সেই ক্ষতই যেন ইতিহাস হয়ে ঝুলে ছিল মেক্সিকো সিটির আকাশে। এবারো প্রতিপক্ষ শুধু স্বাগতিক মেক্সিকো ছিল না; ছিল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতার ক্লান্তিকর পরিবেশ, ৮০ হাজারেরও বেশি দর্শকের গর্জন, বজ্রঝড়ে বিলম্বিত ম্যাচের অস্বস্তি এবং দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই জারেল কোয়ানসাহর লাল কার্ড। ১০ জন নিয়ে প্রায় ৪০ মিনিট লড়তে হয়েছে টমাস টুখেলের দলকে। একের পর এক আক্রমণে ইংল্যান্ডের রক্ষণকে চেপে ধরেছিল মেক্সিকো, প্রতিটি মুহূর্তে বাড়ছিল স্নায়ুচাপ। কিন্তু সব প্রতিকূলতাকে অগ্রাহ্য করে জুড বেলিংহামের জোড়া গোল, হ্যারি কেইনের নেতৃত্ব এবং জর্ডান পিকফোর্ডের অবিচল দৃঢ়তায় অবশেষে আজতেকার অভিশাপ ভেঙেছে ইংল্যান্ড। ইতিহাসের ভার নামিয়ে ৩-২ গোলের রুদ্ধশ্বাস জয়ে তারা জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বকাপের শেষ আটে।

বজ্রসহ ঝড়ের কারণে নির্ধারিত সময়ের ১ ঘণ্টা পর শুরু হয় ম্যাচ। শুরু থেকেই গ্যালারির উন্মত্ত সমর্থনে ভর করে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে মেক্সিকো। রাউল হিমেনেসের হেডসহ একাধিক সুযোগ তৈরি হলেও গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড দুর্দান্ত কয়েকটি সেভ করে দলকে বিপদ থেকে রক্ষা করেন। প্রথম দিকের চাপ সামলে ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে শুরু করে ইংল্যান্ড।

হাইড্রেশন বিরতির পরই আসে ম্যাচের প্রথম বড় আঘাত। ডান প্রান্তে বুকায়ো সাকার দারুণ ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের পর তার ক্রসে হ্যারি কেইন বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ডিফেন্ডারদের টেনে নেন। ফাঁকা জায়গায় ঢুকে নিখুঁত হেডে বল জালে পাঠান জুড বেলিংহাম। আজতেকার গর্জনের মাঝেই এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড।

মেক্সিকো সেই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই আবার আঘাত হানে টুখেলের দল। প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করে বল আদায় করেন অ্যান্থনি গর্ডন। বেলিংহামের পাস পেয়ে কেইন শট না নিয়ে বল ফেরত দেন মাঝখানে উঠে আসা বেলিংহামকে। এবারো ভুল করেননি রিয়াল মাদ্রিদের এ মিডফিল্ডার। ২ মিনিটের ব্যবধানে নিজের দ্বিতীয় ও দলের দ্বিতীয় গোল করে ইংল্যান্ডকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন।

তবে ম্যাচের নাটকীয়তার তখন কেবল শুরু। দুই গোল পিছিয়ে পড়েও দমে যায়নি স্বাগতিকরা। ফ্রি-কিক থেকে তৈরি হওয়া জটলার মধ্যে জুলিয়ান কিনিওনেস দুর্দান্ত ভলিতে ব্যবধান কমান। প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মুহূর্তে মেক্সিকো সমতায় ফেরার এক সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল। একটি কর্নার কিক থেকে রাউল জিমেনেজের হেড পোস্টের দিকে যাওয়ার পর মেক্সিকান ডিফেন্ডার সিজার মন্টেস বলটি নিয়ন্ত্রণে নেন এবং গোল করার জন্য একদম ফাঁকায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু অবিশ্বাস্য এক গোললাইন ক্লিয়ারেন্সের মাধ্যমে সেই যাত্রায় ইংল্যান্ডকে নিশ্চিত পতনের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেন সেই জুড বেলিংহাম।

বিরতির পর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই মেক্সিকো যেন নিজেদের কিছুটা হারিয়ে ফেলে এবং ইংল্যান্ড সে সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। নিকো ও’রিলি পোস্টে বল লাগালে ইংল্যান্ড তাদের লিড বাড়ানোর একটি চমৎকার সুযোগ হাতছাড়া করে। এর পরই ম্যাচের ৫৪তম মিনিটে সবচেয়ে বড় নাটকীয়তার জন্ম হয়।

জেসুস গাইয়ার্দোর পায়ে স্টাড তুলে ট্যাকল করেন ডিফেন্ডার জারেল কোয়ানসাহ। প্রথমে হলুদ কার্ড দেখালেও ভিডিও সহকারী রেফারির পরামর্শে রিপ্লে দেখে সিদ্ধান্ত বদলান আলিরেজা ফাঘানি। সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন কোয়ানসাহ। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের ইতিহাসে মাত্র চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে লাল কার্ডের তিক্ত অভিজ্ঞতা হলো তার।

১০ জনে নেমে পড়ার পর ম্যাচ পুরোপুরি বদলে যায়। মনে হচ্ছিল, মেক্সিকান আক্রমণ সামলানোই এখন ইংল্যান্ডের প্রধান কাজ। কিন্তু ঠিক সে সময়েই গোল কিক থেকে পিকফোর্ডের লম্বা বলে কেইন মাথা ছুঁইয়ে গর্ডনকে একা পাঠিয়ে দেন। গোলরক্ষক রাউল রাঙ্গেল তাকে ফাউল করলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। স্পটকিক থেকে শক্তিশালী শটে গোল করে ইংল্যান্ডকে আবার দুই গোলের স্বস্তি এনে দেন কেইন।

কিন্তু এ স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিজেদের বক্সে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ব্রায়ান গুতিয়েরেসকে ফাউল করেন কেইন। আবারো ভিএআরের সহায়তায় পেনাল্টি পায় মেক্সিকো। এবার রাউল হিমেনেস গোল করে ব্যবধান ৩-২ করেন। ম্যাচের শেষ ২০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে আজতেকা স্টেডিয়ামে যেন মেক্সিকান আক্রমণের এক প্রবল সুনামি বয়ে যায়। ১০ জনের ইংল্যান্ড বাধ্য হয়েই সম্পূর্ণ রক্ষণাত্মক কৌশল অবলম্বন করে এবং নিজেদের ডি-বক্সের আশপাশে একটি দুর্গ গড়ে তোলে। টুখেল জন স্টোনস, ড্যান বার্ন ও জেড স্পেন্সকে নামিয়ে বক্সের সামনে দেয়াল তৈরি করেন। এমনকি দলের অধিনায়ক ও গোলদাতা কেইনকেও তুলে নেন রক্ষণ শক্তিশালী করার জন্য। অন্যদিকে মেক্সিকো কোচ হাভিয়ের আগিরে একের পর এক আক্রমণভাগের খেলোয়াড় নামিয়ে সমতায় ফেরার শেষ চেষ্টা চালান। যোগ করা সময়ে ১১ মিনিট খেলা চলার পরও গোলের মুখ খুলতে পারেনি মেক্সিকো, আর তাতেই নিশ্চিত হয় ইংল্যান্ডের নাটকীয় জয়।

শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন। কেউ দুই হাত আকাশের দিকে তুলে উদযাপন করেন, কেউ আবার ক্লান্তিতে লুটিয়ে পড়েন। টুখেল ছুটে গিয়ে জোড়া গোলের নায়ক বেলিংহামকে জড়িয়ে ধরেন। ম্যাচ শেষে টুখেল বলেন, ‘এটা ছিল পাগলাটে এক ম্যাচ। প্রতিবারই যখন মনে হয়েছে আমরা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছি, তখনই নতুন কোনো ধাক্কা এসেছে। কিন্তু এ দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তারা কখনো বিশ্বাস হারায় না।’ হ্যারি কেইনও একই সুরে বলেন, ‘আজ শুধু একজন বা দুজন নয়, পুরো দলই নায়ক ছিল। এমন রাত আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম প্রিয় হয়ে থাকবে।’

১৯৬৬ সাল থেকে আজতেকায় ৮৯টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের মধ্যে মাত্র দুটিতে হেরেছিল মেক্সিকো। এ মাঠেই এবার তৃতীয় হারের স্বাদ পেল তারা, প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপেও। মেক্সিকোর কোচ হাভিয়ের আগুইরে আক্ষেপ করে বলেন, ‘বড় দলের বিপক্ষে সামান্য ভুলেরও চড়া মাশুল দিতে হয়, আমাদেরও তা-ই হয়েছে।’ তবে দলের লড়াকু মানসিকতার প্রশংসা করেন তিনি।

এ জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ নরওয়ে, যারা আগের ম্যাচে আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোলে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিদায় করে দিয়েছে। ১১ জুলাই মায়ামি গার্ডেন্সের হার্ড রক স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে দুই দল।