শ পাঁচেক বছর আগে গুটেনবার্গ আধুনিক প্রিন্টিং প্রেস আবিষ্কার করেছিলেন। এর ফলে বই ও বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে চলে আসে। তারপর দুনিয়ার যাবতীয় তথ্য সবার হাতে পৌঁছে দিতে গুগলের মতো ভূমিকা আর কেউ রাখেনি। গুগলের নানা রঙের লোগোটি কিন্তু শিশুসুলভ, ব্যাকগ্রাউন্ড একেবারে সাদা। কিন্তু এ সাদামাটা চেহারাই দুনিয়ার যেকোনো তথ্য মুহূর্তেই মানুষের সামনে হাজির করে। তথ্য ও খবরে মানুষের প্রবেশের ধারণাকেই আমূল বদলে দিয়েছে গুগল। মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখন গুগল ছাড়া অচল। শতাধিক ভাষায় কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন গুগল ব্যবহার করছে। এ দেশে হোন্ডা আর মোটরসাইকেল যেমন সমার্থক ভাবা হয়, তেমনি দুনিয়ায় অনেক মানুষ ইন্টারনেট ও গুগলকে সমার্থক মনে করে। যেকোনো জিজ্ঞাসাকে কেবল কম্পিউটার বা ফোন থেকে গুগলে লিখলে চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই জবাব চলে আসে। তরুণরা এখন গুগল ছাড়া জীবনকে কল্পনাও করতে পারে না। গুগলকে বলা যায় মানুষের মস্তিষ্কের সম্প্রসারণ, যে মানুষের নির্দেশমতো নিজের সংশ্লিষ্ট বিষয়টি খুঁজে বের করে। ভাষা, সংস্কৃতি আর ভূগোলের ব্যবধান অতিক্রম করে গুগল এখন সবার প্রিয়।
একটি নতুন ফার্ম তার ব্র্যান্ডের প্রচারণার পেছনে কোনো অর্থ ব্যয় না করেও কীভাবে সফল হওয়া যায়, সে বিষয়ে গুগলের অর্জন দুনিয়ায় আর যে কারো চেয়ে সমৃদ্ধ। গুগলের সাফল্য এসেছে মানুষের মধ্যে তার সেবার সন্তুষ্টির ওপর ভিত্তি করে। মানুষ হয় তা বন্ধু বা অনলাইনে গুগল সম্পর্কে জেনেছে। এখানে ম্যাডিসন এভিনিউর বিপণন গুরুদের কোনো ভূমিকা ছিল না। এ অনিশ্চয়তা ভরা দুনিয়ায় বিনামূল্যে তথ্য সরবরাহ ব্যাপারটা নেহাত কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুগল ব্যবহারকারীদের অনেকেই হয়তো জানে না এর উদ্ভবের ইতিহাস। গুগল কেন এত দামি ব্র্যান্ড, কেনই বা এটি অন্য সার্চ ইঞ্জিনকে পেছনে ফেলে নিজেকে হিমালয়সম উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছে, সে গল্পটাও খুব সহজলভ্য নয়। দুনিয়ার অন্যতম সেরা কম্পিউটার বিজ্ঞানী স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জন হেনেসি গুগলের বোর্ড সদস্যদের একজন। তিনি বলেছেন, গুগল আজকের দুনিয়ায় অনন্য; অনেক দক্ষ সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার কোম্পানির মধ্যে গুগল দুই ক্ষেত্রেই শীর্ষ নাম। গুগল তার অনুসন্ধানসেবার ক্ষমতা বাড়াতে নিজের পেটেন্ট করা ও কাস্টমাইজড প্রোগ্রাম লক্ষ লক্ষ নিজস্ব ও কাস্টমাইজডে ব্যবহার করে। দুনিয়ার সেরা উদ্ভাবনী কোম্পানিটি যখন বিভিন্ন প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটায়, তখন মানুষ চোখের নিমেষে তার অনুসন্ধানের জবাব পেয়ে যায়। ইংরেজি ভাষায় এমন কোনো শব্দ ছিল না, যা দিয়ে এ বিপুল পরিসরে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের মিশ্রণকে বর্ণনা করা যায়, তাই এর নাম হয় গুগলওয়্যার। হেনেসি মনে করেন, গুগলকে যে বৈশিষ্ট্যটি অন্য কোম্পানিগুলো থেকে আলাদা করেছে সেটা হলো, তার কর্মীরা কোম্পানির পার্সোনাল কম্পিউটারগুলোকে নিজেরাই অ্যাসেম্বল ও কাস্টমাইজ করেন। এটাই বোধ হয় গুগলের সবচেয়ে বড় রহস্য। সাধারণত বিশেষজ্ঞরা পার্সোনাল কম্পিউটারকে সাধারণত ভোগ্যপণ্য হিসেবে গণ্য করেন, কিন্তু গুগল তাদের দুই লাখ সাধারণ দামের পিসিকে নিয়মিতভাবে মানোন্নয়ন করে। এসব কম্পিউটার রিফ্রিজারেটর সাইজের র্যাকে একটার ওপর আরেকটা রাখা হয়। নিজেদের পেটেন্ট করা সফটওয়্যার ও তার দিয়ে এসব পিসি নিজেদের মধ্যে যুক্ত থাকে। গুগলের চেয়ে শক্তিশালী কোনো কম্পিউটিং শক্তি দুনিয়ায় আর কারো নেই। হেনেসি জানান, ‘তারা দুনিয়ার সর্ববৃহৎ কম্পিউটার ব্যবস্থা পরিচালনা করে। আমি যতদূর জানি, তাদের ধারেকাছেও কেউ নেই।’
গুগল তাদের নেটওয়ার্কের প্রতিটি পিসিকে গোপনে অ্যাসেম্বল করে নিজেদের নিরাপত্তাবলয়ে রাখে। এসব কম্পিউটার যেকোনো বহিরাগতের জন্য অগম্য, এমনকি গুগলপ্লেক্সের ভিজিটররাও এ কম্পিউটারে কিছু করতে পারেন না। কেউ গুগলপ্লেক্সে ঘুরে মনে করতে পারেন, তিনি অনেক কিছু দেখে ফেলেছেন, কিন্তু আসলে মোটেই তা নয়। অন্যদের কাছ থেকে পিসি না কিনে নিজেরা অ্যাসেম্বল করে গুগল একদিকে যেমন নিজেদের খরচ কমায়, তেমনি অন্যদের বাজারের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন পিসি তৈরি করে। গুগলের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক অনুসন্ধানগুলোকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাগে বিভক্ত করে সেগুলোকে খুঁজে বের করে। গুগলের সাফল্যের পেছনে মূল ভূমিকা তাদের এই পিসি নেটওয়ার্কের। ‘দক্ষভাবে অনুসন্ধান করতে হার্ডওয়্যারই মূল ফ্যাক্টর। গুগল তাদের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক যে হারে বিস্তৃত করেছে, তা থেকে এ অনুমানের সত্যতা মেলে। কেউ যদি সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে গুগলকে টেক্কা দিতে চায়, তাহলে তার যে পরিমাণ মূলধন বিনিয়োগ করতে হবে, তা অনেকের কল্পনার অতীত।’
প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যেই গুগল দ্য সার্চ ইঞ্জিন গুগল দ্য মানি মেশিনে পরিণত হয়। তখনো গুগল প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান, শুরুর বিনিয়োগকারী ও কর্মীরা বাদে বাইরের আর কেউ এর অংশীদার হতে পারতেন না। কিন্তু শিগগিরই এর অবিশ্বাস্য বিকাশ ও বিজ্ঞাপন থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার উপার্জন শুরু হলে গুগলে বিনিয়োগ করতে বিনিয়োগকারীদের ভিড় লেগে যায়। ২০০৪ সালের ১৯ আগস্ট গুগল তার শেয়ার বাজারে ছাড়ে, ২ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার বিক্রি হয়। এটাই প্রযুক্তি খাতের সবচেয়ে বড় আইপিও সংগ্রহ। ১৯৯৮ সালে গুগল প্রতিষ্ঠার পরবর্তী সাত বছরে গুগলের আর্থিক ব্যালান্স তেমন বাড়েনি, কিন্তু এই একই সময়ে গুগলের শেয়ারের মূল্যমান হয় ৮০ বিলিয়ন ডলার।
গুগলের স্টক মূল্যমান বৃদ্ধি পাওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল: গুগলে বিনিয়োগ কি লাভজনক হবে নাকি ঝুঁকিপূর্ণ? ওয়াল স্ট্রিট বিশেষজ্ঞরা অবশ্য গুগলে বিনিয়োগ না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। গুগলের বেশ নামডাক হয়ে গেলেও তখনো তাদের কোম্পানিতে বিনিয়োগ নিয়ে সবাই দ্বিধার মধ্যে ছিলেন। কিন্তু বাল্টিমোরের বিল মিলার একটু ভিন্ন চিন্তা করলেন। তিনি গুগলের ভবিষ্যতে আস্থা রাখলেন। তার লেগ ম্যাসন ভ্যালু ট্রাস্ট আইপিওতে গুগলের ৪০ লাখের বেশি শেয়ার কিনে নেন।
শুরুতে গুগলের প্রতিষ্ঠাতা স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক সের্গেই ব্রিন ও ল্যারি পেজ তাদের গুগল মাত্র ১ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। আলটা ভিস্তা, ইয়াহু এবং আরো অনেক বড় সার্চ ইঞ্জিন ও টেকনো জায়ান্ট তখন গুগলের প্রতি আগ্রহ দেখায়নি। এ প্রত্যাখ্যানের পর ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও সের্গেই ও ল্যারি তাদের পিএইচডি ডিগ্রি বাদ দেন এবং নিজেদের ফার্ম নিয়ে কাজ শুরু করেন। ২০০৫ সাল নাগাদ এ দুজনের প্রত্যেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থের মালিক হয়ে যান। বর্তমানে সের্গেই ও ল্যারির সম্পদের পরিমাণ ৪৬ ও ৪৭ বিলিয়ন ডলার, তারা দুজন দুনিয়ার ১২ ও ১৩তম শীর্ষ ধনী।
হেনেসি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ১৯৯০ দশকের মাঝামাঝি তিনি গুগলের নাম শুনতে পান। তিনি তখন দুনিয়ার অন্যতম কম্পিউটার বিজ্ঞানী। ব্রিন ও পেজের মতো তিনিও তখন সার্চ ইঞ্জিন আলটা ভিস্তা ব্যবহার করে বিরক্ত ছিলেন। যদিও সে সময় এটাই ছিল সেরা সার্চ ইঞ্জিন। তিনি শুনতে পান, তার ক্যাম্পাসেরই দুই ছাত্র পেজর্যাংক নামে একটি নতুন গাণিতিক সূত্র দিয়ে একটি সার্চ ইঞ্জিন তৈরি করেছে। এই দুই ছাত্র হচ্ছেন ব্রিন ও পেজ। নুতন সেই সার্চ ইঞ্জিনকে পরীক্ষা করার জন্য হেনেসি সার্চ বক্সে তার নাম টাইপ করলেন এবং দেখলেন, শুরুতে পর্দায় ভেসে উঠল স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। এটা এতদিন হেনেসি আর কোনো সার্চ ইঞ্জিনে পাননি।
ল্যারি বেশ কয়েক বছর আগে গুগল তৈরিতে তাদের প্রচেষ্টার গল্প শুনিয়েছিলেন, ‘গুগল শুরু হয়েছিল, যখন আমি আর সের্গেই স্ট্যানফোর্ডে কম্পিউটার সায়েন্সে পিএইচডির ছাত্র। আসলে আমরা জানতাম না, ঠিক কী করতে যাচ্ছি। মাথায় পাগলামি চেপেছিল যে, পুরো ওয়েব আমি আমার কম্পিউটারে ডাউনলোড করব। আমার অ্যাডভাইজারকে বললাম, এটা করতে বড়জোর এক সপ্তাহ সময় লাগবে। কিন্তু প্রায় এক বছর পর দেখা গেল, আমি ওয়েবের সামান্য অংশই ডাউনলোড করতে পেরেছি। তাই আশাবাদী থাকা একটা জরুরি বিষয়।’
ল্যারি ও সের্গেইয়ের সাক্ষাৎ হয়েছিল ১৯৯৫ সালের বসন্তকালে। নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন পার্থক্য সত্ত্বেও তারা তাদের আগ্রহের মিলটা বুঝতে সময় নেননি। সের্গেই আগে থেকেই স্ট্যানফোর্ডের শিক্ষার্থী ছিলেন। ল্যারির ওরিয়েন্টেশনের দিন সের্গেই তাদের ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন। এ সময় কিছু চলমান বিষয় নিয়ে ল্যারি আর সের্গেইয়ের মধ্যে তর্ক বেধে গেল। অপরিচিত দুজনের মধ্যে এভাবে তর্ক শুরু হয়ে যাওয়াটা নিশ্চয়ই সুখের বিষয় নয়। কিন্তু তারা দুজনই সেই তর্ক বেশ উপভোগ করছিলেন। সের্গেই ল্যারির চেয়ে বয়সে ছোট ছিলেন। সের্গেই ছিলেন গণিতে পারদর্শী। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই তিনি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কোর্স শেষ করেন। এরপর স্ট্যানফোর্ডে পিএইচডির জন্য দরকারি সব পরীক্ষা একবারে পাস করে যান। ফলত অধ্যাপকরা তাকে গবেষণায় যুক্ত করতে আগ্রহী হয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে সের্গেই জিমন্যাস্টিক, সাঁতার ও নানা ধরনের সামাজিক কাজে ব্যস্ত থাকতেন। অবশ্য কম্পিউটার আর গণিতও ছিল তার নিত্যসঙ্গী। সের্গেইয়ের জন্ম রাশিয়ায়, এক ইহুদি পরিবারে। সের্গেইয়ের বাবা বুঝতে পারছিলেন রাশিয়ায় তার পক্ষে ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব নয়। তাই সত্তরের দশকের শেষদিকে সের্গেইয়ের পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে এসে থিতু হয়। তার বাবা পরবর্তীতে মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক হন আর মা নাসায় গবেষকের কাজ করেন। এখানে একটি তথ্য উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, উনিশ শতকের মধ্যভাগের পর রাশিয়া থেকে বিতাড়িত ইহুদিরা পাড়ি জমিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। এবং তারাই পরবর্তীকালে দুনিয়ার অর্থনীতি ও রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী ‘আমেরিকান জিউস সোসাইটি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
ল্যারির মা ছিলেন ইহুদি আর তার বাবার ধর্ম ছিল প্রযুক্তি। ল্যারির বাবা ছিলেন কম্পিউটার সায়েন্সের একজন অধ্যাপক। সে যুগে কম্পিউটার সায়েন্সের একজন অধ্যাপককে বাবা হিসেবে পাওয়ায় ল্যারি সবসময় নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন। তাদের বাসায় প্রথম কম্পিউটারের প্রবেশ সেই ১৯৭৮ সালে। ল্যারি স্মৃতিচারণে লিখেছেন, ‘কম্পিউটারটা আকারে বেশ বড় ছিল। অনেক টাকাও লেগেছিল কিনতে। এটা কেনার পর টাকার অভাবে আমাদের খাওয়াদাওয়ার মান কমে গিয়েছিল। আমি সবসময় কম্পিউটার পছন্দ করি। কারণ আমার মনে হয়, কম্পিউটার দিয়ে অনেক কিছু করা যায়।’
১৯৯৩ সালে সের্গেই স্ট্যানফোর্ডে পা রাখার পর থেকে তার উপদেষ্টা ছিলেন ৩০ বছর বয়সী অধ্যাপক রাজীব মাতওয়ানি। ল্যারি ও সের্গেইয়ের মধ্যকার বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক অধ্যাপক রাজীবের চোখে পড়েছিল, তিনি এজন্য তাদের ভালোবাসতেন। তার কথায়, ‘তারা দুজনই ছিলেন মেধাবী, আমার দেখা সবচেয়ে স্মার্ট মানুষদের মধ্যে অন্যতম।’ তবে দুজনের দক্ষতা ছিল ভিন্ন। সের্গেই হলেন বাস্তব সমস্যা সমাধানে পারদর্শী প্রকৌশলী। গণিতে তার মস্তিষ্ক ক্ষুরধার। সের্গেই কিছুটা চঞ্চল আর ল্যারি ভাবুক প্রকৃতির মানুষ। সের্গেই দরকার হলে নক না করেই অধ্যাপক রাজীবের কক্ষে ঢুকতেন আর ল্যারি অতি অবশ্যই নক করে যেতেন।
১৯৯৮ সালে দুনিয়ার সেরা সার্চ ইঞ্জিন তৈরি করতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নেন সের্গেই ও ল্যারি। নিজেদের কম্পিউটার, গ্যাজেট ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে তার একটি বাড়ির গ্যারেজ ও কয়েকটি রুমে ওঠেন। বাড়িওয়ালা সের্গেইকে চিনতেন আগে থেকেই। মাসে দেড় হাজার ডলারেই তারা দরকারি গ্যারেজ ও কক্ষগুলো ভাড়া নিতে পারতেন। কিন্তু তারা ১ হাজার ৭০০ ডলার দিতেন, যাতে সব ধরনের ফি ও কর ঠিকঠাক দেয়া হয়। শুরু থেকেই তারা তাদের ব্যবসাকে নিষ্কলুষ রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। ৭ সেপ্টেম্বর তারা আনুষ্ঠানিকভাবে গুগল কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর তারা নিজেদের প্রথম ব্যাংক অ্যাকাউন্ট চালু করেন এবং তাতে জার্মান ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী অ্যান্ডি বেখটলশাইমের দেয়া ১ লাখ ডলারের চেকটি জমা করেন। তারা তাদের এক বন্ধু, স্ট্যানফোর্ডের আরেক পিএইচডি ছাত্র, ক্রেগ সিলভারস্টেইনকে কোম্পানির প্রথম কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেন।
২০০২ সালে গুগল বিরাট অর্থনৈতিক সাফল্য পায়। আমেরিকান অনলাইন ২০০২ সালের ১ মে গুগলকে তাদের সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে গ্রহণ করে। আমেরিকান অনলাইনের নেটওয়ার্কে প্রায় সাড়ে তিন কোটি গ্রাহক ছিলেন। গুগল তখন সবেচেয়ে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সার্চ ফলাফল দিতে শুরু করে। ফলে মানুষের মধ্যে গুগল নিয়ে আগ্রহ বাড়তে থাকে।
২০০৪ সালের বসন্তে গুগলের ব্যবসা রমরমা। তখন গ্রাহকদের চমকে দিতে ল্যারি ও সের্গেই নতুন একটি ই-মেইল তৈরি করেন। গুগলের নামের সঙ্গে মিল রেখে নতুন এ ই-মেইলের নাম দেয়া হয় জিমেইল। গুগলের বিনিয়োগকারী মাইকেল মরিটজ বেশ কয়েক বছর থেকেই বলে আসছিলেন যে, সাধারণ মানুষ অনলাইনে মূলত যোগাযোগ ও তথ্যের খোঁজ করে। সবাইকে চমকে দিতে জিমেইলের খবর গুগলপ্লেক্সেই সীমাবদ্ধ ছিল। মাইক্রোসফট, ইয়াহু, এওএল এবং অন্যদের সার্ভিসের চেয়ে ভালো কিছু দিতে না পারলে জিমেইল সফল হতে পারবে না, এটা সবাই জানতেন। তাই জিমেইলকে অন্য মেইলগুলোর চেয়ে বেশি স্মার্ট, সহজ, সস্তা হিসেবে হাজির করা হয়। আর তা না হলে একদিকে যেমন গুগল ব্যবহারকারীরা হতাশ হতো, তেমনি গুগলের নিজেদের মানও রক্ষা হতো না। প্রতিদ্বন্দ্বীদের ঘায়েল করতে কৌশল নিয়ে গুগলপ্লেক্সে জিমেইল টিম দীর্ঘদিন আলোচনা চালায়। জিমেইলকে হিট করতে ব্যবহারকারীদের ১ হাজার মেগাবাইট ফ্রি স্পেস দেয়া হয়, যা তখন মাইক্রোসফটের চেয়ে ৫০০ গুণ ও ইয়াহুর চেয়ে ২৫০ গুণ বেশি।
গুগল সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছে একেবারে বিনামূল্য। এর বিলিয়ন ডলার আয় আসে বাই-প্রডাক্ট ধরে। ইন্টারনেট ব্যবহার ও অনলাইন বিজ্ঞাপন যতদিন অব্যাহত থাকবে, গুগলের আর্থিক প্রবৃদ্ধিও নিশ্চিত থাকবে। আর ইন্টারনেট যে সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে গেছে, সে তো আর জানার বাকি নেই।
গুগল এখন সেই প্রতিষ্ঠান, যেখানে দুনিয়ার সেরা ও সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রকৌশলীরা জড়ো হচ্ছেন। তারা তাদের বিশ্ববিদ্যালয়, নাসা, বেল ল্যাবস, মাইক্রোসফট এবং আরো অনেক প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যোগ দিচ্ছেন গুগলে। গুগল কোনো প্রথাগত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তরের মতো নয়, বরং এটা একটা গতিশীল উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো। ব্রিন ও পেজ প্রতিনিয়ত দক্ষ গণিতবিদ, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের জড়ো করছেন তাদের গুগলপ্লেক্সে। গুগল মূলত বৈজ্ঞানিক, গণিতবিদ ও কম্পিউটার প্রযুক্তির সেরাদের মিলনমেলা।
আজকের দিনে ‘গুগল করা’ অর্থ ‘অনুসন্ধান করা’। একটি কোম্পানির নাম ইংরেজি, জার্মান ও আরো অনেক ভাষায় ক্রিয়াপদের মর্যাদা পেয়ে গেছে। দুনিয়ার সংস্কৃতিতে গুগলের প্রভাব বুঝতে এ বিষয়টি সহায়ক। তবে গুগল শব্দটি মূলত একটি গাণিতিক টার্ম। ১-এর পরে ১০০টি শূন্য বসিয়ে যে সংখ্যা তৈরি হয়, তাকেই গুগল বলা হয়।
গুগল ও তার প্রতিষ্ঠাতারা নীরবে ভবিষ্যৎ দুনিয়ার দুটি ক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছেন— মলিকুলার বায়োলজি ও জেনেটিকস। লক্ষ লক্ষ জিনের কম্বিনেশন বায়োলজিক্যাল ও সায়েন্টিফিক ডাটার সঙ্গে মিলিয়ে অনুসন্ধান গুগল সার্চ ইঞ্জিনের জন্য দুর্দান্ত দরকারি কাজ হতে পারে। আরো প্রায় ১০ বছর আগে গুগল মানুষের জিনোম মানচিত্র তাদের নেটওয়ার্কে যুক্ত করেছে। গুগল এ বিষয়ে বায়োলজিস্ট ড. ক্রেগ ভেন্টার ও অন্যদের সঙ্গে কাজ করছে। এ গবেষণার সাফল্য বিজ্ঞান, ওষুধ ও স্বাস্থ্য খাতকে চিরতরে বদলে দিতে পারে। সামনে এমন দিন আসবে, যখন মানুষ তার নিজের জিনের নকশা গুগল করে খুঁজে নেবে। ড. ভেন্টারের মতে, ‘এটা প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাতের সংযোগ, যা অসংখ্য মানুষকে ক্ষমতা ক্ষমতায়িত করবে। দুনিয়ার আর যে কারো চেয়ে তাদের গণনা বা অনুসন্ধান করার ক্ষমতা বেশি। সরকারি ডাটাবেজের চেয়ে তাদের সংগ্রহ অনেক অনেক বেশি। নিকট অতীতেই গুগল করে মানুষ তাদের জেনেটিক ও স্ট্যাটিস্টিক্যাল কোড জানতে পারবে।
গুগলপ্লেক্সে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিভিন্ন ভাষা অনুবাদের পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। এ উদ্দেশ্যে ল্যারি ও সের্গেই গুগলপ্লেক্সে বিভিন্ন ধরনের মেধাবী মানুষকে জড়ো করেছেন, যার মধ্যে আছে অনেক সাবেক সিইও, শত শত পিএইচডি, যুক্তরাষ্ট্র ও দুনিয়ার বিভিন্ন এলাকার ধাঁধার চ্যাম্পিয়ন, অলিম্পিকজয়ী, স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
ল্যারি ও সের্গেইয়ের ইচ্ছা দুনিয়ার মানুষ যেন গুগলে আরো আরো অনেক বিষয় ও তথ্য গুগলে থেকে সংগ্রহ করতে পারে। এমন অনেক কিছু তারা যুক্ত করতে চান, যা বর্তমানে ইন্টারনেটে লভ্য নয়। যেমন— সিনেমা, পুরনো টেলিভিশন অনুষ্ঠান, ছবি, লেখা, শিক্ষার জন্য দরকারি বই প্রভৃতি। স্ট্যানফোর্ডের প্রেসিডেন্ট জন হেনেসির কথা, ‘এই দুজনের অনেক বড় ও অসাধারণ রূপকল্প আছে। তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক বেশি চিন্তা করেন।’
জীববিজ্ঞান ও জিন গবেষণায় গুগলের পরিকল্পনা চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। গুগল প্রত্যেক মানুষের জিন নকশাকে সহজলভ্য করে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকরা প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ নকশা পর্যবেক্ষণ করে ওষুধ ও চিকিৎসা দিতে পারবেন, যা মানব জীবনে যুগান্তকারী পরিবর্তন সূচনা করবে। কোন জিনগত বৈশিষ্ট্যের মানুষের জন্য কোন ধরনের ওষুধ, খাবার দরকার হবে এবং কোনগুলো এড়িয়ে চলতে হবে, সেসব তথ্যও সহজলভ্য হয়ে যাবে। ন্যাশনাল হিউম্যান জিনোম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক ড. অ্যালান ই. গুটমেচার মনে করেন জেনেটিক্স বা কৌলিতত্ত্বে গুগলের সংযুক্তি অর্থবহ। কারণ কোনো নির্দিষ্ট জিনকে বা কোনো জিনগত ত্রুটিকে খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে গুগলের অনুসন্ধান ক্ষমতা ব্যবহার করা জরুরি। বিজ্ঞানীদের ল্যাবরেটরিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডাটা বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়, কিন্তু সেটা করার সামর্থ্য দুনিয়ায় কেবল গুগলের আছে। ল্যাবে গবেষণার চেহারাটা দিন দিন বদলে যাচ্ছে। আর বদলে যাওয়ায় অগ্রগামী ভূমিকা রাখতে পারে গুগলের অনুসন্ধান ক্ষমতা।
বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় গুগল সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। প্রোটিন নিয়ে গবেষণায় তারা স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে সহযোগিতা করেছে। অ্যালঝেইমার্স, পারকিনসন ও বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের সঙ্গে প্রোটিনের গঠনের সম্পর্ক আছে। তাই প্রোটিনের গঠন ও কাজ করার পদ্ধতি নিয়ে এ গবেষণা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ব্রিন ও পেজের মতে, গুগল কোনো প্রথাগত কোম্পানি নয়, আর কোনো দিন হবেও না। ব্রিনের মতে, গুগল যদি কোনো শিক্ষার্থী হয়, তাহলে ২০০৪ সালের ১৯ আগস্ট সে প্রাথমিক স্কুল শুরু করেছিল। এ তারিখে গুগল পাবলিক কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ২০০৫ সালে গুগল তার প্রথম গ্রেড সম্পন্ন করে। গুগল স্ট্যানফোর্ড, হার্ভার্ড, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়, নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরি ও অক্সফোর্ডের লক্ষ লক্ষ বই ডিজিটাইজ করার কাজ করছে। গুগল যত সম্ভব তত বইকে অনলাইনে মানুষের জন্য উন্মুক্ত করতে চায়। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে বই আছে ৭০ লাখ। ১৫০ বছর ধরে এ লাইব্রেরি দুনিয়ার অনেক বড় গবেষকদের সহায়তা করছে। আন্ডারগ্র্যাজুয়েট লেভেলে ল্যারি এ লাইব্রেরিতে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সেই নস্টালজিয়া তাকে এ লাইব্রেরির বই ডিজিটাইজ করার প্রেরণা দিয়েছে। দুনিয়ার আরো অনেক লাইব্রেরির ধুলো জমে যাওয়া পুরনো অনেক বই ল্যারি ও সের্গেই তাদের নিজ খরচে ডিজিটাল করে দিচ্ছেন। ল্যারি জানিয়েছেন, গুগল প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই তার ও সের্গেইয়ের মাথায় দুনিয়ার লাইব্রেরির বইপত্র ডিজিটাল করার চিন্তা ছিল। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি খরচ ও বই নষ্ট হওয়ার ভয়ে তাদের বই ডিজিটাল করার প্রস্তাবে শুরুতে রাজি হয়নি। গুগলের একটি দল তখন আরো উন্নত উপায়ে বই ডিজিটাল করার একটি উপায় তৈরি করে আবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
একবার সের্গেইকে এক উন্মুক্ত আলোচনায় স্কুলের ছাত্ররা পর্নোগ্রাফি নিয়ে প্রশ্ন করেছিল। তাদের কথা ছিল যে, গুগলের মাধ্যমে মানুষজন সহজেই পর্নোগ্রাফিকে খুঁজে পাচ্ছে। সের্গেই জবাবটা দিয়েছিলেন একটু ভিন্নভাবে, ‘সাধারণভাবে এটা নির্ভর করে আপনারা কী অনুসন্ধান করছেন, তার ওপর। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার অনেক উপায় আছে। বয়ঃসন্ধিতে আপনাদের মনোযোগ কোথায় নিবদ্ধ রাখবেন, সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
ডেভিড এ. ভাইসের দ্য গুগল স্টোরি গ্রন্থ অবলম্বনে






