ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের ২১ আসরে শুধু ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকানরাই আধিপত্য দেখিয়েছে। ১২ বার ইউরোপের দেশগুলো এবং নয়বার লাতিন আমেরিকার দেশগুলো বিশ্বকাপ জিতেছে।
আগামী ২০ নভেম্বর কাতারে শুরু হবে বিশ্বকাপ ফুটবলের ২২তম আসর। এই আসরটি ঘিরেও আলোচনায় দুই কনফেডারেশন—উয়েফা (ইউরোপ) ও কনমেবলের (লাতিন আমেরিকা) দেশগুলো। এবারো ফ্রান্স, জার্মানি, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল আলোচনায়।
এছাড়া অন্যান্য ফেডারেশনের দলগুলোর অর্জন একটু সমৃদ্ধ হলেও এক্ষেত্রে এখনো কিছুটা পিছিয়ে কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবল (কাফ)। ১৯৩০ সালে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর আফ্রিকার দেশগুলোর কেউ কখনই কোয়ার্টার ফাইনাল ডিঙাতে পারেনি।
তবে আসন্ন কাতার বিশ্বকাপে আফ্রিকানরা কোয়ার্টার ফাইনাল ছাড়িয়ে সেমিফাইনালে উঠতে পারে বলে মনে করেন দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক ফুটবলার ও কোচ পিটসো মোসিমানে।
এটি হতে পারে বিশ্বকাপে আফ্রিকানদের নতুন ইতিহাস। তিনি বলেছেন, আফ্রিকার একটি দল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের বাধা ভেঙে ফেলবে। যদি মহাদেশটির দলগুলো তাদের নিজস্ব কোচের ওপর আরো বেশি আস্থা রাখে।
আফ্রিকা থেকে কাতার বিশ্বকাপে খেলবে ঘানা, সেনেগাল, তিউনিসিয়া, মরক্কো ও ক্যামেরুন। বিস্ময়কর হলেও সত্য, ১৯৩০ সালে শুরু হওয়ার পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপে দেখা যাবে আফ্রিকার সবগুলো দলের কোচই নিজ নিজ দেশের। ঘানার কোচ অটো অ্যাডো, সেনেগালের আলিউ সিসে, তিউনিসিয়ার জালেল কাদরি, মরক্কোর ওয়ালিদ রেগরাগুই ও ক্যামেরুনের কোচ রিগোবার্ট সং। তারা সবাই দেশগুলোর সাবেক খেলোয়াড়ও ছিলেন।
মোসিমানে বলেন, আফ্রিকান কোচের ওপর আস্থা রাখাটা অনেক বড় ব্যাপার। এর ফলে মহাদেশে খেলার উন্নতি হবে, এটা দারুণ অনুভূতি, যেটা টিকিয়ে রাখতে হবে। এটি বিদেশী কোচদের বিরুদ্ধে প্রচারণা নয়। তবে আমাদের ফুটবল ফেডারেশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের সাধুবাদ জানাই। অনেকে বলেন, কেন আফ্রিকান দল বিশ্বকাপের শেষ আটের ওপরে যায়নি বা বিশ্বকাপ শিরোপার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি। আমি বিশ্বাস করি, এটি সেখানে যাওয়ার জন্য একটি বড় পদক্ষেপ।
দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক এ মিডফিল্ডার বলেন, আফ্রিকা অবশ্যই সেমিফাইনালের বাধা ভেঙে দিতে পারে, যদি আমরা আমাদের নিজস্ব কোচদের সমর্থন করি। যারা সত্যিই মানসিকতা, সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জ এবং পারফর্ম করার জন্য প্রয়োজনীয় পদ্ধতিগুলো বোঝে।
এর আগে মাত্র তিনবার আফ্রিকান দলগুলো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছে। তখন দলগুলোর কোচ ছিলেন ভিনদেশী। ১৯৯০ সালে ইতালিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে আফ্রিকার হয়ে প্রথমবার কোয়ার্টারে ওঠে ক্যামেরুন। তখন দলটির কোচ ছিলেন রাশিয়ার ভ্যালেরি নেপোমনিয়াশচি। ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আয়োজিত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলে সেনেগাল। তখন সেনেগালের কোচ ছিলেন ফ্রান্সের ব্রুনো মেটসু। সবশেষ ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে শেষ আটে উঠেছিল ঘানা। তখন দলটির কোচ ছিলেন সার্বিয়ার মিলোভান রাজেভাকের।
মোসিমানের কথা ফলতেও পারে কাতার বিশ্বকাপে। কারণ আফ্রিকার কোচগুলোর সম্প্রতি অর্জনও দারুণ। আলিউ সিসের নেতৃত্বে সেনেগাল এ বছর প্রথম আফ্রিকান নেশনস কাপ জেতে। ২০১৫ সাল থেকে তেরাঙ্গা লায়ন্সের দায়িত্বে রয়েছেন দলটির সাবেক এ ফুটবলার। তার অধীনে দ্বিতীয় এবং সব মিলিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে খেলবে সেনেগাল।
গত নেশনস কাপের শেষ ১৬ থেকে বিদায় নেয়ার পরে তিউনিসিয়ার দায়িত্ব নেন ৫০ বছর বয়সী জালেল কাদরি। তার অধীনে ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে দলটি। কিছুদিন আগে মরক্কোর প্রধান কোচ হন ওয়ালিদ রেগরাগুই। ৪৭ বছর বয়সী রেগরাগুই মরক্কোর হয়ে খেলেছেন ৪৫ ম্যাচ। তিনি গত মৌসুমে দেশটির ক্লাব ওয়াইদাদকে আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং ঘরোয়া লিগের শিরোপা জেতান।
১৯৯৪ সালে প্রয়াত লিওনার্ড এনসেকের পরে দ্বিতীয় ক্যামেরুনিয়ান হিসেবে বিশ্বকাপে নিজ দেশের কোচের দায়িত্ব পালন করবেন রিগোবার্ট সং। ২০০৬ বিশ্বকাপে ঘানার হয়ে খেলেছিলেন অটো অ্যাডো। গত জানুয়ারিতে নেশনস কাপ থেকে গ্রুপ পর্বে বিদায়ের পর ব্ল্যাক স্টারদের দায়িত্ব নেন ৪৭ বছর বয়সী সাবেক মিডফিল্ডার।
৫৮ বছর বয়সী মোসিমানে বলেছেন, এটা হাস্যকর, যে লোকেরা এই বিশ্বাস ধরে রাখে যে শুধু বিদেশীরা আফ্রিকান দলের জন্য ভালো। এই কোচরা ইউরোপ এবং অন্যান্য শীর্ষ দলের হয়েও খেলেছেন। তারা আধুনিক ধারণার সঙ্গে পরিচিত এবং আমাদের খেলোয়াড় ও ভক্তদের সম্মানের যোগ্য।
তিনি আরো বলেন, ২০ নভেম্বর আসুন, যখন টুর্নামেন্ট শুরু হবে, সবার চোখ থাকবে কোচদের দিকে, যারা আফ্রিকা মহাদেশের দলগুলোকে সেমিফাইনালে পৌঁছে দিয়ে ইতিহাস গড়তে পারে কিনা, তা দেখার জন্য। অন্তত আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে তাদের সফল হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে।










