২০০৬ সালে জিনেদিন জিদানের ফ্রান্স, ২০১০ সালে ওয়েসলি স্নাইডারের নেদারল্যান্ডস, ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে জার্মানির কাছে সে ঐতিহাসিক পরাজয় এবং সবশেষ দুই আসরে বেলজিয়াম ও ক্রোয়েশিয়ার কাছে হার। একের পর এক বিদায়ের গল্প জমেছে ব্রাজিলের ইতিহাসের তাকে।

এবার সেই দীর্ঘ দুই দশকের ইউরোপীয় জুজু কাটানোর মিশন আনচেলত্তির শিষ্যদের সামনে। আজ রাত ২টায় নিউ জার্সিতে যখন কার্লো আনচেলত্তির দল মাঠে নামবে আর্লিং হালান্ড আর মার্টিন ওডেগার্দের নরওয়ের বিপক্ষে, তখন সেই ভয়টা আবার নতুন করে জেগে উঠবে না বললে ভুল হবে।

এ ভয়ের একটা বিশেষ কারণ আছে। ২০১৮ সালের বেলজিয়াম আর ২০২২-এর ক্রোয়েশিয়া দুটো দলই বিশ্ব ফুটবলের চিরাচরিত পরাশক্তি নয়। তারা ছিল নিজ নিজ ইতিহাসের সেরা প্রজন্ম। এবার নরওয়েও সেই একই ছাঁচের প্রতিপক্ষ। ব্রাজিলের জার্সির ভার তাদের কাঁধে নেই, উল্টো তারা খেলবে হালকা মনে, নিজেদের ইতিহাসের সেরা তারকাকে সঙ্গী করে।

বর্তমান নরওয়ে দলটিকেও তাদের ইতিহাসের সেরা দল হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এমনকি ১৯৯৮ সালে যে নরওয়ে দলটি গ্রুপ পর্বে রোনালদোর ব্রাজিলকে হারিয়েছিল, বর্তমান দলটি তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী এবং ফুটবল বিশ্বে প্রশংসিত। তাদের দলে রয়েছেন আর্লিং ব্রাউট হালান্ডের মতো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা একজন স্ট্রাইকার এবং মার্টিন ওডেগার্ডের মতো ইউরোপের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার। এ দলটির ওপর ব্রাজিলের হলুদ জার্সির কোনো মানসিক চাপ নেই, বরং আছে নির্ভার হয়ে নিজেদের সেরাটা দেয়ার সুযোগ। নরওয়ে গ্রুপ আই-তে রানার্সআপ হয়ে এ পর্যায়ে এসেছে। এমনকি তৃতীয় ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে তারা তাদের মূল একাদশের প্রায় সবাইকে বিশ্রাম দেয়ার মতো ঝুঁকিও নিয়েছিল। রাউন্ড অব থার্টি টু-তে আইভরি কোস্টকে

২-১ গোলে হারিয়ে তারা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম জয়টি তুলে নিয়েছে।

এর আগে ১৯৩৮ ও ১৯৯৮ সালে নকআউটে উঠলেও তারা ইতালির কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল। নরওয়ের বর্তমান কোচ স্টেল সোলবাকেন ২৮ বছর আগে সেই ঐতিহাসিক ১৯৯৮ সালের দলের খেলোয়াড় ছিলেন। এখন কোচ হিসেবে দলকে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তার সামনে। গত দুই বছরে ১৭টি জয় এবং মাত্র তিনটি হার নিয়ে তার দল এখন দারুণ ফর্মে রয়েছে।

ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে বড় অস্বস্তির জায়গা হলো নরওয়ের বিপক্ষেই তাদের অতীত ইতিহাস। নরওয়ের বিপক্ষে খেলে ব্রাজিল কখনো জয়ের দেখা পায়নি। ১৯৮৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত চারবারের দেখায় দুটি ম্যাচ ড্র হয়েছে এবং দুটিতে হেরেছে সেলেসাওরা। যার মধ্যে ১৯৯৮ বিশ্বকাপের ২-১ গোলের সেই বিখ্যাত পরাজয়টিও রয়েছে, যেখানে বেবেতো গোল করে ব্রাজিলকে এগিয়ে নেয়ার পর তোরে আন্দ্রে ফ্লো ও কেতিল রেকদাল গোল করে নরওয়েকে জয় এনে দিয়েছিলেন। এ ঐতিহাসিক ক্ষত নিশ্চয়ই ভিনিসিয়ুসদের তাড়া করে ফিরবে।

ম্যাচের সবচেয়ে বড় মুখ অবশ্য হালান্ড। সলজবুর্গ থেকে ডর্টমুন্ড হয়ে ম্যানচেস্টার সিটি পর্যন্ত তার উত্থানের প্রতিটি ধাপে আনচেলত্তি ছিলেন প্রতিপক্ষের ডাগআউটে। নাপোলির কোচ হিসেবে যখন তরুণ হালান্ড বদলি হয়ে নেমেছিলেন, আর পরে রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হিসেবে সিটির নীল জার্সিতে তার মুখোমুখি হয়েছেন বারবার। আটটি সাক্ষাতে পাঁচ গোল করেছেন নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার, দুই জয়ের বিপরীতে দুই হার আর চার ড্র নিয়ে এক অদ্ভুত ভারসাম্যের ইতিহাস তৈরি হয়েছে দুজনের মাঝে। গোলরক্ষক আলিসনের সঙ্গেও তার সম্পর্ক জটিল—চারটি সাক্ষাতে দুই গোল করেছেন হালান্ড, একবার আলিসনের নিখুঁত পাসেই লিভারপুল জিতেছিল তাকে আটকে রেখে, আরেকবার গোলরক্ষকের ভুলেই বল জালে জড়িয়েছিলেন তিনি। আর গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসের সঙ্গে তো রীতিমতো দ্বৈরথ গড়ে উঠেছে বছরের পর বছর ধরে, মাঠের ভেতরে ধাক্কাধাক্কি আর মাঠের বাইরে টিপ্পনী মিলিয়ে যে লড়াইয়ে ছয় গোল করে স্পষ্টতই এগিয়ে আছেন হালান্ড।

কিন্তু শুধু হালান্ড নন, ব্রাজিলের চিন্তার কারণ ওডেগার্ডও, যিনি বুদ্ধিদীপ্ত পাসিং আর ছন্দ নিয়ন্ত্রণে দলকে পরিচালনা করেন মধ্যমাঠ থেকে। আর্সেনালের এ জুটি ওডেগার্ড ও মাগালহায়েস একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবেন, যা নিজেই এক বাড়তি নাটকীয়তা যোগ করে ম্যাচে।

ব্রাজিলের পথটাও অবশ্য আগের দুই বিশ্বকাপের চেয়ে আলাদা। ২০১৮ আর ২০২২ সালে মেক্সিকো আর দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে সহজ জয়ে শেষ ষোলো পার হয়েছিল তিতের দল, কঠিন পরীক্ষা আসেনি সেই পর্যন্ত। এবার গল্পটা ভিন্ন। জাপানের বিপক্ষে প্রথমার্ধে গোল হজম করে পিছিয়ে পড়েছিল ব্রাজিল। কিন্তু বিরতির সময় আনচেলত্তির কথায় বদলে গিয়েছিল ড্রেসিংরুমের বাতাস। গোল করে সমতা ফেরান কাসেমিরো, নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিটে জয়সূচক গোলটি করেন গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি।

এ জয়ের পেছনে আনচেলত্তির যে সিদ্ধান্তগুলো আছে, তার একটা বড় অংশ মনস্তাত্ত্বিক। ব্রাজিলের কোচিং স্টাফে প্রথমবারের মতো একজন মনোবিদ যুক্ত করেছেন তিনি, যার সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলে খেলোয়াড়দের মানসিক অবস্থা নিয়ে পরামর্শ নেন। নেইমারকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখার সাহসী সিদ্ধান্তও তারই, আর সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন নেইমার নিজেও। বুঝে গেছেন যে দলের নতুন তারকা এখন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র।

তবু মধ্যমাঠের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। লুকাস পাকেতার চোটে ছিটকে যাওয়া দলে কাসেমিরো আর ব্রুনো গিমারায়েসের জুটিকে একা লড়তে হতে পারে ওডেগার্ড-নিয়ন্ত্রিত নরওয়েজিয়ান মধ্যমাঠের বিপক্ষে। হলুদ কার্ড দেখে থাকা কাসেমিরোর জন্য আরেকটি কার্ড মানেই কোয়ার্টার ফাইনালে নিষেধাজ্ঞা, ঠিক যেমনটা হয়েছিল ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে বিদায়ের সময়। এ ঝুঁকি সামলাতে দানিলো সান্তোসকে তৃতীয় মিডফিল্ডার হিসেবে খেলানোর সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে, যদিও ফাবিনিও কিংবা আন্দ্রে সান্তোসের মতো বিকল্পও হাতে আছে আনচেলত্তির।

আক্রমণভাগে অবশ্য স্বস্তির খবর আছে ব্রাজিলের জন্য। দুই সপ্তাহ চোটে থাকার পর অনুশীলনে ফিরেছেন রাফিনিয়া, নেইমারও এখন পুরোপুরি সুস্থ—ফলে আনচেলত্তির হাতে বিকল্পের অভাব নেই। ভিনিসিয়ুস, কুনহা আর গিমারায়েস দুর্দান্ত ছন্দে আছেন, আর মরক্কোর বিপক্ষে ড্র দিয়ে শুরু করা দলটি ধীরে ধীরে গতি বাড়িয়েছে টুর্নামেন্ট এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে।

সব মিলিয়ে ব্রাজিলের জন্য ম্যাচটি শুধু নকআউট লড়াই নয়, ইউরোপের এক নতুন সোনালি প্রজন্মের সামনে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর চ্যালেঞ্জও। বেলজিয়াম আর ক্রোয়েশিয়ার পর নরওয়ে কি লিখবে সেই একই অধ্যায়ের আরেকটি পাতা, নাকি আনচেলত্তির ব্রাজিল অবশেষে ভাঙবে ২৪ বছরের অভিশাপ? উত্তর মিলবে নিউ জার্সির মাঠে, হালান্ডের বুট আর ভিনিসিয়ুসের গতির মাঝামাঝি কোথাও।