কয়েক মিনিট ধরে চলা সেই সুরের মধ্যেই স্পেন বল নিয়ে নাচছিল, আর বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রশংসিত দল ফ্রান্স হতবিহ্বল হয়ে দেখছিল নিজেদের বিদায়। ফরাসিদের শক্তি ছিল গতি। এমবাপ্পে, দেম্বেলে, বারকোলা ও ওলিসেকে সামনে রেখে দিদিয়ের দেশমের পরিকল্পনাও ছিল পরিষ্কার। স্পেন বল রাখবে, আর ফ্রান্স অপেক্ষা করবে একটি ভুলের জন্য। বল কেড়ে নিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রতিপক্ষের বক্সে পৌঁছে যাওয়ার সামর্থ্য তাদের ছিল। কিন্তু বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেন দেখাল, গতি যত ভয়ংকরই হোক, বল যদি প্রতিপক্ষের কাছে না থাকে, তবে সেই গতি শুধু সম্ভাবনা হয়েই থেকে যায়।
ফ্রান্সের সেই সম্ভাবনাকে শুরু থেকেই বন্দি করে রাখল স্পেন। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল কেবল বল দখলে রাখেনি, বলকে ব্যবহার করেছে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত, বিভ্রান্ত এবং শেষ পর্যন্ত অসহায় করে তুলতে। ছোট ছোট পাস, বল ছাড়া ছুটে যাওয়া, নির্দিষ্ট জায়গায় বাড়তি খেলোয়াড় তৈরি করা এবং হারানো বল মুহূর্তে পুনরুদ্ধার—স্পেনের ফুটবল ছিল নিখুঁত যন্ত্রের মতো। অথচ যাদের ‘ফরাসি মেশিন’ বলা হচ্ছিল, সেই ফ্রান্সই ধীরে ধীরে ছন্দহীন হয়ে পড়ল। মাঝমাঠে এ লড়াইয়ের নিয়ন্ত্রক ছিলেন রদ্রি। পেদ্রির অনুপস্থিতি পূরণ করার দায়িত্ব ছিল তার ওপর, কিন্তু তিনি যেন একজনের নয়, দুজনের কাজই করলেন। কখনো নিচে নেমে ডিফেন্ডারদের কাছ থেকে বল নিয়েছেন, কখনো ফাবিয়ান রুইসের সঙ্গে পাসের ত্রিভুজ গড়েছেন, আবার কখনো প্রতিপক্ষের আক্রমণের পথ বন্ধ করেছেন। তার পাশে রুইস বল ছড়িয়েছেন উদ্দেশ্য নিয়ে। তাদের সামনে ফরাসি মাঝমাঠকে দেখাচ্ছিল দিশাহীন। চুয়ামেনি খেলছিলেন নিজের স্বাভাবিক মানের অনেক নিচে, রাবিও কিছুটা প্রতিরোধ গড়লেও একা কিছু করার ছিল না।
ফ্রান্সের পরিকল্পনা ছিল স্পেনের ভুল থেকে গতি বের করা। কিন্তু ভুল করেছে তারাই বেশি। দেম্বেলে বল হারিয়েছেন, ওলিসে খেলায় প্রভাব রাখতে পারেননি, কুন্দে আক্রমণে উঠেও কোনো ধার তৈরি করতে পারেননি। এমবাপ্পে বারবার ছুটেছেন, কিন্তু সতীর্থদের সঙ্গে তার গতির সামঞ্জস্য ছিল না। তিনি যখন দৌড় শুরু করেছেন, পাস আসেনি; পাস যখন এসেছে, তখন স্পেনের রক্ষণ নিজেদের অবস্থান গুছিয়ে ফেলেছে।
স্পেনের প্রথম গোলটি ছিল দুই ফুটবল-দর্শনের বৈপরীত্যের ফল। মার্ক কুকুরেয়া বারবার বাঁপ্রান্ত দিয়ে উঠে আসছিলেন। কিন্তু ফ্রান্স তার ওভারল্যাপ আটকানোর কার্যকর কোনো পথ বের করতে পারেনি। এক আক্রমণে লুকাস দিনিয়ে বল পরিষ্কার না করে মাথা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে যান। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লামিনে ইয়ামাল মুহূর্তেই বিপদ বুঝে বলের সামনে চলে আসেন। দিনিয়ে তাকে কিক করে বসলে পেনাল্টি পায় স্পেন। সেখান থেকে মিকেল ওয়ারজাবালের গোল ছিল ম্যাচের গতিপথেরই স্বাভাবিক পরিণতি।
ফ্রান্সের সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তটি এসেছিল তাদের মূল অস্ত্র থেকেই। নিজেদের অর্ধ থেকে বল নিয়ে ছুটে যান এমবাপ্পে। সামনে খোলা জায়গা, সঙ্গে তার দুরন্ত গতি। মুহূর্তটি ফরাসিদের পরিকল্পনা সফল হওয়ার আদর্শ দৃশ্য হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু অনেকটা বাইরে এসে সুইপারের মতো বল সরিয়ে দেন সিমোন। দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রান্সের ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু তারা আবারো প্রথম ১০ মিনিট স্পেনের হাতে তুলে দেয়। দেশম পরে দেজিরে দুয়েকে নামান, তবু খেলার গতিপথ বদলায়নি। এর মধ্যেই পেদ্রো পোরো ও দানি ওলমোর সমন্বয়ে আসে দ্বিতীয় গোল। ওয়ান-টু পাস, সময়মতো জায়গা বদল এবং নিখুঁত ফিনিশিং।
দুই গোলে এগিয়েও স্পেন রক্ষণাত্মক হয়ে যায়নি। তারা বল রেখেছে, আবার আক্রমণ করেছে। ইয়ামাল ডান দিক থেকে ভেতরে ঢুকে বাঁ পায়ে দারুণ এক গোলও করেছিলেন, যদিও অফসাইডে সেটি বাতিল হয়। শেষ দিকে মরিয়া ফ্রান্সের বিপক্ষেও স্পেন আতঙ্কিত হয়নি। বরং বল নিজেদের কাছে রেখে সময় ও ম্যাচ—দুটিই নিয়ন্ত্রণ করেছে। অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে ফ্রান্সের গতি পরিণত হয়েছে হতাশায়।















