শেষাবধি শহীদ দেশে এসে আর নিঃশ্বাস নিল না।  প্রবাসে মরে গেল। দেশ ছাড়ার পর মার্কিন দেশে সারা জীবন কাটিয়ে দিল। কিছুই প্রায় লিখল না। শরীরের সঙ্গে নিত্যদিন লড়াই একটা কারণ হতে পারে। ডায়ালাইসিসের ওপর তাঁর জীবন নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। জীবনের বড় একটা অংশ তিনি সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারেননি। ব্যক্তিগত আবেগ, ঘটনাঘটনের টানাপড়েন এবং  আরো নানা কারণে লেখালেখির জন্য যে দূরত্বটুকু দরকার, সেটা তৈরি করা আমার জন্য কঠিন ব্যাপার। তবে কাদরী মরে গেল, এ অতি সাধারণ সত্যটুকু আমাকে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়েছে। আমি স্মৃতিকথা লিখতে বসিনি। কখনো লিখব বলেও মনে হয় না। তবে শহীদ কাদরীকে নিয়ে শোকগ্রস্ত ঘোরের মধ্যে দু-একটি কথা পেশ করছি মাত্র। শহীদকে নিয়ে কিছু লিখব বা লিখতে হবে এটা আমি ভাবিনি।

শহীদ কাদরী দীর্ঘ একটা সময় বিদেশী একজন নারীকে বিয়ে করে যখন বাস করছিলেন, তখন কারো সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতেন না। আমি নিজেও কয়েকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। তবে খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করতাম। যোগাযোগ ছিন্ন করার মধ্যে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটা শহীদের স্বভাবের ব্যতিক্রম কিছু না।

তবে নীরা কাদরীর কাছে বাংলাদেশের কবিদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। প্রায় হারিয়ে যাওয়া শহীদকে তিনি আবার সচল, সরব ও দৃশ্যমান করে তুলেছিলেন। নিউইয়র্কের প্রবাসী কবিদের নিয়ে নিজের বাসাতেই একটা আড্ডা ও কাব্যচর্চার ক্ষেত্র তৈরি করে নিয়েছিলেন। শহীদের জন্য সেটা খুবই উপকারী চর্চা হয়েছে বলে মনে হয়। কিছুকাল আগে নিউইয়র্কে নীরা, শহীদ ও তাঁদের কাব্যমহলের সদস্যদের সঙ্গে বেশকিছু সময় কাটাতে পেরেছিলাম। এখন মনে হচ্ছে, এটা সৌভাগ্যই ছিল আমার। 

একদমই প্রবাসী হয়ে যাওয়ার মধ্যে যে অভিমান কাজ করেছে তার বিস্তর ব্যক্তিগত কারণ থাকতে পারে। যারা কবিকে জানাবোঝার চেয়ে কবির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অতি আগ্রহী তারা হয়তো এখন নানা কেচ্ছাকাহিনী বলবে ও বানাবে। কবিতা প্রেমিকদের আগেই বলে রাখি শহীদকে বোঝা কঠিন কিছু নয়। তাকে বোঝার জন্য তার কবিতাই যথেষ্ট। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস বাদ দিয়ে আলাদাভাবে স্রেফ কবিতা নামক বিচ্ছিন্ন সাহিত্যকর্ম হিসেবে পড়লে চলবে না। পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশক অবধি যে সময়কাল তার একটা খতিয়ান মনে রাখা দরকার। সেই খতিয়ান তৈরি অবশ্য কবিদের কাজ নয়, সেটা ইতিহাসওয়ালাদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। সেই ইতিহাস যতো পরিচ্ছন্ন হবে হয়তো ততই আমরা শহিদ কাদরীকে বুঝতে পারব।

দুই.

যাদের সঙ্গে অতিশয় ঘনিষ্ঠ থেকে জীবনের একটা সময় বড় হয়েছি, তাদের মৃত্যু গভীর ও গোপন কিছু তন্ত্রীতে আঘাত করে। এড়ানো কঠিন হয়ে যায়। প্রবাসে শহীদের মৃত্যু তরুণ বয়সের বিস্তর কিছু স্মৃতি উসকে দিচ্ছে। একটা সময় গিয়েছে দিনের পর দিন শহীদ, আল মাহমুদ এবং  আমার সম বয়সী কিংবা অনুজ কবি বন্ধুরা আমার বাসায় থেকেছে। দিনের পর দিন আড্ডা দিয়েছি আমরা। এই স্মৃতিগুলো আমার জীবনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময় বটে। একই সঙ্গে কবিদের উদ্দেশ্যহীন আড্ডাবাজির অন্তঃসারশূন্যতা সম্পর্কে  দ্রুত ধারণাও হয়েছে আমার। তবে  তরুণ আধুনিক কবি হিসেবে আমার বেড়ে ওঠার জগত্ এবং তার সীমা সম্পর্কে উপলব্ধি এর মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে। এটাই এই সময়ের নগদ লাভ। যে অল্প কয়েকজন বয়সে বড় কবিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আমি জড়িত ছিলাম। তাদের মধ্যে শহীদ একজন। অগ্রজদের মধ্যে শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ আছেন, সন্দেহ  নেই। কিন্তু শহীদ কাদরী ও রফিক আজাদের সঙ্গে  আমার ঘনিষ্ঠতা  ছিল বেশি। সম্ভবত শহীদ শামসুর রাহমানের বয়েসী নন, আবার আমাদের বয়সের মধ্যেও পড়ত না। বয়সে বড় হলেও তার চরিত্রের আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে ওর বন্ধুত্বের সংজ্ঞায় শহীদের বড়-ছোট ভেদবিচার ছিল না। ছোটদের সঙ্গে শহীদ সবচেয়ে বেশি সপ্রতিভ। তাদের সঙ্গে সারাক্ষণ হাসি-ঠাট্টা তামাশা শ্লেষে চরম।  বন্ধুদের নিয়ে ‘মজাক’ করতে তার তুমুল আনন্দ। অন্যরাও পুলকিত হোত। ফলে তার সম্পর্কে ভীতি ও মিথ দুটোই তৈরি হয়েছিল। যারা তার প্রিয় মানুষ কিংবা বন্ধু, তাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার শক্তি শহীদের ছিল অপরিসীম। এর জন্য তাকে অনেক মূল্যও দিতে হয়েছে।

ষাট ও সত্তরের দশকে বিউটি, রেক্স, তাজ ইত্যাদি রেস্তোরাঁর আড্ডা নিয়ে বিস্তর মিথ তৈরি হয়ে আছে। শহীদ কাদরীকে নিয়ে এই মিথগুলো সচল রয়েছে।  সেসব আড্ডায় সাহিত্য নিয়ে কথাবার্তা হতো, ঠিক। কিন্তু পনেরো আনা হতো সাহিত্যের বাইরের জিনিস। পরচর্চা  ও পরনিন্দা। তবে ‘রেস্তোরাঁ’র মিথের সঙ্গে আধুনিক বাংলা কবিতার একটা কাল্পনিক সম্পর্ক আছে।

স্বাধীন-পূর্ব পাকিস্তানে ঢাকা শহর তখন সবে গড়ে উঠছে। জিন্নাহ এভিনিউ ও গুলিস্তানের মোড়ে ঘোড়াগাড়ি তখনো বিলুপ্ত হয়নি। প্রাচীন আস্তাবলের শেষ চিহ্ন, রিকশার ক্রিং ক্রিং ও গাড়ির হর্নের আওয়াজের মধ্যে চাবুক, চাকা ও খুরের আওয়াজ শোনা যায়। ঘোড়ার  মুত ও চনার গন্ধ তখনো নাকে এসে লাগে। এর মধ্যেই সাতচল্লিশে স্বাধীন হওয়া নতুন পূর্ব পাকিস্তানে নয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটেছে। তারা ‘আধুনিক’ হতে চায়। কিন্তু যে জীবনচর্চা আধুনিক কবি তৈরি করে, সেটা ঢাকায় সম্ভব না। ঢাকায় কলকাতার মতো কফি হাউজ নেই। তার পরও নতুন কবিরা বুদ্ধদেব বসুর বোদলেয়ার পড়ে ‘আধুনিক’ হচ্ছে। পারির রেস্তোরাঁয় কবিদের আড্ডার কেচ্ছা শুনে তারা আপ্লুত। মদে আসক্তি ও গণিকার প্রতি প্রেম তাদের আধুনিক হওয়ার উপজীব্য হয়ে উঠেছে। মাহবুব আলী ইনস্টিটিউট তখন মদ ও জুয়ার আড্ডা। বাংলা মদ বাংলা সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে উঠছে অনেকের কাছে। এ সেই পরিস্থিতি, যখন ঢাকায় প্যারিসের কিংবা কলকাতার মতো কফি হাউজ বা রেস্তোরাঁ না থাকায় কবি-সাহিত্যিকদের গলিঘুঁজিগুলো আবিষ্কার করতে হয়েছে, কারণ তাদের ‘আধুনিক’ হতে হবে।  বিউটি, রেক্স বা অন্য কোনো রেস্তোরাঁকে ‘মিথ’ বানানোকে সিরিয়াসলি নেয়ার কোনো যুক্তি নেই। দুর্ভাগ্য যে, শহীদ কাদরী নিয়ে কথা উঠলেই রেস্তোরাঁ, আড্ডা, আড্ডাবাজিতা ইত্যাদি প্রসঙ্গ প্রায়ই তোলা হয়। এর প্রাসঙ্গিকতা ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বের মধ্যে নেই বলা যাবে না। কাব্য ও সাহিত্যচর্চার দিক থেকে সেটা আধুনিক হওয়ার জন্য সাতিশয় কাতর শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মনোজগেক বোঝার জন্য কাজে লাগে। 

তিন.

শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ ও শহীদ কাদরীকে বুঝতে হলে ষাট থেকে সত্তরের দশকের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত বুঝতে হবে। ব্রিটিশদের ভারত ত্যাগের মধ্য দিয়ে সাতচল্লিশে পাকিস্তান স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে হাজির হলো। এরই মধ্যে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আত্মপরিচয় নির্মাণের নির্ণায়ক ধারণা ও কল্পনায় মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে নতুন জামিদারি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জমিহারা বাংলাদেশের জনগণ জমিদার-মহাজনদের বিরুদ্ধে লড়েছে। লড়তে গিয়ে ‘মুসলমান’  হিসেবে নিজেদের ঐতিহাসিক আত্মোপলব্ধির যে বয়ান জনগণ খাড়া করেছিল, যার ভিত্তিতে তারা পাকিস্তান চেয়েছে, সেটা অকস্মাত্ মিথ্যা হয়ে গেল। ‘মুসলমান’ হিসেবে তার পরিচয়ের কথন ছিল ব্রিটিশ ঔপবেশিক শক্তি ও বর্ণ হিন্দুর ক্ষমতা, বিধিবিধান ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বয়ান। সেখানে ষাটের দশকের মধ্যেই প্রতিস্থাপিত হলো ‘আবহমান বাংলা ও বাঙালি’র কেচ্ছা’, বর্ণ হিন্দুর সাংস্কৃতিক আধিপত্য। এ কাল্পনিক কমিউনিটি (imagined Community) বা কাল্পনিক বাঙালি আদতে কলকাতার উচ্চ বর্ণের হিন্দু কবি-সাহিত্যিকদের নির্মিত জিনিস। কিন্তু তা সত্ত্বেও এর ঐতিহাসিক ন্যায্যতা পাকিস্তানের সামরিক-আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর ন্যায্য লড়াই। নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ন্যায্যতা। জরুরি ও অনিবার্য, কিন্তু ‘বাঙালি’ আত্মপরিচয়ের পক্ষে কোনো ন্যায্যতা নয়।

এই সময়ের আধুনিক কিংবা অনাধুনিক কোনো কবি-সাহিত্যিকের মধ্যে আমরা আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে ঐতিহাসিক সচেতনতা দেখি না। শহীদ কাদরীও ব্যতিক্রম নয়। যারা বাঙালি পরিচয়ের চেয়েও নিজের ‘মুসলমান’ পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ মনে করত তারা এই পরিচয়ের ঐতিহাসিক তাত্পর্য বুঝত না, এখনো বোঝে না। একে তারা নিছকই ধর্মীয় পরিচয় মনে করত। এখনো তার হেরফের হয়নি। তালিম হোসেন, বেনজির আহমেদ, ফররুখ আহমদদের আমরা এভাবেই বুঝতে পারি। তাদের প্রতিপক্ষরাও তাদের পরিচয়কে নিছকই ধর্মীয় পরিচয়ই মনে করে যার মধ্যে তারা ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কোনো যোগসূত্র ধরতে পারত না। এখনো পারে না। ফলে তাদের কাছে ইসলাম, মুসলমান ইত্যাদি ‘বাঙালি’র বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতিপক্ষ হয়ে উঠল। অন্যদিকে ‘বাঙালি’ হিসেবে তাদের নিজেদের আত্মপরিচয়কেও তারা চিরায়ত ও শাশ্বত মনে করত, যার প্রতিপক্ষ ছিল মুসলমান বা ইসলামী আত্মপরিচয়। 

ব্যতিক্রম না হলেও শহীদের মধ্যে বাঙালিপনার চেয়েও ইউরোপীয় আধুনিকতার ঝোঁক তুলনামূলকভাবে আমরা বেশি দেখি। সম্ভবত এখানেই তার কবিতার স্বাতন্ত্র্য। অনেক সময় অনুকরণও বটে। এখানে শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের সঙ্গে তার পার্থক্যের জায়গা আমরা ধরতে পারি। এই দুই কবির তুলনায় তার অস্থিরতা ও অস্বস্তির জায়গাও হয়তো এখানে। কিন্তু ইউরোপীয় আধুনিকতা বাংলা কবিতার ঐতিহাসিক শর্ত নয়, শহীদ কাদরীর মধ্যে আমরা সে কারণে যে ‘উন্মূল ও উদ্বাস্তু’ চেতনার  উপাদান পাই, তাকে কতটা ইউরোপীয় আর কতটা সংকীর্ণ বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারা থেকে আলাদা ব্যাপার বলে শনাক্ত করতে পারি, সেটা কবিতা পাঠের একটা চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তবে আমি যখনই শহীদের কবিতা পড়ি, তখনই এই উন্মূল ও উদ্বাস্তু চেতনার অনুরণন টের পাই। এর পুরো অর্থ বোঝার চেষ্টা এখানে করা সম্ভব নয়। তবে প্রসঙ্গ হিসেবে আপাতত বলে রাখলাম। শহীদ কাদরীকে বোঝার জন্য আমার কাছে এই বাস্তুহীন মোহাজির কিংবা ইতিহাসদের সঙ্গে সম্পর্কহীন উন্মূল চেতনা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। সে কারণে বাংলা কবিতায় শহীদ কাদরীর ‘আধুনিকতা’ নতুন পদার্থ। একান্তই তার নিজের।

শহীদ বাংলা ভাষার আধুনিক কবি হতে চেয়েছিল।  বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় কিশোর বয়সের কবিতা ছাপা তার জন্য বিশাল স্বীকৃতি। শহীদ নিজেও তাই মনে করত। রেস্তোরাঁয় শহীদ আড্ডা মারত সন্দেহ নেই, আমরাও তুমুল অংশ নিতাম। তার সম্বোধন কবিদের পস্পরের সম্বোধন হয়ে উঠেছিল। ‘ওস্তাদ’, শহীদ ডাকত। সেটা এখন বাংলাদেশের সব কবির ডাক হয়ে গিয়েছে। একসময় শহীদের সঙ্গে ‘ওস্তাদ’ সম্বোধনের সম্পর্ক পাতানোর অর্থ ছিল আধুনিক কবি হিসেবে ঢাকা শহরে স্বীকৃতি পাওয়া। সেটা খুব চাট্টিখানি ব্যাপার ছিল না।

কানে শহীদের মশকরা মিশ্রিত ‘ওস্তাদ’ সম্বোধনই  ক্রমাগত বাজছে। এ অসাধারণ সম্বোধনের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের কবিদের মধ্যে শহীদ জীবিত থেকে যাবে আমার মনে হয়।

একই সঙ্গে উন্মূল ও উদ্বাস্তু হওয়ার উপলব্ধি ও আধুনিক চেতনা।

৩১ আগস্ট ২০১৬। আরশিনগর

 

            লেখক: কবি ও দার্শনিক