বেশ কিছুদিন ধরেই একটা প্রশ্ন উঠছিল, কেন পরের প্রজন্ম নোভাক জোকোভিচকে থামাতে পারছে না?
অবশেষে পারলেন কার্লোস আলকারাজ। গত রোববার রাতে জোকোভিচকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো উইম্বলডন শিরোপা জয় করেন ২০ বছর বয়সী আলকারাজ। এ জয়ে তিনি র্যাংকিংয়ের শীর্ষস্থানও ধরে রেখেছেন।
আলকারাজ ১-৬, ৭-৬ (৬), ৬-৪, ৩-৬, ৬-৪ গেমে ২৩ বারের গ্র্যান্ড স্লাম চ্যাম্পিয়ন জোকোভিচকে হারান। টুর্নামেন্ট শুরু করেছিলেন ১ নম্বর হিসেবে, তাই শিরোপা জেতায় তার শীর্ষস্থান সংহতই থাকছে। জোকোভিচ জিতলে তিনি উঠে যেতেন ১ নম্বরে। পরাজয় শেষে তরুণ আলকারাজকে নিয়ে জোকোভিচ বলেন, ‘আলকারাজ প্রমাণ করেছে, সন্দেহাতীতভাবেই সে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়।’
জোকোভিচকে এবার গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালেই শুধু হারালেন না, তিনি সার্ব খেলোয়াড়টিকে হারালেন তারই দুর্গে। অল-ইংল্যান্ড ক্লাবে জোকোভিচ হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য। এখানে টানা পাঁচবার ফাইনালে উঠে সেটি তিনি প্রমাণও করেন। টানা পাঁচবার উইম্বলডন জিতে সুযোগ ছিল রজার ফেদেরারের আট শিরোপার রেকর্ড ছোঁয়ারও। সেই সঙ্গে উন্মুক্ত যুগের রেকর্ড ২৪ গ্র্যান্ড স্লাম জেতার হাতছানিও ছিল। কিন্তু মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়ালেন ২০ বছরের তরুণ আলকারাজ।
২০১৩ সালের পর এ প্রথম উইম্বলডনের সেন্টার কোর্টে হারলেন জোকোভিচ। সর্বশেষ তাকে এ কোর্টে হারান অ্যান্ডি মারে। এবার তাকে হারালেন আলকারাজ। এটি শুধুই একটি জয়-পরাজয় নয়। উইম্বলডনে দ্বৈতে নয়বারের চ্যাম্পিয়ন টড উডব্রিজ এখানে একটি রূপান্তর দেখছেন।
একটি প্রশ্ন টেনিস বিশ্বে ঘুরে ফিরছিল—জোকোভিচ, ফেদেরার ও রাফায়েল নাদালের পর টেনিসে রাজত্ব করবে কে কিংবা কারা? ২০ বারের গ্র্যান্ড স্লাম চ্যাম্পিয়ন ফেদেরার গত বছর অবসর নিয়েছেন। চোটের সঙ্গে লড়াই করা নাদাল আগামী বছর খেলে অবসর নেবেন। ৩৬ বছর বয়সী জোকোভিচও ক্যারিয়ারের শেষ দিকে।
সর্বশেষ নয়টি গ্র্যান্ড স্লাম আসরের মধ্যে সাতটি শিরোপা জিততেই রোববার অল-ইংল্যান্ড ক্লাবে ফাইনাল খেলতে নেমেছিলেন জোকোভিচ। তিনি এ বছর অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ও ফ্রেঞ্চ ওপেন শিরোপা জিতে নিয়েছেন। ফেভারিট ছিলেন উইম্বলডনেও। যদিও তাকে এ যাত্রায় হতাশ করেন আলকারাজ। অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে আলকারাজ চোটের কারণে খেলতে পারেননি, আর প্যারিসে অপ্রতিরোধ্য জোকোভিচকে তিনি থামাতে পারেননি। রোলাঁ গারোঁয় জোকোভিচের টেকনিক, ট্যাকটিকস, কোর্টে দৃঢ়চেতা মানসিকতার কাছে হার মানেন তরুণ আলকারাজ। তিনি স্প্যানিশ তরুণ খেলোয়াড়টির জন্য হয়ে ওঠেন এক ভয়ংকর প্রতিপক্ষ।
গত দুই দশকের বেশির ভাগ সময় আধিপত্য করেছেন জোকোভিচ, ফেদেরার ও নাদাল এবং এদের আধিপত্যের ভিড়ে সুইজারল্যান্ডের স্তান ভাভরিঙ্কার (২০১৬) পর প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে একাধিক গ্র্যান্ডস্লাম জিতলেন আলকারাজ। এছাড়া ফেদেরার, নাদাল, জোকোভিচ কিংবা মারের বাইরে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ২০০২ সালের পর উইম্বলডন জিতলেন স্প্যানিশ তরুণ।
আলকারাজের অলরাউন্ড খেলা দেখা উপভোগ্য। বেজলাইনের শক্তি, নেটের কাছে অবিশ্বাস্য টাচ আর পুরো কোর্টে অসাধারণ ক্রীড়াশৈলী মুগ্ধ করে যে কাউকে। কেউ কেউ তো বলেন, জোকোভিচ, ফেদেরার ও নাদালের প্রত্যেকের কিছু গুণ ধারণ করছেন আলকারাজ। এ নিয়ে জোকোভিচ বলেন, ‘আমি এর সঙ্গে একমত। আমি মনে করি, সে তিনজনের কাছ থেকেই মৌলিক কিছু পেয়েছে। সে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে স্প্যানিশ ষাঁড় মানসিকতা ও লড়াকু চেতনা এবং রক্ষণের অবিশ্বাস্য গুণ পেয়েছে, যারা বছরের পর বছর ধরে আমরা রাফার (নাদাল) মধ্যে পেয়েছি।’
জোকোভিচ আরো বলেন, ‘আমি মনে করি, সে আমার ব্যাকহ্যান্ডের মতোই কিছু স্লাইডিং ব্যাকহ্যান্ড করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। দুই হাতের ব্যাকহ্যান্ড, রক্ষণ দারুণ মানিয়ে নিয়েছে। এসব দীর্ঘদিন ধরেই ছিল আমার নিজস্ব শক্তি, যা এখন তার মধ্যে দেখছি।’
এবার চমকে দেয়ার মতো কথাই বললেন পুরুষদের টেনিসে সবচেয়ে বেশি গ্র্যান্ড স্লামের মালিক, ‘সত্যি বলতে কি, আমি কখনই তার মতো প্রতিপক্ষের মোকাবেলা করিনি। রজার ও রাফার পরিষ্কার কিছু শক্তি ও দুর্বলতা ছিল। কিন্তু কার্লোস পরিপূর্ণ এক খেলোয়াড়। খাপ খাইয়ে নেয়ার সামর্থ্য আছে তার, যা সব ধরনের কোর্টে একজনের দীর্ঘ ও সফল ক্যারিয়ারের চাবিকাঠি।’
উইম্বলডন ফাইনালের আগে জোকোভিচ বলেছেন, ৩৬ মানে নতুন ২৬। তিনি টুর্নামেন্টজুড়েই প্রমাণ করেছেন, এখনই র্যাকেটটা তুলে রাখার সময় আসেনি, তার র্যাকেটের ধার যে কমেনি। তবু ক্যারিয়ারটা শেষের অধ্যায় পার করছে। আর ঠিক এ সময় টেনিসের নতুন রাজার আবির্ভাব ঘটল।










