জর্জ প্লিম্পটন ১৯৫৪ সালের মে মাসে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সাক্ষাত্কার নেন। এটি প্রকাশিত হয় আরো চার বছর পর ১৯৫৮ সালের বসন্তে, প্যারিস রিভিউতে।
হেমিংওয়ের জন্ম ২১ জুলাই, ১৮৯৯ সালে; ২ জুলাই ১৯৬১ সালে তিনি আত্মহনন করেন।
হেমিংওয়ে ১৯৫৪ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী।
তার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে: দ্য সান অলসো রাইজেস (১৯২৬), ফেয়ারওয়েল টু আর্মস (১৯২৯), ফর হুম দ্য বেল টোলস (১৯৪০) এবং দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি (১৯৫১)।
হেমিংওয়ের কথা: ম্যান ইজ নট মেইড টু ডিফিট— মানুষকে পরাজয়ের জন্য সৃষ্টি করা হয়নি।
প্রশ্ন: (আপনার লেখালেখির) প্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছু বলবেন কি? আপনি কখন কাজ করেন? আপনি কি খুব কঠোরভাবে এই রুটিন অনুসরণ করেন?
হেমিংওয়ে: যখন আমি একটি বই কিংবা একটি গল্পের ওপর কাজ করি, প্রতিদিন যতটা সম্ভব দিনের প্রথম আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই কাজে বসে যাই। তখন বিরক্ত করার কেউ নেই। যখন কাজের শুরু, আপনি ঠাণ্ডা ও শীতল আর কাজ করতে করতে উষ্ণ হয়ে উঠবেন। যা লিখেছেন তা পড়ে ফেলুন, এরপর কী ঘটতে যাচ্ছে, সেখান থেকে আপনি কোথায় যাবেন, তা যদি জানেন, তাহলে আপনি থামতে পারেন। লেখার মসলা ও তাড়না যতক্ষণ আছে চালিয়ে যান আর পরের বিষয়টুকু যখন আপনি জানেন, নেমে পড়ুন, দিনটা পার করে কাল আবার বসে পড়বেন। ধরুন সকাল ৬টায় শুরু করলেন, তাহলে দুপুর পর্যন্ত চালিয়ে যান কিংবা তার আগেও থামতে পারেন। এই ব্যাপারটা আপনার ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে সঙ্গমের মতো। কোনো কিছুই আপনাকে আঘাত করতে পারে না, কিছুই ঘটতে পারে না— অন্তত আগামীকাল পর্যন্ত— আগামীকালের প্রতীক্ষাটিও কঠিন।
প্রশ্ন: আপনি যে প্রকল্প নিয়েই কাজ করুন না কেন, টাইপরাইটার থেকে উঠে আসার পর ওটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারেন কি?
হেমিংওয়ে: অবশ্যই। এটা করতে এক ধরনের শৃঙ্খলা দরকার এবং তা অর্জন করতে হয়। তা করতেই হয়।
প্রশ্ন: আগের দিন লেখাটা যেখানটায় ছেড়ে এলেন, তা পড়ার সময় কি পুনর্লিখন করেন? নাকি শেষ হওয়ার পর?
হেমিংওয়ে: যেখানটাতে এসে আমি থামি, প্রতিদিনই আমি তাতে কিছু পুনর্লিখন করে থাকি। কাজটা শেষ হওয়ার পর তো স্বাভাবিকভাবেই দেখতে হয়। যখন অন্য কেউ টাইপ করে দেয়, আপনি সংশোধন ও পুনর্লিখনের একটা সুযোগ পান— এটাকে পরিচ্ছন্ন টাইপ-মুদ্রিত অবস্থায় তখন দেখতে পান। শেষ সুযোগ প্রুফ দেখার সময়। এসব বিভিন্ন ধরনের সুযোগের জন্য আপনি কৃতজ্ঞ বোধ করবেন।
প্রশ্ন: আপনি কতটা পুনর্লিখন করে থাকেন?
হেমিংওয়ে: লেখার ওপর নির্ভর করে। আমার ‘ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ উপন্যাসের শেষ পৃষ্ঠাটি ৩৯ বার পুনর্লিখনের পর আমি তৃপ্ত হয়েছিলাম।
প্রশ্ন: কোনো টেকনিক্যাল সমস্যা ছিল কি? কোনো কারণে আপনি আটকে পড়েছিলেন?
হেমিংওয়ে: সঠিক শব্দ খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
প্রশ্ন: পুনর্পাঠের কারণেই কি ‘তাড়না’ বেড়ে যায়?
হেমিংওয়ে: পুনর্পাঠ আপনাকে সঠিক জায়গাটা চিনিয়ে দেয়, যেখানে লেখাটা পৌঁছাতে চায়— যতটা নিয়ে যেতে পারেন, ততই ভালো। তাড়না সর্বত্রই রয়েছে।
প্রশ্ন: কিন্তু এমন সময় আসে, যখন কোনো প্রেরণাই থাকে না?
হেমিংওয়ে: স্বাভাবিক। কিন্তু থামার সময় আপনি যদি জানেন এরপর কী ঘটতে যাচ্ছে, তাহলে তো সমস্যা নেই। শুরু করতে পারলেই হলো। তাড়না-রস এসে যাবে।
প্রশ্ন: দিনের কাজ ঠিকঠাক চালিয়ে যাওয়ার জন্য থর্নটন ওয়াইল্ডার স্মৃতিসহায়ক কোনো কিছু ব্যবহার করার কথা বলেছেন। আপনি নাকি একবার তাকে বলেছেন, লেখার জন্য আপনি কুড়িটি পেন্সিল ধার করিয়ে রাখেন।
হেমিংওয়ে: আমার মনে হয় না, কোনো কালে আমার কুড়িটি পেন্সিল ছিল। আমার দিনের কাজের জন্য দুটো সাত নম্বর পেন্সিলই যথেষ্ট।
প্রশ্ন: আপনার কাজের জন্য কোন জায়গাগুলো ভালো মনে হয়েছে? ওখানে লেখা বইয়ের সংখ্যার কথা বিচার করলে অ্যাম্বোস মুন্ডোস হোটেল নিশ্চয়ই এগুলোর একটি। আশপাশের পরিবেশ কি লেখার ওপর প্রভাব ফেলে?
হেমিংওয়ে: হাভানার অ্যাম্বোস মুন্ডোস নিশ্চয়ই একটি চমত্কার স্থান। এই ফিনকাও চমত্কার কিংবা একসময় চমত্কার ছিল, আমি সব জায়গাতেই বেশ কাজ করেছি। তার মানে আমি বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কাজ করার মানুষ। তবে টেলিফোন ও দশর্নাথী কাজের ১২টা বাজিয়ে দেয়।
প্রশ্ন: ভালো লেখার জন্য আবেগের স্থিতিশীলতা জরুরি? আপনি আমাকে বলেছিলেন, আপনি যখন প্রেমে পড়েন, তখনই কেবল লিখতে পারেন। এর কি আরো খানিকটা ব্যাখ্যা দেবেন?
হেমিংওয়ে: প্রশ্নের কী বাহার! তবে চেষ্টা করার জন্য পুরো নম্বর। মানুষ যখন আপনাকে নিঃসঙ্গ ছেড়ে যাবে, বিরক্ত করতে আসবে না, আপনি যখন ইচ্ছা লিখতে পারবেন অথবা আপনি যদি এ ব্যাপারে কাঠখোট্টা আচরণ করতে পারেন, তাহলেও লিখতে পারবেন। তবে আপনার শ্রেষ্ঠ লেখাটি আসবে যখন আপনি প্রেমে পড়বেন। সবটাই যদি আপনার কাছে একই রকম মনে হয়, তাহলে এ ব্যাপারে আর ব্যাখ্যা দিতে চাই না।
প্রশ্ন: অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে কী বলবেন? এটা কি ভালো লেখার অন্তরায় হতে পারে?
হেমিংওয়ে: ব্যাপারটা যদি বেশি আগেভাগেই এসে যায়, আর যদি জীবনটাকে আপনার কাজের মতোই ভালোবাসেন, তাহলে এ লোভ ঠেকাতে কঠোর চরিত্রের মানুষ হতে হবে। লেখালেখিটাই যখন আপনার মুখ্য পাপ এবং সবচেয়ে বড় আনন্দ হয়ে উঠবে, কেবল মৃত্যুই পারবে এটাকে ঠেকাতে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অবশ্যই বড় সাহায্য, কারণ এটা আপনাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত রাখবে। দুশ্চিন্তা লেখার ক্ষমতা নিঃশেষ করে দেয়। আনুপাতিকভাবে দুর্বল শরীরও খারাপ, এতে উদ্বেগের জন্ম হয়, যা আপনার অবচেতনকে আঘাত করে এবং আপনার অর্জন ও সংরক্ষিত শক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়।
প্রশ্ন: আপনি কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তের কথা মনে করতে পারছেন, যখন আপনি লেখক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?
হেমিংওয়ে: না, আমি সবসময়ই লেখক হতে চেয়েছি।
প্রশ্ন: ফিলিপ ইয়ং আপনাকে নিয়ে লেখা তার বইতে লিখেছেন, ১৯১৮ সালে আপনার ওপর মর্টার শেলের আঘাতের কারণে যে আতঙ্কজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, লেখক হিসেবে আপনার ওপর এর বেশ প্রভাব পড়েছে। আমার মনে পড়ে, আপনি এ বিষয়ে মাদ্রিদে কিছু বলেছিলেন— ফিলিপ ইয়ংয়ের কথার যথার্থতা সামান্যই; আপনি বলেছেন শিল্পীর হাতিয়ার অর্জিত কিছু নয়, গ্রেগর ম্যান্ডেল যে অর্থে উত্তরাধিকার সূত্র দিয়েছেন, সে রকম বংশগুণে প্রাপ্ত।
হেমিংওয়ে: স্পষ্টতই সে বছর মাদ্রিদে আমার মন খুব সুস্থিত ছিল না। তখন একমাত্র যা বলার ছিল তা হচ্ছে— সাহিত্যে ইয়ং সাহেবের ট্রমা তত্ত্ব। সম্ভবত দুটি আঘাত এবং মাথার করোটিতে একটি ফাটল সে বছর আমাকে দিয়ে এই দায়িত্বহীন বক্তব্য প্রদান করিয়েছে। আমার মনে আছে, আমি বলেছিলাম কল্পনাশক্তি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত গোত্রীয় অভিজ্ঞতা থেকে সৃষ্ট। আঘাত-পরবর্তী হালকা বাতচিত হিসেবে এটা ঠিকই আছে, আমিও তা-ই মনে করি। কাজেই ট্রমা থেকে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত ব্যাপারটা ওখানেই থাকুক। আমি হয়তো এজন্য আমার কোনো আত্মীয়কে দায়ী করে কিছু বলে থাকতে পারি— সেসব প্রসঙ্গ না তোলার জন্য ধন্যবাদ। আপনি যে প্রশ্ন তুলেছেন, যুদ্ধে আঘাতের ফলে তারতম্য থাকতে পারে। সামান্য আঘাত, যাতে হাড়গোড় ভাঙে না, তা অনেক সময় আত্মশক্তি বাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু যে ক্ষত অস্থি ও স্নায়ুর বড় ধরনের ক্ষতি করে, তা লেখকদের জন্য মোটেও ভালো কিছু নয়, কারো জন্যই নয়।
প্রশ্ন: যিনি আগামীর লেখক, তার জন্য সবচেয়ে ভালো বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশিক্ষণ কী হতে পারে বলে আপনি বিবেচনা করেন?
হেমিংওয়ে: বরং এভাবে বলি, তাকে বাইরে আসতে এবং গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়তে দিন। কারণ ভালো লেখা তার পক্ষে অসম্ভব রকম কঠিন। দয়ামায়াহীনভাবে কেটে টুকরো করে তাকে বাধ্য করা যেন বাকি জীবন যতটা সম্ভব ভালো লিখতে সে নিজেকে বাধ্য করে। তাহলে অন্তত শুরু করার জন্য গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ার গল্পটা তো তিনি পাবেন!
প্রশ্ন: যারা জীবিকার জন্য শিক্ষকতার পেশাকে বেছে নিয়েছেন, তাদের ব্যাপারে কী বলবেন? লেখকদের অনেকেই যারা শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত, তারা কি তাদের সাহিত্যজীবনের সঙ্গে আপস করে চলছেন?
হেমিংওয়ে: আপস বলতে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন, এটা তার ওপর নির্ভর করছে। এটাতে কি আপস করা নারীর কথা বলছেন? নাকি রাষ্ট্র পরিচালকদের আপস? নাকি আপনার মুদি বা দর্জির সঙ্গে আপস যে, আপনি পয়সা কিছু বেশিই দেবেন কিন্তু দেবেন পরে? একজন লেখক যিনি লেখেন এবং পড়ান, তাকে দুটো কাজই ভালোভাবে করতে হবে। বহু যোগ্য লেখক প্রমাণ করেছেন, তা করা সম্ভব। আমি জানি, আমি এটা করতে পারতাম না, কিন্তু যারা পেরেছে আমি তাদের প্রশংসা করি। আমি মনে করি, শিক্ষকতার জীবন বাইরের অভিজ্ঞতার ছেদ ঘটিয়ে পৃথিবী সম্পর্কে জ্ঞানের প্রবৃদ্ধিকে সীমিত করে দিতে পারে। জ্ঞান লেখকের কাছ থেকে আরো দায়িত্বজ্ঞান দাবি করে এবং তার লেখালেখির কাজটাকে কঠিন করে দেয়। প্রকৃত লেখার কাজে দিনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা ব্যয় হলেও স্থায়ী মূল্যের লেখালেখি পূর্ণকালীন কাজ। লেখককে ইঁদারার সঙ্গে তুলনা করা যায়— অনেক ধরনের যেমন লেখক, ইঁদারার তেমনি অনেক ধরন। জরুরি কাজটি হচ্ছে, ইঁদারা থেকে ভালো পানি তুলে আনা। কাজেই পানি তুলে শুকিয়ে ফেলে আবার পানি এসে তা ভরাট করার জন্য অপেক্ষা করার চেয়ে নিয়মিত পানি তোলা বেশি ভালো। দেখুন আমার মনে হচ্ছে, আমি প্রশ্ন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। তবে প্রশ্নটিও তেমন মজার কিছু ছিল না।
প্রশ্ন: তরুণ লেখকের জন্য আপনি কি সংবাদপত্রের চাকরির কথা বলবেন? কানসাস সিটি স্টার পত্রিকায় আপনার প্রশিক্ষণ কতটা কাজে লেগেছে?
হেমিংওয়ে: স্টারে কাজ করার সময় আমি সরল স্পষ্ট ঘোষণামূলক বাক্য লিখতে বাধ্য হয়েছি। এটা যে কারোর জন্য উপকারী। সংবাদপত্রের কাজ তরুণ লেখকদের জন্য ক্ষতিকর নয়, তবে যদি ঠিক সময় সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে তাহলে বরং ভালো। এটা অনেকটা বহুলচর্চিত বাজে কথার মতো হয়ে গেল। আপনি আমাকে পুরনো জরাজীর্ণ, ক্লান্তিকর প্রশ্ন করলে এমন উত্তরই পাবেন।
প্রশ্ন: ট্রান্সআটলান্টিক রিভিউতে আপনি একবার লিখেছেন, সাংবাদিকতা করার একমাত্র ভালো পয়সাকড়ি পাওয়া। আপনি বলেছেন, ‘আপনার ভালো যা কিছু আছে, সে সম্পর্কে লিখে যখন এগুলো ধ্বংস করেন, তার বদলে ভালো কামাতে চান।’ আপনি কি মনে করেন, লেখালেখি এক ধরনের আত্মবিনাশী কাজ?
হেমিংওয়ে: এমন কিছু কখনো লিখেছি বলে মনে পড়ছে না। নখ কামড়ানো এবং ভালো কোনো বক্তব্য দেয়ার বদলে এমন কথা হাস্যকর ও সহিংস শোনাচ্ছে। আমি অবশ্যই মনে করি না যে, লেখালেখি আত্মবিধ্বংসী কোনো কাজ। তবে সাংবাদিকতা একটা পর্যায়ের পর সিরিয়াস সৃজনশীল লেখকের বেলায় নিত্যদিনই আত্মবিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারে।
প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন, অন্য লেখকদের বুদ্ধিবৃত্তিক সান্নিধ্য একজন লেখকের জন্য মূল্যবান হতে পারে?
হেমিংওয়ে: অবশ্যই।
প্রশ্ন: কুড়ির দশকের প্যারিসে আপনি কি অন্য লেখক ও শিল্পীদের সঙ্গে ‘গোষ্ঠীগত টান’ অনুভব করতেন?
হেমিংওয়ে: না, গোষ্ঠীগত কোনো টান ছিল না। আমাদের পরস্পরের জন্য শ্রদ্ধা ছিল। আমি অনেক শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলাম। তাদের কেউ কেউ আমার বয়সী, অন্যরা বয়সে বড়। গ্রিন, পিকাসো, ব্রক, মনে (তিনি তখনো জীবিত) এবং কিছু লেখক: জয়েস, এজরা, স্টেইনের ভালো কিছু...।
প্রশ্ন: আপনি যখন লিখছেন, সে সময় আপনি যা পড়ছেন তা আপনার লেখাকে প্রভাবিত করে বলে কি আপনি মনে করেন?
হেমিংওয়ে: জেমস জয়েসের ইউলিসিস লেখার আগে পর্যন্ত এমনটা ঘটেনি। তিনি আমার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেননি। সেই দিনগুলোয় যখন আমরা জানতাম কিছু শব্দ আমাদের জন্য নিষিদ্ধ, যখন প্রতিটি শব্দের জন্য আমাদের লড়াই করতে হতো, জয়েসের প্রভাব সবকিছু বদলে দিয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞার বিধিবিধান ভেঙে ফেলতে আমাদের সক্ষম করে তুলেছে।
প্রশ্ন: লেখকদের কাছ থেকে লেখা সম্পর্কে কিছু কি শিখতে পেরেছেন? যেমন গতকাল আপনি আমাকে বলেছেন, জয়েস লেখালেখি নিয়ে কথা বলাটা পছন্দই করতেন না।
হেমিংওয়ে: আপনি যখন নিজ পেশার লোকজনের সান্নিধ্যে, তখন আপনি সাধারণত অন্যদের বইপত্র নিয়ে আলাপ করবেন। জয়েস অনেক বড় লেখক, তিনি কী লিখছেন, তার ব্যাখ্যা দিতেন কেবল বোকাসোকাদের; অন্য লেখক— যাদের তিনি সমীহ করতেন, তারা তো জয়েসের লেখা পড়েই জেনে নিতেন।
প্রশ্ন: শেষদিকে আপনি লেখকদের সান্নিধ্য এড়িয়ে চলেছেন বলে মনে হচ্ছে। কারণটা কী?
হেমিংওয়ে: ওই ব্যাপারটা আরো জটিল, আপনি লেখালেখির যত ভেতরে যাবেন, আপনি ততই নিঃসঙ্গ হয়ে উঠবেন।
আপনার সবচেয়ে ভালো ও পুরনো বন্ধুরা মরে গেছেন। কদাচিৎ কারো সঙ্গে দেখা হয়, কিন্তু আপনি লিখে যাচ্ছেন, ফলে অনেকের সঙ্গে আপনার যোগাযোগটি রয়ে যায়— যেমন সেই পুরনো দিনগুলোয় আপনারা ছিলেন ক্যাফের আড্ডায়। আপনি তাদের সঙ্গে কৌতুক করছেন, মজাদার দায়িত্বহীন অশ্লীল চিঠিপত্র বিনিময় করছেন— এ তো সামনাসামনি কথা চালাচালি করার মতোই। কিন্তু আপনি যে আরো নিঃসঙ্গ, কারণ আপনাকে লিখতে হবে। আর কাজ করার সময় তো সবসময়ই সংক্ষিপ্ত; আপনি যদি এ সময়ের অপচয় করেন, তাহলে আপনি পাপ করলেন, যে পাপের কোনো ক্ষমা নেই।
প্রশ্ন: আপনার সমকালীন এ মানুষগুলোর কতটা প্রভাব আপনার কাজের ওপর; গাট্রুড স্টেইনের যদি কোনো অবদান থেকে থাকে, তা কী? কিংবা এজরা পাউন্ড? কিংবা (মার্কিন বুক এডিটর) ম্যাক্স পার্কিনস?
হেমিংওয়ে: আমি দুঃখিত। ময়নাতদন্তের কাজে আমি দক্ষ নই। এ ধরনের কাজ করার জন্য সাহিত্যবিষয়ক এবং সাহিত্যবহির্ভূত বিষয়ের মুর্দাফরাশ রয়েছে। মিস স্টেইন যথেষ্ট ভুলভ্রান্তি মিলিয়ে আমার লেখায় তার প্রভাব নিয়ে বেশ বড়সড় একটা লেখা ছেড়েছেন। এটা করা তার জন্য জরুরিই ছিল, কারণ ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’ নামের বইটি থেকে কথোপকথন কেমন করে লিখতে হয় তা শিখেছেন। আমি তাকে খুব পছন্দ করতাম এবং ভাবলাম তিনি যখন কথোপকথন লেখা শিখেছেন, ভালোই হলো। জীবিত হোন কি মৃত, কারো কাজ থেকে শেখা আমার জন্য নতুন কিছু নয়; তবে এটা যে গাট্রুডকে এত সহিংসভাবে নাড়া দিয়েছে, সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। অন্যদিকে তিনি কিন্তু বেশ ভালোই লিখছিলেন।
৩৫ বছর আগেকার নোংরা কাপড় পরিষ্কার করতে গিয়ে পেছন দরজার সাহিত্য আলোচনা আমার কাছে অরুচিকর মনে হয়। যদি পুরো সত্যটা কেউ বলতেন, তাহলে অন্য রকম শোনাত, তার একটা মূল্য দাঁড়াত। এখানে বরং ব্যাপারটাকে সহজ করে ফেলি, শব্দের বিমূর্ত সম্পর্ক নিয়ে আমি তার কাছ থেকে যা শিখেছি, সেজন্য গাট্রুডকে ধন্যবাদ জানাই। বলতে চাই, আমি তাকে কত পছন্দ করতাম, বড় কবি ও বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে এজরার প্রতি আমার আনুগত্য আবার নিশ্চিত করছি, আর ম্যাক্স পার্কিনসকে আমি এতটাই পছন্দ করতাম যে, তার মৃত্যু আমি কখনো মেনে নিতে পারিনি। আমার লেখার অমুদ্রণযোগ্য কয়েকটি শব্দ ছাড়া কোনো কিছু তিনি আমাকে পাল্টাতে বলেননি। সেই জায়গাগুলো ফাঁকা রাখা হয়েছে। আর সেই শব্দগুলো যাদের জানা, তারা জানতেন কেমন করে ফাঁকা জায়গা পূরণ করতে হবে। আমার বেলায় তিনি সম্পাদক নন, তিনি একজন বিজ্ঞ বন্ধু এবং একজন বিস্ময়কর সঙ্গী। তিনি যেভাবে মাথায় হ্যাট পরতেন এবং যে অদ্ভুতভাবে ঠোঁট নাড়তেন, আমার ভালো লাগত।






