২৮ কারো জন্যই অবসরের বয়স না। ফুটবলারের জন্য তো নয়ই। সবুজ ঘাসে মহাকাব্য লেখার যুগ তখন শুরু হয় মাত্র। ক্ল্যাসিক খেলোয়াড় তার প্রমাণ। পঁয়ত্রিশ টপকে গিয়েও দিব্যি মাঠে টিকে আছেন রোনালদো ও মেসি। পাঁচটা ফিফা আসরে অংশগ্রহণ করে লিখে চলছেন পায়ের আখ্যান। কিন্তু জাস্ট ফন্টেইনের নিয়তিতে তা ছিল না। ইনজুরির জন্য ছেড়ে দিতে হয়েছে মাঠ। অবশ্য সবার নিয়তি একরকম হতে হবে, তার প্রয়োজনও নেই। বিশ্ববিজেতা হওয়ার জন্য আলেকজান্ডারকে দীর্ঘজীবী হতে হয়নি। এটাই ঠিক করেছিল জাস্ট ফন্টেইনের নিয়তি। ২৮ বছর বয়সে যখন অবসরে গেলেন, পেছনে তখন অনন্য অর্জন। প্রতিদিন কত রেকর্ড ভেঙে কত রেকর্ড তৈরি হয় ফুটবলের মাঠে। রেকর্ড নাকি তৈরি হয় ভাঙার জন্যই। কিন্তু ফন্টেইনের রেকর্ড সৃষ্টির ছয় দশক পরও তাকে স্পর্শ করতে পারেনি কেউ।
গত বুধবার ৮৯ বছর বয়সে বিদায় নিলেন ফরাসি কিংবদন্তি। যাত্রা করলেন পেলে আর ম্যারাডোনার সঙ্গে মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্যে।
১৯৫৮ সাল। ফুটবলের শিরোপা জিতেছিল ব্রাজিল। ১৭ বছর বয়সী পেলেকে কাঁধে তুলে উদযাপন করেছে তারা। একই বছরে প্রায় একই রকম দৃশ্যে ক্যামেরাবন্দি হয়েছে ফরাসি শিবির। যদিও সেমিফাইনালে সেবার ব্রাজিলের কাছে হেরেই ছিটকে পড়েছিল ফ্রান্স। তারপরও শুধু ফুটবল দল না, গোটা ফ্রান্স আপ্লুত হয়ে পড়ে জাস্ট ফন্টেইনে। বিশ্বকাপের এক আসরে ১৩টি গোল করেছে সে। এ রেকর্ড স্বাভাবিক না। সে আসরে ফুটবলের বরপুত্র পেলের গোল ছিল ছয়টি। সর্বশেষ কাতার বিশ্বকাপের আসরে ৮ গোল করে গোল্ডেন বুট ঝুলিতে তুলেছেন ফরাসি তরুণ এমবাপ্পে। ২০০২ সালে রোনালদো ৮ গোল করেছিলেন আসরে। কোনো এক আসরে একজন খেলোয়াড়ের দেয়াল এটি। অর্থাৎ ফন্টেইন ঠিক যতগুলো গোল করেছেন, বলতে গেলে তার অর্ধেক গোলই গোল্ডেন বুট জয়ের জন্য যথেষ্ট। এ রেকর্ড অদূর ভবিষ্যতে কেউ ভাঙতে পারবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। বিশ্বকাপের আসরে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ গোলদাতা মিরোস্লাভ ক্লোসা। ২৪টি ম্যাচে অংশগ্রহণ করে তার গোলসংখ্যা ১৬। আর ১৯টি ম্যাচে ১৫টি গোল করে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন ব্রাজিলের রোনালদো। ১৩ ম্যাচে ১৪ গোল করে তালিকায় তৃতীয় মুলার। ঠিক তাদের পরেই রয়েছে ফন্টেইন ও মেসির নাম। ফন্টেইন মাত্র ৬ ম্যাচে ১৩ গোল তুলেছেন ঝুলিতে। গড়ে প্রতি ম্যাচে দুটির চেয়েও বেশি। বর্তমান মাঠের জাদুকর মেসির ১৩টি গোল করার জন্য খেলতে হয়েছে ২৬ ম্যাচ। এ পরিসংখ্যান চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ফন্টেইনের শ্রেষ্ঠত্বকে।
তার জন্ম হয়েছে মরক্কোর মারাকেশে। মরক্কো তখন ফ্রান্সের উপনিবেশ। ফরাসি বাবা আর স্প্যানিশ মায়ের প্রশ্রয়েই ফুটবলের প্রতি বাড়ে দরদ। মারাকেশের স্থানীয় ক্লাব থেকে যোগ দেন কাসাব্লাঙ্কার ক্লাবে। তার দুই পায়ের সমান দক্ষতা, বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আর গোলস্কোরিংয়ের অবিশ্বাস্য ক্ষমতা তাকে অন্য সকলের থেকে পৃথক করেছে। ফরাসি ক্লাব নিস খাঁটি স্বর্ণ চিনতে ভুল করেনি। ১৯৫৩ সালে তুলে নিয়ে আসে ফ্রান্সের মাটিতে। সে বছরেই ফরাসি জাতীয় দলে হয়ে প্রথম মাঠে নামেন তিনি। প্রতিপক্ষ লুক্সেমবার্গ। চমকে দেন হ্যাটট্রিক উপহার দিয়ে। ১৯৫৬ সালে তাকে নিয়ে নেয় রিমে ক্লাব। ফন্টেইনের ক্যারিয়ারে স্বর্ণসময় পার হয়েছে মূলত রিমে ক্লাবেই। ইনজুরির কারণে ১৯৬২ সালে অবসর নেয়ার আগে পর্যন্ত এ ক্লাবেই যুক্ত ছিলেন।
জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তার মাঠে বিচরণ ছিল মাত্র সাত বছর। যদিও পরে মরক্কো ও পিএসজির কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে খেলোয়াড় হিসেবে তার অর্জনই ছাপিয়ে গেছে সব। ১৯৫৮ সালে পেয়েছিলেন ব্যালন ডি’অর। ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন ২০০৩ সালে তাকে গত ৫০ বছরের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে সম্মাননা দেয়। ২০০৪ সালে পেলের নির্বাচিত ১২৫ জন জীবিত ফুটবল কিংবদন্তির তালিকায় তাকে স্থান দেয়া হয়।
চৌকস যোদ্ধার মতো বল পায়ে যখন এগিয়ে যেতেন ফন্টেইন, তাকে মনে করা হতো অপ্রতিরোধ্য। স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের ৯৯ দশমিক ৯৪ রানের গড়ের মতো ফুটবলের ফন্টেইনের ১৩ অজেয় রেকর্ড হয়ে থাকবে। তার পরও একই আফসোস থাকে। যদি ফন্টেইন আরো কিছু ম্যাচ খেলতে পারতেন!










