মাঠে তারা শেষ পর্যন্তই ছিল। বলা ভালো ঠিক সেই মুহূর্ত পর্যন্ত, যখন আতশবাজির ঝলকে ইউরোপিয়ান কাপ উঁচিয়ে ধরেন মারকুইনোস। হারের মেডেল ঝুলে ছিল তাদের গলায়, তবে অধিকাংশ খেলোয়াড় তখনই সেগুলো খুলে ফেলেছে। সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে ছবির জন্য প্রস্তুত হাজারো ক্যামেরার লেন্স তাদের দিকে নয়, ঘুরে আছে বিজয়ীদের দিকে। এরপর এক বিস্ময়কর দ্রুততায় পায়ে পায়ে টানেলের দিকে চলে যায় তারা। বলাই বাহুল্য, সে গতি তাদের ছিল না ম্যাচের ৯০ মিনিটে।
চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে ৫-০ গোলে হারার অনুভূতি কেমন? এ মুহূর্তে এবং সম্ভবত বহু বছর ধরে, কেবল এই ইন্টার দলটিই সেই উত্তর জানবে। গ্যালারিতে, করিডোরে, এমনকি স্টেডিয়ামের বাইরে মেট্রো স্টেশনের দিকে যেতে যেতে কাঁদছিলেন বহু ইন্টার সমর্থক। আল্পস পেরিয়ে যারা এসেছিল আশার আলো নিয়ে, তাদের জন্য, এক প্রজন্মের জন্য এই রাত হয়ে থাকবে ফুটবলজনিত ট্রমার কারণ।
এখন আর কোনো হিসেবের দরকার নেই যে, এই দল গত তিন মৌসুমে দু-বার চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে উঠেছিল, এবং দু-বারই হেরেছে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগে গড়া ক্লাবের কাছে। এ যাত্রায় গর্ব থাকতেই পারে। কিন্তু শ্রেষ্ঠ ইন্টার দলগুলো কখনো শুধু যাত্রা নিয়েই সন্তুষ্ট ছিল না। বিশেষ করে যে যাত্রার শেষে এসে মনে হয়, নিষ্ঠুর আলোছায়ার ভেলকি ব্যতীত এটা আর কিছুই ছিল না। এখানে যা ঘটেছে তা কেবল একটি পরাজয় নয়, ছিল রীতিমত অপমান। ইউরোপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে যেন শাসন করা হলো স্কুলপড়ুয়াদের দলকে। এমন এক মানসিক চোট কাটিয়ে ওঠা যে কারো পক্ষেই প্রায় অসম্ভব। সিমোন ইনজাঘির দলের জন্য মিউনিখের দুঃস্বপ্ন দ্রুত যে কাটবে না, সেটা বলতে বেগ পেতে হচ্ছে না।
ইন্টার এমন এক দল, যারা আপনার ঘাম ঝরাবে, কষ্ট দেবে, শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবে। তারা প্রতি ইঞ্চি মাঠই রক্ষা করতে জানে, নিজেদের ডি-বক্সে রক্ত ঢেলে দেয়। এই প্রতিযোগিতায় তাদের শেষ তিন ম্যাচের স্কোরলাইন ছিল ৩-৩, ৪-৩ এবং শেষে ০-৫। দলের বয়স এবং ক্লান্তি আগে থেকেই জানা ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে দলটির ভেঙে পড়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু এমন এক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এভাবে আত্মপরিচয় চূর্ণ হয়ে যাবে—তা কেউ ভাবেনি। এই হার তাই কেবল একটি ম্যাচের গণ্ডিতেই আটকে থাকার নয়। ইন্টার যেন তাদের আত্মার একটা অংশ হারিয়ে ফেলেছে।
অন্যদিকে, পিএসজি যেন ফুটবলের এক দারুণ বুদ্ধিমত্তায় পরিণত হয়েছে। কেবল আক্রমণ বা রক্ষণে ভালো ছিল এমন নয়, বরং প্রতিটি ডুয়েলেও জয়ী হয়েছে লুইস এনরিকের শিষ্যরা। ফুটবলের কোনো আধুনিক যন্ত্রচালিত রূপ যেন দেখাল প্যারিস। দেম্বেলের মাঝমাঠে নামার প্রবণতা বন্ধ করা ছিল ইন্টারের পরিকল্পনায়। কিন্তু দেম্বেলে তখন কৌশল পাল্টালেন—আর মাঝখানে নামলেনই না। বরং উইং দিয়ে খেললেন। উইংব্যাকদের পেছনে ফাঁকা জায়গায় তিনি ও তার দলের উইঙ্গাররা নতুনভাবে গঠন করলেন আক্রমণ। ইন্টারের কৌশল ছিল পুনরাবৃত্তিতে ভরা। বিপরীতে পিএসজি প্রতিটি আক্রমণে তৈরি করল নতুন নতুন ধাঁধা। তালা খোলার জন্য ব্যবহার করল চাবির গোছার প্রতিটি চাবি।
বল পায়ে থাকলেই বরং ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা হচ্ছিল ইন্টারের। সম্মিলিত প্রেসিংয়ে যেন ইন্টারের রক্ষণভাগকে ছিঁড়ে খেল পিএসজি। মাঝমাঠকে পাত্তাই দিল না, আর সামনে থাকা দুই ফরোয়ার্ড লাউতারো মার্তিনেজ আর মার্কাস থুরাম প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে থাকলেন। পিএসজির প্রথম গোলটা এল রাইটব্যাক আশরাফ হাকিমির কাছ থেকে। কয়েক গজ দূর থেকে ফাঁকা পোস্টে বল ঠেললেন তিনি। তখনই ইন্টারের খেলোয়াড়রা একজন আরেকজনের তাকাচ্ছিলেন—যেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না, প্রতিপক্ষের রাইটব্যাক যদি ফাঁকা পোস্টে গোল করে, তবে তারা মাঠে আছে কেন!
ইন্টারের একমাত্র পথ হতে পারতো রক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা, স্কোরলাইনটা কিছুটা ধরে রাখা। কিন্তু তারা বারবার ধরা পড়ছিল কাউন্টার অ্যাটাকে। বল হারিয়ে ফেলার পর একই দুঃস্বপ্নের পুনরাবৃত্তি, যেখানে বারবার দেখা যাচ্ছে—দেজাইরে দুয়ে একা দৌড়াচ্ছেন গোলের দিকে। পরে বদলি হয়ে নামা ব্র্যাডলি বারকোলা এমন এক স্কিলে ফ্রান্সেসকো অ্যাচারবিকে ছাড়িয়ে গেলেন আর অ্যাচারবি গড়াতে থাকলেন ঘাসে। ম্যাচে ইন্টারের অসহায়ত্বের এত তীব্র প্রতিচ্ছবি আর হয়তো পাওয়া যাবে না।
ইন্টারের জন্য মৌসুমের সবচেয়ে করুণ সমাপ্তি হয়ে রইল মর্যাদার এই ম্যাচ। সিমোন ইনজাঘি ম্যাচের পরে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার কথা বলেছেন। কিন্তু এই দলে আদৌ ভবিষ্যৎ আছে কি? অ্যাচারবি ৩৭, ইয়ান সমার ও মিখিতারিয়ান ৩৬। যাদের ‘তরুণ’ বলা হচ্ছে সেই বাস্তোনি, মার্কাস থুরামদের বয়সটাও আর তরুণদের মধ্যে পড়ে না। ইনজাঘি হয়তো শিগগিরই সৌদি আরবের কোনো লিগে চলে যাবেন। আর ইন্টার? তারা এখন এক এমন ছোট মাছ যারা খেলছে রাষ্ট্রীয় অর্থে গড়া বড় বড় সুপার ক্লাবের পুকুরে। এই হার শুধু এক ম্যাচের স্মৃতি নয়, এটি তাদের নতুন বাস্তবতাও। একসময় যারা ইউরোপ শাসন করতো, তারা এখন নিজেদের সবচেয়ে অপমানজনক রাতের ছায়ায় নিজেদের নতুন করে খুঁজতে শুরু করবে।










