কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনার জেরে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ভারত ও পাকিস্তান। গতকাল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত চলে পাল্টাপাল্টি হামলা। এ যুদ্ধের বিশাল প্রভাব পড়ে ক্রীড়াঙ্গনে। বিশেষ করে ক্রিকেটের হয়েছে বড় ক্ষতি। ভারত ও পাকিস্তানের পাশাপাশি ক্ষতির শিকার হতে যাচ্ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটও। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) ও পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল) স্থগিত করা হয়। এছাড়া মে-জুনের পাকিস্তান-বাংলাদেশ সিরিজ, আগস্টের বাংলাদেশ-ভারত সিরিজ ও সেপ্টেম্বরের এশিয়া কাপও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। যদিও যুদ্ধবিরতি এখন ক্রীড়াঙ্গনেও আশার আলো দেখাচ্ছে।

ভারতীয় ক্রিকেট দলের এ বছরের আগস্টে বাংলাদেশ সফরে আসার কথা রয়েছে। এ সফরের সূচিতে রয়েছে সমান তিনটি করে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। যদিও ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে হার্দিক পান্ডিয়া, সূর্যকুমার যাদবদের বাংলাদেশে আসা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে সেপ্টেম্বরের এশিয়া কাপ।

ভারতের সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছিল, বাংলাদেশ সফর ও এশিয়া কাপের বিষয়ে নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছে ভারতের ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিসিসিআই। বাংলাদেশ সফরের ওই সময়ে আইপিএলের স্থগিত হয়ে যাওয়া বাকি ম্যাচ আয়োজন করা হতে পারে। এখন হয়তো সবকিছু স্বাভাবিক হতে শুরু করবে।

সূচি অনুযায়ী চলতি মে মাসেই আইপিএল শেষ হওয়ার কথা। এরপর ভারতীয় ক্রিকেট দল ইংল্যান্ড যাবে জুনের প্রথম সপ্তাহে। সেখানে পাঁচ টেস্টের সিরিজ খেলার পর তাদের বাংলাদেশে আসার কথা। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, যদি আইপিএলের বাকি অংশ ভারতের বাংলাদেশ সফর ও এশিয়া কাপের আগে শেষও হয়ে যায়, তবু এই সফর এবং এশিয়া কাপ বাতিল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

ভারত ও পাকিস্তানের সংঘাতে আইপিএল স্থগিত করা হয়েছে। বিসিসিআইয়ের এক সূত্র শুক্রবার হিন্দুস্তান টাইমসকে খবরটি নিশ্চিত করে। পরে বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানান, এক সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে আইপিএল। বিসিসিআই এ নিয়ে অফিশিয়াল বিবৃতিতে বলেছে, ‘ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) আইপিএল ২০২৫ তাৎক্ষণিকভাবে এক সপ্তাহ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নিয়ে নতুন সূচি ও ভেন্যুর বিষয়ে পরে জানানো হবে।’

মঙ্গলবার দিবাগত রাতে পাকিস্তানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ভারত। পাকিস্তান প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে—এমন শঙ্কার মধ্যে বৃহস্পতিবার ধর্মশালায় আইপিএলের ম্যাচ খেলতে নামে পাঞ্জাব কিংস-দিল্লি ক্যাপিটালস। ম্যাচের মাঝপথে স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইট নিভিয়ে দেয়া হয়। পরে জানানো হয়, নিরাপত্তার কারণে ম্যাচ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যম জানায়, ওই একই সময়ে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তে একাধিক হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়, ধর্মশালায় আকস্মিক খেলা বন্ধের পর পাঞ্জাব ও দিল্লির খেলোয়াড়েরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। শুক্রবার ভোরে তারা ধর্মশালা ছেড়ে যান। আশঙ্কা ছিল, এমন পরিস্থিতিতে এবারের আসরে আইপিএলের বাকি ১৬ ম্যাচ পিছিয়ে যেতে পারে কয়েক মাস। তবে এখন পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।

এদিকে ভারতকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি)। ভারত চাইলে স্থগিত হয়ে যাওয়া আইপিএলের বাকি অংশ আয়োজন করার আগ্রহ দেখায় তারা। যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান জানায়, সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে বিসিসিআই সচিবের সঙ্গে কথা বলেছেন ইসিবির প্রধান নির্বাহী রিচার্ড গোল্ড। যদিও এখন আর ইসিবির সাহায্য নেয়ার প্রয়োজন পড়বে না বিসিসিআইয়ের।

সংঘাতময় পরিস্থিতিতে দেশী-বিদেশী সব ক্রিকেটারকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় বিসিসিআই। এ কারণে আইপিএলের খেলা শুরু হতে খানিকটা বিলম্ব হতে পারে।

যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশ জাতীয় দলের সূচিতেও পরিবর্তন আসার ঝুঁকি ছিল। পাঁচটি টি-টোয়েন্টি খেলতে চলতি মাসেই পাকিস্তান সফরে যাওয়ার কথা বাংলাদেশ দলের। সে লক্ষ্যে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে চলছে টাইগারদের অনুশীলন। তবে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের জেরে সফরটি পিছিয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়। সংঘাতময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) পাকিস্তানে দল পাঠাতো কিনা, সেই প্রশ্ন থাকছে। সেই সঙ্গে পিসিবিও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।

পিএসএল স্থগিত করতে বাধ্য হয় পিসিবি। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পিএসএলের বাকি থাকা আট ম্যাচ স্থগিত ঘোষণা করে সংস্থাটি। যদিও এর আগে শুক্রবার পিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, পিএসএলের বাকি ম্যাচগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত হবে। তবে এখন ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার কারণ দেখিয়ে বাকি আট ম্যাচ স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে পিসিবি।

পিএসএলে শুক্রবার রাওয়ালপিন্ডি স্টেডিয়ামে করাচি কিংস ও পেশোয়ার জালমির মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ড্রোন হামলায় স্টেডিয়াম কমপ্লেক্স ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর জরুরি বৈঠক শেষে ম্যাচটি আর হয়নি। এরপরই আরব আমিরাতে সূচি পুনর্নির্ধারণ করে খেলার পরিকল্পনা করে পিসিবি। যদিও শেষ পর্যন্ত সেটিও আপাতত হচ্ছে না। পিএসএল স্থগিত হয়ে যাওয়ায় গতকাল দেশে ফিরে এসেছেন বাংলাদেশের খেলোয়াড় রিশাদ হোসেন ও নাহিদ রানা।

সংঘাতের কারণে পিছিয়ে যেতে পারতো বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের হোম সিরিজ। বাংলাদেশ দলের পাকিস্তানে যাওয়ার কথা ২১ মে। পাঁচ টি-টোয়েন্টি সিরিজটি আইসিসির ভবিষ্যৎ সফরসূচির (এফটিপি) অংশ। লিটন দাসকে অধিনায়ক করে ১৫ সদস্যের দল ঘোষণা করেছে বিসিবি। পাকিস্তান সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ দলের ১৪ মে ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার কথা। ২১ মে পাকিস্তানে পৌঁছার আগে দুবাইয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে দুটি টি-টোয়েন্টি যুক্ত করেছিল বিসিবি। এখন পাকিস্তান সফর পিছিয়ে গেলে বা স্থগিত হয়ে গেলে লিটনদের আরব আমিরাত সফরও পড়ে যাবে অনিশ্চয়তায়। কারণ দুবাই হয়ে যাওয়ার পথে দুটি ম্যাচ খেলাই যায়, এমন ভাবনা থেকেই করা হয়েছিল আরব আমিরাতের সূচি।

গতকাল মিরপুরের জাতীয় সুইমিং কমপ্লেক্সে সাঁতার ফেডারেশনের এক অনুষ্ঠানে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলছিলেন, ‘বর্তমানে যে পরিস্থিতি, এর মধ্যে কোনো প্রকার ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না। পাকিস্তান এম্বাসি থেকেও আমাদের নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি জানিয়েছে। বিসিবি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা জানাবে।’

গতকাল বিসিবির কয়েকজন পরিচালকের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে দ্বিতীয় দফা বৈঠকে বসেন বোর্ড সভাপতি ফারুক আহমেদ। সভার পর আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বিসিবি জানিয়েছে, পাকিস্তান সফরের আগে হতে যাওয়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে দুই ম্যাচ টি-টোয়েন্টি সিরিজটি ঠিক সময়ে হবে, তবে পাকিস্তান সফর হবে কিনা তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। যুদ্ধ থেমে গেলে সূচিতেও হয়তো পরিবর্তন আনা লাগবে না।