দলীয় বাস হোটেলের সামনে থামার সঙ্গে সঙ্গেই হ্যারি কেইন, জুড বেলিংহ্যাম আর বুকায়ো সাকাদের উদ্দেশে গর্জে ওঠে হাজারো কণ্ঠ। শিস, দুয়োধ্বনি আর বিদ্রূপের স্লোগানে মুহূর্তেই মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। সেখানেই শেষ নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের রাতে ঘুমাতে না দেয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন একদল মেক্সিকান সমর্থক। পরিস্থিতি সামাল দিতে হোটেলের সামনে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। আর এ তো কেবল শুরু। সামনে অপেক্ষা করছে আজতেকা—যে স্টেডিয়াম বহুদিন ধরেই মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় শক্তি। প্রায় ২ হাজার ২৪০ মিটার উচ্চতায় দাঁড়িয়ে থাকা এ ফুটবল দুর্গে স্বাগতিকদের হারানো যেমন কঠিন, তেমনি কঠিন পাতলা বাতাস আর উন্মত্ত গ্যালারির পরীক্ষায় উতরে যাওয়া।
মেক্সিকানরা এ মাঠকে কেবল নিজেদের ঘরের মাঠ বলে না, বলে ‘কাসা’ বা বাড়ি। সেই বাড়িতে অতিথিদের জন্য স্বস্তি খুব কমই থাকে। দশকের পর দশক ধরে আজতেকা স্বাগতিকদের আত্মবিশ্বাসের অন্য নাম। এখানকার গ্যালারি যেন খেলার অংশ হয়ে ওঠে। একেকটি ট্যাকল, একেকটি দৌড়, একেকটি কর্নারে হাজারো কণ্ঠের বিস্ফোরণ প্রতিপক্ষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। মেক্সিকোর ফুটবল সংস্কৃতিতে আজতেকা শুধুই একটি স্টেডিয়াম নয়; এটি জাতীয় পরিচয়েরও অংশ। সে কারণেই বড় বড় দলও এখানে এসে নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়েছে।
এ বিশ্বকাপেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে স্বাগতিকরা। গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে নকআউটে ওঠার পথে তারা নিজেদের শক্তিকে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগিয়েছে ঘরের মাঠেই। রক্ষণে সংগঠিত, মাঝমাঠে নিরলস পরিশ্রম আর দর্শকদের উন্মাদ সমর্থনে তারা প্রতিপক্ষকে একের পর এক চাপে ফেলেছে। যেন মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের একাদশ নয়, বরং তারা কোথায় খেলছে।
আজতেকার সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র অবশ্য গ্যালারি নয়, উচ্চতা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ২৪০ মিটার ওপরে অবস্থিত এ স্টেডিয়ামে বাতাসে অক্সিজেনের ঘনত্ব সমতলের তুলনায় কম। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে একই গতিতে প্রেসিং করা কঠিন হয়ে পড়ে। খেলোয়াড়রা প্রায়ই বলেন, এখানে শেষ কুড়ি মিনিট যেন অন্য এক ম্যাচ।
অবশ্য মেক্সিকোর ফুটবলারদের জন্য এটি দৈনন্দিন বাস্তবতা। কিন্তু ইংল্যান্ডের অধিকাংশ খেলোয়াড় এমন পরিবেশে নিয়মিত খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে আসেননি। টমাস টুখেল ম্যাচের আগে স্বীকার করেছেন, এ উচ্চতা ম্যাচের অন্যতম বড় ফ্যাক্টর হতে যাচ্ছে। তাই অনুশীলন থেকে শুরু করে খেলোয়াড়দের শারীরিক পুনরুদ্ধার সবকিছুতেই বিশেষ পরিকল্পনা করেছে ইংল্যান্ড।
প্রকৃতিও যেন এ ম্যাচকে আরো নাটকীয় করে তুলতে চাইছে। মেক্সিকো সিটিতে ম্যাচের সময় সম্ভাব্য বজ্রঝড়ের পূর্বাভাস থাকায় কিক-অফ পিছিয়ে দেয়া হবে কিনা, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। বিভিন্ন ব্রিটিশ গণমাধ্যমও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে। তবে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের পর শেষ পর্যন্ত ফিফা সিদ্ধান্ত নেয়, সূচিতে কোনো পরিবর্তন আনা হবে না। নির্ধারিত সময়েই ম্যাচ শুরু হবে। অর্থাৎ বজ্রঝড়ের সম্ভাবনা মাথায় রেখেই দুই দলকে মাঠে নামতে হবে।
ইংল্যান্ড অবশ্য আত্মবিশ্বাস নিয়েই আজতেকায় পা রেখেছে। শেষ ষোলো নিশ্চিত করার পথে তাদের পারফরম্যান্স ছিল স্থির ও পরিণত। হ্যারি কেইনের অভিজ্ঞতা, বেলিংহ্যামের নেতৃত্ব, সাকার গতি, ফিল ফোডেনের সৃজনশীলতা সব মিলিয়ে কাগজে-কলমে ইংল্যান্ড হয়তো এগিয়ে। কিন্তু বিশ্বকাপের নকআউটে কাগজের হিসাব খুব কমই শেষ কথা বলে। বিশেষ করে ম্যাচটি যদি হয় আজতেকায়। ইংল্যান্ডের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ একটি নয়। তাদের হারাতে হবে মেক্সিকোকে, সামলাতে হবে উচ্চতা, উপেক্ষা করতে হবে বৈরী গ্যালারিকে, পেরোতে হবে মনস্তাত্ত্বিক চাপ, এমনকি প্রকৃতির অনিশ্চয়তাকেও।









