মা হারা দানিয়েলের শোক ভোলাতেই বাবা তাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন পাঠাগারের। যে সে পাঠাগার নয়, প্রাচীন আর দুষ্প্রাপ্য সব বইয়ের সঞ্চয়। সিমেট্রি অব ফরগটেন বুকস বা বিস্মৃত গ্রন্থের গোরস্তান হিসেবে পরিচিত সংগ্রহশালাটি দানিয়েলের চোখে ভিন্ন এক জগত। বলতে গেলে সেখানে আকস্মিকভাবেই খুঁজে পায় ‘দ্য শ্যাডো অব দ্য উইন্ড’ নামের একটা বই, লেখকের নাম জুলিয়ান কারা। তারপরের গল্প অনেকেরই জানা।

বইয়ের পাতা জুড়ে দানিয়েলের কাছে উন্মোচিত হতে থাকে জুলিয়ানের রহস্য। এই দানিয়েলও মূলত উপন্যাসের চরিত্র। আর পুরো বিষয়টা দুর্দান্তভাবে তুলে এনেছেন স্পেনিশ লেখক কার্লোস রুইস সাফোন। উপন্যাসের নামও ‘দ্য শ্যাডো অব দ্য উইন্ড’।

কাতার বিশ্বকাপে এই আসরেরও রহস্যময় নায়ক জুলিয়ান। না, তিনি জুলিয়ান কারা নন;  জুলিয়ান আলভারেজ। দানিয়েলের লাইব্রেরি থেকে হঠাৎ আবিষ্কৃত হওয়া লেখকের মতোই সে হাজির হলো আর্জেন্টিনার দলে। প্রথম সাক্ষাতেই ছুড়ে দিল একরাশ চমক। বয়স মাত্র বাইশ। অথচ কাতার বিশ্বকাপে মাঠে যেন জাদুর কাঠি নিয়ে হাজির হচ্ছেন এই তরুণ।

ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে খেলায় মাঝ মাঠ থেকে বল টেনে নেট পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া আর্জেন্টিনাকে নস্টালজিক করে তোলে। একই ঘটনা তারা দেখেছিল সেই ছিয়াশিতে। দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই গোলটি এখনো ‘দ্য গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে খ্যাত। আলভারেজ হয়তো ম্যারাডোনার মতো পাঁচ-ছয়জনকে কাটিয়ে নেননি। কিন্তু বেশ ভালোভাবেই চিনিয়েছেন নিজের জাত। মেসির পা থেকে দ্বিতীয় অ্যাসিস্টে করা গোল যেন নিখুঁত শিল্পীর জ্যামিতিক কারিশমা। খোদ মেসি তাকে নিয়ে মন্তব্য করেছে, ‘কেউ কল্পনাও করতে পারেনি জুলিয়ানের অংশগ্রহণ ও দাপট। দলে তার অবদান সত্যিই অবিশ্বাস্য।’

২০১০ সালে তোলা ছবিটি এখন ভাইরাল

ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে ৩-১ ব্যবধানে জয়ের দুটি গোলই এসেছে আলভারেজের পা থেকে। এ নিয়ে টুর্নামেন্টে তার গোল সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চারে। ফলে মেসি, এমবাপ্পে ও জিরুর মতো গোল্ডেন বুট জেতার রেসে যুক্ত হয়েছে তার নামটাও। মেসি ও এমবাপ্পের গোল পাঁচটি করে, জিরু ও আলভারেজের চার। ফাইনালে ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হলেই নির্ধারিত হবে গোল্ডেন বুটের যথাযথ দাবিদার।

স্বপ্ন মানুষকে কত বড় করতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ আলভারেজ। ২০০০ সালের ৩১ জানুয়ারি আর্জেন্টিনার শহর কর্ডোবার ক্যালচিনে জন্ম তার। মেসির জন্মস্থান রোজারিও থেকে ৩৫০ কিলোমিটার দূরে। বাবা গুস্তাভো ও মা মারিয়ানা আলভারেজ। আর্জেন্টিনার আট-দশটা শিশুর মতো তিনিও বেড়ে ওঠেছিলেন ফুটবলকে পায়ে জড়িয়ে। এগারো বছর বয়সেই রিয়াল মাদ্রিদের সামনে এক ট্রায়ালে মুনশিয়ানা দেখিয়েছিলেন। বাইরে যেতে বাধ সাধে স্প্যানিশ আইন। তেরো বছরের আগে বিদেশী ক্লাবের সঙ্গে চুক্তিতে যাওয়া মানা। ফলে জুলিয়ান দেশের ভেতরে থেকেই নিজেকে পরবর্তী চ্যালেঞ্জের জন্য তৈরি করলেন। ১৬ বছর বয়সে দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ ক্লাব ‘রিভার প্লেট’-এ যোগ দেন। এই ক্লাবে থাকা অবস্থাতেই জিতে নেন কোপা লিবারতেদরস, কোপা আর্জেন্টিনা ও প্রাইমেরা ডিভিশনসহ অন্যান্য ট্রফি। ২০২১ সালে প্রাইমেরা ডিভিশনে ৩৫টি ম্যাচ খেলে ২০ গোল করেন আলভারেজ। তাকে ‘সাউথ আমেরিকান ফুটবলার অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করা হয়। পরের বছর জুলিয়ান আলভারেজ ১৪ দশমিক ১ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে রিভার প্লেট থেকে ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেন।

কাতারের আসরে আলভারেজের চমক কারো অগোচরে নেই। মাত্র দশ বছর আগেই মেসিকে কাছে পেয়ে ছবি তুলেছিলেন তার সঙ্গে। মেসিকে মানতেন নিজের আদর্শ হিসেবে। সেই ছবিতে সয়লাব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সেই জুলিয়ান আলভারেজ এখন মেসির পাশে খেলছেন। মেসির অ্যাসিস্টে বল তুলে দিচ্ছেন প্রতিপক্ষের জালে। 

এবারের বিশ্বকাপে বাধভাঙা উল্লাসে মেসি ও আলভারেজ

ফ্রন্টলাইনের যেকোনো জায়গায় খেলতে সক্ষম আলভারেজ। ক্ষিপ্রতা, কৌশল ও বলের ওপর ডান পায়ের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতায় দেখিয়েছেন জাদুকরী দক্ষতা। স্বপক্ষের খেলোয়াড়দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা ও প্রতিপক্ষের ব্যূহ ভেদ করে এগিয়ে যাওয়াতে তিনি আর্জেন্টিনার ভরসার জায়গা হতে পারেন আগামী দিনের জন্য।

৩৫ বছর বয়সী মেসির জন্য কাতারই শেষ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে। ফুটবলের রাজ্যে সকল ধরনের পুরস্কার ঝুলিতে তোলার পরও বিশ্বকাপের স্বপ্ন এখনো অধরাই থেকে গিয়েছে এই দশ নম্বর জার্সিধারীর। মেসির জন্যই বিশ্বকাপের যাত্রায় একটু বেশি মরিয়া আর্জেন্টিনা। পৌঁছেও গিয়েছে শেষ দরজায়। তবে তার চাইতে বড় প্রশ্ন মেসি পরবর্তী আর্জেন্টিনার তরুণদের নিয়ে। তারা কি ম্যারাডোনা ও মেসির যথার্থ উত্তরাধিকার ধরে রাখতে পারবে? এখানেই থিয়াগো ও মার্তিনেজদের পাশে এসে পড়ে আলভারেজের নাম। এর মধ্যেই তারা আশার সঞ্চার করেছেন। বোঝাতে চান যেন ‘আমরা ভবিষ্যতের জন্যও প্রস্তুত’।