প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি) ক্লাবের ২০২৪-২৫ মৌসুমের প্রথমার্ধ থেকে দ্বিতীয়ার্ধে রূপান্তর ছিল অবিশ্বাস্য। প্রথমার্ধে নড়বড়ে সূচনার পর ইউরোপে বিবর্ণ লুই এনরিকের দল তোপের মুখে পড়ে। কিলিয়ান এমবাপ্পের বিদায়ে পিএসজির পতনও দেখছিলেন কেউ কেউ। এরপর রাতারাতি বদলে গেল পিএসজি। বার্সেলোনার পাশাপাশি তারা মৌসুমের শ্রেষ্ঠ উপভোগ্য দল হয়ে উঠল। আকর্ষণীয় ফুটবল খেলে ফ্রেঞ্চ লিগ ও ফ্রেঞ্চ কাপ জিতেছে প্যারিসিয়ানরা; চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপাও হাতছানি দিচ্ছিল লুই এনরিকের দলকে।
লিভারপুলের ডিফেন্ডার ভার্জিল ফন ডাইক তো বলেই বসলেন—‘তিন বছরের মধ্যে আমার মুখোমুখি হওয়া সেরা দল’। দলটি তীব্রতা, সৃষ্টিশীলতা আর দক্ষতার অপূর্ব সন্নিবেশ ঘটিয়ে সেরা ফুটবল খেলে যাচ্ছে। নকআউট পর্বে বেশকিছু বড় জয়ের পর তারা ফাইনালে উঠে যাওয়ায় প্যারিসে স্বস্তির সুবাতাস বয়ে যায়। বুকের ওপর থেকে যেন জগদ্দল পাথরটাও নেমে যায় এনরিকের, সেই সঙ্গে পিএসজির খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের।
কিন্তু কীভাবে করে দেখালেন মার্কিনোস, ওসমান দেম্বেলে, আশরাফ হাকিমি, গনসালো রামোসরা? এই দলটিতে ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, নেইমার ও লিওনেল মেসির মতো সুপারস্টার। এত বড় মাপের খেলোয়াড়দের মধ্যে ‘ইগো’র নেতিবাচক প্রভাব দেখেছেন সবাই। সেটি আজ পরিণত হয়েছে নিঃস্বার্থ, সুসংগঠিত দল হিসেবে। অতীতে এমন সংঘবদ্ধ আর সুসংগঠিত স্কোয়াড কখনো দেখেছে পিএসজি?
বলতে গেলে ‘তারকাহীন’ দলটিই দ্বিতীয়বারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে উঠেছে। গতকাল রাতে মিউনিখ ফাইনালে ইন্টার মিলানের মুখোমুখি হয় এনরিকের দল। নিজেদের ইতিহাসে প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা থেকে মাত্র ৯০ মিনিট দূরে দাঁড়িয়ে ছিল পিএসজি।
অথচ এ দলটাই গ্রুপ পর্বে ছয় ম্যাচের মধ্যে মাত্র দুটি জিতেছে, হেরেছে তিনটি। ম্যানসিটির কাছে হোম ম্যাচে হারলেই শীর্ষ ২৪ থেকে ছিটকে যেত তারা। তখন অন্য ম্যাচের ফলের ওপর ভরসা করে স্টুটগার্টের মাঠে খেলতে যেতে হতো এনরিকের দলকে। এমন সমীকরণের ম্যাচেই কিনা সিটির কাছে আগে দুই গোল খেয়ে বসে পিএসজি। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দিকে গোল করেন জ্যাক গ্রিয়ালিশ ও আর্লিং হালান্ড। ৩ মিনিটের মধ্যে এক গোল পরিশোধ করে পিএসজির আশা বাঁচিয়ে রাখেন দেম্বেলে। সেই ম্যাচ পিএসজি জিতেছে ৪-২ গোলে!
এরপর স্টুটগার্টের মাঠে দেম্বেলের হ্যাটট্রিকে ভর করে বীরদর্পেই নকআউট পর্বে উঠে যায় পিএসজি। সিটির বিপক্ষে ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোই পিএসজিকে উজ্জীবিত করেছে এবং তাদের আত্মবিশ্বাসের রসদ এনে দেয়।
পিএসজি কোচ এনরিকে বলেন, ‘আমাদের যদি এ মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগের ঘটনা বিশ্লেষণ করতে হয় তাহলে বলব, এবার তো হরর কিংবা থ্রিলার সবকিছুই ছিল। সিটির বিপক্ষে আমরা যেভাবে জিতেছি তা ছিল অভাবনীয়। সেটাই আমাদের বদলে দেয়। সেটা ছিল টার্নিং পয়েন্ট, কারণ আমরা ২-০ গোলে হারতে বসেছিলাম।’
সিটির বিপক্ষে জয়ের পর আরো কয়েকটি ইংলিশ ক্লাবকে হারায় তারা। প্লে-অফ রাউন্ডে স্বদেশী ব্রেস্তকে ১০-০ গোলে বিধ্বস্ত করার পর তাদের শিকার হয় লিভারপুল, আর্সেনাল ও অ্যাস্টন ভিলা। ফ্রেঞ্চ লিগ ওয়ানকে দুর্বল লিগ বলে উপহাস করেন কেউ কেউ। পিএসজির হাতে চার চারটি ইংলিশ দল ধরাশায়ী হওয়ার পর এখন নিশ্চয়ই এই বদনাম ঘুচবে খানিকটা।
এনরিকে এ নিয়ে বলেছেন, ‘কৃষকদের লিগ? আমরা কি কৃষকদের লিগ। কিন্তু এটা সুন্দর। আমরা সবকিছু উপভোগ করছি এবং সবাই আমাদের নিয়ে কথা বলছে এখন।’
অ্যানফিল্ডে শেষ ষোলোর ম্যাচে লিভারপুলকে হারিয়ে দেয় পিএসজি। এ ম্যাচ শেষে লিভারপুল কোচ আর্নে স্লট বলছিলেন, ইউরোপে তার মুখোমুখি হওয়া সেরা দল পিএসজি। তার কথায়, ‘সব পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে, তারাই এখন ইউরোপের সেরা দল। তিনটি দলবদল উইন্ডোতে লুই এনরিকে অবিশ্বাস্য একটি দল তৈরি করেছেন। গতি, কাজের হার, মিডফিল্ডের দক্ষতা আর বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ তাদের অবিশ্বাস্য।’
পিএসজির প্রতিটি খেলোয়াড়ের মধ্যে যেন ‘ফরেস্ট গাম্প’ চরিত্রটির দেখা মিলছে। ‘রান, ফরেস্ট, রান!’—মন্ত্রকে ধারণ করেই যেন দৌড়াচ্ছেন আর সফলতা ছিনিয়ে আনছেন দেম্বেলে ও তার সতীর্থরা। এ মৌসুমে ফাইনালের আগ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়নস লিগে প্রতি ম্যাচে গড়ে ৭৩ মাইল দৌড়েছেন পিএসজির খেলোয়াড়রা। গত মৌসুমে প্রতি ম্যাচে এর চেয়ে ১০ কিলোমিটার কম দৌড়েছে দলটির খেলোয়াড়রা, তারা সেবার সেমিফাইনাল খেলেছে।
গত মৌসুমের পর অনেক পরিবর্তন এনেছেন এনরিকে, যদিও তার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো তিনি একটি যথার্থ দল তৈরি করতে পেরেছেন। স্প্যানিশ কোচের কথায়, ‘আমি চাই তারা একসাথে আক্রমণে যাবে, আবার একসাথে রক্ষণও করবে। এতে প্রতিপক্ষ বলের ওপর দখল নিতে পারবে না এবং আমরাও যত দ্রুত সম্ভব বল পুনরুদ্ধার করতে সমর্থ হব।’
তারুণ্যনির্ভর দলকে ধীরে ধীরে তৈরি করেছেন এনরিকে। ‘কিলার স্ট্রাইকার’ এমবাপ্পে চলতি মৌসুমে নাম লেখান রিয়াল মাদ্রিদে। এরপর গত জানুয়ারিতে নাপোলি থেকে ৬ কোটি ইউরোয় জর্জিয়ান ফরওয়ার্ড খাভিচা কাভারাতস্খেলিয়াকে কিনে শক্তি বাড়ায় পিএসজি। তাকে ছাড়াই সিটিকে হারায় পিএসজি। তবে তিনি যোগ দেয়ার পর আক্রমণের ধার বাড়ে দলটির। অ্যাটাকিং থার্ড অঞ্চলে তার সঙ্গে আছেন ডিজায়ার দুয়ে ও ব্র্যাডলি বারকোলা। সব ধরনের অস্ত্রই আছে এনরিকের ভাণ্ডারে। সফলতাও তাই পাচ্ছেন।
চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে ফল যা-ই হোক না কেন, এরই মধ্যে আলোড়ন তুলেছে পিএসজি। জয়-পরাজয় যাই হোক, সিদ্ধান্তে তারা অটল ছিল। তারা সুপারস্টারদের বাদ দিয়ে তরুণদের ঘিরে দল গড়তে চেয়েছে এবং সেটাই ফলপ্রসূ হয়েছে। সামনের বছরগুলোয়ও তারা ইউরোপের একটি শক্তি হিসেবে থাকবে, এটা নিশ্চিত। ইন্টার মিলানের কাছে হারলেও লজ্জা নেই, কষ্ট থাকতে পারে। কারণ এটা তো তারুণ্যনির্ভর পিএসজির সবে শুরু। তারা সুপারস্টারদের ওপর অতিনির্ভরতা বাদ দিয়ে, বড় প্রকল্পের পেছনে না ছুটে একটি গ্রুপ হিসেবে বেড়ে ওঠার সুফল কেবলই পাওয়া শুরু করেছে।
ইউরোপের একটি বড় প্রজেক্টের স্পোর্টিং ডিরেক্টর ইএসপিএনকে বলেছেন, পিএসজিকে এখন আর কেউ বুড়ো খেলোয়াড়দের ভাগাড় বলতে পারবে না, যেসব খেলোয়াড়কে আবার রেকর্ড ফি দিয়ে কিনতে হয়। পুরনো নীতি থেকে সরে এসেছে পিএসজি। তাই তো ম্যানইউতে ব্রাত্য হয়ে পড়া মার্কাস র্যাশফোর্ডকে কিনতে চেয়েও সেখান থেকে ফিরে আসে তারা। ওই স্পোর্টিং ডিরেক্টর বলেন, ‘নীতিতে পরিবর্তন আনার সুচিন্তিত একটি সিদ্ধান্ত কয়েক বছর আগে নিয়েছে পিএসজি। ক্লাবটি অনুভব করে যে তারা প্যারিসের সঙ্গে যুক্ত নয়, এমনকি সমর্থকগোষ্ঠী আলট্রাসের সঙ্গেও নয়। এমনকি আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী লিওনেল মেসিকেও দুয়োধ্বনি শুনিয়েছেন পিএসজির সমর্থকরা। কাজেই ক্লাবটি বড় খেলোয়াড়ের পেছনে না ছুটে তরুণদের ওপর বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘পিএসজি ম্যানেজমেন্ট তার দলকে বলে দিল, তারা তরুণ খেলোয়াড়দের বাজারে কর্তৃত্ব করতে চায় এবং বিশ্বব্যাপী মেধাবী তরুণদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে চায়। তারা সেটি করে দেখিয়েছে। যখন আপনার আর্থিক সক্ষমতা থাকবে এবং বিশ্বমানের কোচ থাকবে তখনই আপনি এটা পারবেন। এর পরও ভুল পিএসজি করেছে। তারা ৭৫ মিলিয়ন ইউরোয় র্যানডাল কোলো মুয়ানিকে ও ৬০ মিলিয়ন ইউরোয় ম্যানুয়েল উগার্তেকে কিনেছে, যারা দুজনই ব্যর্থ হয়েছেন। যদিও সামগ্রিকভাবে পিএসজির পরিকল্পনা ও নীতি সফলতার মুখ দেখেছে।’
এক নেইমারকে সই করাতেই ২২২ মিলিয়ন ইউরোর দুনিয়া কাঁপানো ফি খরচ করতে হয় পিএসজিকে। এরপর মেসি ও এমবাপ্পেকে আকাশচুম্বী বেতন দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে পিএসজি ক্লাবটি। অথচ এক নেইমারের পেছনে ঢালা টাকা খরচ করেই এখন গোটা একটা দল বানিয়ে ফেলতে পারছেন এনরিকে।
পিএসজি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতুক কিংবা না-ই জিতুক, গ্রীষ্মের দলবদলে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের আকৃষ্ট করার মতো প্রকল্প তাদের আছে। তাদের আর্থিক সক্ষমতা তো আছেই, সেই সঙ্গে ইউরোপসেরার মুকুট জিততে পারলে ‘কৃষকদের লিগে’র দল বলে কেউ আর অবজ্ঞা করবে না হয়তো। তখন হয়তো উদীয়মান তারকা খেলোয়াড়রা পিএসজিতে নাম লেখাতেও মরিয়া হবেন।
পিএসজির এসব পরিবর্তনের নেপথ্য নায়ক এনরিকে। ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে তিনি দলটির দায়িত্ব নেন। তিনি যোগ দেয়ার আগেই মেসি নাম লেখান মেজর লিগ সকারের দল ইন্টার মায়ামিতে। নেইমারকে সৌদি আরবে দলবদলে সবুজসংকেত দেয়া হয় এনরিকেকে। বলে রাখা ভালো, মেসি ও নেইমার দুজনের সঙ্গেই বার্সেলোনায় কাজ করে সফলতা পেয়েছেন তিনি। তবে পিএসজি অধ্যায়ে তিনি এসব বড় নামের ওপর ভরসা করতে চাইলেন না। ‘বিগ থ্রি, একসঙ্গে’—অসম্ভব। দায়িত্ব গ্রহণের আগে পিএসজির পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে এক বৈঠকে এনরিকে বলেন, ‘আজকের ফুটবলে আপনি এমন দল চাইবেন না যেখানে এমন তিনজন ফ্রন্টলাইনার থাকবে। এটা কাজ করবে না।’
এই কোচের নীতি হলো—আপনি যদি ১১ জন নিয়ে আক্রমণে যেতে না পারেন কিংবা ১১ জন নিয়েই রক্ষণ করতে না পারেন, তাহলে সফলতা পাবেন না। কিছু অর্জনও করতে পারবেন না।
লরাঁ ব্লাঁ, টমাস টুখেল, উনাই এমেরি, মাউরিসিও পচেত্তিনো কিংবা ক্রিস্টোফ গালতিয়েরের মতো কোচেরা পিএসজিকে আরাধ্য চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা এনে দিতে পারেননি। তাদের প্রত্যেকের সময়ই বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়কে উড়িয়ে এনেছে ফরাসি জায়ান্টরা। সেই দিক থেকে ব্যতিক্রম এনরিকে। বিশাল বিনিয়োগ না করেও তিনি বহুল প্রতীক্ষিত সেই সাফল্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। গতকাল রাতে এনরিকের শিষ্যরা কি ইউরোপ জয়ের উৎসব করতে পেরেছেন?










