শেষ বত্রিশে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে যেভাবে বীরের মতো লড়েছেন কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা, তা হৃদয় জয় করে নেয় ফুটবলপ্রেমীদের। বিশ্বকাপে অভিষেক আসরে তাদের পথচলা শেষ হলেও আলোচনা তো শেষ হচ্ছে না সহসাই। চারদিকে এখন কেপ ভার্দের রূপকথার নায়কদের স্তুতি চলছে। তাদের নিয়ে গর্বিত দলটির কোচ বুবিস্তাও। বিদায় নেয়ার আগে দল যেভাবে নিজেদের নিংড়ে দিয়ে লড়াই করেছে, তাতে মুগ্ধ তিনি।
মায়ামিতে বাংলাদেশ সময় গতকাল ভোরে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দুইবার সমতা ফেরায় কেপ ভার্দে। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে (১১১তম মিনিট) আত্মঘাতী গোল খেয়ে বসে আফ্রিকার দলটি, যা তাদের আশা শেষ করে দেয়। সাড়ে ৫ লাখ অধিবাসীর দেশটি শেষ পর্যন্ত হেরে যায় ৩-২ গোলের ব্যবধানে।

এ বিশ্বকাপটা যেন কেপ ভার্দের জন্যই মানুষ মনে রাখবে। একে একে রূপকথা লিখে চলে দলটি। গ্রুপ পর্বে সাবেক দুই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়ের পাশাপাশি সৌদি আরবের বিপক্ষেও ড্র করে তারা। গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে জায়গা করে নেয় নকআউট শেষ বত্রিশে। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে নকআউটে ওঠার কীর্তি গড়ে কেপ ভার্দে। নকআউটে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচটা টাইব্রেকারে নিতে পারলে হয়তো সবচেয়ে বড় অঘটনের জন্ম হতো, বাড়ি ফিরতে হতো মেসিদের। কিন্তু তেমনটি ঘটেনি। না জিতলেও ভোজিনিয়াদের গৌরব কম কীসের!
কেপ ভার্দের এ উত্থানের, এ গৌরবময় অর্জনের নায়ক বুবিস্তা। বিশ্বকাপ অভিষেকে স্বপ্নের মতো পথচলা এখানেই থেমে যাওয়ায় খারাপ লাগলেও বিশ্ব আসরে যে দৃঢ়তা ও মানসিকতা দেখিয়েছেন ভোজিনিয়ারা, তাতে ভীষণ গর্বিত দলটির কোচ। ম্যাচ শেষে বিমর্ষ ও একই সঙ্গে গর্বিত বুবিস্তা বলেন, ‘ড্রেসিং রুমের পরিবেশ বিষাদময়। আমরা কষ্ট পাচ্ছি, কারণ প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নিচ্ছি। আমরা (জয়ের) খুবই কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম, খুবই কাছাকাছি। ছেলেরা অনেক কষ্ট পাচ্ছে, একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কান্না করছে। এগুলো বিকাশের একটি অংশ। এটা আমাদের বেড়ে উঠতে সাহায্য করবে এবং একই সঙ্গে এটাও প্রমাণ করে যে এ দলের ভেতরে প্রাণ আছে।’
এ মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা দল, বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মতো দলের বিপক্ষে ম্যাচকে অতিরিক্ত সময়ে নেয়াকেই অনেক বড় পাওয়া হিসেবে দেখছেন বুবিস্তা। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘ছেলেরা যা করেছে, তাতে আমি গর্বিত। তারা মর্যাদা ও সাহসের সঙ্গে লড়াই করেছে। আর আমার মনে হয়, আর্জেন্টিনা দেখিয়েছে তারা কেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। আমাদের দলও দেখিয়েছে, এ ম্যাচটি খেলার জন্য তারা কতটা প্রস্তুত ও আগ্রহী ছিল। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আর কোনো দল দুই গোল করেছে এবং ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে টেনে নিয়েছে বলে মনে হয় না। এটা আমাদের মানসিকতা ও দক্ষতাকে ফুটিয়ে তোলে। ছেলেরা বীরত্বের সঙ্গে লড়েছে, কখনো নিজেদের পরিচয় হারায়নি।’

বিশ্বকাপের আগে অনেকেই কেপ ভার্দের নামও শোনেননি। এবারের বিশ্বকাপে কেবল খেলতে আসেনি কেপ ভার্দে, নিজেদের দেশকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতেও এসেছে ভোজিনিয়ারা। বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়ার পর সে কথাটি উল্লেখ করেছেন কোচ বুবিস্তা। তার কথায়, ‘স্রেফ খেলা না, আরো বড় লক্ষ্য ছিল আমাদের, সেটা হলো বিশ্বের সামনে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরা। পুরো টুর্নামেন্টে যতদিন আমরা টিকে ছিলাম, আমরা সবসময় ইতিবাচক ফুটবল খেলতে চেয়েছি এবং বিশ্বের সেরা দলগুলোর মুখোমুখি হতে চেয়েছি। আমরা সততার সঙ্গে খেলেছি এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছি। আমার মনে হয়, দারুণ একটি টুর্নামেন্ট কাটানোর জন্য সবারই উচিত খেলোয়াড়দের ধন্যবাদ জানানো। কারণ তারা দেখিয়েছে আমাদের ছোট্ট দেশটি আসলে কীসের প্রতিনিধিত্ব করে।’
লিওনেল স্কালোনির প্রশংসায় ভাসল কেপ ভার্দে:
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কেপ ভার্দে নিজেদের ২০০ শতাংশ দিয়ে খেলছিল বলে মন্তব্য করেছেন মেসিদের কোচ লিওনেল স্কালোনি। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে স্কালোনি বলেন, ‘ওরা ভীষণ ক্লান্তি নিয়ে ম্যাচ শেষ করেছে। অতিরিক্ত সময়ের জন্য খেলোয়াড়রা ক্লান্ত—অনেক মিনিট খেলতে হয়েছে—কিছু ক্র্যাম্পও ছিল। উন্নতির কিছু জায়গা আছে, তবে ওরা ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা দেখিয়েছে। দল আজ তাদের দৃঢ়তা ও সামর্থ্য দেখিয়েছে। কেপ ভার্দে আজ ২০০ শতাংশ দিয়ে খেলেছে আর ফুটবলে এটা ব্যবধান ঘুচিয়ে দেয়। ভক্তরাই প্রথম এটা বুঝতে পারে যে এটা আর্জেন্টিনা এবং আমাদের জন্য কোনো কিছু সহজ নয়।’
এরপর নিজেদের নিয়ে কথা বলেছেন স্কালোনি। শেষ ষোলোয় মঙ্গলবার মিসরের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। ওই ম্যাচের আগে খেলোয়াড়দের সতেজ করে তোলাই স্কালোনির এখন মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, ‘এ জার্সির বিশেষ একটা ব্যাপার আছে। আমরা এগিয়ে যেতে থাকব। আর আমাদের একরকম দৃঢ়তা নিয়ে নামার ও সামনে এগিয়ে যেতে না পারার কোনো কারণ নেই।’
১০২তম মিনিটে সিডনি লোপেস কাব্রলের দুর্দান্ত গোলে দ্বিতীয়বারের মতো সমতায় ফেরে কেপ ভার্দে। তখন ম্যাচটি টাইব্রেকারের দিকে গড়াচ্ছিল। টাইব্রেকারে গেলে কেপ ভার্দেরও সমান সম্ভাবনা টিকে থাকত। যদিও ভাগ্যক্রমে আত্মঘাতী গোলটি বাঁচিয়ে দেয় আর্জেন্টিনাকে। ম্যাচ শেষে স্কালোনি বললেন, অনেকে যেমন মনে করেছিলেন মোটেও তেমন সহজ ছিল না কেপ ভার্দে ম্যাচ। আফ্রিকার ছোট্ট দেশটি দ্বিতীয়বার সমতা ফেরানোর পর বড় আপসেটের সম্ভাবনাও জেগে উঠেছিল। তার কথায়, ‘আমি স্রেফ চাচ্ছিলাম, ম্যাচটা শেষ হোক। আপনারা দেখেছেন কী দুর্দান্ত এক গোল তারা করেছিল। আমি সবসময়ই সাবধান থাকি। যতটা দেখাচ্ছি আমি এর চেয়ে শান্ত ছিলাম। অনেকে ভেবেছিলেন, এটা সহজ ম্যাচ হবে। তবে আমরা জানতাম তেমনটা হবে না।’
আর্জেন্টিনার প্রাণভোমরা, অধিনায়ক লিওনেল মেসির প্রশংসাও কুড়ান কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা। ম্যাচে দুইবার সমতা ফেরানো কেপ ভার্দের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘ওরা যে স্পেন ও উরুগুয়ের বিপক্ষে হারেনি, সেটা তো বিনা কারণে নয়। আমরা কঠিন কাজটা করেছিলাম, প্রথম গোলটা করেছিলাম। এরপর ভেবেছিলাম ছন্দ পাব, কিন্তু হয় এর উল্টো। আমরা বল হারাই, আমরা রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ি এবং সে সময় ওদের ঠিকঠাক চেপে ধরতে পারিনি। তারা সর্বোচ্চটা দিয়েছে। এটাই এ বিশ্বকাপের বাস্তবতা।’
মাঠের লড়াইয়ে মেসিকে কোনো ছাড় দেননি কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা। যার সামনেই সুযোগ এসেছে তিনিই চড়াও হয়েছেন তার ওপর, ধাক্কা মেরেছেন, ফাউল করেছেন। তবে ম্যাচ শেষে সে সব মনে রাখেননি আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে মেসির জন্য অপেক্ষা করছিলেন কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা। আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী মহাতারকা তাদের কাউকেই নিরাশ করেননি। পরে মজা করে বলেন, ‘ওরা আমার জার্সি চাইছিল, সবকিছুই—আর মাঠে ওরা সবাই আমার ওপর চড়াও হয়েছিল।’
নকআউট রাউন্ডের প্রতিটা দলই ভালো দল হিসেবে এসেছে বলে মনে করেন মেসি। তার ভাষায়, ‘আমরা সবসময় সব দলকে সম্মান করি। জানতাম সহজ হবে না। এখন সব দলই খুব কাছাকাছি মানের। প্রতিটি ম্যাচই কঠিন হবে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিশ্রাম নেয়া এবং সামনে কী আসছে, সেটা নিয়ে ভাবা। ভালো দিকগুলো ধরে রাখতে হবে, আর যেসব ভুল হয়েছে, সেগুলো শুধরে নিতে হবে।’
নিজেদের ভুল নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যথেষ্ট চাপ তৈরি করতে পারিনি। আমাদের লাইনগুলোর মধ্যে অনেক দূরত্ব ছিল। আমরা সমস্যায় পড়েছিলাম। খেলোয়াড়দের মধ্যে সমন্বয়ও ঠিক ছিল না। আর প্রতিপক্ষ যে শারীরিক পরিশ্রম করছিল, আমরা তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারিনি।’









