সটীক সংস্করণ
বাঁকাউল্লার দপ্তর গ্রন্থের একটি অধ্যায় নিচে পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—
রায় মহাশয়
‘—জেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের জমিদার রামতারণ বাবুর বিধবা ভগ্নী সৌদামিনী গর্ভপাত করিয়াছে—রামতারণ বাবু স্বয়ং বিশ্বাসী ভৃত্য শ্রীদাম ঘোষকে সঙ্গে লইয়া সেই সাতমেসে গর্ভভ্রূণ অন্দরের পুকুরপাড়ে তেঁতুলতলায় গাড়িয়া ফেলিয়াছেন। দুইজন জেলে, বাবুর হুকুমমত অন্দরপুকুরে খাবার মাছ ধরিতে গিয়াছিল, সৌদামিনী তখন স্নান করিতেছিল; জেলেরা সৌদামিনীকে পূর্ণগর্ভা দেখিয়াছে। কাওরা হরিশের স্ত্রী, বাবুর বাড়ির বাঁধা ধাই; প্রকাশের ভয়ে তাহাকে না ডাকিয়া, তারাপুরের রূপচাঁদ হাড়ির স্ত্রীকে আনিয়া সূতিকাকার্য করিয়াছে। প্রসব হইবার পর ছেলেটি একবার কাঁদিয়া উঠিয়াছিল। দ্বারিক চৌকিদার সেই সময় বাবুর বাড়ির অন্দরের দিকে চৌকি দিতে গিয়াছিল, সে কান্নার শব্দ পাইয়াছিল। পুলিশ তদন্তে আসিলে সকলই বিদিত হইবেন।’ এই পত্রখানি, এক ব্যক্তি ‘অস্পষ্ট দাস’ এই নাম স্বাক্ষর করিয়া, পুলিশের বড় সাহেবের নিকট পাঠাইয়াছে। সাহেবের বিশ্বাস হইয়াছে। এইরূপ কলঙ্কজনক ব্যাপার গোপন করা যে জমিদার লোকের পক্ষে অসম্ভব নয়, সাহেব একথা বিশ্বাস করিয়াছেন। কাজটা বড়ই গর্হিত; সংবাদদাতা জমিদারের ভয়ে নিজের নাম লিখিতে সাহস করে নাই। স্থানীয় পুলিশকে কেবল সহায়তার ভার দিয়া এ মকর্দমার তদন্তভার আমার উপরেই পড়িয়াছে। প্রস্রাব ত্যাগের হিসাবনিকাশ পর্যন্ত যে চাকরিতে ডাইরি-বন্দী করিতে হয়, তাহাতে আর কথা কি? সংবাদ প্রাপ্তিমাত্র মকর্দমাটা নিজের ডাইরিতে জমা করিয়া লাইয়া—সাহেব বরাবর তদন্তরুজুর এত্তেলা দিয়া, গোপন অনুসন্ধানের জন্য বাহির হইলাম।
বড়ই চিন্তিত হইতে লাগিল। ভদ্রঘরের কুলকন্যা, বিশেষ জমিদারের ভগ্নী, অন্তঃপুরেই বাস; কি করিয়া অনুসন্ধান লইব, কি করিয়া প্রকৃত কথা সংগ্রহ করিব, ভাবিয়া আকুল হইলাম। ভয়ও হইল। জমিদার-লোকেরা অসীম ক্ষমতাপন্ন; একটু এদিক ওদিক হইলে, নিজের দেহেরও আশঙ্কা আছে। ঘটেও এমন। যেমন ভয়, তেমনি ভাবনা। এই ভাবেই কৃষ্ণপুরে চলিলাম।
বড় লোকের ঘরে যে এমন সকল কুকাজ ঘটে না, এমন নহে; কিন্তু যাঁহারা ধনশালী, তাঁহারা কি এ লোকলজ্জা সহসা পাইতে চাহেন? অনেক স্থানেই শোনা যায়, দুর্ভাগ্যক্রমে ওই প্রকার কোনও দুর্ঘটনা ঘটিয়া গেলে, বড়লোকেরা নৌকাযোগে অভাগিনীদিগকে গয়া কাশী পাঠাইয়া দেন। দরিদ্র লোকেরা তত ব্যয়বাহুল্যে সমর্থ হয় না—দেশের দুর্নাম অগত্যা তাহাদিগকে শিরোধার্য করিতে হয়। রামতারণ বাবু জমিদার লোক, তিনি কেন এ ব্যয়বাহুল্যে পিছাইলেন? পয়সা থাকিতে তিনি কেন এ কলঙ্কের ডালি মাথায় লইলেন? একথা সর্বপ্রথম ভাবিবার জিনিস।
স্থানীয় দারগা, রামতারণ বাবুর বড় বৈঠকখানায় বার দিয়া বসিয়াছেন, গ্রামের গণ্যমান্য লোকেরা দারগাবাবুর তলপে হাজির থাকিয়া, সুরত্হালের সাহায্য করিতেছেন, বাজে লোকও বিস্তর জুটিয়াছে। বাড়ির স্থানে স্থানে—এক রকম বাতাবন্দি হিসাবে পুলিশ-পদাতিকেরা বসিয়া আছে। আমার গাড়ি গিয়া সদর দরজায় লাগিল। দারগাবাবুকে হুকুমনামা দেখাইলাম, রামতারণ বাবুর সহিত সংক্ষেপে আলাপ সারিয়া লইলাম। কতকক্ষণ চুপচাপ।
একটু বিশ্রাম করিয়া দারগা যতদূর তদন্ত করিয়াছেন, তাহা তাঁহার কাগজপত্রে দেখিলাম। মকর্দমা একরকম প্রমাণ। দারগার নথিপত্র, সাক্ষীদের জবানবন্দি, স্থানীয় লোকের মত প্রভৃতি পড়িয়া দেখিলাম। মকর্দমা প্রমাণিত। সে প্রমাণ আটঘাট বাঁধা। বেনামীপত্রের লেখক ‘অস্পষ্ট দাস’ যে স্থানের উল্লেখ করিয়াছিলেন, ঠিক সেই স্থানে একটি শিশুর অর্ধ-বিকৃত মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছে। শ্রীদাম ঘোষ, রামতারণ বাবুর খাস খানসামা; সে বলিয়াছে সে নিজে লণ্ঠন ধরিয়া কোদাল হাতে আগে আগে গিয়াছে, রামতারণ বাবু বিধবা ভগ্নীর মৃতপুত্র লইয়া, পশ্চাতে পশ্চাতে গিয়াছেন। শ্রীদাম গর্ত খুঁড়িয়া দিয়াছে, রামতারণ বাবু শিশু-শব গর্ত-গর্ভে নিক্ষেপ করিয়া মাটি চাপা দিয়াছেন। দুইজন জেলে অন্দর-পুকুরে মাছ ধরিতে গিয়াছিল, তাহারাও দিদি ঠাকুরানির উদর ভার দেখিয়াছে; নিম্ন উদর স্ফীত দেখিয়াছে। সে কথা তাহারা তাহাদের পরিবারের কাছেও গল্প করিয়াছে। তিন সাক্ষীর বাক্য ঐক্য হইয়াছে, লাশও পাওয়া গিয়াছে, তবে আর অন্য প্রমাণের কি প্রয়োজন? দারগাবাবু, দিদিঠাকুরানিকে থানায় লইয়া যাইতে চাহিতেছেন। রামতারণ বাবু বলিতেছেন, ‘যাহা করিতে হয়, আমাকে করুন। প্রাণদণ্ডেরও যদি অপরাধ হইয়া থাকে, সে অপরাধ আমার হইয়াছে, আমি করিয়াছি। ভদ্রবংশের কুলকন্যা, তাহাকে আর থানায় লইয়া যাবেন না;—একটা গণনীয় বংশে এ কালি আর দিবেন না।’
বেলা হইয়াছে, তদন্ত স্থগিত রাখিতে বলিলাম। গ্রামস্থগণকে বৈকালে আসিতে অনুরোধ করিয়া, সে বেলার জন্য মজলিস ভঙ্গের আদেশ দিলাম। পাকশাকের আয়োজন হইতে লাগিল।
অবিশ্বাসের অনেকগুলি কারণ আছে। রামতারণ বাবু তাঁহার ভগ্নীর জারজ-সন্তান পুকুরপাড়ে পুঁতিলেন কেন? বাড়ির ভিতরেও ত প্রচুর স্থান আছে। রাস্তা হইতে অন্দর প্রায় ৭/৮ রশি দূর। সাতমেসে নির্জীব ছেলের কান্না কি তত দূরে শোনা যায়? যে সকল গ্রামস্থ লোক মজলিসে বসিয়াছিল, তাহার একজনও রামতারণ বাবুর এই অপমানজনক ব্যাপারে সমবেদনা প্রকাশ করে না কেন? কাওরা হরিশের বধূর এজেহার লওয়া হইল না কেন? যাহা হউক, সর্বপ্রথমে একবার সৌদামিনীকে দেখা উচিত। রামতারণ বাবুকে গোপনে ডাকিয়া, মোলায়েম কথায় বলিলাম, ‘দেখুন মহাশয়, পুলিশের লোক হইলেও আমরা মানীলোকের মানের কদর জানি। যে আপনার ভগ্নী, আমারও সে ভগ্নী, ধর্মভগ্নী। তাঁহার জবানবন্দী লইতে চাহি না; একবার দেখিব। গুরুতর সন্দেহের ভঞ্জন জন্য তাঁহার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি একবার দেখা আবশ্যক। হয়ত তাহাতে আপনার মঙ্গল হইবে। আপনিও উপস্থিত থাকিবেন, নির্জনে তিনজনে দেখা করিব।’ স্বীকৃত হইয়া রামতারণ বাবু অন্দরে প্রবেশ করিলেন, দেখা সাক্ষাতের বন্দোবস্ত করিলেন,—দেখা করিলাম। বড় ঘরের মেয়ে, সুন্দরী বটেন। বয়স একুশ বাইশ, বাল্যবিধবা। সৌদামিনীকে দেখিয়া বড় কষ্ট হইল। এ পর্যন্ত সে জলবিন্দুও খায় নাই। যে দাদার অন্নে প্রতিপালিত সেই দাদার জাতকুল যাইতে বসিয়াছে; আহারে কি রুচি থাকে? সৌদামিনী যে মরণাপন্ন হইয়া পড়িয়াছে। চক্ষুলজ্জার মাথা খাইয়া, সৌদামিনীকে বেশ করিয়া দেখিলাম। সন্দেহ রইল না। সবে মাত্র সাত মাসের গর্ভ যে পাত করে, তাহার দেহের অবস্থা কখনই এমন থাকিতে পারে না। জোর করিয়া বলিতে পারি, সৌদামিনী এ কলঙ্কের কিছুমাত্র জানে না। তাহার চরিত্র নির্মল, কিন্তু প্রমাণ কি? অনুকূল প্রমাণ ত কিছুই নাই। বাহিরে আসিলাম।
দারগাবাবু ক্রমেই চটিতেছেন। এমন প্রমাণী মামলা, চালান দিতে আর বিলম্ব কেন? দারগাবাবু অলক্ষ্যে নানা কথাই কহিতেছেন। এত বড় এক মকর্দমা, তদন্তের খ্যাতিটা পাছে আমার একায়িকের ভাগ্যে ঘটিয়া যায়, এজন্য বড়ই বিরক্ত হইতেছেন। নীরবেই সে সকল সহিতেছি। মনে বুঝিতেছি, ঘটনার মূলে রহস্য আছে; তবে কেমন করিয়া তাড়াতাড়ি একটি ভদ্রবংশের কুলনারীকে চালান দিই?
অনুসন্ধানে জানিলাম, গ্রামে দলাদলি। গ্রামের ব্রাহ্মণ-কায়স্থ-গণের ব্রহ্মত্র মহাত্রাণ নিষ্কর১ ভূমি আছে; মালে লাখিরাজে২ বিবাদ বিসম্বাদ আছে; উভয় দলেরই হাতে লোকজন আছে; কয়েকটা খুব সঙ্গিন-সঙ্গিন মকর্দমাও হইয়া গিয়াছে। যে জেলে দুজন সাক্ষ্য দিয়াছে, তাঁহারা ব্রহ্মত্র জমির প্রজা। তলপ করিলাম। জবানবন্দী লইলাম। তাঁহারা পূর্বকথিত কথারই পুনরাবৃত্তি করিল। দিদি ঠাকুরানির বয়স জিজ্ঞাসা করিলাম। একজন বলিল, বছর ত্রিশ, একজন বলিল, পনের ষোল। দেখিতে কেমন? একজন বলিল কাল, একজন বলিল ফরসা। পুকুরের কোনদিকের ঘাটে দিদি ঠাকুরানি স্নান করিতে নামিয়াছিলেন? একজন বলিল পশ্চিমদিকে, একজন বলিল পূর্বদিকে। অনেকটা রহস্যভেদ হইল। সৌদামিনীর বয়স কুড়ি একুশ, সে গৌরাঙ্গী; অন্দর পুকুরের পূর্বদিকে ঘাটই নাই, উত্তরদিকে ঘাট। জেলেরা আদৌ দিদি ঠাকুরানিকে দেখে নাই,—চিনে না। সন্দেহ ভঞ্জনের জন্য বাড়ির আর পাঁচটি মেয়েকে ডাকিয়া—দুই দল করিয়া—একদলে সৌদামিনীকে তাহাদের মধ্যে রাখিয়া শনাক্ত করান হইল; জেলেরা দিদি ঠাকুরানিকে চিনিতে পারিল না—নজরবন্দি রহিল।
শ্রীদাম বলিয়াই ছিল, এখন তলপ করিতেই আর তাহাকে পাওয়া গেল না! অনুসন্ধানে শ্রীদাম বলিয়াছিল, সে কোদালী দিয়া গর্ত খুঁড়িয়া দিয়াছে; গর্ত দেখিলে কিন্তু তাহা খন্তা দিয়া খোঁড়া স্পষ্ট বোধ হয়। গর্তের পাশে দুই তিন স্থানে খন্তার ফলার দাগও রহিয়াছে। খন্তা দিয়া গর্ত খুঁড়িয়া মাটি তুলিবার সময় লোকে খন্তাখানা গর্তের উপর পুঁতিয়া রাখে, সেই সময় গর্তের বাম ধারে ফলার দাগ পড়ে; কেন-না, লোকে বাম হস্তে খন্তা ধরিয়া দক্ষিণ হস্তে গর্তের মাটি তুলে। এখানেও ঠিক তাহাই দেখা গেল। বেশই বুঝিয়াছিলাম, সৌদামিনী গর্ভপাত করে নাই, এখন তাহার অনুকূলে প্রমাণও মিলিতেছে।
মজলিসে কোনও প্রসঙ্গ শেষ হইবার পর মজলিস ভাঙিয়া যখন মজলিসীরা চলিয়া যায়, তখন পথে সেই প্রসঙ্গেরই আলোচনা চলে। এ নিয়ম চিরন্তন। মজলিসী লোকদিগের মতামত জানিবার জন্য, সায়াহ্নের মজলিস ভঙ্গের সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ু লইয়া বাহির হইলাম। একটু দূরে—যেখানে গিয়া লোক বেশ নির্ভয়ে মনের কথা বলিতে পারে—ততদূরে—রাস্তার ধারের একটা গাছের আড়ালে দাঁড়াইলাম। তখন অনেক রাত্রি।
চারি পাঁচজন লোক চলিয়া গেল। তাহাদের কথায় তেমন কিছু পাইলাম না। তারপর আর দুইজন; তাহারা নীরব। তাহার পর তিনজন, ছোটবড় কথা কহিতে কহিতে আসিতেছে দেখিয়া, তাহাদের কথার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিলাম। একজন বলিল, ‘নির্ঘাত্ চোট্! এবার আর বাছার উদ্ধার নাই। জমিদারি হেক্মতি আর ফলাইতে হইবে না। মুখ চূণ।’
২য়। তাহাই হইত বটে, কিন্তু মকর্দমা যে দাঁড়ায়, এমন বুঝি না। লেড়ে ব্যাটা মকর্দমাটা উল্টাইবার চেষ্টায় আছে।
১ম। আরে রেখে দাও তোমার লেড়ে ভেড়ে। লাশ যখন পাওয়া গিয়াছে, তখন নির্ঘাত্!
৩য়। এ লোকটা কিন্তু সুচাকের নয়। ব্যাটার চাউনি দেখিলে পেটের পিলে চমকাইয়া যায়। কোথাকার ঘটনা, কেমন টানিয়া টানিয়া বাহির করিতেছে দেখিতেছ? জেলে দুটা ত এক রকম নাকচ হইয়া পড়িয়াছে। কাহার কপালে কী হয়, বলা যায় না।
১ম। আরে তোর ভয় দেখে যে আর বাঁচি না। ‘খোদার মোর্দা রাজি, কি করিবে কাজি।’ লাশ যখন পাওয়া গিয়াছে, তখন শিব আসিলেও তারণের নিস্তার নাই।
৩য়। তোমরা যতই বল, আমার কিন্তু ভয় ঘুচিতেছে না। কাল সকালেই আমি জামাই বাড়ি চলিয়া যাইব।
১ম। আরে তোর ভয় দেখে আর বাঁচি না। মোছলমানের মড়া, রাত্রি দুপুরে কবর খুঁড়িয়া যখন চুরি করিয়া আনিস, তখন ভয় পাস নাই?
৩য়। তখন সাহস ছিল। আশেপাশে তোমরা সহায় ছিলে। রায় মহাশয় অভয় দিয়াছিলেন। এখন?
১ম। যাহা হইক, কাল ত চালান যাক্। ভাই বোনে ত গারদে পচুক—তারপর অন্য কথা।
পর পর তিনজনেরই বাড়ি দেখিয়া আসিলাম। যে লোকটা মুসলমানের ছেলেটাকে কবর খুঁড়িয়া তুলিয়াছিল, কথার ভঙ্গিতে বুঝিলাম, লোকটা বড় ভয় পাইয়াছে। পাছে জামাইবাড়ি পালায়, একজন পদাতিককে পাহারায় রাখিলাম।
প্রভাতেই তাহার বাড়ির দরজায়। নাম অদ্বৈত ঘোষ। চোক্ মুছিতে মুছিতে যেমন বাইরে আসা, অমনি গেরেপ্তার;—একবারে হাতে হাতকড়ি। অদ্বৈতকে শূন্য ভরে৩ রামতারণ বাবুর বাড়ি আনা হইল। রামতারণ প্রদত্ত রায় ফয়সালা দেখিলাম; এ পর্যন্ত তাঁহার সহিত যতগুলি মকর্দমা হইয়াছে, অদ্বৈত তাহার সকলগুলিতেই লিপ্ত আছে। সঙ্গের লোক দুজনও পূর্ব পূর্ব মকর্দমার সাক্ষী ছিল।
একদিকে কড়া তহশিল, অন্যদিকে সরকারি সাক্ষী শ্রেণীভুক্ত করিয়া খালাস করিয়া দিবার প্রলোভন; অদ্বৈত যে কবর হইতে লাশ আনিয়াছিল, তাহা দেখাইয়া দিল। খোদাবক্স সেখের স্ত্রী, এক হপ্তা হইল একটি মৃত-সন্তান প্রসব করিয়াছিল; খোদাবক্স ওই কবরেই তাহাকে গোর দিয়াছিল।
সুপ্রমাণিত হইল, রামতারণকে জব্দ করিবার অভিপ্রায়ে গ্রামের লোক এই মিথ্যা মকর্দমা সাজাইয়াছে। জেলেরা ব্রহ্মত্র জমির প্রজা, তাহারা মুনিবের উপদেশমত সাক্ষ্য দিয়াছিল, বাস্তবিক অন্দরের পুকুর তাহারা দেখে নাই। শ্রীদাম যখন ফেরার, তখন তাহার সাক্ষ্য ত মিথ্যা। হরিশের স্ত্রী ত ঘটনার কিছুই জানে না। রূপ চাঁদ হাড়ির বধূ সব গুলাইয়া ফেলিল, প্রলাপ বকিল।
মতলব দিয়াছেন, ব্রজবল্লভ রায়। তদ্বির করিয়াছে, অদ্বৈত ঘোষ, রামলোচন রায়, আর দীনবন্ধু বাগচী। চারিজনকেই আসামি করিয়া চালান দেওয়া হইল। শ্রীদামের নামে ফেরারি পরওয়ানা বাহির হইল। আসামিদিগের এক জনও অব্যাহতি পাইল না।
শ্রীদামকে সৌদামিনী কাকা বলিয়া ডাকিত। ঠিক কাকার মতই দেখিত—মান্য করিত। সেই শ্রীদাম, সৌদামিনীর চরিত্রে এমন কলঙ্ক দিল, যাহার অন্নে প্রতিপালিত—সেই প্রতিপালককে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়া এমত বিপদে ফেলিতে উদ্যত; দেশময় শ্রীদাম কাকার নিন্দা রটিল। এক সপ্তাহের ভিতরই থানায় সংবাদ আসিল; গ্রামের উত্তর পার্শ্বের এক তেঁতুলগাছে শ্রীদাম গলায় দড়ি দিয়া মরিয়াছে।
সৌদামিনীকে ধর্মভগ্নী বলিয়াছিলাম, মকর্দমা মিটিয়া গেলে, রামতারণ বাবু নিমন্ত্রণ করিয়া পাঠাইয়াছিলেন; নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে পারি নাই। চাকরি ছাড়িয়া, এ ঘটনার প্রায় ত্রিশ বত্রিশ বত্সর পরে ধর্মভগ্নীর নিমন্ত্রণ রক্ষা করিয়াছিলাম। তখন আমরা সকলেই প্রাচীন। বড়ই আনন্দিত হইয়াছিলাম। এ ধর্মসম্বন্ধ, এখনও আমাদের পুরুষানুক্রমে চলিতেছে।
টীকা
১. ব্রহ্মত্র মহাত্রাণ নিষ্কর: ব্রাহ্মণকে দান করা জমিকে ব্রহ্মোত্তর জমি বলা হয়। এই জমির দখলিকার, অর্থাত্ সেই ব্রাহ্মণ এবং তার বংশকে জমির কর বা খাজনা দিতে হয় না।
২. মালে লাখিরাজে: ‘লাখেরাজ জমি’র অর্থ নিষ্কর জমি। ‘লা’ অর্থ ‘না’ এবং ‘খেরাজ’ অর্থে ‘ভাড়া’ বা ‘কর’। লাখেরাজ জমির প্রজাকে মালিকের কাছে কর বা খাজনা দিতে হয় না। যদিও লাখেরাজ জমির প্রজাকে আইনি ভাষায় লাখেরাজদার বলা হয়, এক্ষেত্রে মালে লাখিরাজে বাক্য-বন্ধে লাখেরাজ জমির মালিক ও প্রজাকে বোঝানো হয়েছে।
৩. শূন্য ভরে: যে অবস্থায় ছিল, সেই অবস্থাতেই।






