তিন ম্যাচ হাতে রেখেই এবার ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা নিশ্চিত করে ফেলেছে ম্যানচেস্টার সিটি। কিন্তু ৬ ফেব্রুয়ারির কথা যদি মনে করতে পারেন, তবে বিস্মিতই হতে হবে। সেদিন আর্থিক নীতিমালা ভঙ্গের ১১০টি অভিযোগ তোলা হয় সিটির বিরুদ্ধে।
গভীর সেই সংকটের মধ্যেই সেরাটা বেরিয়ে আসে সিটির। সেই থেকে কোনো প্রতিযোগিতায় কোনো ম্যাচ হারেনি পেপ গার্দিওলার দল! এ পথে নিশ্চিত হয়েছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা। এখন উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও এফএ কাপ জয়ের হাতছানি। সিটিজেনরা জিতে নিতে পারে ‘ট্রেবল’, যা ১৯৯৮-৯৯ মৌসুমের পর কোনো ইংলিশ ক্লাব পারেনি।
ফেব্রুয়ারির ওই ধাক্কার পর মাঠের পারফরম্যান্সে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়ে একের পর এক ম্যাচ জিততে থাকে ম্যানসিটি। সেটা তাদের এ মৌসুমের সাফল্যের ‘টার্নিং পয়েন্ট’ ধরা যেতেই পারে। আবার ওই ঘটনাই ইংলিশ ফুটবলে সিটির প্রায় এক দশকের আধিপত্যেও কলঙ্ক লেপন করে দিতে পারে। সিটির আকাশে এখনো শঙ্কার কালো মেঘ উঁকি দিচ্ছে।
২০০৮ সালে ম্যানসিটি কিনে নেয় আবুধাবি গ্রুপ। আবুধাবির শাসক পরিবারের অন্যতম সদস্য শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ক্লাবটিতে কোটি কোটি পাউন্ড বিনিয়োগ করতে থাকেন। মধ্যপ্রাচ্যের ধনকুবেরদের ছোঁয়ায় ক্লাবটি আমূল পাল্টে যায়। নামিদামি সব খেলোয়াড় থেকে শুরু করে কোচদের উড়িয়ে আনে ম্যানসিটি। দ্রুতই ফল আসতে শুরু করে। প্রিমিয়ার লিগের একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় সিটিজেনরা। গত ছয় বছরের মধ্যে পঞ্চম ও ১১ বছরের মধ্যে সপ্তম লিগ শিরোপা জয়ই প্রমাণ করে, কতটা আধিপত্য করেছে তারা। ইউরোপেরও অন্যতম সেরা ক্লাব হিসেবে উঠে আসে সিটি। যদিও এখনো ধরা দেয়নি বহুল আকাঙ্ক্ষিত চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা।
গত রোববার ইতিহাদ স্টেডিয়ামে সমর্থকদের সঙ্গে শিরোপার আনন্দ ভাগাভাগি করছিল ম্যানসিটির খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও ম্যানেজমেন্টের সদস্যরা। তখন মনেই হয়নি বাইরের ইস্যু এখানে বিন্দুমাত্র কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পেরেছে। সমর্থক ও খেলোয়াড়দের মধ্যে উৎকণ্ঠার কোনো ছাপ লক্ষ্য করা যায়নি। মাঠ দখলে নেয় নীল ধোঁয়ার মেঘ আর রঙিন কনফেত্তি। সেখানে তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্য দিয়ে প্রিমিয়ার লিগের ট্রফি নিয়ে উৎসব চলতে থাকে চ্যাম্পিয়নদের।
গত সাত বছরের মধ্যে ১০টি বড় ধরনের শিরোপা জেতা সিটি মাঠে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করে গেলেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ মাথায় নিয়ে ঘুরছে। সম্প্রতি এক ব্রিটিশ পত্রিকার কলামে লেখা হয়েছে, ‘এটা কি সেরা দল, নাকি বছরের পর বছর ধরে প্রতারণার মাধ্যমে এখানে পৌঁছেছে?’
২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নয় বছর ক্লাবের অর্থের উৎস নিয়ে ভুল তথ্য প্রদানের অভিযোগ তোলা হয়েছে সিটির বিরুদ্ধে। ওই সময়টাতে সিটি তিনটি শিরোপা জিতেছে এবং ইয়া তোরে, সার্জিও আগুয়েরো ও কেভিন ডি ব্রুইনের মতো বেশ কিছু তারকা খেলোয়াড় কিনেছে। সিটি এ সময় নিজেকে ইউরোপের অন্যতম সেরা ক্লাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এবং লড়াইটা আমূল বদলে দেয়। তখন অঢেল অর্থ বিনিয়োগ করে ইতিহাদকে তারকাপুঞ্জ বানিয়ে ফেলে ম্যানেজমেন্ট। প্রতিপক্ষ ক্লাবগুলো তাদের এ বিনিয়োগ ও সফলতায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। সিটির এ আধিপত্য কেউ থামাতে পারবে বলে তখন মনেও হচ্ছিল না।
যা-ই হোক, দীর্ঘ চার বছরের তদন্ত শেষে সিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষ। ২০১৮ সালে জার্মান সাময়িকী দার স্পিয়েজেল গোপন নথি ফাঁস করে দিয়ে জানায়, উয়েফা ও প্রিমিয়ার লিগের শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে বাইরের খাত থেকে অর্থ নিয়ে ব্যয় সামলেছে ম্যানসিটি। সেই অর্থ বিনিয়োগ করেছেন শেখ মনসুর।
অপরাধ প্রমাণিত হলে পয়েন্ট কর্তন কিংবা ইংল্যান্ডের শীর্ষ লিগ থেকে অবনমনের মতো কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে পারে ম্যানসিটি। যদিও এর আগে উয়েফার একটি শাস্তি এড়িয়েছে সিটি। ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে আর্থিক অনিয়ম করার অপরাধে ২০২০ সালে তাদের দুই বছর নিষিদ্ধ করে উয়েফা। তথ্য দিয়ে উয়েফার তদন্তে সহযোগিতা না করায় ১ কোটি ১৩ লাখ ডলার জরিমানাও করা হয়েছিল সিটিকে। যদিও পরে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে আপিল করলে তাদের সেই শাস্তি খারিজ করে দেন আদালত। দার স্পিয়েজেল জানিয়েছে, ৩০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে বিশ্বের সেরা ৫০ জন আইনজীবীকে নিয়োগ করে সেবার শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পেয়েছে সিটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উয়েফার নিয়মের কিছু ফাঁকফোঁকর ও দুর্বলতার কারণে সেবার বেঁচে যায় সিটি। তবে প্রিমিয়ার লিগের ক্ষেত্রে তেমনটি না-ও ঘটতে পারে।
এদিকে, ম্যানসিটি কোচ গার্দিওলা চান ‘যত দ্রুত সম্ভব’ তার ক্লাবের বিরুদ্ধে প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষের আনা ১১৫টি আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়ে যাক। ছয় মৌসুমের মধ্যে সিটিকে পাঁচটি লিগ শিরোপা জেতানো এ কোচ বলেন, ‘আমি চাইব প্রিমিয়ার লিগ ও বিচারকরা যেন বিষয়টির যত দ্রুত সম্ভব রায় দিয়ে দেন। তখন আমরা যদি কোনো ভুল করি, তো মানুষ সেটা জানল, আর আমরা যদি সঠিক জায়গায় থাকি, তবে মানুষ এ নিয়ে কথা বলা বন্ধ করবে। আমরা এটা চাই আগামীকালই সুরাহা হোক। এ বিকালেও হলে আরো ভালো, আগামীকালও নয়।’
স্প্যানিশ কোচ বলেন, ‘মনে হয় তারা খুব ব্যস্ত নয় এবং বিচারকরা উভয় দিকই বিবেচনা করে দেখে সেরা রায় দেবেন। কারণ, সত্য বলতে কি, আমরা যা কিছু জিতেছি তা কিন্তু মাঠ থেকেই জিতেছি, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। আমরা এজন্য দুই বছর অপেক্ষা করতে রাজি নই। আইনজীবীদের নিয়ে বসুন। এর সুরাহা করুন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। যতটা দ্রুত সম্ভব মীমাংসা হলে প্রত্যেকের জন্যই ভালো।’ এপি, বিবিসি










