ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো সুপারস্টার নাম লিখিয়েছেন সৌদি আরবের ক্লাবে। ইউরোপিয়ান ফুটবলে রোনালদোর দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসিরও যোগ দেয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। শেষ মুহূর্তে তিনি সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলে নাম লেখান যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে। মেসি না গেলেও ইউরোপভিত্তিক বহু তারকার সৌদিতে নাম লেখানোর গুঞ্জন চলছে। রোনালদোর সাবেক সতীর্থ করিম বেনজেমাও সৌদি আরবের আল ইত্তিহাদ ক্লাবে যোগ দিয়েছেন।
ইউরোপের ফুটবলের জন্য সৌদি আরবের লিগ কি হুমকি হয়ে উঠছে? ইউরোপভিত্তিক তারকার মিছিলে আতঙ্কিত অনেকে। যদিও এতে ভয়ের কিছু দেখেন না ইউরোপিয়ান ফুটবল গভর্নিং বডি উয়েফার প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার সেফেরিন। তিনি বরং সৌদি আরবের বিপদ দেখছেন। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে থাকা ফুটলারদের পেছনে বিনিয়োগ করে ভুল করছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি।
রোনালদো বছরে পাচ্ছেন প্রায় ২০ কোটি ইউরো। ফরাসি গ্রেট বেনজেমা বছরে ১০ কোটি ইউরোয় চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। বেনজেমার আল ইত্তিহাদ ক্লাবে নাম লেখাতে সম্মত হয়েছেন তার স্বদেশী ও চেলসি মিডফিল্ডার এনগোলা কান্তে।
২০১৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার কান্তে চেলসির হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন। যদিও চোটের কারণে ২০২২-২৩ মৌসুমে তিনি মাত্র নয়টি ম্যাচ খেলতে পেরেছেন। এবার তিনি পাড়ি জমাচ্ছেন সৌদি আরবে। ইত্তিহাদের সঙ্গে তার তিন বছরের চুক্তি হবে বলে জানা গেছে। তিন বছরে তিনি অন্তত ৮৬ মিলিয়ন পাউন্ড পারিশ্রমিক পাবেন।
এর মধ্য দিয়ে ইংলিশ ফুটবলে তার সফল এক অধ্যায় শেষ হতে চলেছে। ২০১৫-১৬ মৌসুমে লেস্টার সিটিকে প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জিততে সাহায্য করেছেন তিনি। চেলসির জার্সিতে তিনি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, প্রিমিয়ার লিগ, ইউরোপা লিগ ও এফএ কাপ শিরোপা জিতেছেন। ২০১৬-১৭ মৌসুমে তিনি ফুটবল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের ‘ফুটবলার অব দ্য ইয়ার’ এবং প্রফেশনাল ফুটবলার্স অ্যাসোসিয়েশনের ‘প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার পান।
বেনজেমার কাছাকাছি অংকের চুক্তির প্রস্তাব আছে রিয়াল মাদ্রিদের ক্রোয়াট মিডফিল্ডার লুকা মডরিচের জন্যও। যদিও রোনালদোর পর সৌদি আরবের মূল টার্গেটে ছিলেন মেসি। দুজন মিলে ১২টি ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। দুই সক্রিয় ফুটবল সুপারস্টারকে নিতে পারলে সৌদি ফুটবলের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতো।
পিএসজির সঙ্গে চুক্তি নবায়ন না হওয়ায় ধারাবাহিক গুঞ্জন ছিল মেসিকে ঘিরে। সাবেক ক্লাব বার্সেলোনায় ফিরে যাওয়ার গুঞ্জনও ছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত অর্থ কিংবা আবেগের কাছে হার না মেনে তিনি ইন্টার মায়ামি ক্লাবকে বেছে নেন। এতে ফুটবল সংশ্লিষ্ট মানুষজন বেশ বিস্মিত হয়েছেন। তেমনি হতাশ হয়েছেন সৌদি আরবের ফুটবল অনুরাগীরা। কেননা তারা ভেবেছিলেন, আল হিলালের অভাবনীয় প্রস্তাব তিনি লুফে নেন। তাকে বছরে ৪০ কোটি ইউরো পারিশ্রমিকের প্রস্তাব দিয়েছিল সৌদি ক্লাবটি।
সৌদি লিগের শীর্ষ চারটি ক্লাবের মালিকানায় এসেছে পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড, যার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। এরপর থেকেই সৌদি লিগে অর্থের ঝনঝনানি এবং ইউরোপের বহু তারকা এ লিগে আকৃষ্ট হতে শুরু করেছেন। রোনালদো, বেনজেমার পথ অনুসরণ করে আরো অনেক তারকা শিগগিরই সেখানে নাম লেখাতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নেদারল্যান্ডসের এক সম্প্রচার মাধ্যম উয়েফা প্রেসিডেন্ট সেফেরিনকে প্রশ্ন করেছিল, খেলোয়াড়রা দল বেঁধে সৌদি আরব যাচ্ছে, এতে আপনি কি আতঙ্কিত? তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উত্তর দিয়েছেন, ‘না, না, না।’ এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, এটা সৌদি আরব ফুটবলের জন্য একটি ভুল সিদ্ধান্ত। তাদের জন্য কেন সমস্যা? কারণ তাদের একাডেমিতে বিনিয়োগ করা উচিত, তাদের কোচ নিয়ে আসা উচিত এবং নিজেদের খেলোয়াড়দেরই গড়ে তোলা উচিত। যেসব খেলোয়াড় ক্যারিয়ারের শেষ লগ্নে চলে এসেছে তাদের কেনার মধ্য দিয়ে ফুটবলের উন্নয়ন কোনোভাবেই হবে না। একই ভুল চীনও করেছিল, যখন তারা ক্যারিয়ার শেষ হওয়া কিংবা হতে চলা খেলোয়াড়দের কিনে নিয়েছিল।’
চীনের অন্যতম বড় রিক্রুট ছিল আইভোরিয়ান সুপারস্টার দিদিয়ের দ্রগবা। এছাড়া নিকোলাস আনেলকা ও ফ্রেডেরিক কানুর মতো ইউরোপভিত্তিক বহু তারকাকে সই করায় চীনের ক্লাবগুলো। সেখানে নাম লেখায় ব্রাজিলের মাঝারি মানের বহু তারকা। যদিও এ সময়টাতে চীনের পুরুষ ও নারী জাতীয় দল সেই অর্থে কোনো লাভবান হয়নি।
সেফেরিন বিষয়টি নিয়ে আরো বলেন, ‘আমাকে এমন একজন খেলোয়াড়ের কথা বলবেন কি, যে বয়সে তরুণ এবং সবে ক্যারিয়ার শুরু করেছে, সে সৌদি আরবে খেলছে? এখানে শুধু অর্থই সবকিছু নয়। খেলোয়াড়রা শীর্ষ প্রতিযোগিতাও চায়। আর শীর্ষ প্রতিযোগিতা হয় ইউরোপে।’
সৌদি আরব এমন সব তারকাকে টার্গেট করেছে যারা ইউরোপে সবকিছু জিতেছেন। তবে সবাই সৌদি যেতে চান না। মেসি গত বছর কাতারের মাঠে ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছেন এবং তিনি ইন্টার মায়ামিতে যোগ দিয়েছেন। অথচ তাকে ঈর্ষণীয় পারিশ্রমিকের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। এদিকে, লুকা মডরিচকে সৌদি আরব চাইলেও খুব সম্ভবত আরো এক মৌসুম রিয়ালে খেলবেন তিনি।
ইউরোপের ফুটবল তার শীর্ষ তারকাদের হারাচ্ছে কিনা, এ নিয়ে সেফেরিন বলেন, ‘আমরা তাদের হারাতে চাইনি। তারা এখনো ফুটবল খেলে। তবে ক্যারিয়ার শেষে তারা কেউ কেউ কোথাও গিয়ে কিছু অর্থ আয় করতে চায়।’
তবে মেসি, মডরিচ না এলেও নিউক্যাসলের মালিকানার মধ্য দিয়ে এরই মধ্যে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে থাকছে সৌদি আরব। নিউক্যাসল ইউনাইটেডের ৮০ শতাংশ মালিকানা পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের।










