‘ক্যারিয়ার শেষ হলে তার রান সংখ্যা দাঁড়াবে পাকিস্তানের সেরা ক্রিকেটারদের তালিকায়। এটা শুধু তার জন্য না, পৃথিবীজুড়ে যারাই ক্রিকেটকে পছন্দ করে, তাদের জন্যও আনন্দের।’

‘দ্য আইসিসি রিভিউ’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে কথাটা অজি গ্রেট রিকি পন্টিং বলছিলেন পাকিস্তান দলনায়ক বাবর আজম প্রসঙ্গে। শুধু রিকি পন্টিংই না, ক্রিকেটবোদ্ধাদের কাছে বাবর আজম বর্তমানে নিয়মিত চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এই তো বৃহস্পতিবার তাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) বর্ষসেরা ক্রিকেটার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হলো। সঙ্গে টানা দ্বিতীয়বারের মতো তিনি লুফে নিলেন বর্ষসেরা ওয়ানডে ক্রিকেটারের পুরস্কার। বছর শেষে সব ফরম্যাট মিলিয়ে ৪৪ ম্যাচে ৫৪.১২ গড়ে ২ হাজার ৫৯৮ রান ঝুলিতে তুলেছেন বাবর আজম। তার মধ্যে আটটি সেঞ্চুরি ও পনেরোটি হাফসেঞ্চুরি। প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে এক পঞ্জিকাবর্ষে দুই হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। গত বছর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পাকিস্তানকে টি২০ বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলতেও অবদান ছিল তার। নজরকাড়া সব উদাহরণই তাকে সবার থেকে আলাদা করেছে। ক্রিকেটের মাঠে একটানা ফর্ম ধরে রাখা কঠিন। বাবরের ঝাঁপিতে চমকের যেন শেষ নেই।

এশিয়া কাপ ও টি২০ বিশ্বকাপের ফাইনালে হারের পর অধিনায়ক হিসেবে কিছুটা সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন বাবর। প্রশ্ন তোলা হয়েছে নেতৃত্ব নিয়ে। তবে বাবর প্রমাণ করেছেন, পাকিস্তান দলে এখন পর্যন্ত তার বিকল্প নেই। পারলে তিনিই দলকে এগিয়ে নিতে পারেন। ইনজুরির কারণে প্রায়ই মাঠের বাইরে থাকেন শাদাব খান ও শাহিন শাহ আফ্রিদি। তাদের এ মুহূর্তে বাবরের বিকল্প মনে করাটা হবে আত্মঘাতী।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, বাবরের বিশেষত্বপূর্ণ অর্জনগুলো এসেছে অধিনায়কের চাপ কাঁধে রেখেই। গত বছর নয়টি ওডিআই ম্যাচের আটটিতেই জয়লাভ করেছে পাকিস্তান বাবরের নেতৃত্বে। ২০২২ সালে ২৬টি ম্যাচ খেলে জয়ের সংখ্যা ১৪। অধিনায়কের ভূমিকা পালন করা ছোট বিষয় নয়। টি২০ বিশ্বকাপের সময় সেটা আরো বেশি কঠিন। অথচ সেটাই বাবর করেছেন। খুব ভালোভাবেই করেছেন। অভিজ্ঞতার ঘাটতিটুকু পোক্ত করে নিলে হয়তো তাকে পাকিস্তানের সেরা অধিনায়কদের কাতারে দেখা যাবে।

২০২২ সাল যেন বাবর আজমের বছর হয়ে থাকবে ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে। আন্তর্জাতিক তিনটি ফরম্যাটেই দুর্দান্ত পারফর্ম করেছেন। টেস্টে রান সংখ্যা ১১৮৪, ওয়ানডেতে ৬৭৯ এবং টি২০-তে ৭৩৫ রান। বাবরের দিকে তাকিয়ে ক্ল্যাসিক্যাল পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের দেখতে পান পন্টিং। তিনি মনে করেন, বাবর আরো ভালো করার সক্ষমতা রাখেন। অধিকাংশ ব্যাটসম্যান তাদের স্বর্ণসময় পার করেন বয়স ত্রিশের ঘরে থাকা অবস্থায়। অথচ ১৯৯৪ সালে জন্মগ্রহণ করা বাবরের বয়স এখনো ত্রিশে পা-ই রাখেনি। সময় আছে, রয়েছে নিজের সক্ষমতাকে আরো উঁচুতে নেয়ার সুযোগ।

বাবর স্পিন ভালো খেলেন। ফাস্ট বলেও তার মুন্সিয়ানা নজরকাড়া। তার চেয়ে বড় কথা পৃথিবীর ভিন্ন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারা। গড়পড়তা ভালো খেলোয়াড় থেকে শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের আলাদা করে এ বৈশিষ্ট্য। বাবর সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশেও আধিপত্য বিস্তার করে থাকতে পারেন। তৈরি করে ফেলতে পারেন নিজস্ব বলয়।

একজন বাবরের মাধ্যমেই নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল উপমহাদেশের ইতিহাসে। আরেক বাবরের হাতে এখন পাকিস্তান ক্রিকেটের ভাগ্য। তার সময়ে পাকিস্তানি ক্রিকেটের নতুন যুগের শুরু হওয়া অসম্ভব না। ইনজামাম ও ইউনুস খানদের মতো সর্বকালের সেরা পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের মাটিতে বাবরকে ইতিহাস লিখতে হলে তৈরি হতে হবে সেভাবেই। আইসিসির বর্ষসেরা তকমা লাভ তাকে সে পথে এগিয়ে দিল। বাকি প্রাপ্তির জন্য অপেক্ষা সময়ের।