আমেরিকান টেনিস গ্রেট জন ম্যাকেনরো কোনো এক সময় বলেছিলেন, ক্লে-কোর্টে ফর্মে থাকা নাদালকে সামলানোর চেয়ে ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন আর কিছু হয় না। এটাই টেনিসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ম্যাকেনরো কেন কথাটি বলেছেন, তা তারাই ভালো বুঝবেন, যারা বিশেষ করে রোলাঁ গারোঁয় এই স্প্যানিশ ম্যাটাডোরের মুখোমুখি হয়েছেন। সুরকির এই কোর্টে তিনি ১১৫ ম্যাচ খেলে ১১২টি জিতেছেন। এ পথে ধরা দিয়েছে রেকর্ড ১৪টি শিরোপা! 

কিন্তু এবার রোলাঁ গারোঁর এই জাদুকরকে খুঁজবেন ফরাসি টেনিস সমর্থকরা। ১৯ বছরের মধ্যে প্রথমবার ‘‌ক্লে কোর্টের রাজা’কে ছাড়াই এবার রোলাঁ গারোঁর টেনিস উৎসব শুরু হতে চলেছে। আগামীকাল শুরু কোয়ালিফাইং রাউন্ড, আর ২৮ মে থেকে মূল লড়াই। এবারের আসরে দেখা যাবে না সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত নাম, সবচেয়ে বড় তারকা, সবচেয়ে ফেভারিট হিসেবে প্রতিটি আসর শুরু করা নাদালকে। চোটের কারণে তিনি এবারের আসরে অংশ নেবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার রাতে ৩৬ বছর বয়সী নাদাল সরে দাঁড়ানোর ঘোষণায় বলেন, ‘আমি সিদ্ধান্তটি নিইনি, নিয়েছে আমার শরীর। রোলাঁ গারোঁয় খেলা এবার আসলেই অসম্ভব।’

আসলেই তাই। তিনি নিজে থেকে প্রিয় এই কোর্টে, নিজের দুর্গে অনুপস্থিত থাকা মানুষ নন। তিনি বাধ্য হয়েছেন শারীরিক ফিটনেসের ঘাটতির কারণে। যে কারণেই হোক না কেন, ‘‌‌রোলাঁ গারোঁয় নাদাল খেলবেন না’—এ কথা আপনাকে যতবারই বলা হোক না কেন, এটা আপনার কাছে, টেনিস সমর্থকের কাছে অনেকটা ‘‌অসম্ভব’ কিছুই মনে হবে। 

ফ্রেঞ্চ ওপেনের টুর্নামেন্ট ডিরেক্টর অ্যামেলি মরেসমো নাদালের অনুপস্থিতি নিয়ে বলেছেন, ‘‌এটা কল্পনা করাও কঠিন। প্রায় ২০ বছর ধরে এ টুর্নামেন্টের ইতিহাসের বড় অংশ সে। কাজেই এটা খুবই দুঃখজনক।’ 

২০০৫ সালে প্রথমবার অংশ নিয়েই ফ্রেঞ্চ ওপেন জিতে তাক লাগিয়ে দেন নাদাল। এরপর ১৭ আসরে অংশ নিয়ে ১৩ বার শিরোপার স্বাদ পেয়েছেন বামহাতি এ খেলোয়াড়। এ পথে গড়েছেন ইতিহাস। অন্য কোনো খেলোয়াড় নির্দিষ্ট কোনো আসরের এককে এত বেশিবার চ্যাম্পিয়ন হতে পারেননি।

২০০৯ সালে ফ্রেঞ্চ ওপেনে প্রথম হারের স্বাদ পান নাদাল। সেবার চতুর্থ রাউন্ডে সুইডেনের রবিন সোডারলিংয়ের কাছে তিনি হেরে যান। এছাড়া ২০১৫ সালে ও ২০২১ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে তাকে হারিয়ে দেন নোভাক জোকোভিচ। গত বছর ছত্রিশতম জন্মদিন পালনের দুদিন পর নরওয়ের ক্যাসপার রুডকে হারিয়ে সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে ফ্রেঞ্চ ওপেন শিরোপা জয়ের কীর্তি গড়েন নাদাল। এবার সুযোগ ছিল রেকর্ডটা আরেকটু সমৃদ্ধ করার। তবে আরেক বছর অপেক্ষা করবেন। তার স্বপ্ন রোলাঁ গারোঁয় ১৫তম শিরোপা জিতে অবসর নেয়া। 

অবসর ভাবনা নিয়ে নাদাল বলেন, ‘‌এখন পর্যন্ত জানি, আগামী বছরই সম্ভবত আমার শেষ। এবার যদি আমি খেলি, তবে হয়তো পরিকল্পনামতো শেষ করতে পারব না।’

নাদাল ও জোকোভিচ দুজনই যুগ্মভাবে সর্বোচ্চ ২২টি গ্র্যান্ড স্লাম জয় করেছেন। এছাড়া ৭০টি এটিপি শিরোপা জিতেছেন নাদাল, আর র‍্যাংকিংয়ে এক নম্বরে থেকেছেন ১০৯ সপ্তাহ—এটিপির ইতিহাসে যা ষষ্ঠ দীর্ঘতম। 

স্পেনের মায়োর্কা থেকে উঠে আসা এই বামহাতি খেলোয়াড় অবশ্য এ বছর জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের পর আর খেলেননি। তখন পড়েছিলেন হিপ ইনজুরিতে। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি অনুশীলন করে গেলেও বড় টুর্নামেন্টে খেলার মতো ফিট হয়ে উঠতে পারেননি।

২৮ মে শুরু হবে ফ্রেঞ্চ ওপেন, শেষ হবে আগামী ১১ জুন। এ আসরে নাদালের অনুপস্থিতি বিশেষভাবে চোখে পড়বে সবার। নিজের ফিটনেস নিয়ে তিনি বলেন, ‘‌চার মাস ধরে প্রতিটি দিন আমি সুস্থ হয়ে উঠতে কাজ করেছি, কিন্তু এটা কঠিন ছিল, কারণ অস্ট্রেলিয়ায় আমি যে সমস্যার মুখোমুখি হই সেটার সঠিক সমাধান খুঁজে পাচ্ছিলাম না। রোলাঁ গারোঁয় খেলতে হলে যে মানে থাকা প্রয়োজন নেই পর্যায়ে আমি নেই। আমি এমন খেলোয়াড় নই যে কিনা রোলাঁ গারোঁয় শুধুই অংশগ্রহণ করবে এবং অমন অবস্থানে থাকা আমি পছন্দও করি না।’

এ বছর উইম্বলডন খেলাও অনিশ্চিত নাদালের। অল ইংল্যান্ড ক্লাবে ২০০৮ ও ২০১০ সালে শিরোপা জিতেছেন তিনি। এ বছর ৩ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত চলবে উইম্বলডন আসর। 

অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের দ্বিতীয় রাউন্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাকেঞ্জি ম্যাকডোনাল্ডের কাছে হেরে যাওয়া ম্যাচে হিপ ইনজুরিতে পড়েন নাদাল। প্রথমে ধারণা করা হচ্ছিল তিনি আট সপ্তাহের জন্য ছিটকে যাবেন। যদিও দুদিন পর এমআরই স্ক্যানে দেখা যায়, তার হিপের সোয়াস মাসল ছিঁড়ে গেছে। 

গত মাসে তিনি এক ঘোষণায় জানান, কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে সেরে না ওঠায় মাদ্রিদ ওপেনে খেলবেন না। পরে ইতালিয়ান ওপেন ও এবার ফ্রেঞ্চ ওপেন থেকেও সরে দাঁড়ালেন নাদাল।