অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে শুরু হলো পেশাদার ক্রিকেট লিগ। বিশ্বব্যাপী ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টি২০ লিগের তালিকায় এবার যুক্ত হলো আমেরিকান মেজর লিগ ক্রিকেট (এমএলসি)। যদিও এ লিগটিকে বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য ‘‌বিঘ্নকারী’ হিসেবে দেখছেন অনেকে।

এর আগেও যুক্তরাষ্ট্রে টি২০ লিগ আয়োজনের চেষ্টা ছিল, তবে প্রতিবারই ব্যর্থ হয় আয়োজকরা। এমনকি এ বছর জানুয়ারিতে নাসার আইকনিক হাউস্টন স্পেস সেন্টারে জমকালো অনুষ্ঠানে খেলোয়াড় ড্রাফ করা হলেও পরবর্তী সময়ে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। এমএলসি আশা করছে, এবার আর তেমন কোনো সমস্যার মুখে তারা পড়বেন না।

যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির সহযোগী দেশ হওয়ায় এ লিগে ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স তাদের ঘরোয়া টি২০ ক্যারিয়ারে যোগ হবে না, যেমনটি ঘটেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্ষেত্রেও। 

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের দল কলকাতা নাইট রাইডার্স, মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স, চেন্নাই সুপার কিংস, দিল্লি ক্যাপিটালস মেজর লিগ ক্রিকেটের ছয় দলের চারটির মালিকানায় যুক্ত রয়েছে। বাকি দুটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার রাজ্য ক্রিকেট সংস্থা ক্রিকেট নিউ সাউথ ওয়েলস ও ক্রিকেট ভিক্টোরিয়া।

এখানে প্রথম মৌসুমে দলগুলো ‘‌নিজেদের মাঠ’ বলতে তেমন কোনো সুবিধা পাচ্ছে না। সব খেলা হবে বেসবল মাঠকে ক্রিকেট মাঠে রূপ দেয়া টেক্সাসের গ্র্যান্ড প্রেইরি এবং অপেক্ষাকৃত ছোট মাঠ নর্থ ক্যারোলাইনার মরিসভাইলে। 

টুর্নামেন্ট ডিরেক্টর জাস্টিন গিয়াল বলেন, ‘স্থানীয় সমর্থক বাড়াতে আমাদের যার যার এলাকায় খেলতে হবে। দুটি ভেন্যুতে খেলা মোটেও আদর্শ নয়। তবে শিগগিরই হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে ভিত্তিতে সূচি করা হবে। তাই পরের মৌসুমে আমরা ৩০ ম্যাচ রাখার পরিকল্পনা করছি। পরের মৌসুমে খেলা সানফ্রান্সিসকোতে রাখার কথা এরই মধ্য ভাবছি আমরা। আশা করি আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাজারে আমরা ২০ হাজার দর্শক ধারণক্ষম অন্তত ১০টি স্টেডিয়াম পেয়ে যাব। এটাই আমাদের লক্ষ্য।’

তবে অবকাঠামোগত দুর্বলতা সত্ত্বেও লিগটি একঝাঁক নামি ক্রিকেটার টানতে সমর্থ হয়েছে। ইংল্যান্ড থেকে আছেন জেসন রয় ও লিয়াম প্লাঙ্কেট। অবসর ভেঙে অ্যাশেজে ফেরা মঈন আলীকেও টার্গেট করেছিল লিগটি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অন্য তারকারা হলেন আফগানিস্তানের রশিদ খান, দক্ষিণ আফ্রিকার ফাফ ডু প্লেসি, ডেভিড মিলার, রাইলি রুশো, কুইন্টন ডি কক, কাগিসো রাবাদা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সুনীল নারাইন, কাইরন পোলার্ড, আন্দ্রে রাসেল এবং অস্ট্রেলিয়ার যুগল মার্কাস স্টয়নিস ও অ্যারন ফিঞ্চ। অজি তারকা স্টিভ স্মিথ ২০২৪ সালের আসরে খেলবেন বলে নিশ্চিত করেছে লিগটি। 

ক্রিকেটের বড় বড় নাম কীভাবে টানল মেজর লিগ? এ লিগের সহপ্রতিষ্ঠাতা ভারতের শীর্ষ মিডিয়া গ্রুপ ‘‌টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপ’। মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলাসহ আরো কিছু ডোনার এ প্রকল্পকে সামনে এগিয়ে নিতে এগিয়ে এসেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপ বাকিদের নিয়ে ১২ কোটি ডলারের তহবিল জোগান দিয়েছে। 

প্রথম মৌসুমে অংশ নিচ্ছে ছয় দল। আড়াই সপ্তাহের এ আসরে মোট ম্যাচ হবে ১৯টি। অংশগ্রহণকারী দলগুলো হলো এমআই নিউইয়র্ক, টেক্সাস সুপার কিংস, লস অ্যাঞ্জেলেস নাইট রাইডার্স, সিয়াটল ওরকাস, সানফ্রান্সিসকো ইউনিকর্ন ও ওয়াশিংটন ফ্রিডম। 

জাস্টিন গিয়াল আরো বলেন, ‘আইপিএলের দলগুলোকে সম্পৃক্ত করায় আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতা যেমন বেড়েছে, তেমনি খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফদের পাওয়াও সহজ হয়েছে। এছাড়া এ লিগটি আমাদের স্থানীয় ক্রিকেটারদের জন্য বিরাট আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।’

প্রতিটি দল ১৫ থেকে ১৮ জন খেলোয়াড় কিনতে ১১ লাখ ৫০ হাজার ডলার বাজেট পেয়েছে, যা ইংল্যান্ডে দ্য হানড্রেড টুর্নামেন্টের মতোই। যদিও এ টুর্নামেন্টে খেলা হানড্রেডের চেয়ে অনেক কম। জেসন রয় এখানে খেলে ১ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ডের মতো পাবেন। দ্য হানড্রেড খেলে তিনি বছরে পান ৬০ থেকে ৭০ হাজার পাউন্ড। 

এটাকে কেউ কেউ আইপিএলেরই মিনি ভার্সন হিসেবে দেখছেন। কেননা এখানে আইপিএলের চার মালিক যেমন রয়েছেন, তেমনি এর সহপ্রতিষ্ঠান ভারতীয় এবং ব্যাকরুম স্টাফদের অনেকেই ভারতীয়। গিয়াল বলেন, ‘‌এ নিয়ে লজ্জার কিছু নেই। বাণিজ্যিকভাবে বিশ্ব ক্রিকেটের কেন্দ্রে অবস্থান করছে ভারত। কিন্তু আমরা সম্পূর্ণরূপে নতুন ও নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরির চেষ্টা করছি। এটা অবশ্যই মিনি আইপিএল নয়। আমরা স্বকীয়তা আনার চেষ্টা করছি। আমরা যতটা সম্ভব পারি এমএলসিকে একটি আমেরিকান প্রডাক্ট হিসেবে রূপ দিতে চাই।’

যুক্তরাষ্ট্রে বেসবল জনপ্রিয় খেলা। কাজেই বেসবলে যেভাবে দর্শক টানা হয়, সেই কৌশল কাজে লাগিয়ে ক্রিকেটেও দর্শক আনার চেষ্টা করবেন গিয়ালরা। ইনিংসের বিরতিতে থাকবে বিনোদনের ব্যবস্থা। এ নিয়ে সিইও বলেন, ‘আমরা স্থানীয় কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করতে সব চেষ্টাই করব। এখানে বেসবল নাইট, বলিউড নাইট কিংবা অস্ট্রেলিয়ান নাইটের মতো আইডিয়া থাকবে। পরিশেষে আমাদের লক্ষ্য আমেরিকান মঙ্গল ও ক্রিকেটকে এগিয়ে নেয়া।’

আমেরিকান ক্রিকেট বাজার নিয়ে তিনি বলেন, ‘সম্ভাবনা শব্দটি আমি ঘৃণা করি। যুক্তরাষ্ট্রে এটি বহুল ব্যবহৃত। তবে হ্যাঁ, এখানে বড় এক বাজারের হাতছানি। খেলাটির প্রসার ঘটাতে পারলেই আমরা সেটা ধরতে পারব। এটা চীন কিংবা রাশিয়া নয়, এটা যুক্তরাষ্ট্র।’

যুক্তরাষ্ট্রের তারকা পেস বোলার আলী খান এ লিগ নিয়ে খুব আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলেন, ‘আমি দেখতে পাচ্ছি লিগটি অনেক বড় হবে। আমি মনে করি, আইপিএলের পর এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম লিগ হতে চলেছে। কেন? কারণ বাজার এখানে, পৃষ্ঠপোষক এখানে, টাকাও এখানে। এটা বড় এক দেশ। অনেক বেশি সুযোগ এখানে। এটা আমাদের জন্য জীবন বদলের এক সুযোগ।’

দুই দশকের মধ্যে এবারই প্রথম ওয়ানডে বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব খেলেছে যুক্তরাষ্ট্র। শ্রীলংকা, জিম্বাবুয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো বড় দল এখানে খেলেছে। শ্রীলংকা ও নেদারল্যান্ডস উঠেছে বিশ্বকাপে। জিম্বাবুয়ে ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ ব্যর্থ হয়েছে। টেস্ট দল আয়ারল্যান্ডও শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। কাজেই বিশ্বকাপের টিকিট কাটতে ব্যর্থ হওয়া নিয়ে কোনো আক্ষেপ থাকার কথা নয় আমেরিকানদের। তাদের আশা, মেজর লিগটি ঘরোয়া ক্রিকেটের উন্নতি ঘটিয়ে তাদের জাতীয় দলকে সামনে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। বিসিবি ও ক্রিকইনফো