জেসি শ্যাফি। অনুবাদ: শওকত হোসেন

রোমানীয় কবি ও সাংবাদিক মির্চা কার্তেরেস্কু ট্রিলজি ব্লাইন্ডিংয়ের জন্য ২০১৬ সালের প্রিমিও গ্রেগর ফন রেসসোরি পুরস্কার পেয়েছেন। রোমানিয়ার অন্যতম প্রধান লেখক কার্তারেস্কুর জন্ম ১৯৫৬ সালে, বুখারেস্টে। তার লেখা গ্রন্থের ভেতর নস্টালজিয়া, ট্রাভেস্টি ও দ্য লেভান্ত উল্লেখযোগ্য। তার পাওয়া পুরস্কারগুলোর ভেতর ২০১২ সালের বার্লিন সাহিত্য পুরস্কার, সুইজারল্যান্ডে ২০১৩ সালের স্পাইশারলিউক ও ইউরোপীয় সাহিত্যের জন্য অস্ট্রীয় সাহিত্য পুরস্কার অন্যতম।

২০১৬ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে অনুষ্ঠিত ফেস্টিভাল দেগলি স্ক্রিরেতোরি চলার সময় গ্রেগর ফন রেসসোরি পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করার আগেই লেখক হিসেবে তার বিবর্তন ও পুরস্কার বিজয়ী উপন্যাস ব্লাইন্ডিং সৃষ্টি সম্পর্কে আমি আলাপের সুযোগ পেয়েছিলাম।

 

প্রশ্ন: কীভাবে লেখালেখির জগতে এলেন এবং সময়ের পরিক্রমায় কেমন করে লেখক হিসেবে আপনার বিবর্তন ঘটেছিল?

মির্চা কার্তেরেস্কু: বইবিহীন একটা বাড়িতে বেড়ে উঠেছি আমি। আমার মা-বাবা ছিলেন সামান্য শ্রমিক। তারা পড়াশোনা করতেন না। কিছু পড়তে হলে বই ধার করতে লাইব্রেরিতে যেতে হতো আমাকে। বই পড়া আমার জীবনে বিরাট একটা আনন্দের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সুযোগ পেলেই বই কিনতাম। ক্রমে বাড়িতেই নিজের একটা বুক কেস বানিয়ে আমার পছন্দের ১০০-২০০ বই জমিয়েছিলাম। লেখক হয়ে ওঠার আগে আমি ছিলাম বিরাট পাঠক। পেছনে তাকালে সবসময়ই আমার হাতে একটা বই দেখতে পাই। প্রচুর কবিতা আর সেই সঙ্গে গদ্য পড়ার কারণেই একটা সময় আমার মনে হলো নিজেরও লেখা উচিত। প্রথমে কবিতা এবং তারপর নিজস্ব ছোটগল্প ইত্যাদি। মনে আছে, আমার নয় বছর বয়সে আমার প্রথম উপন্যাসটি শুরু হয়েছিল। ১০ পৃষ্ঠার একটা উপন্যাস ছিল সেটা।

প্রশ্ন: নয় বছরের হিসাবে অনেক বেশি বলতে হয়।

মির্চা কার্তেরেস্কু: হ্যাঁ, বড় উপন্যাস ছিল সেটা। আমার সূচনা ছিল সেটা। লেখক হিসেবে আমার গড়ে ওঠার পেছনে কলেজই ছিল আদর্শ জায়গা। বিভিন্ন চিঠিপত্র নিয়ে গবেষণা করেছি। মহান শিক্ষকরা ছিলেন। রোমানিয়ার সেরা সাহিত্য সমালোচকদের কেউ কেউ আমার প্রফেসর ছিলেন। তাদের সুবাদে এবং আমার একই প্রজন্মের লেখকদের দুর্দান্ত সংগ্রহের সুবাদে যা বলতে চাই, সেটা বলার সাহস করে ওঠার বেলায় নিজের ওপর আস্থা তৈরি হয়েছিল। আমার ২০ বছর বয়সে প্রথম পেশাদারি কবিতা লিখি আমি। ২৪ বছর বয়সে আমার প্রথম কবিতার বই বেরোনোর ভেতর দিয়ে সেটার পরিণতি ঘটাই। গোড়ার দিকে কেবল কবিতাই লিখতাম। গদ্য রচনায় হাত দেয়ার আগে ছয় কি সাতটা কাব্যগ্রন্থ লিখেছি আমি। একটা বিশেষ মুহূর্তে কবিতা লেখার ব্যাপারে বীতশ্রদ্ধ আর ক্লান্ত হয়েই গদ্য লিখতে শুরু করি— প্রায় এক হাজার পৃষ্ঠার এক বিরাট কবিতার সংগ্রহ ছিল।

যখন বুঝতে পারলাম, আমি মূলত কবি নই, বরং গদ্য লেখক, সেটা ছিল আমার লেখকজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সবকিছু পাল্টে দিতে শুরু করে সেটা। ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত নস্টালজিয়া নামে পাঁচটি গল্পের একটি সংকলন ছিল আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ। রোমানিয়ায় এটা এখন কাল্ট গ্রন্থে পরিণত হয়েছে। তারুণ্যের বই ছিল সেটা। এমনকি এখনো নস্টালজিয়ার জন্য নস্টালজিয়ায় ভুগি আমি; ওই প্রথম বইটির জন্য, আমার পরবর্তী সময়ের লেখালেখির বিষয়বস্তু ধারণ করছে ওটা।

প্রশ্ন: ব্লাইন্ডিং উপন্যাসটি গ্রেগর ফন রেসসোরি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেল কীভাবে? কোন জিনিসটা একে অনুপ্রাণিত করেছে?

মির্চা কার্তেরেস্কু: ব্লাইন্ডিং আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অ্যাডভেঞ্চার ছিল। লিখতে শুরু করার আগে অনেক দিন ধরেই আমার মনের ভেতর ছিল এটা— সাত কি আট বছর হবে। লেখা শুরু করার পর ১৪ বছর মেয়াদি একটা ঘোরের ভেতর চলে গিয়েছিলাম। বইটা এমনভাবে লিখেছি, যেন স্রেফ হরফে পরিণত করছি। কিছুই মুছিনি, ১০ পৃষ্ঠায় এক কি দুই শব্দের বেশি না। প্রথম থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত যেন একটানা বয়ে গেছে। মূল পাণ্ডুলিপি আমার কাছেই আছে— কারণ হাতে লিখেছিলাম ওটা— ছোট ছোট সূক্ষ্ম হরফে তিনটা বড় বড় নোট বইয়ে। আমার জীবনের অ্যাডভেঞ্চার ছিল এটা। নিদারুণ খুশি ছিলাম আমি।

প্রশ্ন: ওই রচনার কতটা স্মৃতির ওপর নির্ভর করেছে আর কতটা আপনার কল্পনা থেকে তৈরি এবং আপনি কোথায় সেই সীমাটুকু দেখেন?

মির্চা কার্তেরেস্কু: সত্যি স্মৃতি, মিথ্যা স্মৃতি ও বানোয়াট স্মৃতি ইত্যাদির ফারাক সম্পর্কে তেমন একটা সচেতন নই আমি। যেমন আমি মা ও মায়ের পূর্বসূরিদের নিয়ে লিখতে শুরু করেছিলাম, কিন্তু মা সামান্য কিষানী ছিলেন বলে নানা-নানি সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা ছিল না। সুতরাং আমার হাতে যথেষ্ট পরিমাণ বাস্তব তথ্য যদি না থাকে, তো পূর্বসূরিদের আবিষ্কার করতে বাধ্য হয়েছি... আমি সবসময় পরিবারের দীর্ঘ ইতিহাসের অধিকারী অভিজাত লেখকদের ঈর্ষা করেছি। কিন্তু আমার তা নেই। তো নানা ধরনের চরিত্র উদ্ভাবনে বাধ্য হয়েছি আমি— খুবই অদ্ভুত, খুবই বেখাপ্পা— তারপর ভাব করেছি যে, ওরা আমার দাদা, পরদাদা ইত্যাদি। তো আমার বেলায় কল্পনা আমার নিজের জীবন আর আমার বংশধারার আগের মানুষগুলোর স্মৃতির ঘাটতি, দলিলপত্রের অভাব পূরণ করে। হয়তো তথ্যের এ ঘাটতির কারণেই আমার বইগুলো এত কল্পনানির্ভর।

প্রশ্ন: নানা জায়গায় বসবাস ও লেখালেখির কারণে আপনি যেখানে থাকছেন— এলাকা, ভূগোল, সংস্কৃতি— সেটা কি আপনার পদ্ধতিতে প্রভাব ফেলে বা আপনার কাজের বিষয়বস্তু পাল্টে দেয়?

মির্চা কার্তেরেস্কু: আপনি জানেন, আমার পরিবার যেখানে থাকে, সেটাই আমার দেশ। সব ধরনের জায়গায় প্রচুর অনুদান পেয়েছি আমি। বহুবার জার্মানি, অস্ট্রিয়া আর আমস্টার্ডামে— এখানে দুই বছর ছিলাম— থেকেছি, কিন্তু আমার স্ত্রী আর ছোট ছেলেটি কাছে থাকলে সব জায়গাকেই আমার নিজের বাড়ি মনে হয়েছে। কোথায় লিখছি, তাতে আমার তেমন একটা আসে যায় না। আমার মাত্র একটা কি দুটি চাহিদা রয়েছে: দরজা বন্ধ অবস্থায় একটা রুমে একাকী থাকতে হবে, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে টেবিলে এক কাপ কফি। সুতরাং অনুপ্রেরণা নিয়ে আসার জন্য বিশেষ কিছুর দরকার পড়ে না আমার। সবই আছে ভেতরে।

প্রশ্ন: রোমানিয়া বা অন্য কোথাও লেখকদের ভেতর কারা আপনার লেখাকে প্রভাবিত করেছে বা তাদের লেখালেখির সঙ্গে মেলে বলে মনে করেন?

মির্চা কার্তেরেস্কু: আমার কাজকে প্রভাবিত করার মতো কয়েকশ লোক থাকতে পারে। লেখকের চেয়ে বরং একজন পাঠক হিসেবেই নিজের তারিফ করে থাকি আমি। জেমস জয়েস, রবার্ট মুসিল, ফ্রাঞ্জ কাফকার মতো আধুনিক ক্ল্যাসিক থেকেই মূল প্রভাবটা এসেছে। তবে আর্নেস্তো সাবাতো, হুলিয়ো কর্তাসার এবং অবশ্যই মার্কেস ও বার্গাস য়োসার মতো লাতিন আমেরিকান গদ্য লেখকদের কাছ থেকেও প্রভাবিত হয়েছি। এবং মার্কিন লেখকদের কাছ থেকে— টমাস পিঞ্চন আমার লেখালেখির ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান প্রভাব সৃষ্টিকারী। তবে জর্ন বার্থ ও ডোনাল্ড বার্থেলমের মতো অন্যরাও আছেন।

প্রশ্ন: আপনার লেখার অনুবাদের কাজে কখনো কি সংশ্লিষ্ট ছিলেন? নিজের লেখার অনুবাদ পড়েছেন? অন্য ভাষায় কীভাবে সেটা পড়া হচ্ছে, তার কোনো ধারণা আছে?

মির্চা কার্তেরেস্কু: আদৌ না। বেশ, এদিক থেকে আমার ব্যাপারটা স্পেশাল। আমি রোমানিয়া থেকে অন্য ভাষায় তর্জমাকরীদের সেরা মানুষগুলোর সঙ্গে কাজ করি। তো আমরা অনেকটা পরিবারের মতো। ভালো বন্ধুদের একটা প্রাচীরের মতোই আমার চারপাশে আছেন ওরা। আমি মনে করি, অনুবাদকরাই আমার সেরা বন্ধু। ওদের আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করি। কারণ ওদের প্রত্যেককেই সেরা বলে জানি। যেমন ইতালির বেলায় ব্রুনো মানসোনিই সেরা।

প্রশ্ন: তিনি আপনার সাতটি বই তর্জমা করেছেন?

মির্চা কার্তেরেস্কু: হ্যাঁ। আরো অনেকেই আছেন এ রকম। যেমন আমার সুইডিশ অনুবাদক ইঙার ইয়োহানসন আমার রচনার হাজার হাজার পৃষ্ঠা অনুবাদ করেছেন এবং নরওয়েজীয় ও বুলগেরীয় অনুবাদকও। নেদারল্যান্ডসের জান ভিলেম বস আছেন, এ রকম। ওরা কেবল অনুবাদকই নন। সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, খুবই মেধাবী এবং দারুণ প্রতিভাবান লেখক। তাছাড়া আমার মতো একই মানসিক অবস্থা রয়েছে ওদের। তো ওরা আমার মতো রোমানীয় জীবন ও সংস্কৃতি আর পরিবেশ সম্পর্কে জানেন। ভাষার বেলায়ও তাই। তো আমি ওদের বিশ্বাস করি। ওদের সঙ্গে কখনো কাজ করিনি। ওদের অনুবাদও কখনো পড়িনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমি পড়তে পারবও না। কারণ ভাষাটা আমার জানা নেই। কিন্তু ফরাসি বা ইংরেজি পড়তে জানি, কিংবা এমনকি ইতালীয়। কিন্তু রোমানীয় ভাষায়ও নিজের বই পড়ি না আমি। কখনো দ্বিতীয়বার পড়তে যাই না। সামনে তাকানোর সুযোগ আছে যেখানে, কেন পেছনে তাকানো?’

প্রশ্ন: এবং সৃষ্টি অব্যাহত রাখার।

মির্চা কার্তেরেস্কু: এবং লিখে চলার, হ্যাঁ। বাইসাইকেল চালাচ্ছে, এমন কেউ পেছনে তাকায় না। তাহলে সোজা গাছের গায়ে টক্কর খাবে।

প্রশ্ন: অন্যান্য দেশে আপনার লেখা সমাদৃত হতে দেখে আদৌ কি বিস্মিত বোধ করেছেন?

মির্চা কার্তেরেস্কু: বিভিন্ন দেশে আমার লেখা গ্রহণের ব্যাপারটা খুবই আলাদা। উত্তরের বিভিন্ন দেশ— সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্কের মতো দেশগুলোয় এ মুহূর্তে আমি ভালোই সাড়া পাচ্ছি এবং জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ায়। তবে গত বছরগুলোয় ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোয় আমার বইয়ের অবস্থার উন্নতি ঘটেছে। স্পেনে দুটো প্রধান পুরস্কার পাওয়ার পর গত দুই বা তিন বছরে দারুণ সাফল্য মিলেছে। এখানে, ইতালিতেও বহু বছরের অস্পষ্টতার পর অবস্থা পাল্টাতে শুরু করেছে। ইতালিতে দুটো পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছি আমি— গ্রেগর ফন রেসসোরি পুরস্কার ও স্ট্রেগা পুরস্কার। এটা খুবই ভালো লক্ষণ। কারণ আমাদের জন্য— রোমানীয় লেখকদের জন্য— ইতালিতে বহু রোমানীয় থাকা সত্ত্বেও বোধগম্য না হওয়াটা দুঃখজনক হয়ে দাঁড়াবে। রোমানীয়দের বিপুল অভিবাসন ঘটেছিল— এখন ইতালিতে তিন মিলিয়ন রোমানীয় রয়েছে, আর স্পেনে আছে দুই মিলিয়ন।

প্রশ্ন: আপনার লেখা এই পাঠকদের কাছে পৌঁছবে বলে আশা করছেন?

মির্চা কার্তেরেস্কু: আমার ধারণা, সেটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, হ্যাঁ।