[কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক মাহবুব-উল আলমের জন্ম ১৮৯৮ সালে, চট্টগ্রামে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বাঙালি পল্টনখ্যাত ৪৯ বেঙ্গলি রেজিমেন্টের সদস্য হিসেবে ১৯১৭ সালে মেসোপটেমিয়ায় যাত্রা করেন। যুদ্ধ শেষে ১৯১৯ সালে দেশে ফেরেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে লেখেন ‘পল্টন জীবনের স্মৃতি’। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তার যোগদান ও ৪৯ বেঙ্গলি রেজিমেন্ট নিয়ে মাহবুব-উল আলমের রচনা থেকে দুটি রচনাংশ এখানে সংকলিত হলো। লেখা দুটি ২০০৯ সালে অনুপম প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত লেখকের সংকলনগ্রন্থ ‘বাঙালীর সামরিক ঐতিহ্য’ থেকে নেয়া হয়েছে। মাহবুব-উল আলম ১৯৮১ সালে প্রয়াত হন]

৪৯-তম বাঙালি পল্টনের একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচিত হওয়া আবশ্যক। অনেক উপযুক্ত ব্যক্তি পল্টনে গিয়াছিলেন। তন্মধ্যে বাবু সয়চাঁদ ব্যানার্জী (বি.এ.)’র পল্টন-কাহিনী লিখাবার ইচ্ছা ছিল জানিতাম। বিনোদবাবুর বেশ লিখবার শক্তি ছিল দেখিয়াছিলাম। কুমার অধিক্রম মজুমদার (এম.এ.বিএল.) পল্টনে সর্বাপেক্ষা বিদ্বান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি এখন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট; সয়চাঁদ সাব-ডেপুটি কালেক্টর। বিনোদের খবর জানি না। তিনি এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের বি.এসসি. ছিলেন। তাঁহাকে ‘বখাটে’ বলিয়াই জানিতাম। তাঁহার শরীরটা ইস্পাতের মত শক্ত ছিল। হাত ও পায়ে স্থানে স্থানে আঘাতজনিত ভাঙ্গা ছিল। তিনি রাতদিন পট্টি আঁটিয়া থাকিতেন।

১৯১৫ সালে মহাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য ‘দি বেঙ্গল এম্বুলেন্স কোর’ নামে যে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গঠিত হয় উহা টেসিফনের যুদ্ধে বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দেয়। এই স্বেচ্ছাসেবী যুবকগণের দৃষ্টান্তের অনুসরণ করিয়াই বাঙালি পল্টন গঠনের আন্দোলন আরম্ভ হয়। লড়াই এর হুজুগে পল্টন গঠিতও হইয়াছিল, লড়াই এর পরেই পল্টন ভাঙ্গিয়া দেওয়া হয়।


অনেকের বিশ্বাস পল্টন যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারে নাই। কিন্তু যাহারা ভিতরের খবর রাখেন তাহারা জানেন নানারূপ প্রতিকূলতার মধ্য দিয়াও পল্টন বার বার যোগ্যতার পরিচয় দিয়াছে।

১৯১৯ সালের ১৬ জুন লেফটেন্যান্ট-কর্নেল ভিক্টর ভিন্সেন্ট স্যান্ডিফোর্ড এর অধিনায়কত্বে এই পল্টনের দুই জন ব্রিটিশ অফিসার (ক্যাপ্টেন রবার্ট ফ্রেডারিক ফিটজহার্বার্ট এবং ক্যাপ্টেন জোন্স) ও পাঁচ জন ভারতীয় সামরিক কর্মচারী (সুবেদার ফণিভূষণ দত্ত, সুবেদার মন বাহাদুর সিংহ, সুবেদার দুর্গাপদ ব্যানার্জী—এখন সাব-ডেপুটি কালেক্টর, জমাদার প্রফুল্ল কুমার সাঁতরা এবং জমাদার প্রকৃতি কুমার ঘোষ) এবং সানুচর ২৩৫ জন সৈনিক লইয়া গঠিত দল ইরাকে কুর্দি অভিযানে প্রেরিত হয়। আমিও সিগনেলার পদে এই দলের অন্তর্ভুক্ত হই। সৈন্যদলের সঙ্গে তিনটি সুশিক্ষিত অশ্ব, একটি টাট্টু ঘোড়া, আটটি ভারবাহী খচ্চর এবং কিছু সংখ্যক তাঁবু ছিল। সাজসজ্জা বাদে প্রত্যেকেরই সঙ্গে ১২ পাউন্ড ওজনের ছোট্ট বিছানা ছিল।

১ সেপ্টেম্বর বিদ্রোহী দলের নেতা (সুলেমানিয়ার) শেখ মাহমুদ এবং তাঁহার পরামর্শদাতা (সিতকের) শেখ গরিবকে বন্দী অবস্থায় প্রহরাধীনে লইয়া এই দল তনুমায় প্রত্যাবর্তন করে। তনুমা তখন বাঙালি পল্টনের হেডকোয়ার্টার্স ছিল। এই অভিযানে বাঙালি পল্টন বিদ্রোহীদের সুলেমানিয়ার নিকটবর্তী ইয়ালাঙ্কুজ ও সৈয়দ আলি পর্যন্ত ধাওয়া করিয়াছিল। বেইজি হইতে কুর্দিস্তানের প্রধান নগরী কার্কুক পর্যন্ত সমগ্র গিরি প্রদেশে এই দলকে একটানা মার্চে যাইতে হয়। পথিমধ্যে স্নানাহারের জন্য ইহারা ফাতাহ্, লেসার জব, একটা ঝোপ ও বারোয়ান ব্রিজে ২/৪ ঘণ্টা করিয়া বিশ্রাম পাইয়াছিলেন মাত্র। কার্কুকে সামান্য বিশ্রাম গ্রহণ করিয়া ইঁহারা সুলেমানিয়ার পথে অগ্রসর হন এবং সৈয়দ আলী পর্যন্ত যাইয়া পলায়নরত বিদ্রোহীদের পশ্চাত্ধাবন করিতে করিতে একদল দুর্গম পার্বত্য পথে এবং অপর দল বন্দী করা প্রাণীসমূহ ও লুণ্ঠিত দ্রব্য-সম্ভার লইয়া উপত্যকা পথে চমচমল দুর্গে প্রত্যাবর্তন করেন। তত্কালে একদল অশ্বারোহী বিদ্রোহী আশেপাশে ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল। প্রথম দল ইহাদের উদ্দেশ পাইয়া পর্বতগাত্রে কামান স্থাপন করে। কিন্তু বিদ্রোহীরা বিনা যুদ্ধেই পারস্য সীমান্তের দিকে দ্রুত প্রস্থান করে।

         চমচমল হইতে একদল পুনরায় মামলাহাই পর্যন্ত ধাওয়া করে। অতঃপর একবার পার্বত্য পথে মসুল পর্যন্ত অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা হইয়াছিল। তখন শীতের প্রারম্ভ। পাহাড়ের চূড়ায় বরফ জমাট বাঁধিতেছিল। সমরকর্তারা মসুল পর্যন্ত সৈন্য পাঠাইবার প্রয়োজন অনুভব করেন নাই। বিশেষত শেখ মাহমুদ ও শেখ গরিবের ধৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিদ্রোহীরা পারস্য সীমান্তে পলায়ন করিয়াছিল। অতঃপর সৈন্যদল পল্টন হেড কোয়ার্টার্সে প্রত্যাবর্তন করে।

         এই অভিযানের বর্ণনা করিতে যাইয়া ইউরোপীয় সম্পাদিত সংবাদপত্র ‘স্টেটসম্যান’ লিখেন: ‘কুর্দিস্তানের অন্তঃস্থল কোন সীমান্ত প্রদেশ যত জঘন্যতম কল্পনা করা যায় সেরকম। মসুলের উপকণ্ঠে যে সকল পাহাড় আছে সেগুলো একদম ওয়াজিরিস্তানের পাহাড়ের মতো বৈ তো নয়। ১৯১৯ সালের প্রচণ্ডতম গ্রীষ্মের মধ্যে ব্রিটিশ কর্মচারীদের বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণভাবে হত্যার প্রতিশোধে যে অভিযান চালানো হয় তাহাতে যে সকল শ্রান্ত-ক্লান্ত সৈন্যদল এই সব পাহাড়ের উপর দিয়া হামাগুড়ি দিয়াছিল এবং ছাউনি ফেলিয়াছিল, তাহারা তফাৎ মালুম করিতে পারে নাই।’

১৯১৯ সালের ১২ই জুন সকালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্যান্ডিফোর্ড ‘লাইনস অব কমিউনিকেশন্স’-এর অধ্যক্ষের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া বসরা হেড কোয়ার্টার্সে গমন করেন। অধ্যক্ষ বলেন: ‘কুর্দিরা ব্রিটিশ পলিটিক্যাল এজেন্টসহ ১১জন অফিসার ও তাঁহাদের সঙ্গী প্রায় ৪০জন সৈন্যকে একটা ঘরে তালাবদ্ধ করিয়া রাখায় ১ ব্যাটালিয়ান সৈন্য তাঁহাদের মুক্তির জন্য পাঠানো হইয়াছিল। কুর্দিরা তাহাদিগকে পরাজিত করায় সম্প্রতি তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হইয়াছে। বাগদাদ হইতে কয়েক শত মাইল দূরে কার্কুক নগরীতে যুদ্ধ চলিতেছে। এখন আমি তোমার নিকট ১ কোম্পানি সৈন্য চাই’।

এই অভিযানে পল্টনের কার্যকলাপ সম্বন্ধে লে: কর্নেল স্যান্ডিফোর্ড লিখিয়াছেন: ‘তাহারা কষ্টকর অবস্থার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দৃঢ়তা দেখাইয়াছিল।’

স্যান্ডিফোর্ড পল্টনের কোনো বিশেষ কোম্পানিকে (চার কোম্পানি লইয়া এক রেজিমেন্ট বা পল্টন গঠিত হয়) হুকুম না করিয়া নির্দিষ্ট সংখ্যক ‘স্বেচ্ছাসেবক’ (ভলান্টিয়ার) সৈন্য চাহিয়াছিলেন। ইহাতে পল্টনে বিশেষ উৎসাহের সঞ্চার হইয়াছিল। হাসপাতালে পর্যন্ত একটা উত্তেজনার সাড়া পড়িয়া গিয়াছিল! আমি কুর্দি অভিযানে যাইতেছি, ১২ই জুন পীড়িত বন্ধুদের নিকট হইতে বিদায় মাগিবার জন্য হাসপাতালে যাই। সেখানে জিতেন ও দয়াল পীড়িত অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিল। তবুও তাহারা এইজন্য দুঃখ করিতে লাগিল যে তাহারা কুর্দি যুদ্ধে যাইতে পারিল না।

বাস্তবিক, এই উৎসাহের ভাব বরাবরই অব্যাহত চিল। জাহাজে যখন যাত্রা করিয়াছি, জাহাজেও শরীর চালনা, ‘সঙ্গীন যুদ্ধ’, ‘Lewis’ কামান ছোঁড়া অভ্যাস, আমরা সিগনেলারদের ‘buzzer’ যন্ত্র ও বক্তৃতা, খচ্চরের পিঠে বিছানাগুলির বাক্স ‘Kit-bag’বোঝাই ইত্যাদি শিক্ষার বিরতি ছিল না। এ সকল প্রশিক্ষণের এক পর্যায়ে ১৭ই জুন প্রাতে ৭টা হইতে ৮টা পর্যন্ত আমাদের চমত্কার সঙ্গীন যুদ্ধের মহড়া হইয়াছিল। কর্নেলের আদেশে তখন জাহাজ থামানো হইয়াছিল। ‘সঙ্গীন যুদ্ধ’ দেখিয়া কর্নেল বলিয়াছিলেন: ‘এরূপ ২০০ সিপাহী পাইলে আমি কাহাকেও ভয় করি না।’

‘P.S. 59’ জাহাজ আমাদিগকে তনুমা হইতে কুত-অল-আমারা নিয়া যায়। কুত হইতে আমরা ট্রেনে হিনাইদি, হিনাইদি হইতে জাহাজে বাগদাদ, বাগদাদ হইতে ট্রেনে তিকরিৎ ও সামারা অতিক্রম করিয়া বেইজি পৌঁছি।

বেঙ্গল পল্টনের গোড়ার কথা


এখন বেঙ্গল পল্টনের গোড়ার কথা শুরু করি।

বেঙ্গল পল্টন প্রথম গড়িয়া উঠে নওশেরায়। নওশেরা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের একটি ক্যান্টনমেন্ট। ওখানে শ’ আড়াই লোক হওয়ার পর প্রথমত, ডাবল-কোম্পানি গঠিত হয়। ইহাদিগকে করাচিতে স্থানান্তরিত করা হয়। অতঃপর বন্যার স্রোতের মত বাঙালি পল্টনের ঢুকিতে থাকে। তখন ‘Bengal Battalion’ গঠিত হয়। ১৯১৭ সালের ১ জুলাই আমি করাচি পৌঁছি।

আমি যুদ্ধে গিয়াছিলাম প্রধানত কর্তব্যবোধে। কারণ, ‘বার ভূঞা’ ও সুরেশ বিশ্বাস বাঙালি হইলেও তখনও বাঙালির ভীরু বলিয়া অপবাদ ছিল। সুতরাং আমি বুঝিয়াছিলাম যুদ্ধে যাওয়া বাঙালির একান্ত কর্তব্য। তাহা হইলে সে যুদ্ধ শিখিবে ও যুদ্ধ করিবে এবং যুদ্ধ করিয়া দেখাইতে পারিলে কেহই আর তাহাকে ভীরু বলিতে পারিবে না। দ্বিতীয়ত, বিবাহের পরে পরেই আমি কলেজে পড়া মকুব করি। কিছুকাল পরে যখন পুনরায় পড়িতে যাওয়ার কথা মনে করিলাম তখন কলেজে প্রমোশন হইয়া গিয়াছে। যাহাদের সহিত বরাবর পড়িয়া আসিতেছি তাহাদের এক শ্রেণী নিচে পড়িতে যাওয়া আমার কাছে অচিন্তনীয় মনে হইল। তাহাদের সমকক্ষতা লাভের জন্য আমার মন লালায়িত হইয়া উঠিল। তখন রং রুটের খুব সমাদর সভা-সমিতি করিয়া খুব জাঁকের সহিত সরকার ও দেশবাসী সকলে মিলিয়া তাহাদের অভ্যর্থনা দিতে ব্যস্ত হয়। সহপাঠীদের সহজে অতিক্রম করার উদ্দেশ্যও আমার রং রুট হওয়ার অন্যতম লক্ষ্য ছিল। যাহা হউক, আমি ১৯১৭ তে রংরুট হই এবং জুলাই এর শেষ সপ্তাহেই আমরা করাচি হইতে বসরায় নীত হই।

বসরায় আমরা ‘Mesopotamia Expeditionary’ এর অন্তর্ভুক্ত হই। প্রথমে বসরার নিকটবর্তী মেকিনায় আমাদিগকে কিছুদিন রাখা হয়। অতঃপর আমাদিগকে বাগদাদ লইয়া যাওয়া হয়। তখন ৩২ মাইল দূরবর্তী ‘বাকুবা’তে যুদ্ধ চলিতেছিল। ১২৯-তম নম্বর রাজপুত সেনাদলের পার্শ্বে একটি খেজুর বাগানে আমাদের তাঁবু পড়ে। এই সময় হইতেই ‘৪৯-তম নম্বর বাঙালি সেনাদল’ নামে আমরা অভিহিত হইতে থাকি।