বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) এসেছে বড় রদবদল। নতুন সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক কৃতী ক্রিকেটার, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল। ফারুক আহমেদকে সরিয়ে তাকে নতুন সভাপতি নির্বাচন করেছেন বোর্ড পরিচালকরা। যদিও এখানে সরকারের হস্তক্ষেপ ছিল। প্রথমে তিনি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) মনোনীত কাউন্সিল ও বোর্ড পরিচালক হন। এরপর পরিচালকরা তাকে সভাপতি নির্বাচন করেন। বিসিবির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সব প্রক্রিয়া শেষে তিনি নতুন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থার সভাপতির চেয়ারে বসে তিনি নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আশার বাণী শুনিয়েছেন।
বিসিবি সভাপতি হিসেবে আমিনুলের দায়িত্বটা আপাতত হতে পারে আগামী অক্টোবর পর্যন্ত। ওই সময় বিসিবির নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মাত্র চার মাসের স্বল্প সময়ে খুব বেশি কিছু করা সম্ভব নয়, তা ভালোভাবেই জানেন তিনি। তাই টি-টোয়েন্টি ম্যাচের মতো অল্প সময়ে কার্যকর কিছু করার ইচ্ছা তার। শুক্রবার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আমিনুল বলেছেন, ‘যেহেতু সময় কম, আমরা জানি টেস্ট ম্যাচ পাঁচদিনের হয়, ওয়ানডে হয় সাত ঘণ্টার। আমি একটা কুইক টি-টোয়েন্টি ইনিংস খেলতে এসেছি এখানে। একটা ভালো টি-টোয়েন্টি ইনিংস খেলব, যেটা আপনারা সবাই মনে রাখবেন। চেষ্টা করব, ক্রিকেটটা যাতে সবাই খেলতে পারে, যাতে সবার খেলা হয়। আমাদের যেন একটা স্টেটমেন্ট হয়, ক্রিকেটটা সবার জন্য। এ রকম একটা কাজ শুরু করে দিয়ে যেতে চাই।’
সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্যে সারা দেশে ক্রিকেট ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যের কথা জানিয়েছেন আমিনুল। তিনি বলেন, ‘একটা বড় দায়িত্ব পেয়েছি। দায়িত্বটা হচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেট না—ক্রিকেট ইন বাংলাদেশ। বাংলাদেশে কী ক্রিকেট আছে, সেটা আমরা ঘুরে দেখে চেষ্টা করব আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। আমি বিশ্বাস করি যে শুধু ১১ জন ক্রিকেট খেলে না, দেশের সবাই ক্রিকেট খেলে। আপনারা (সংবাদমাধ্যম) খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নয়নের জন্য এবং ক্রিকেটের স্থায়িত্বের জন্য। তো আমি আশা করব যে আমরা একটা দল হিসেবে কাজ করব।’
বেশকিছু এজেন্ডা নিয়ে কাজ করবেন আমিনুল। সেই পরিকল্পনায় ক্রিকেটের বিকেন্দ্রীকরণ পাবে অগ্রাধিকার। তার কথায়, ‘আমরা যে পরিকল্পনা করছি, এক নম্বর হচ্ছে, আমাদের যে (আইসিসির) সহযোগী দেশের ক্রিকেট ছিল, যেখান থেকে শিখেছি, সেই আঙ্গিকে চেষ্টা করব বাংলাদেশের ক্রিকেটের বিকেন্দ্রীকরণ করা বা একটা উপজেলার ছেলে কীভাবে ক্রিকেট খেলে আত্মবিশ্বাস নিয়ে মূলধারায় আসতে পারবে, সেই চেষ্টাটা করব।’
সবাইকে এক জোট হয়ে ক্রিকেটকে ভিন্ন উচ্চতায় তুলতে কাজ করার আহ্বান জানান সাবেক এ অধিনায়ক। তিনি বলেন, ‘আমরা ২৫ বছর ধরে টেস্ট খেলছি। ভালো পারফরম্যান্স করছি। আমাদের অনূর্ধ্ব-১৯ দল বিশ্বকাপ জিতেছে, মেয়েদের দল এশিয়া কাপ জিতেছে। আমরা আরো ভালো কিছু আশা করতে পারি এবং আশা করব। সেটার সামর্থ্য আমাদের আছে। এজন্যই বললাম যে আমরা সবাই মিলে একটা দল, আমরা সবাই বাংলাদেশকে সাপোর্ট করি। চলুন বাংলাদেশ ক্রিকেটকে ভিন্ন উচ্চতায় তুলতে একসঙ্গে কাজ করি।’
১৯৯৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে আমিনুলের নেতৃত্বে খেলেছে বাংলাদেশ। ২০০৩ সালে খেলোয়াড়ি জীবন থেকে অবসর নেন তিনি। এরপর নাম লেখান কোচিংয়ে। পরে পরিবার নিয়ে চলে যান অস্ট্রেলিয়ায়। তখনই এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার হিসেবে শুরু হয় তার নতুন অধ্যায়।
পরে এক দশক ধরে ডেভেলপমেন্টের নানা ভূমিকায় আইসিসিতে কাজ করছেন আমিনুল। সবশেষ আইসিসির এশিয়া অঞ্চলের ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। আইসিসি ও এসিসির বিভিন্ন দায়িত্বে সহযোগী সদস্যদেশগুলোয় ক্রিকেটের প্রচার-প্রসারে কাজ করেছেন আমিনুল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার নিজ দেশের ক্রিকেট উন্নতিতেও সফল হওয়ার আশা তার।
বিভিন্ন দেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আমিনুল বলেন, ‘আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারি, আমার এ মুহূর্তে যে স্কিলসেট আছে, এটা একটা প্যাকেজ। আমি ছোট্ট দেশ তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান যেখানে ক্রিকেট খেলা হয় না তেমন (সেখানে কাজ করেছি) এবং পাকিস্তান, ইন্ডিয়াতে যেখানে খেলা হয়, তাদের সঙ্গেও কাজ করি। আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করব। ইনশা আল্লাহ ব্যর্থ হব না। আমার অভিজ্ঞতাটা শেয়ার করব বাংলাদেশের সঙ্গে। ক্রিকেটার হিসেবে আমি এখানে বসিনি, আমার যে দায়িত্বটা আছে, সেটা আমি ভালো করে পালন করার চেষ্টা করব।’
দেশের ক্রিকেট নিয়ে কাজ করার আগ্রহ অনেক আগে থেকেই প্রকাশ করেছেন আমিনুল। তবে নিজের চাওয়ার চেয়ে বেশিই পেয়েছেন তিনি। বিসিবি সভাপতির চেয়ারে বসে সুযোগটা কাজে লাগাতে চান, দেশের ক্রিকেটের জন্য কাজ করতে চান। তার কথায়, ‘আমার মনে হয়, এই দায়িত্বটা আরো ভালো। যেখানে আমাকে হয়তো কম কাজ করতে হবে, অভিজ্ঞ পরিচালকদের সাহায্য নিয়ে বেশি দিকনির্দেশনা দিতে হবে।’
বিসিবি সভাপতি হওয়ার প্রস্তাব কখন কীভাবে পেয়েছেন সে কথাটিও জানালেন আমিনুল। গত মাসের শেষ দিকে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার কাছ থেকে একটি ফোন পান তিনি। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা আছে কিনা, জানতে চাওয়া হয় তার কাছে। তখনো তাকে নির্দিষ্ট কোনো দায়িত্বের জন্য বলা হয়নি। তবে ওই ফোন পেয়েই বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তার কথায়, ‘আমাকে বলা হয় যে আপনাকে একটা সুযোগ দেয়া হবে, আপনি কি সুযোগ গ্রহণ করবেন? আমি যে আপনাদের এত প্রমিজ করতাম বা আমি অপেক্ষা করতাম একটা ডাকের জন্য। যখন এই ডাক পেয়েছি, তখন আর পেছনে তাকাইনি। আমার একটাই লক্ষ্য ছিল, কীভাবে এই ডাকটাকে সম্মান করতে পারি। এটা আমার জন্য নতুন একটা পরীক্ষা বা একটা সুযোগ। চেষ্টা করব, বাংলাদেশের ক্রিকেটকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে।’










