে মিথ্যাবাদী
সাব্যস্ত করা
হয়।
বেদুইন আইন
ও বিচার
ব্যবস্থায় তিন
ধরনের শ্রেণীবিন্যাস
দেখা যায়।
এগুলো হলো:
[এক] অরফি,
অর্থাৎ এক
পর্যায়ের বিচার
ব্যবস্থা। সিনাইয়ের
কিছু বেদুইন
উপজাতি অরফি
আদালতের মাধ্যমে
সালিশ নিষ্পত্তি
করে। অরফি
আদালত সত্য
খুঁজে বের
করতে বা
দোষীদের নিন্দা
করতে চায়
না, বরং
উভয় পক্ষের
মধ্যে মধ্যস্থতাকারী
হিসেবে কাজ
করে। অরফি
আদালতের নেতৃত্বে
রয়েছেন একজন
মুক্তার (বিচারক)।
[দুই] ঘাদি,
অর্থাৎ দুই
স্তরের বিচার
ব্যবস্থা। মিসরের
আলেগাত অঞ্চলের
বেদুইন সম্প্র্রদায়
তিনজন বিচারক
নিয়োগ দেয়।
যদি কেউ
দ্বন্দ্ব সমাধানের
ফলাফলে অসন্তুষ্ট
হয়, তবে
সে অন্য
বিচারকের কাছে
আবেদন করতে
পারে কিংবা
শেখের (নেতা)
কাছে আবেদন
করতে পারে।
উল্লেখ্য, শেখের
রায় বাতিল
করা যায়
না।
[তিন] আর্মিলাত,
অর্থাৎ পাঁচ
স্তরের বিচার
ব্যবস্থা। সর্বনিম্ন
স্তরের মধ্যস্থতাকারীরা
হলেন কাফিল।
তারা ক্ষমতা
ও মর্যাদাসম্পন্ন
ব্যক্তি বা
উপজাতির মধ্যে
শারীরিক শক্তিসম্পন্ন
ব্যক্তি এবং
প্রতিটি দলের
মাধ্যমে নির্বাচিত
হন। কাফিলের
ওপরের স্তরে
রয়েছেন কবির,
আদ্রাইবি, মানশাদ
এবং সর্বোচ্চে
রয়েছেন প্রধান
বিচারক।
বেদুইনদের মধ্যে
রক্তের বিবাদ
সম্পর্কিত সমাধান
প্রায়ই আদালতের
সিদ্ধান্তকে খর্ব
করে এবং
গোষ্ঠী থেকে
গোষ্ঠীতে পরিবর্তিত
হতে পারে।
হত্যার শাস্তি
সাধারণত মৃত্যুদণ্ড
হয়, কিন্তু
কিছু গোষ্ঠীতে
মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে
রক্তের প্রতিশোধের
নির্ধারিত পরিমাণ
অর্থ ধার্য
করা হয়
এবং অভিযুক্ত
ব্যক্তি সেই
অর্থ পরিশোধ
করে। তবে
সে অক্ষম
হলে তার
গোত্রের অন্যরা
মিলে সেই
অর্থ পরিশোধ
করতে বাধ্য
হয়। রক্তের
বিনিময়ে অর্থ
নির্ধারণ করা
হয় একাধিক
ক্ষেত্রে, যেমন
আক্রমণের ফলে
প্রাপ্ত আঘাত
বা ক্ষতের
জন্য ক্ষতি;
জমি বিরোধ,
চারণ ক্ষেত্র
বা চাষের
অধিকার সম্পর্কিত
বিবাদ; ঋণ,
সম্পত্তির অংশ,
মোহরানা, ভরণপোষণ,
বিবাহবিচ্ছেদ ও
সম্পদ চুরি।
একটি নির্দিষ্ট
বেদুইন উপজাতির
সদস্যরা সাধারণত
একই ধরনের
ন্যায়বিচার ব্যবস্থা
অনুসরণ করে।
তবে ঘনিষ্ঠভাবে
সম্পর্কিত উপজাতিরাও
একই ধরনের
ন্যায়বিচার ব্যবস্থা
অনুসরণ করতে
পারে এবং
এমনকি তাদের
জন্য সাধারণ
মধ্যস্থতাকারী আদালতও
থাকতে পারেন।
আরব বিশ্বের
বিভিন্ন রাষ্ট্রের
আইনবিদরা প্রায়ই
বেদুইন আইন
ও বিচার
ব্যবস্থার রীতিনীতিকে
দৃষ্টান্ত হিসেবে
উল্লেখ করেন।
শেষ কথা
বর্তমানে
বেদুইন উপজাতীয়
সংস্কৃতি বিভিন্ন
প্রতিকূল অবস্থার
মুখোমুখি হচ্ছে,
যা ক্রমেই
পশ্চিমা সংস্কৃতির
সঙ্গে মিশে
যাচ্ছে। কেননা
সংখ্যাগরিষ্ঠ বেদুইন
জনগণ শহুরে
জীবনযাত্রার জন্য
তাদের উপজাতীয়
ঐতিহ্য ও
যাযাবর জীবন
পরিত্যাগ করেছে।
তবে অনেকেই
ঐতিহ্যবাহী গোত্র
কাঠামো, সংগীত,
কবিতা, নৃত্য
ও অন্যান্য
অনেক সাংস্কৃতিক
কর্মকাণ্ড বজায়
রেখেছে। নাগরিক
বেদুইনরা প্রায়ই
সাংস্কৃতিক উৎসবের
আয়োজন করে,
যা সাধারণত
বছরে বেশ
কয়েকবার অনুষ্ঠিত
হয়।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: এ
লেখার জন্য
উইকিপিডিয়া ও
অন্যান্য ব্লগসহ
বিভিন্ন গ্রন্থ
এবং প্রকাশিত
গবেষণা প্রবন্ধ/নিবন্ধ
থেকে তথ্য
ব্যবহার করা
হয়েছে। ব্যবহূত
সব তথ্যসূত্রের
লেখক/লেখিকাদের
কাছে বিশেষভাবে
কৃতজ্ঞ
ফজল হাসান: লেখক ও অনুবাদক





