যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই গতকাল লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির বার্তা সংস্থা এনএনএ। কয়েক মাস ধরে চলা সহিংসতা বন্ধের লক্ষ্যে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে এ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। খবর রয়টার্স।

ইসরায়েল দাবি করেছে, ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাব হিসেবেই তারা এ অভিযান চালিয়েছে। এক ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা জানান, দক্ষিণ লেবাননে অবস্থানরত ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর হিজবুল্লাহ ৫০টির বেশি প্রজেক্টাইল নিক্ষেপ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় যেসব স্থাপনাকে ‘হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেগুলোতে হামলা চালানো হয়।

রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থাটি জানায়, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ও ড্রোন দক্ষিণ লেবানন এবং বেকা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালিয়েছে।

অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ অভিযোগ করেছে যে ইসরায়েল শত শতবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, এ ধরনের হামলা ‘প্রতিক্রিয়াহীন থাকবে না’। একই সঙ্গে তারা ওয়াশিংটনের প্রতি ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে, যাতে হামলা বন্ধ করা হয়।

এক ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে বাহিনী নতুন নির্দেশনা পেয়েছে এবং তারা এখন আর আগ্রাসী অভিযান চালাচ্ছে না। বরং ইসরায়েল যাকে ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ বলে উল্লেখ করে, তার মধ্যে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

তিনি আরো জানান, গত ৪৮ ঘণ্টায় দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর হামলায় পাঁচ ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন।

দক্ষিণ লেবাননের কিছু অংশ এখনো ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, হিজবুল্লাহর হামলাগুলো যুদ্ধবিরতি চুক্তির ধারাবাহিক লঙ্ঘন।

তাদের দাবি, রাজনৈতিক নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তারা যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিক বা সেনাদের ওপর যেকোনো হামলার জবাব তারা কঠোরভাবে দেবে।

হিজবুল্লাহও বলেছে, তারা যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে ইসরায়েল যদি নতুন করে ভূখণ্ড দখল বা দখলদারিত্ব বিস্তারের চেষ্টা করে, তাহলে তার জবাব দেয়া হবে।

সংগঠনটির দাবি, গত শুক্রবার রাতে দক্ষিণ লেবাননের আলি আল-তাহের পাহাড় এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনী অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছিল। তখন তাদের যোদ্ধারা ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। এর পরপরই ইসরায়েল ঘোষিত অভিযান এলাকার ভেতরে ও বাইরে বিমান হামলা চালায়।

হিজবুল্লাহর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, লেবাননের অধিকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলকে ‘অবাধ চলাচলের স্বাধীনতা’ দেয়া হবে না। তার ভাষ্য, যতদিন ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননে অবস্থান করবে, ততদিন সশস্ত্র প্রতিরোধ বৈধ থাকবে।

নতুন করে শুরু হওয়া এ সহিংসতা শুধু যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়েই নয়, চলতি সপ্তাহে ঘোষিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। ওই সমঝোতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল লেবাননে সংঘাত বন্ধ করা।

সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাগুলোর একটি চালানো হয় টায়ারের বারিশ শহরের একটি তিনতলা আবাসিক ভবনে। স্থানীয় এক কর্মকর্তার মতে, ওই হামলায় একই পরিবারে বাবা-মা ও তাদের দুই সন্তান নিহত হন।

লেবাননের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, কফাররুম্মান-নাবাতিয়েহ সড়কে আরেকটি ইসরায়েলি হামলায় এক সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।

এনএনএ জানায়, ইসরায়েলি বিমান হামলায় নাবাতিয়েহ শহরে লেবাননের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি শাখা ধ্বংস হয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক বিবৃতিতে বলেছে, ভবনটি সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। এতে ব্যাপক বস্তুগত ক্ষতি হলেও কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আরবি ভাষার মুখপাত্র বলেন, হিজবুল্লাহ যদি তাদের কথিত বৈরী কর্মকাণ্ড ও চুক্তি লঙ্ঘন বন্ধ করে, তাহলে পরিস্থিতি শান্ত হতে পারে।

তিনি দাবি করেন, নিরাপত্তা অঞ্চলে ইসরায়েলের উপস্থিতির লক্ষ্য বেসামরিক মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করা নয়; বরং হুমকি দূর করা এবং হিজবুল্লাহর অবকাঠামো ধ্বংস করা।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ৪ হাজার ৫৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে চিকিৎসাকর্মী, নারী ও শিশুও রয়েছেন। তবে কতজন যোদ্ধা ছিলেন, সে তথ্য আলাদাভাবে দেয়া হয়নি।

অন্যদিকে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাতে অন্তত ৩২ জন সেনা ও চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

চলতি সপ্তাহে ঘোষিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতায় লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে সংশ্লিষ্ট পক্ষ ও তাদের মিত্রদের সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে।

তবে আলোচনার অংশ না থাকা ইসরায়েল এই সমঝোতার কিছু ধারার বিরোধিতা করেছে। তাদের মতে, এসব শর্ত লেবাননে তাদের সামরিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতাকে সীমিত করতে পারে।