দুই টেস্ট, তিনটি করে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ম্যাচের সিরিজ খেলতে শ্রীলংকা সফরে গেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। এ সফরে তিন ফরম্যাটে বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দেবেন তিনজন ভিন্ন অধিনায়ক। টেস্টে নাজমুল হোসেন শান্ত, ওয়ানডেতে মেহেদী হাসান মিরাজ ও টি-টোয়েন্টিতে লিটন কুমার দাস। সাদা পোশাকের ক্রিকেটে এক বছরের জন্য বাংলাদেশের অধিনায়ক শান্ত। টি-টোয়েন্টিতে ২০২৬ বিশ্বকাপ পর্যন্ত এ দায়িত্ব পেয়েছেন লিটন।

শ্রীলংকা সফর থেকেই শুরু হয়ে যাবে বাংলাদেশের তিন সংস্করণে ভিন্ন অধিনায়কের যাত্রা। যেখানে দুই টেস্টে শান্ত, তিন ওয়ানডেতে মিরাজ ও তিন টি-টোয়েন্টিতে দলকে নেতৃত্ব দেবেন লিটন। সর্বশেষ ২০২২ সালে তিন সংস্করণে আলাদা অধিনায়কের নেতৃত্বে খেলেছে বাংলাদেশ। তখন টেস্টে মুমিনুল হক, ওয়ানডেতে তামিম ইকবাল ও টি-টোয়েন্টিতে দায়িত্বে ছিলেন মাহমুদউল্লাহ।

শ্রীলংকা সফরে প্রথমেই টেস্ট সিরিজ। মঙ্গলবার গলে শুরু হবে প্রথম টেস্ট। এ সফরে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলতে চান বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। সেই সঙ্গে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপেও উন্নতি করতে চান তিনি। বাংলাদেশ দলনায়ক বলেছেন, চলতি ২০২৫-২৭ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রে আগেরবারের চেয়ে দু-তিনটা টেস্ট বেশি জিততে চান তারা।

২০১৯ সালে শুরু হওয়া টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম চক্রে সাত ম্যাচে কোনো জয় পায়নি বাংলাদেশ। পরের চক্রে ১২ ম্যাচে ১টি জিতলেও তলানিতে ছিল তারা। সবশেষ ২০২৩-২৫ চক্রে পাকিস্তানকে তাদের মাঠে হোয়াইটওয়াশ করে চমক উপহার দেয় বাংলাদেশ। পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়েও একটি ম্যাচ জেতে তারা। আর ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডকে হারায় শান্তর দল।

সব মিলিয়ে ১২ ম্যাচে চারটি জিতে পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওপরে ৭ নম্বরে থেকে এবারের চক্র শেষ করে বাংলাদেশ। ধারাবাহিক উন্নতির এ পথে থেকে ধীরে ধীরে বড় স্বপ্নের দিকে এগোতে চান শান্ত। বৃহস্পতিবার মিরপুরে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন (টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ) শুরু করেছিলাম, এর আগের চক্রে একটি ম্যাচ জিতেছি। পরের চক্রে আমরা চারটা জিতেছি। তার মানে একটু উন্নতি হয়েছে। এ চক্রে লক্ষ্য থাকবে কীভাবে আমরা দু-তিনটা ম্যাচ বেশি জিততে পারি। যদি এভাবে ছোট ছোট চিন্তা করে এগোতে পারি, কেন নয়? একটা সময় হয়তো বাংলাদেশ ফাইনাল খেলবে। এ দুই বছরের মধ্যে আমরা কীভাবে আরো ভালো ফল পেতে পারি, সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।’

২০২৫-২৭ চক্রে নিজেদের লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ অধিনায়ক বলেন, ‘টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে আমরা গত বছর (চক্রে) ৭ নম্বরে শেষ করেছি। এ বছর তো অবশ্যই লক্ষ্য থাকবে যেন ৪-৫-৬ নম্বরের মধ্যে আসতে পারি। তাহলে খুব ভালো হয়। গত বছর (চক্রে) জয়ের হার সম্ভবত ৪৫ শতাংশ (আসলে ৪৫ পয়েন্ট ও ৩১.২৫ শতাংশ) ছিল। এখান থেকে যদি বাড়াতে পারি, ৫০-৫৫ বা ৬০ শতাংশ হলে, একজন অধিনায়ক হিসেবে আমার মনে হয়, ভালো একটা ফল হবে আমাদের।’

ঘরের মাঠেও পারফরম্যান্সে উন্নতি আনতে চান শান্ত। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের সবশেষ চক্রে তুলনামূলক ভালো করলেও ঘরের মাঠে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স সন্তোষজনক ছিল না। দেশে ছয় ম্যাচে মাত্র একটি জিতেছিল তারা। বিপরীতে দেশের বাইরে ছয় ম্যাচে ছিল তিন জয়। এবার আরেকটু এগোতে দেশের মাঠে ভালো করার দিকে জোর দিতে চান শান্ত। তিনি বলেন, ‘ঘরের মাঠের ম্যাচগুলো জিততে হবে। সবশেষ চক্রে ঘরে আমরা খুবই বাজে খেলেছি। ঘরের মাঠে যদি জিততে পারতাম, তাহলে (ওই চক্রে) হয়তো আরো দু-তিনটা ম্যাচ বেশি জেতা থাকত। চিন্তা সেটাই, ঘরে কীভাবে আমরা জিততে পারি। দেশে খেলা হলে আরো ভালো পরিকল্পনা করে খেলব ইনশা আল্লাহ। ঘরের বাইরে ভালো হয়েছে, এ আত্মবিশ্বাস কাজে দেবে। এ বছর যদি আমরা বাইরের মাঠেও ফল পেতে পারি, তাহলে এ চক্রে আমাদের ফল আরেকটু ভালো হবে।’

এবার চ্যালেঞ্জের নাম শ্রীলংকা। তাদের সঙ্গে টেস্টে ২৬ ম্যাচ খেলে বাংলাদেশের জয় মাত্র একটি। নিজেদের শততম টেস্টে শ্রীলংকার মাটিতেই এসেছিল জয়টি। আগে-পরে আর কখনো জিততে পারেনি বাংলাদেশ। গত বছর ঘরের মাঠে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হয়েছে বাংলাদেশ। এবারের সিরিজ নিয়ে শান্ত বলেন, ‘প্রস্তুতি মোটামুটি ভালোই হয়েছে। এটা বলব যে আরেকটু ভালো হতে পারত। পাকিস্তান সিরিজটা একটু দেরি হলো, যার কারণে সময়টা একটু কম পাওয়া গেছে কিছু ক্ষেত্রে। কিন্তু অজুহাত হিসেবে এটা দিতে চাই না। শ্রীলংকায় আমরা আগেও টেস্ট জিতেছি। আশা করি এবারো ভালো হবে।’

শ্রীলংকা সিরিজের দল নিয়ে বেশ খুশি বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক, ‘দল নিয়ে আমি খুবই খুশি। দলে যেসব ক্রিকেটারকে চেয়েছি, শতভাগ পেয়েছি। তাই অধিনায়ক হিসেবে দল নিয়ে আমি খুশি। যখন খেলা শুরু হবে, তখনই বুঝতে পারবেন আমরা কী চিন্তা করে দলটা বানিয়েছি। ওই বিষয়গুলো বুঝতে পারবেন কেন দলে একটা ওপেনার কম। কম্বিনেশনটা দেখলে সবার পক্ষে আরো ভালোভাবে বুঝতে সুবিধা হবে। আমাদের দলে চারজন করে পেসার ও স্পিনার আছে। মানে ভারসাম্য আছে। আমরা কন্ডিশন দেখে দুই ধরনের কম্বিনেশনেই যেতে পারি। দল নিয়ে আমি খুশি। ভারসাম্য করার মতোই দল।’

এদিকে, শ্রীলংকা সফর সামনে রেখেই নতুন ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে মিরাজকে দায়িত্ব দিয়েছে বোর্ড। কঠিন সময়ে নেতৃত্ব নিয়ে তাই নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক না করে, দলকে ভালো একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন মিরাজ। আগামী এক বছরের জন্য দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। তার নেতৃত্বে ২১টি ওয়ানডে খেলবে বাংলাদেশ।

২০২৩ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৪৩ ম্যাচে বাংলাদেশের জয় মাত্র ১৪টি। সবশেষ শান্তর নেতৃত্বে ১৩ ম্যাচে তারা জিততে পারে স্রেফ চারটিতে। আইসিসি র‍্যাংকিংয়ে ১০ নম্বরে নেমে গেছে বাংলাদেশ। দলের নাজুক অবস্থায় এক বছরের জন্য দায়িত্ব পেলেন মিরাজ। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শুক্রবার তার প্রথম সংবাদ সম্মেলনে জানতে চাওয়া হলো, অধিনায়কত্বের মেয়াদ ২০২৭ বিশ্বকাপ পর্যন্ত পেলে ভালো হতো কিনা? উত্তরে মিরাজ বলেছেন, ‘লম্বা সময় (দায়িত্বে) পেলে ভিশন ভালো থাকে। সামনে ওয়ানডে বিশ্বকাপ আছে। যেহেতু দল হিসেবে আমরা এখন একটু সংগ্রাম করছি, তাই বোর্ড হয়তো ভেবেছে এক বছরে একটা জায়গায় দাঁড় করাই দলকে। এরপর হয়তো পরবর্তী ধাপ দেখবে কন্টিনিউ করবে না কী করবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এখন সময় এসেছে ওয়ানডে দলকে একটা জায়গায় দাঁড় করানোর। আমাদের দুজন সিনিয়র ক্রিকেটার (মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ) অবসর নিয়েছেন। যারা সুযোগ পাবে তাদেরকে এ জিনিসগুলো বা কারা সুযোগ পাবে, আমার মনে হয় এক বছরের মধ্যে সেট করা যাবে।’

শ্রীলংকা সফরের টেস্ট স্কোয়াড

নাজমুল হোসেন শান্ত (অধিনায়ক), সাদমান ইসলাম, এনামুল হক বিজয়, মুমিনুল হক সৌরভ, মুশফিকুর রহিম, লিটন কুমার দাস, মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন, জাকের আলী, মেহেদী হাসান মিরাজ (সহ-অধিনায়ক), তাইজুল ইসলাম, নাঈম হাসান, হাসান মুরাদ, এবাদত হোসেন, হাসান মাহমুদ, নাহিদ রানা ও সৈয়দ খালেদ আহমেদ।