ইংরেজ রাজশাসিত ঔপনিবেশিক বাংলার ভূখণ্ডে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সরাসরি আঁচ পড়েনি ঠিকই (যেমনটা পড়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়), কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বাঙালির জন্য একটি বিশেষ কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। আদতে সর্বগ্রাসী উপনিবেশের আবহে নিজেদের ‘ভেতো’ ও ‘ঘরকুনো’ অপবাদ ঘুচিয়ে আপন সামরিক সক্ষমতার পরিচয় বাঙালি বহুদিন পর দিতে পেরেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটেই। ইংরেজ-ফরাসি-রুশ-মার্কিন মিত্রশক্তির হয়ে জার্মান-তুর্কি অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি একাধিক ফ্রন্টে তখন লড়তে গিয়েছিলেন বহু বাঙালি সৈনিক। বিশেষত মেসোপটেমিয়া ও ফরাসি ফ্রন্টে বাঙালি সৈনিকদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। যুদ্ধের ময়দানে মিলিটারি কোরের বাঙালি চিকিৎসকদের ভূমিকাও ছিল অগ্রগণ্য। যুদ্ধশেষে তো বটেই, এমনকি যুদ্ধ যখন চলমান, তখনো একাধিক বাঙালি সৈনিক নিজেদের যুদ্ধ-অভিজ্ঞতার বয়ান লিখে পাঠিয়েছেন সেকালের বিভিন্ন বিশিষ্ট সাময়িক পত্রে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বাঙালি সৈনিকদের এ ব্যক্তিগত বয়াননির্ভর লেখাগুলো যেমন বহু-বিচিত্র অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ, তেমনি সামরিক ইতিহাস রচনার উপাদান হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রণাঙ্গনে গিয়ে বাঙালি সেনাদের কী হাল হয়েছিল? তাদের চোখে ধরা পড়া যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতিইবা ছিল কেমন? তা জানতে মিত্রশক্তির বাঙালি সেনাদের লিখে যাওয়া বিবরণগুলো পড়ার বিকল্প কার্যত এখন পর্যন্ত নেই। ১৯১৬তে ইয়েমেনের এডেন শহরের নিকটবর্তী একটি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ছোট ভাইকে চিঠি লিখে সেখানকার অবস্থা জানিয়েছিলেন মিত্রশক্তির সামরিক বিভাগের চিকিৎসক শারদেন্দুভূষণ মুখোপাধ্যায়। বিষয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় পরে তার লেখা চিঠিটি প্রকাশ পায় সাহিত্যপত্রিকা ভারতবর্ষে। শারদেন্দুভূষণের চিঠিটি আকারে ছোট, কিন্তু ওই সংক্ষিপ্ত পরিসরেই উঠে এসেছে স্থানীয় আরবদের সঙ্গে মিত্রশক্তির সম্পর্ক থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষ তুর্কিদের যুদ্ধকৌশল—সরেজমিনে গিয়ে দেখা যুদ্ধক্ষেত্রের এ রকম বহু কৌতূহলোদ্দীপক প্রসঙ্গ। তিনি জানাচ্ছেন, ‘...স্থানীয় আরবীরা আমাদের (মিত্রশক্তির) পক্ষবর্ত্তী—তাহারা উটে চড়িয়া “স্কাউট”-এর কাজ করে। তাহাদিগকে অপেক্ষাকৃত কমজোরী বন্দুক দেওয়া হয়। ইহারা আমাদের পক্ষে থাকার দরুণ তুর্কিরা ইহাদের উপর ক্রুদ্ধ।...’ পরে আরো লিখেছেন, ‘রয়টার-এর তারে’ বিবৃত ‘এডেনের খণ্ডযুদ্ধের’ নেপথ্যের কারণ ছিল মূখ্যত সেটিই—স্থানীয় আরবদের সঙ্গে তুর্কি বাহিনীর সংঘাত। যুদ্ধ যখন চরমে তখন আবার উঠেছিল বালুঝড়। ওইরকম সংঘাতদীর্ণ ও প্রাকৃতিকভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দুপুরের খাবার অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে ডা. শারদেন্দু লিখেছেন: ‘মাথার উপর প্রচণ্ড সূর্য, চারিদিকেই বালুর ঝড়, সামান্য দূরেই কামান ও বন্দুকের আওয়াজ—তাহার মধ্যে আহার একটা নতুন অনুভূতি—ঠিক আনন্দ বলা যায় না।’ তুর্কি-বাহিনী এক সময় পিছু হটলেও শারদেন্দুর কাজ কমল না, বরং তিনি উল্টো দেখলেন ‘এতক্ষণ পর্যন্ত আমার কাজ কেবল সর্দি-গর্মীভোগী রোগীর সামান্য চিকিৎসার মধ্যেই বদ্ধ ছিল...কিন্তু আহারের অল্প পরেই উটের গাড়িতে জখমী পৌঁছিতে লাগিল।’ চিঠির শেষ প্রান্তে আছে কপালজোরে একটুর জন্য বেঁচে যাওয়া কয়েকজন সৈনিকের কথা, একজনের ‘গাত্রসংলগ্ন জলের বোতল ফুটা করিয়া একটি গুলি নিষ্ক্রান্ত হইয়া গিয়াছিল’ আর আরেকজনের ক্ষেত্রে ‘একটি গুলি তাহার পাগড়ির মধ্য দিয়া নানা স্থানে ছিন্ন করিয়া বাহির হইয়া গিয়াছিল।’

ফরাসি অধিকৃত চন্দননগরের অনেক বাঙালি তরুণই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফরাসি সেনাবাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলেন। ইংরেজদের নয়, বরং চন্দননগর সরাসরি ফরাসি শাসনে থাকায় এমনটা ঘটেছিল। চন্দননগরের উদ্যমী যুবক হারাধন বক্সী সে সময় ফরাসিদের পক্ষে বাঙালি সৈন্য দল গঠনে অগ্রগামী ভূমিকা রেখেছিলেন। প্রথমে ৭৫ জন বাঙালি ফরাসি সেনাদলে যোগদানের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে আবেদন জমা দিয়েছিলেন। এদের মধ্যে ৩২ জন স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ওই ৩২ জনের সবাইকে প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য পণ্ডিচেরীতে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের আপত্তির কারণে চারজন ও স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায় আরো দুজন চূড়ান্ত সৈন্যতালিকা থেকে বাদ পড়েন। অবশিষ্ট ২৬ জন বঙ্গসন্তান ফরাসি রণাঙ্গনে যুদ্ধ করতে যান। হারাধন পরে ব্রিগেডিয়ারের পদমর্যাদা পান। তিনি ১৯১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে নিজের দেখা যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতির অনুপুঙ্খ বয়ান তুলে ধরেন সাময়িক পত্র ‘সাহিত্য’তে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত ‘বাঙালি সৈনিকের দৈনন্দিন লিপি’ শীর্ষক রচনায়। লেখাটি একজন লড়াকু সৈনিকের স্মৃতিকথা হিসেবে যেমন গুরুত্ববাহী, তেমনি সামরিক কলাকৌশলের বিবরণীর কারণেও মূল্যবান। হারাধন তার বিবরণীর শুরুতেই জানিয়ে দেন, ‘পূর্বে লড়াই হইত দুর্গে পাহাড়ে ও সুরক্ষিত শহরে...এখন তাহা উল্টাইয়া গিয়াছে।’ ফরাসি সেনাবাহিনী বনাম জার্মান সেনার লড়াইতে তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল ‘ট্রেঞ্চযুদ্ধ’ বা খাত কেটে যুদ্ধ করার বিষয়টিকে। জার্মান সেনাদল ট্রেঞ্চ কাটার প্রকৌশলে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিল, আর সে দক্ষতার কারণে ফরাসি সেনাবাহিনীও মাঝেমধ্যে বিপাকে পড়ত বৈকি। পাশাপাশি ছিল তাদের বিমানবাহিনীর বিরতিহীন তত্পরতা—‘সিদ্ধ মাংস, আলুর চপ ও কফি’ দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ করার সময় মাথার ওপর ‘জার্মান ব্যোমযানের’ গোঁ গোঁ শব্দে উদ্বেগজনক আবির্ভাবের কথা লিখেছেন হারাধন। ক্ষেত্রবিশেষে যুদ্ধক্ষেত্রের আন্তর্জাতিক রীতিনীতি বিসর্জন দিয়ে জার্মান গুপ্তচররা কীভাবে প্রতিপক্ষের সেনাদের হত্যা করত, তারও বিবরণ পাই তার লেখায়: ‘...তারা (জার্মান সেনা) ‘প্যারাসুট’ করিয়া সময়ে সময়ে গুপ্তচর নামাইয়া দিত। ব্যাটারির প্রহরীরা তাড়া করিলে ইহারা আমাদের ‘ডাগ-আউট’-এর ভিতর আশ্রয় লইত। পাছে কোনোরূপ গণ্ডগোল হয়, সেই জন্য ঘরে যারা নিদ্রিত থাকিত, তাহাদের শিরশ্ছেদ করিয়া আপনাদের কাজ নিরাপদে সাধন করিত। মাটির নিচে ঘরে থাকিলে আমরা দ্বারে ও গবাক্ষে অর্গল দিয়া বন্দুকটিতে টোটা ভরিয়া মাথার নিকট রাখিয়া তবে নিদ্রা যাইতাম।...’

বাঙালি সৈনিকদের লেখা যুদ্ধক্ষেত্রের বিবরণীগুলোতে যুদ্ধকালীন আহারাদির বিবরণ প্রায়ই মেলে। ১৯১৭ সালে বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক মাহবুব-উল আলম। তখন তার বয়স মাত্র ১৯। যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করার জন্য তিনি মেসোপটেমিয়া গিয়েছিলেন। পরে সেখান থেকে ফিরে আসেন ১৯১৯-এ। যুদ্ধক্ষেত্রের স্মৃতি নিয়ে লেখা তার একাধিক গ্রন্থে বহু দুর্লভ বিবরণের সমাহার ঘটেছে। বিশেষ করে ‘পল্টন জীবনের স্মৃতি’ (১৯৪০) ও পল্টনসংক্রান্ত স্মৃতিকথা নিয়ে মৃত্যু-উত্তর প্রকাশিত সংকলন ‘পল্টনে’-এর (১৯৯৮) কথা বলতেই হয়। যুদ্ধ সময়ের বিচিত্র ও মানবিক অভিজ্ঞতার কথা লিখতে গিয়ে মাহবুব-উল আলম এমন কিছু অভিজ্ঞতার বয়ান বিবৃত করেছেন, যা একই সঙ্গে দুর্লভ ও মজাদার। সৈনিকদের খাওয়া-দাওয়াসংক্রান্ত তার বিবৃত একটি ঘটনা এখানে তুলে ধরা যাক। যুদ্ধক্ষেত্রে এমনিতেই সৈনিকদের পরিশ্রম অনেক, ফলে পেটের খিদেও যন্ত্রণা করে অধিক। আর যারা আহত অবস্থায় ফিল্ড হাসপাতালে ভর্তি থাকেন, তাদের খাদ্যচাহিদা স্বাস্থ্যগত কারণেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকবে। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বরাদ্দ পরিমাণের বাইরে কারো একটু বেশি মাংস বা আরো কয়েকটি রুটি পাওয়ার সুযোগ খুব একটা ছিল না। এ রকম অবস্থা দেখে মাহবুব-উল আলম অন্যপথে হাঁটলেন। মেসোপটেমিয়ায় মিত্রশক্তির তাঁবুর তৈরি হাসপাতালে রান্না করে খাওয়ানোর দায়িত্বে ছিল একদল পশতু বাবুর্চি। কিন্তু তাদের স্বভাষায় বিনোদনের ব্যবস্থা উপস্থিত ছিল না। অন্যদিকে হাসপাতালে থাকা সেনাদের বিনোদনের জন্য সেখানে একাধিক ভাষার গানের গ্রামোফোন রেকর্ড ছিল, কিন্তু কোনো পশতু রোগী না থাকায় তা বাজানো হতো না। এহেন পরিস্থিতি দেখে একদিন মাহবুব-উল আলম পশতু বাবুর্চিদের কাছে গিয়ে বললেন, ‘তোমরা পশতু গান শুনতে পাও না। আজ থেকে আমি পশতু গান বাজাব, তোমরা শুনো।’ পরে আগে থেকেই ঠিক করে রাখা পরিকল্পনা অনুযায়ী হাসপাতালের তাঁবু থেকে বেজে উঠল পশতু গান। শুনে তো বাবুর্চিরা খুশিতে ডগমগ। ফলে এর পরের দিন থেকেই তারা ‘হাতসাফাই করে রুটির অতিরিক্ত বরাদ্দ দিতে লাগল’। যুদ্ধক্ষেত্রে বাড়তি খাবার আদায়ের জন্য এমন কৌশল অবলম্বন অভিনবই বটে!

বাঙালি পল্টনের আরেক সৈনিক অমিয় হালদারের স্মৃতিগ্রন্থ ‘পল্টন ছাউনি’ প্রকাশ পায় ১৯৬০-এ। ১৯১৭-তে বাঙালি পল্টনের ছাউনি করাচিতে এসে ‘রংরুট’ হিসেবে যোগ দিয়ে পুরোদস্তুর পেশাদার সৈনিক হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষায় প্রশিক্ষণ নেয়ার প্রসঙ্গ দিয়ে বইয়ের শুরু, শেষ সাড়ে তিন বছর পর পল্টনের ভাঙো ভাঙো দশায়। লেখক জানাচ্ছেন, করাচিতে সৈনিকদের প্যারেড করা ছাড়া বড় কাজ আরো দুটো—‘গার্ড ডিউটি, ফেটিগ ডিউটি...অর্থাৎ পাহারা দেয়া, আর হরেক রকম কাজ করা—নিজেদেরই...লঙ্গরখানা বা রান্নাঘর—ওরফে কিচেনের আনাজকাটা, রুটিবেলা, পরিবেশন করা ছাড়াও যেতে হয় এদিক-সেদিক...খাবার পৌঁছে দিতে হয় সেন্ট্রিপোস্টে...শহরে গিয়ে আনতে হয় পল্টনের রসদ...।’ করাচিতে প্রশিক্ষণের কড়াকড়ি ছিল, তবে ব্যারাকে খাদ্যবৈচিত্র্যের অভাব ছিল না। কিন্তু পরে করাচি ছেড়ে জাহাজে চেপে বসরাসংলগ্ন মাকিনা ক্যাম্পে যখন যেতে হলো অমিয়কে, তখন সেনাদলের খাওয়া-দাওয়ার অবস্থা হয়ে পড়ল সঙিন। দিনে ‘মটর বা মাষকলাইয়ের ডালের খিচুড়ির সঙ্গে রোজই পিঁয়াজের তরকারি’ আর রাতে মাংসের সঙ্গে চাপাটি রুটি—এর বাইরে বিশেষ কিছু জুটত না। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে এসে তাদের ভুলতে হয়েছিল যাবতীয় সংস্কার ও পারিবারিক প্রথা। খিদের জ্বালায় না জেনেই যুদ্ধের মাঠে মহিষের মাংস খেয়ে ফেলা ও তা নিয়ে নিজের তীব্র অনুশোচনার কথা অমিয় লিখেছেন। কিন্তু পরে এও কবুল করেছেন যে, যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকের এত কিছু ভাবলে চলে না।

একাধিক বাঙালি সৈনিক প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নৌপথেও লড়াই করেছিলেন। ১৯১৫ সালের ১৪ এপ্রিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির হয়ে যোগদানের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়েছিলেন বাঙালি সৈনিক আশুতোষ রায়। বোম্বে থেকে জাহাজে করে বসরায় পৌঁছন তিনি। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীদ্বয়ের সঙ্গমস্থলে অবস্থিত মিসরের গ্রাম কুর্নায় তারা রওনা হয়েছিলেন ইরানের আসার থেকে। কুর্নায় মিত্রশক্তির জাহাজ বহর পৌঁছার পরদিন সকালে দুই মাইল দূরের একটি ছোট দ্বীপে লুকিয়ে থাকা তুর্কি বাহিনী ও তাদের গোলন্দাজ জাহাজ কামানের গোলা ছুড়ে হামলা চালায়। তার পরের বিবরণ আশুতোষ রায়ের লেখা থেকেই পড়া যাক: ‘...মুহুর্মুহু তোপধ্বনি হইতে লাগিল। ৮-১০টা আওয়াজের পর আমাদের পক্ষ হইতে প্রত্যভিবাদন করা হইল।...এ পর্যন্ত তুর্কির যতগুলি গোলা আসিল, কোনোটি ফাটিল বলিয়া মনে হইল না। কিন্তু আমাদের গোলা গিয়া তুর্কি লাইনে পড়িয়া মহা হইচই বাধাইয়া দিল। এইবার আমাদের উভয় রক্ষী-ক্রুইজারই পরপর কামান দাগিতে লাগিল। তুর্কিদের ঘন ঘন তোপধ্বনি ক্রমশ মন্দীভূত হইয়া আসিল। আমরা দূরবীক্ষণ যন্ত্র-সাহায্যে যাহা দেখিলাম, তাহা অতি বিস্ময়কর! আমাদের গোলা গিয়া যখন শত্রু-শিবিরে ফাটিতেছে, তখন অনেকে হাত-পা ছড়াইয়া ভূমির ওপর আপনার দৈর্ঘ্যের পরিমাপ করিতেছে।...’ নৌপথে যুদ্ধের সময় জলমাইনের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও লিখেছেন তিনি: ‘গুপ্তচর সংবাদ আনিল যে—পলায়নপর কতকগুলি তুর্কি-সৈন্য নাছিরিয়ার দিকে এবং আর কতকগুলি আমারার দিকে গিয়াছে।...এইসব দেখিয়া-শুনিয়া আমাদের একখানি গানবোট অগ্রবর্তী হইল। জলপথ নিরাপদ কিনা তাহা দেখা এবং শত্রুর গতি-নির্ধারণ এই গমনের উদ্দেশ্য।...কী একটা কালো জিনিস নদীতে ভাসিতে দেখিয়া আমাদের স্টিমারের কমান্ডার তত্প্রত লক্ষ্য করিয়া বন্দুক ছুঁড়িলেন...তখন বোঝা গেল, সে একটা মাইন...পলাইবার পূর্বে তুর্কিরা নদীমধ্যে উহা রাখিয়া গিয়াছে...খুব একটা ফাঁড়া কাটিয়া গেল...।’ আশুতোষ রায়ের এই চমকপ্রদ বিবরণী প্রকাশ পেয়েছিল জলধর সেন সম্পাদিত ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় ১৯১৯ সালে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একাধিক বাঙালি গোলন্দাজের কথাও জানা যায়। তাদের লিখিত অভিজ্ঞতার খোঁজ অবশ্য সরাসরি মেলে না, তবে ‘প্রবাসী’ পত্রিকার কার্তিক ১৩২৪ সংখ্যায় প্রকাশিত মতিলাল রায়ের নিবন্ধ ‘ফরাসি রণাঙ্গনে বাঙালি গোলন্দাজ’-এ লেখক তার হাতে আসা ফরাসি বাহিনীর হয়ে যুদ্ধরত এক বাঙালি গোলন্দাজের বয়ান উদ্ধৃত করেছেন। অনামা সেই বাঙালি গোলন্দাজের বয়ান থেকে জানা যায়, পাঁচজন বাঙালি গোলন্দাজ ফ্রান্সের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সেন্ট মিহিয়েলকে জার্মান বাহিনীর হাত থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। জায়গাটি ‘সর্বাপেক্ষা বিপদসংকুল স্থান—জার্মান গোলন্দাজগণ ওই স্থানটি হইতে ফরাসি বাহিনীকে বিতাড়িত করিবার জন্য মুহুর্মুহু শ্র্যাপলেন নিক্ষেপ করিতেছে—বৃষ্টিধারার মতো শ্র্যাপনেলের মধ্যে আত্মরক্ষা করিয়া বাঙালি গোলন্দাজগণ ফরাসি পদাতিককে সেন্ট মিহিয়েল অধিকার করিতে সহায়তা করিতেছে।...’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই বাঙালি গোলন্দাজ আরো জানিয়েছিলেন, ‘...৩ তারিখে আধ ঘণ্টার মধ্যে জার্মানি প্রায় ৪০০-এর উপর গোলা নিক্ষেপ করে—তাতে একজন মাত্র মারা যায়। জার্মান আয়োজন যা-ই হোক, আর ফ্রেঞ্চ অফেনসিভ ভাঙতে পারবে না—এক্ষণে ফরাসি জাতি সকল দিকেই প্রস্তুত রয়েছে।...’

 

মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক